বসন্তের_ঝরা_ফুল #পর্ব_২৪

0
19

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২৪
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
রাতের সেই বীভৎস তাণ্ডব শেষে যখন সকাল হলো, শিউলির মনে হলো, আজকের সকালটা বুঝি একটু বেশিই তাড়াতাড়ি চলে এলো। তার সাজানো পৃথিবীটা ধ্বংস করার জন্য আলোর বুঝি খুব তাড়া ছিল।
​শিমুলকে তামিমের লোকেরা তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। লোক দেখানো মহানুভবতা দেখাতে তামিম ডাক্তারকেও খবর দিয়েছিল।
শিউলি নিজের ঘরে জানালার ধারে পাথরের মতো বসে আছে। তার শূন্য দৃষ্টি বাইরে শিউলি গাছটার ওপর নিবদ্ধ। কী অদ্ভুত! আজ গাছটায় একটি ফুলও অবশিষ্ট নেই, সব ঝরে গেছে। ধুলোমাখা মাটির ওপর সাদা রঙের ফুলগুলো অবহেলায় পড়ে আছে কিছুক্ষণ পরেই হয়তো কারও পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে ওগুলো মিশে যাবে মাটির সাথে।

নিজের জীবনের পরিণতির সাথে মিল খুঁজে পেয়ে শিউলি এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি হাসল। তার বুকের ভেতরটা শিমুলকে একবার দেখার জন্য হাহাকার করে উঠছে।
​ইদ্রিস খন্দকার পাশের ঘরে বসে খাতা-কলম নিয়ে বিয়ের খরচের হিসাব মেলাচ্ছেন। কালকের অত বড় ঘটনার পর তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু জেদ। শিউলি ধীরপায়ে সেই ঘরে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়ের ছায়া দেখে ইদ্রিস খন্দকার মুখ না তুলেই কর্কশ স্বরে বললেন, “কী হয়েছে?”

​“আব্বা, আমার না খুব তৃষ্ণা পেয়েছে।” শিউলির কণ্ঠস্বর আজ একেবারেই নিস্প্রাণ, যেন ওপার থেকে কেউ কথা বলছে।

​মেয়ের অদ্ভুত কথা শুনে ইদ্রিস খন্দকার এবার তার দিকে তাকালেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“এইটা আমারে কইতাছো ক্যান? যাও, গিয়া পানি খাও।”

​শিউলি এবার ভীষণ করুণ স্বরে, এক বুক হাহাকার নিয়ে বলল,
“না আব্বা, এই তৃষ্ণা সাধারণ পানি দিয়া মিটবে না। আমার শিমুল ভাইরে একবার দেখার বড় তৃষ্ণা পেয়েছে। তুমি শুধু অনুমতি দাও আব্বা, আমি একবার দেখেই চলে আসব।”

​মুহূর্তেই ইদ্রিস খন্দকারের চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। তিনি হাতের কলমটা টেবিলে আছাড় দিয়ে ধমকে উঠলেন, “তোর কি লাজ-শরম সব চইলা গেছে? আমার সামনে খাড়াইয়া ওই পোলার কথা বলতে তোর বুক কাঁপতাছে না?”

শিউলি এক অদ্ভুত, শীতল হাসি হাসল। সে শান্ত গলায় বলল, “আমার কি আর কোনো মান-সম্মান অবশিষ্ট আছে আব্বা যে লাজ-শরম থাকবে? আপনি তো পিতা হয়ে নিজ হাতে জনসমক্ষে আমার সবটুকু সম্মান বিক্রি করে দিয়েছেন।”

​ইদ্রিস খন্দকার পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মেয়ের মুখের এই রূঢ় সত্য হজম করা কঠিন, কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করতে পারলেন না। শিউলি আবারও বলতে শুরু করল, “তবে আব্বা, আপনার ওপর আমার আর কোনো রাগ নেই, সত্যি বলছি। শুধু আপনার ওপর না, এই পৃথিবীর কারোর ওপরই আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। কষ্ট শুধু একটাই আমি আমার শিমুল ভাইরে পেলাম না। আমার জীবনের সব চাওয়া হয়তো পূর্ণ হবে আব্বা, কিন্তু এই একটা আজন্ম লালিত স্বপ্ন কোনোদিনও আর সত্যি হবে না।”

