যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৩৬]

0
27

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩৬]

রান্নাঘরের পাশে সদ্য ফুলের কলি ধরা মরিচ গাছটা ছাগলে খেয়ে ফেলেছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ওই গাছটাতে রোজ পানি দিতেন মর্জিনা। অথচ আজ সেই গাছের গোড়া ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।দৃশ্যটা দেখেই তাঁর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। হাত থেকে নিমের ডাল মাটিতে ছুঁড়ে চিৎকার চেঁচামেচিতে মাথায় তুললেন সারা বাড়ি। দৌড়ে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে টেনে আনলেন পাশের বাড়ির রফিকের বউ রিতাকে। রিতা মুখ দিয়ে বিশ্রী সব গালি দিতে দিতে বললো,“ছাড় মাগী, আমার চুল ছাড়।”

“ছাড়মু না। ফহিন্নির ঘরের ফহিন্নি! জায়গা জমি নাই তারপরেও এত্তগুলা ছাগল, মুরগি পালোস ক্যান? আর পাললেও দেইখা রাখতে পারোস না? আমার মরিচ গাছটায় মাত্র কলি ধরছিল, কত যত্নের গাছ! এহন এর ক্ষতি পূরণ কেডায় দিবো?”

“তুই বেড়া দিতে পারোস নাই?”

“আমি বেড়া দিমু ক্যান?”

“তগো বাড়ির ছাগলেই খাইছে। আমগো ছাগলে এইত্তা খায় না। এক্কেবারে জাতের ছাগল।” বলেই মর্জিনাকে খামচে ধরে, হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো রিতা। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে চুলে বাঁধলো খোপা।

নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রেগে গেলেন মর্জিনা। কিছু কিছু জায়গায় চামড়া উঠে রক্ত জমাট বেঁধেছে। গর্জে উঠে বললেন,“দুইবেলা ভাতের ফেন আর মাইনষের বাড়িত ছাইড়া দিয়া পালা ছাগল নাকি জাতের ছাগল। থাপড়াইয়া তোরে ছাগল পালন শিখাইয়া দিমু, অসভ্য।”

মর্জিনা যেমন ঝগড়ুটে তেমনই রিতা হচ্ছে এলাকার সবচেয়ে নির্লজ্জ মহিলা। বুকে ঠিকমতো কাপড় থাকে না, এলোমেলো শাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সারা গ্ৰাম। এবারেও পরনের শাড়ি হাঁটু পর্যন্ত উঁচু করে মুখ বিকৃত করে বললেন,“আয় দেহি, তোর গায়ে কত জোর! হাত ভাইঙা গলায় ঝুলাইয়া দিমু। আমিও গাজী বংশের মাইয়া।”

মর্জিনা হাসলেন‌।কটাক্ষ করে বললেন,“গাজী কোনো বংশ হইলো? তুই মাইয়াও ফহিন্নি বাড়ির, আর বউও ফহিন্নি বাড়িরই। বংশ হইলো আমারটা। পালোয়ান বংশের মাইয়া আমি। বিয়া হইছে শাহ বাড়িত। আমার ঠ্যাং এর সমান যোগ্যতা আছে তোর?”

ঝগড়া ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিলো। সামান্য একটি মরিচ গাছ আর ছাগল থেকে শুরু হয়ে চলে গেলো বংশ পরম্পরা, বাপ, স্বামী আর সন্তান পর্যন্ত। মিছরি অবাক হয়ে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাদের কান্ড কারখানা দেখছে। আচমকা তার কানের লতিতে শিরশির করে উঠলো। কেউ বলে উঠলো,“ভালা কইরা শিখা রাখো, বউ। ভবিষ্যতে কাজে লাগবো। এমনিতেও তোমার লগে ঝগড়া কইরা মজা পাই না।”

মিছরি লাফিয়ে উঠলো। বুকে থুথু ছিটিয়ে পিছু ফিরে দেখলো নাজির দাঁড়িয়ে। তার দিকেই ঝুঁকে আছে কিন্তু দৃষ্টি হচ্ছে ঝগড়া করতে থাকা চাচী আর পাশের বাড়ির অসভ্য মহিলার দিকে স্থির। মিছরি সেদিকে একপলক দেখে দ্রুত স্বামীর চোখের সামনে হাত রেখে আড়াল করল দৃশ্যটি।
আচানক আক্রমণে বিব্রত হলো নাজির। স্ত্রীর হাতটা সরানোর চেষ্টা চালিয়ে বললো,“এইডা লুকোচুরি খেলার সময় না, বউ। রাইতে সবাই ঘুমাইয়া গেলে না হয় একলগে খেলমু। এহন হাত সরাও।”

“সরাবো না, দৃষ্টির হেফাজত করুন। মহিলার শরীর বেরিয়ে আছে, ওদিকে তাকালে পাপ হবে।”

“ঘরে আইয়ো, তোমার দিকে তাকাই।”

“চুপ থাকেন।”

“জামাইরে ধমকাস!”