শিউলির কণ্ঠে কোনো কাঁপুনি ছিল না, চোখের কোণে এক ফোঁটা জলও ছিল না। মৃত মানুষের মতো এক প্রাণহীন গলায় কথাগুলো বলে সে ধীর পায়ে নিজের রুমে ফিরে এল। সে খুব ভালো করেই জানে, তার পাথর-হৃদয় বাবা এই জন্মে অন্তত তাকে শিমুলের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেবেন না।
​শিউলি আবারও জানালার ধারে সেই আগের জায়গাটিতে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঝরে পড়া ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে ভাবল ‘আচ্ছা, শিমুল ভাইয়ের কি জ্ঞান ফিরেছে? নাকি সে এখনো অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন? তার জন্য বোধহয় অজ্ঞান হয়ে থাকাই ভালো। জ্ঞান ফিরলে তো সে আবারও আমায় খুঁজে না পেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করবে।’

​প্রেম কি আসলেই কখনো সুখ দেয়? নাকি এটি মানুষের জীবনে সবথেকে বড় দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? শিউলির কানে এখন এক করুণ সুর বাজছে। সে অস্ফুট স্বরে আপনমনে গুনগুন করে গাইতে লাগল,
​ “এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,
প্রেম মিলে না,
শুধু সুখ চলে যায়,
এমনি মায়ারই ছলনায়…

​এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,
প্রেম মিলে না,
এরা ভুলে যায়, কারে ছেড়ে কারে চায়…”

​শিউলির গলার স্বর জানালার ওপারে বাতাসের সাথে মিশে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। তার জীবনের সব সুর বুঝি আজ ওই ঝরে পড়া শিউলি ফুলগুলোর মতোই মলিন হয়ে গেছে।

হঠাৎ শিউলির ভীষণ জোরে হাসতে ইচ্ছে হলো। এক পৈশাচিক আর অদ্ভুত হাসিতে তার বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু কেন এই অকাল হাসি, তা সে নিজেও জানে না। হয়তো চরম শোক মানুষকে পাগল করে দেয়, অথবা ভাগ্যের এই নিষ্ঠুর পরিহাস দেখে হাসি ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখা টকটকে লাল বেনারসিটা সে স্থির দৃষ্টিতে পরখ করে দেখল।
​ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন দিলওয়ারা বেগম। শিউলিকে দেখা মাত্রই তার মুখটা অপরাধবোধে কুঁচকে গেল। শিউলি তাকে দেখে আরও চওড়া হাসি হাসল, যেন সে কোনো পরম বন্ধুর দেখা পেয়েছে। সে শান্ত গলায় বলল,
“এসো খালা, বিছানায় এসে বসো।”

​মহিলাটা থরথর করে কাঁপছেন। তিনি পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে শিউলির থেকে খানিকটা দূরত্ব রেখে বিছানার এক কোণে জড়সড় হয়ে বসলেন। শিউলি বিছানার সাথে হেলান দিয়ে, দুই হাঁটু ভাঁজ করে তার ওপর মাথা রাখল। তারপর নিস্প্রাণ স্বরে প্রশ্ন করল,
“খালা, শুনলাম তোমার নাতনির নাকি গতকালই অপারেশন হয়েছে?”

​দিলওয়ারা বেগম যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। শিউলি আবারও ম্লান হেসে বলল,
“চমকানোর কিছু নেই খালা। যে অপারেশনের টাকা জোগাড় করতে পারোনি বলে কয়েকমাস ধরে কাজটা আটকে ছিল, সেই টাকা মাত্র দুই দিনে হয়ে গেল! যাক, ভালোই হলো, এবার তোমার নাতনি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবে। কিন্তু এত টাকা কোথায় পেলে খালা?”

​দিলওয়ারা বেগম কোনোমতে কাঁপা গলায় জবাব দিলেন, “আমার… আমার কিছু জমানো টাকা ছিল, সেখান থেকেই…”

​বাকি কথাটুকু আর শেষ করতে দিল না শিউলি। সে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল,
“থাক খালা, কষ্ট করে আর নতুন কোনো মিথ্যে বলতে হবে না। আমি সব জানি। এই টাকা তোমাকে তামিম দিয়েছে, তাই না?”

​দিলওয়ারা বেগম চোরের মতো মাথা নিচু করে বসে রইলেন। শিউলি এবার সোজা হয়ে বসল। তার চোখের দৃষ্টি এবার আগুনের মতো জ্বলছে। সে আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে বলল, “তোমার নাতনির বয়স তো মোটে তেরো বছর, খালা। তোমার নাতনির চেয়ে আমি আর কতটুকুই বা বড়? জোর গেলে পাঁচ-ছয় বছরের। কীভাবে পারলে খালা? আমার ইজ্জত বিক্রির টাকা দিয়ে নিজের নাতনির চিকিৎসা করাতে তোমার হাত একবারও কাঁপল না?”

শিউলির তীক্ষ্ণ সত্যের সামনে দিলওয়ারা বেগমের মিথ্যে দেয়ালটা মুহূর্তেই ধসে পড়ল। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে শিউলির হাত ধরতে চাইলেন,
“আমারে মাফ কইরা দে শিউলি… আমি বড় পাপ করছি রে মা!”

​শিউলি ঘৃণাভরে হাতটা সরিয়ে নিল। শান্ত কিন্তু বিষণ্ন গলায় বলল, “থাক খালা, আর ক্ষমা চাইতে হবে না। একদিক দিয়ে আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গেলেও অন্যদিক দিয়ে তো ভালোই হলো একটা নিষ্পাপ মেয়ের প্রাণ বাঁচল, এটাই বড় কথা। কিন্তু খালা, আমি যখন এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, তখন সবাইকে বুক ফেটে বলে দিও শিউলির শরীরে কোনো কলঙ্ক ছিল না। সেই রাতে যা রটেছিল, তার সবটাই ছিল সাজানো এক মিথ্যে।”

​দিলওয়ারা বেগম আর এক মুহূর্ত সেখানে বসার সাহস পেলেন না। অপরাধবোধের বোঝা নিয়ে তিনি প্রায় পালিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
​শিউলি আবারও হাসল। আজ মেয়েটার মুখ থেকে হাসি যেন সরতেই চাইছে না অথচ কিছুক্ষণ পরেই তার জীবনের সেই অন্ধকার লগ্নটি ধেয়ে আসবে। সে মনে মনে সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা ভাবল। সালিশি মজলিসে যখন দিলওয়ারা বেগমকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন তিনি কপালে করাঘাত করে বলেছিলেন যে, তিনি নাকি নাতিকে দেখতে সন্ধ্যায় বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। আর রাতে ফিরে এসে নাকি নিজের চোখে তামিম আর শিউলিকে আপত্তিকর অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন! সেই সাজানো সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই গ্রামের মানুষগুলো নেকড়ের মতো শিউলির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অথচ শিউলির স্পষ্ট মনে আছে, সেই রাতের বিশৃঙ্খলার মাঝে দিলওয়ারা বেগম নিজেই চিৎকার করে আশেপাশের মানুষকে জড়ো করেছিলেন, যাতে শিউলির অপবাদ চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে যায়।
​তামিমদের বাড়ি থেকে এখানে আসতে বড়জোর আধা ঘণ্টা লাগে। সময় ফুরিয়ে আসছে। শিউলি জানে, খুব শিগগিরই তার সেই সাজানো যমদূত এসে দরজায় কড়া নাড়বে।
★★★
​শিমুলের কাছে বসে আছেন আছিয়া বেগম। আদরের সন্তানের এই রক্তাক্ত আর নিথর দেহ দেখে কেঁদে কেঁদে তার চোখের দুটো লাল হয়ে গেছে। সেই গত রাত থেকে এখন অবধি শিমুলের জ্ঞান ফেরেনি। তার ওপর প্রচণ্ড জ্বরে ছেলেটার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আছিয়া বেগমের বুকটা আজ অনুশোচনায় ফেটে যাচ্ছে। তাঁর মনে হচ্ছে, কেন তিনি তাদের এই পালানোর পথে সায় দিলেন? কেন তিনি বুঝতে পারলেন না যে, এই শকুনের সমাজে ভালোবাসা এত সহজে ডানা মেলতে পারে না!
​হঠাৎ শিমুলের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। জ্বরের ঘোরে সে অস্ফুট স্বরে বারবার কী যেন বলছে। আছিয়া বেগম কান পেতে শুনলেন, ছেলেটা জ্বরের ঘোরেও বিড়বিড় করছে, “শিউলি… যাস না তুই… শিউলি!”