“কথা না শুনলে ধমকাতেই হয়।”

নাজির মুচকি হাসলো। নরম হাতটা সরিয়ে দিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো মেয়েটির গালে। ঘুরে অপরদিকে যেতে যেতে বললো,“আমি হইলাম বাধ্য সোয়ামি। হুনলাম না হয় বউয়ের কথাই।”

ঝগড়া ক্রমেই বাড়তে থাকলো। চিৎকারে আশপাশ থেকে মানুষ এসে বাড়ির ফটকে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে। অবশেষে ভেতর থেকে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন মুমিনুল শাহ। ধমক দিয়ে বললেন,“এই! বাড়িতে হইতাছে কী এইসব? চুপ সবাই!”

পুরুষালি হুঙ্কারে দুজনেই থেমে গেলেন। স্বামীকে দেখে মর্জিনা ছুটে এলেন। আহত হাতটা সম্মুখে ধরে দেখাতে দেখাতে বললেন,“দেহেন, দেহেন ওই চুন্নি মাগী আমার হাতটার কী অবস্থা করছে।”

মুমিনুল শাহ আঁতকে উঠলেন। লোকটা যেমনই হোক না কেন, স্ত্রীর কাছে ভীষণ নরম মনের মানুষ। মুখ মলিন করে রিতার দিকে রাগত দৃষ্টিতে তাকিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,“এইডা তুমি কী করলা, রফিকের বউ?”

“শুরু তো করছে আমনের বউয়ে। আমার চুলের মুঠি ধরছে ক্যান?”

“তার লাইগা তুমি আমার সন্তানের মায়ের গা থাইক্যা রক্ত ঝরাইবা?”

মর্জিনা বললেন,“শুধু তাই না, আমার মরিচ গাছটা ওর ছাগলে খাইয়া ফেলাইছে। আমি ভাবছিলাম প্রথম মরিচটা আমনেরে খাওয়ামু, কিন্তু ওর ছাগলে সব নষ্ট কইরা দিছে। এহন ওয় অস্বীকার করে। উল্ডা আমগো জাত লইয়া কথা কয়, নাজমুলের বাপ।”

মুমিনুল শাহর মায়া হলো। স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে রিতাকে ধমক দিয়ে বললেন,“ওর কাছে মাফ চাইয়া সব ভুল স্বীকার করো। না হইলে আইজ কুরুক্ষেত্র বাইন্ধা যাইবো। তুমি আমার বউরে মাইরা ফেলাইতে চাইছো। তাই আমি চেয়ারম্যান, মেম্বার ডাইকা আইন্না তোমার বিচার বসামু।।”

নাজির গোয়ালঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,“এর থাইক্যা আমনের থানায় যাওয়া উচিত, চাচা। কোমরে দড়ি বাইন্ধা সবার সামনে দিয়া যহন টানতে টানতে লইয়া যাইবো তহন হের শিক্ষা হইবো।”

ভাতিজার কথায় সহমত হলেন লোকটা। মাথা নাড়িয়ে বললেন,“নাজিরে ঠিক কইছে। পুলিশের কাছে গিয়া তোমার নামে মামলা করমু। এহন মাফ চাইবা নাকি জেলে যাইবা?”

রিতা মুখ বাঁকালো। থুথু ফেলল উঠোনে। যেতে যেতে বলে গেলো,“যা করার করেন। এই খবিশ মহিলার কাছে রিতায় জিন্দেগীতেও মাফ চাইবো না।”

মর্জিনা তেতে উঠলেন,“আমনের সামনে আমারে খবিশ কইয়া গেলো, নাজমুলের বাপ। আমি কী খবিশ?”

“তুমি চিন্তা কইরো না, বউ‌। ওই চুন্নির নামে আমি মানহানির মামলা করমু।”

“মামলা দিলে হইবো না। ওর লগে আমারে জিততে হইবো। তাড়াতাড়ি শাহরিয়ার, নাজমুলরে বিয়া দেন। ওগো বউ লইয়া ওই রিতারে আমি রাস্তায় ফালাইয়া পিডামু।”

“আইচ্ছা, তুমি কোনো চিন্তা কইরো না। আমি আইজ গিয়াই ঘটকের লগে কথা কইতাছি।”

স্বামীর কথায় সন্তুষ্ট হলেন মর্জিনা। মুহূর্তেই মরিচ গাছের কথা ভুলে গেলেন। নাজমুল, শাহরিয়ার সিঁড়িতে বসে ছিল এতক্ষণ। ঝগড়া শেষে প্রসঙ্গ তাদের দিকে যেতেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বলে উঠলো,“এনে আমগো বিয়ার কথা আইলো কইত্তে?”

শাহরিয়ার দুদিকে মাথা নাড়ালো। অর্থাৎ সে জানে না।

সেই কাক ডাকা ভোরে মিল্টন আর লতিফ এসে দুধ ধুইয়ে নিয়ে গিয়েছে দোকানের উদ্দেশ্যে। নাজিরের হাতে আপাতত কাজ নেই। গোয়াল ঘরে যোগ হয়েছে নতুন এক জোড়া গরু। বাছুর ছাড়া বাকিগুলোকে সে বের করে না, ঘাস কেটে এনেই খাওয়ায়।

ভাই বউয়ের ঝগড়া, চেঁচামেচিতে বিরক্ত আমিরুল শাহ। দুই হাত পেছনে রেখে উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন তিনি। কোথাও বের হবেন সম্ভবত। অদূরে বসে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা করতে থাকা নাজিরের দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “তোর ব্যবসা বাণিজ্য দেহি ভালাই চলতাছে।”

নাজির না তাকিয়েই উত্তর দিলো,“আল্লাহর রহমতে ভালাই।”

“দুধ কী এহন আর গোয়ালার কাছে বেচোস না? মিল্টনরে দেখলাম পিকআপে তুলতাছে।”

“না, মিষ্টির দোকানে যায়।”

“ওহ, ভালাই। কেমন লাভ হয়?”

উত্তর দিলো না নাজির। পাল্টা প্রশ্ন করল,“আড়ত কেমন চলে? হুনছি, সব ধরণের কাঁচামালও নাকি এহন যোগান দেওয়া শুরু করছেন?”

“হ, সামিউলে আইয়া কইলো কাঁচামালের চাহিদা নাকি বাড়তি।”

“লাভ কেমন?”

“চলে আরকি। তেমন ভালা না।” উদাস কণ্ঠে বললেন।

নাজিরের হাসি পেলো। লোকটা জীবনেও একটু শুকরিয়া আদায় করতে পারে না। দ্বিগুণ লাভ হলেও একই কথা বলে নিজেকে হতাশ দেখানোর প্রচেষ্টা চালায়। আমিরুল শাহ পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “পরশু সাহেব সাইজা কই গেছিলি?”

“ডাক্তারের কাছে গেছিলাম। খাসিডার জানি কী হইছে। খায় না, ঝিমায় সারাক্ষণ।”

“এইসব পাইলা পুইষা লাভের থাইক্যা ক্ষতিই হয় বেশি। কয়দিন পরপর খালি রোগ আর রোগ।”

“খাইয়া পইড়া বাইচ্চা থাকতে হইলে আমগো মতন মাইনষের এছাড়া আর উপায় কী?”

প্রসঙ্গ বদলালেন তিনি। এটা তাঁর স্বভাব। জায়গা মতো ছেলেটা খোঁচা মারলেই এড়িয়ে যান।

“বাড়ি থাইক্যা কম বাহির হস। অসুখ নাকি?”

“না তো।”

“তাইলে? আগে তো এই কাম ওই কামে লাইগাই থাকতি। খুইজাই পাওয়া যাইতো না সহজে।”

“এত কাম কইরা লাভ কী? কোনোমতে খাইয়া পইড়া বাঁচতে পারলেই হইলো। দেরিতে হইলেও বুঝছি চাচা, দুনিয়ার জীবন কিছু না। কেউ কী সম্পদ লইয়া মরতে পারে? তাই কাম করা কমাইয়া দিছি।”

আমিরুল শাহর মুখখানা ছোটো হয়ে গেলো। শুধু মাথা নাড়ালেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীর থেকে বিদায় নিয়ে ছাতা মাথায় চলে গেলেন বাড়ির বাইরে। তাঁর প্রস্থান দেখে নাজির হাসলো। খোঁচাটা একেবারে জায়গামতো লেগেছে। তার দৈনন্দিন কাজ ঠিকই জারি রয়েছে। কিছু রহস্য উদঘাটনের ব্যস্ততায় শুধু বাড়ি থেকে অযথা তেমন একটা বের হচ্ছে না।

মামার বাড়ি থেকে ফেরার আজ দুদিন। এই দুদিনেও মোতালেব‌ নামক ব্যক্তির সন্ধান সে পায়নি। এমনকি মিল্টনকে জিজ্ঞেস করেও না।

নাজিরের ধারণা তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তার দুই চাচা আর এই মোতালেব নামক লোকটির কাছেই রয়েছে। তবে চাচাদের থেকে কোনো উত্তরই সে পাবে না। সন্দেহের খাতায় যদিও আরো একজন রয়েছে তবে তার কোনো ভরসা নাই। তাই যেকোনো মূল্যে ওই লোকটাকেই খুঁজে বের করতে হবে।
________

আকবর মিয়া নিজ বিছানায় শুয়ে তাসবিহ জপছেন। ঠোঁট ক্ষীণ স্বরে নড়ছে। তখনি অনুমতি নিয়ে ভেতরে এলেন নজরুল আলম। ঘরের এক কোণে রাখা চেয়ারটি টেনে নিঃশব্দে বসে পড়লেন। আকবর মিয়া শোয়া থেকে উঠে বসলেন। হাতের তাসবিহ বালিশের পাশে রেখে জিজ্ঞেস করলেন,“মেঘের গর্জন হুনলাম। বৃষ্টি পড়ে?”