​আছিয়া বেগম পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকলেন, “শিমুল… ওরে বাপ আমার, শুনতে পাচ্ছিস? চোখ মেল বাপ!”

​শিমুল খুব ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেলল। ঝাপসা চোখে সামনে মা-কে দেখেই সে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল। বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসে হাহাকার ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আম্মা! শিউলি কই? শিউলি কি চলে গেছে?”

​আছিয়া বেগম ছেলের অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “তুই শান্ত হ বাপ! তোর শরীরে অনেক চোট, তুই একটু শুয়ে থাক।”

​কিন্তু শিমুলের কানে তখন কোনো বারণ পৌঁছাচ্ছে না। সে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে উন্মাদেরর মতো ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দিল। তার লক্ষ্য শিউলিদের বাড়ি। কিন্তু বাড়ির আঙিনা পার হওয়ার আগেই তামিমের আগে থেকে বসিয়ে রাখা পাহারাদারেরা লোহার মতো শক্ত হাতে তাকে জাপ্টে ধরল। তামিম জানত শিমুল শান্ত থাকবে না, তাই সে আগেই একদল গুণ্ডা শিমুলদের বাড়ির সামনে মোতায়েন করে রেখেছিল।
​শিমুল সেই দানবগুলোর কবজায় বন্দি হয়েও শরীরের শেষটুকু শক্তি দিয়ে শিউলিদের বাড়ির দিকে মুখ করে চিৎকার করে উঠল,
“শিউলি… ও শিউলি রে! তুই বিয়ে করিস না শিউলি!”

​কিন্তু সেই গগনবিদারী করুণ চিৎকার শিউলিদের বাড়ির উৎসবের বাজনার আড়ালে পৌঁছাল কি না, তা কেবল বিধাতাই জানেন।
★★★
শিউলিকে আজ অপূর্ব করে সাজানো হয়েছে। পরনে টকটকে লাল বেনারসি, মাথায় কারুকাজ করা ওড়না আর অঙ্গে জড়ানো সোনার গয়না সব মিলিয়ে তাকে এক অপার্থিব সুন্দরী লাগছে। প্রতিটি মেয়ের জীবনে এই সাজ সুখের বার্তা নিয়ে আসে, কিন্তু শিউলির কাছে এই লাল বেনারসি জ্বলন্ত এক কাফন। বাইরে বর সেজে দম্ভের সাথে হাজির হয়েছে তামিম। চলছে এলাহি কারবার। বিশালাকার ষাঁড় আর খাসি জবাই করে গ্রামের মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে। কোনো এক নিষ্ঠুর রাজ্য জয় করে আসা দস্যু রাজার মতো তামিমের মুখে আজ এক পৈশাচিক হাসি।

​ইদ্রিস খন্দকার বুক ফুলিয়ে মেহমানদারী তদারকি করছেন। বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা, আভিজাত্যে যেন কোনো কমতি না থাকে! কিন্তু এই উৎসবের বাদ্যি আর হইহুল্লোড়ের মাঝেই হঠাৎ ভেতর বাড়ি থেকে কয়েকটা কন্ঠ ভেসে আসলো কনে সাজানো মেয়েরা আর্তনাদ করে বলতে লাগল, “শিউলি! ও শিউলি, তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

​ইদ্রিস খন্দকার কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন, কনে সাজা শিউলি আগুনের গোলার মতো ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দিচ্ছে। তার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল এত মানুষের সামনে মেয়েটা আবারও তার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেবে? তামিমও রাগে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
​শিউলির গন্তব্য আজ কোনো অজানায় নয়, সে দৌড়াচ্ছে তার শিমুল ভাইয়ের দিকে। এলোমেলো পায়ে, বেনারসির আঁচল ধুলোয় লুটিয়ে সে উন্মাদিনীর মতো ছুটছে। ইদ্রিস খন্দকার চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় শিউলির পথ আগলে ধরলেন এবং তার হাতটা লোহার মতো শক্ত করে চেপে ধরলেন। দাঁতে দাঁত পিষে তিনি গর্জে উঠলেন,
“শিউলি! তুই আমার সম্মান এভাবে সবার সামনে শেষ করে দিতে পারিস না!”

​শিউলি তার বাবার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চেনা দৃষ্টি আজ উধাও; সেখানে খেলা করছে এক অপার্থিব স্থিরতা আর গভীর শূন্যতা। শিউলি নিস্পৃহ, নিস্তব্ধ কণ্ঠে বলল,
“আব্বা, এবার আমায় ছেড়ে দাও। আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। জীবনের এই শেষ বেলায় অন্তত একবার শিমুল ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে শান্তিতে মরতে দাও। খোদার কসম আব্বা, আমি আর তোমাদের কোনোদিন জ্বালাব না।”

​শিউলির সেই প্রাণহীন কথাগুলো যেন বাতাসের শীতিলতা বাড়িয়ে দিল। তার চোখেমুখে তখন এক চূড়ান্ত বিদায়ের আভা।
শিউলির সেই ভাঙা, হাহাকার ভরা কণ্ঠস্বরে এমন এক অদৃশ্য শক্তি ছিল যে, ইদ্রিস খন্দকারের পাথরের মতো শক্ত হাতজোড়াও অবশ হয়ে শিউলিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। শিউলি তার বাবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত করুণ এক চিলতে হাসি হাসল। যে হাতটা আজ শেষলগ্নে আলগা হলো, সেই হাতটা যদি গতকাল রাতে একবার মমতায় শিউলিকে ছেড়ে দিত, তবে কি আজ মেয়েটার এই করুণ দশা হতো?

​আশ্চর্যের বিষয়, সবসময় পিছু লেগে থাকা তামিমও আজ শিউলিকে আটকাল না। কেন সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, সেই উত্তর হয়তো তার নিজের কাছেও নেই। শিউলি আবার দৌড়াতে শুরু করল। লাল বেনারসির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, গয়নাগুলো শব্দ করে ঝরছে। কয়েক কদম গিয়েই সে হোঁচট খেয়ে ধুলোয় আছড়ে পড়ল। কিন্তু তার গন্তব্য যে আজ ধ্রুবতারা! সেই ব্যথার তোয়াক্কা না করে সে আবারও উঠে দৌড়াতে লাগল।

​ঠিক তখনই ভেতর বাড়ি থেকে শিউলির মা জাবেদা বেগম বুকফাটা চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটি কাঁচের শিশি। তিনি উঠানে আছাড় খেয়ে পড়ে বিলাপ করতে করতে বললেন,
“ও শিউলির বাপ! শিউলির ঘরে আমি এই খালি বিষের শিশিটা পাইছি গো! আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে!”

​এক মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত সবার রক্ত হিম হয়ে গেল। চারদিকে রটে গেল শিউলি তার অপমান আর যন্ত্রণার বোঝা সইতে না পেরে নীল বিষ পান করেছে।
​ওদিকে শিউলি টলতে টলতে শিমুলদের উঠানে গিয়ে এক অমানুষিক আর্তনাদ করে উঠল,
“শিমুল ভাই… ও শিমুল ভাই!”

​শিউলির সেই আর্তচিৎকার শুনে শিমুল উন্মত্তের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু সামনে তাকিয়ে সে যা দেখল, তাতে তার কলিজা যেন শুকিয়ে গেল। শিউলিকে দেখে তার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটল না, বরং এক চরম বিভীষিকা গ্রাস করল তাকে। বনের কোনো বিশাল বৃক্ষকে গোড়া থেকে কুঠার দিয়ে কেটে ফেললে তা যেভাবে মাটির দিকে নুয়ে পড়ে, শিউলি নামক সেই মায়াবী ফুলটিও আজ ঠিক সেভাবেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার জন্য নেতিয়ে পড়েছে।

শিমুল উন্মত্তের মতো দৌড়ে গিয়ে শিউলিকে ধরতে চাইল, কিন্তু তার আগেই শিউলির শরীরটা নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শিমুল ধপাস করে মাটিতে বসে শিউলির মাথাটা নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিল। তার কণ্ঠ আজ এতটাই ভাঙা আর রুদ্ধ যে, শব্দগুলো যেন ঠিকমতো বেরোতে চাইছে না। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“কী হয়েছে তোর শিউলি? কেন তুই এভাবে ঢলে পড়লি?”

​শিউলি কাঁপাকাঁপা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল তার প্রিয় মানুষটির দিকে। পরম মমতায়, জীবনের শেষ স্পর্শটুকু দিয়ে সে শিমুলের মুখখানায় হাত বুলাল। তার ঠোঁটের কোণে এক ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমি তো বলেছিলাম অন্য কারো নামে কবুল পড়ার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়। আমি তো মিথ্যে বলিনি। তাই তো মৃত্যুকে হাসিমুখে কবুল করে নিলাম।”

​শিমুল হাহাকার করে উঠল, তার চোখ ফেটে রক্তবর্ণ অশ্রু ঝরতে লাগল। সে চিৎকার করে বলল,
“কী কইতাছোস এসব আবোল-তাবোল! চল, তোরে এহনই হাসপাতালে নিতে হইবো। তোর কিছু হইতে দেব না আমি!”

​শিউলি এবার এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আরও কাঁপা কণ্ঠে বলল, “নড়ো না শিমুল ভাই… তোমার এই মুখখানা শেষবারের মতো দুচোখ ভরে দেখে নিতে দাও। আচ্ছা শিমুল ভাই, তোমার বুকে কি একবার আমায় মাথা রাখতে দেবে? আমার যে বড্ড ইচ্ছে তোমার বুকের ওই মাঝখানটায় একটু আশ্রয় নিতে!শেষ ইচ্ছে কি পূরণ হবে?”

​শিমুল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। শিউলির কথা শেষ হওয়ার আগেই সে তাকে দুহাতে পরম মমতায় নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জাপ্টে ধরল। শিউলি আজ তার স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছেছে। তার মনে হলো, যদি এভাবে আরও কয়েকশ বছর বেঁচে থাকা যেত! শিমুলের হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে শুনতে শিউলির চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে ভারি হয়ে এল।

​শিমুল আকাশের দিকে মুখ তুলে এক বুকফাটা আর্তনাদে ফেটে পড়ল,
“আল্লাহ! আমার ফুলকে তুমি এভাবে কেড়ে নিও না আল্লাহ! দোহাই লাগে তোমার, ওকে ফিরিয়ে দাও!”

​কিন্তু বিধাতার লিখন বড়ই নিষ্ঠুর। শিমুলের সেই গগনবিদারী চিৎকার গ্রামের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিলেও, শিউলির দেহটা শিমুলের বুকের ওপর ধীরে ধীরে নিথর হয়ে এল। একটি অপূর্ণ প্রেমের ইতি ঘটল একরাশ নীল বিষের বিষাদে।শিউলির ইচ্ছে পূরন হলো সে তার শিমুল ভাইয়ের বুকে মাথা রাখতে পেরেছে।

শিমুল হঠাৎ অনুভব করল, তার বুকের ওপর রাখা শিউলির দেহটা অদ্ভুতভাবে শীতল হয়ে আসছে। যে তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো একটু আগেও তার বুকে আছড়ে পড়ছিল, সেগুলো এখন একদম শান্ত। শিমুলের মনে হলো, হঠাৎ করে পুরো পৃথিবীটা থমকে দাঁড়িয়েছে চারপাশের সব শব্দ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা দৃষ্টিতে শিউলির মুখের দিকে তাকাল। শান্ত, স্নিগ্ধ দুটি চোখ বন্ধ হয়ে আছে ঠিক যেন গভীর ঘুমে নিমগ্ন কোনো রাজকন্যা।

​শিমুল আবারও শিউলিকে নিজের বুকের সাথে উন্মাদের মতো জাপ্টে ধরল। তার দুচোখ বেয়ে নোনা জল শিউলির নিথর মুখে গিয়ে পড়ছে। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“আমারে ভালোবাসা শিখাইয়া এখন কার কাছে রাইখা যাইতাছোস রে শিউলি? ও খোদা, তুমি ক্যান শুধু ওরে নিলা? আমাকেও সাথে নিয়ে যাও!”

​ততক্ষণে শিউলিদের বাড়ির উৎসবের কোলাহল শিমুলদের উঠানে এসে আছড়ে পড়েছে। তামিম যখন দেখল শিউলি লাল বেনারসি পরে নিথর হয়ে শিমুলের বুকে পড়ে আছে, তখন তার সমস্ত দম্ভ আর নিষ্ঠুরতা মাটির সাথে মিশে গেল। এক অদৃশ্য আঘাতে সে থমকে দাঁড়িয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। যে শিউলিকে সে জয় করতে চেয়েছিল, সে আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে এক অন্য জগতে চলে গেছে।
​শিমুল তখনও শিউলির নাম ধরে আর্তনাদ করে চলেছে,
“ফুল… ও ফুল! একবার চোখ মেল। আমারে ছেড়ে যাস না। তোর শিমুল ভাইরে এখন কে সান্ত্বনা দেবে? কে আমারে শাসন করবে? বল না তোর মতো করে আর কে আমারে ভালোবাসবে?”

শিমুল এবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে হাহাকার ভরা কন্ঠে বলল,
“ও আম্মা আমার শিউলি কথা কয় না ক্যান?ওরে কথা কইতে কও।শিউলি চুপ কইরা রইলো কেন।ও কি ঘুমাইতাছে?শিউলি তুই উঠ আমাদের একটা সুন্দর সংসার হইবো।তোর স্বপ্নের সংসার না কইরা তুই কেমনে বিদায় নিবি?আ্যইজ তোর শিমুল ভাই অনেক বোঝদার, আ্যইজ দরকার পড়লে সবাইরে খু’ন কইরা তোরে নিয়া পালাইয়া যামু।কথা দিতাছি শিউলি তুই খালি একবার চোখ খুল।”
শিউলি উঠলো না।একই ভাবে পড়ে রইল একটা লা’শ হয়ে।
​শিমুলের সেই বুকফাটা হাহাকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলো, উপস্থিত সবার চোখ জলে ভিজে গেল। কিন্তু শিউলি আর উঠল না। সে সমস্ত অপমান, অপবাদ আর না-পাওয়ার বেদনা থেকে মুক্তি নিয়ে চিরদিনের জন্য অভিমানী এক লা’শ হয়ে পড়ে রইল।
​শিউলি গাছ থেকে যেমন ভোরের আলো ফোটার আগে ফুল ঝরে যায়, শিউলি নামের মেয়েটিও জীবনের সব আলো ফোটার আগেই ঝরে গেল শিমুলের সেই শূন্য বুকে।
আজ বসন্তের শেষ দিন।বাংলায় চৈত্র মাসের ত্রিশ তারিখ।ইংরেজিতে এপ্রিল মাসের তেরো।বসন্তের শেষ দিনে শিউলি নামক একটা ফুল অকালে সারাজীবনের জন্য ঝরে গেল।এটা কে “বসন্তের ঝরা ফুল” নামেও ডাকা যায়।
ঝরে গেল সমাজের বুক থেকে একটা পবিত্র ভালোবাসা।ঝরে গেল একটা পবিত্র আত্মার সংসার করার স্বপ্ন।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here