“না, আব্বা। রোদের মধ্যেই গুড়গুড় করতাছে।”

“ওহ।”

“ডাকছিলেন যে?”

“রুহুলের বিয়া লইয়া কী ভাবছোস?”

“এহনো ভাবি নাই, আব্বা। বয়স কম, এত তাড়াতাড়ি বিয়া দিয়া কী করমু?”

“এইসব কী কথা? হের ছুডো ছুডো বোইনগো বিয়া শেষ, তাইলে ওর বয়স কম কেমনে? পঁচিশ হইছে না?”

“হইছে, আব্বা।”

“আরো আগে বিয়া দেওয়া উচিত আছিলো। পোলা, মাইয়া গো যত তাড়াতাড়ি বিয়া দেওয়া যায় তত ভালা। যিনা, পাপাচার কম হয়। ওয় কী আর বাপরে আইয়া কইবো যে আমারে বিয়া দেও? এইগুলা বাপ-মায়ের দায়িত্ব।”

নজরুল আলম চুপচাপ শুনলেন। মাঝেমধ্যে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন। আকবর মিয়া বললেন,“ওর পছন্দের কেউ আছে নাকি তা আগে জিগা। থাকলে খোঁজখবর নে, মাইয়ার বংশ ভালা হইলে বিয়া দিয়া দে। আর বংশ খারাপ হইলে পোলারে বুঝাইয়া নিজেগো পছন্দ মতো মাইয়া খোঁজ। পারলে এই বছরেই শুভ কাজ সাইরা ফেলা।”

“আইচ্ছা, আব্বা। ঘটকরে না হয় খবর দিমু।”

“হের বিয়া হইলে আবার কাশেমের লগে কথা কইয়া মাসুমের বিয়া দিতে হইবো। পোলাডার রাগ বেশি। ঠান্ডা মেজাজের বুদ্ধিমতি মাইয়া খুঁজতে হইবো। দিনকাল ভালা যায় না। নাতিগো সংসার দেইখা মরলেও শান্তি।”

“এইবার নতুন ঘর তুলতে হইবো, আব্বা। সুজনের দুই পোলা, মাইয়া। তালেব, রুহুল, মাসুম তো এহনো বাকিই আছে। মাইয়ারা বছরে দুইবার আইয়া বেড়াইয়া যায়। হেগো পোলাপাইনও আছে। বুঝেনই তো।”

“আমি কয়দিন ধইরা ভাবতাছিলাম। ব্যবসার অবস্থা কী? তুললে ভালা কইরাই তুলতে হইবো।”

“আল্লাহর রহমতে ভালাই। কাশেম আমারে কইলো, এইডায় তোমরাই থাহো, ভাইজান। সামনে খালি পইড়া থাকা জায়গায় না হয় আমি তুলমু।”

“তোর কী মত?”

“আমার কোনো সমস্যা নাই। লগে আমিও না হয় ট্যাহা দিলাম। তাড়াতাড়ি শেষ হইয়া যাইবো।”

ভাইয়ে ভাইয়ে মিল দেখে সন্তুষ্ট হলেন আকবর মিয়া। এটাই তো তিনি চেয়েছিলেন। একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করলেন,“মিছরির খবর কী? নাজিরের লগে দেখা হইলে কইস আমি ডাকছি। কথা আছে।”

“ওর লগে কথা কওয়া মানেই ঝামেলা। একটা কইলে দশটা হুনাইয়া দিবো।”

“দিবো না, তুই কইস। পায়ে জোর পাই না। না হইলে আমিই যাইতাম।”

“আইচ্ছা।” আলোচনা শেষ করে নজরুল আলম বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে।
_______

দুপুরের রান্নাবান্না শেষে রোজকার মতো গোসল করতে কলপাড় গিয়েছে মিছরি। টিউবওয়েল চাপতে গিয়ে হাতের তালুতে গাঢ় লাল দাগ পড়ে গিয়েছে। বিয়ের কয়েক মাস পেরোলেও কিছুতেই যেন এসবে অভ্যস্ত হতে পারছে না সে।

মাছের প্রজেক্টে খাবার দিয়ে দোকানপাড় গিয়েছিল নাজির। হাতে চিঠির খাম। ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই ভ্রু দ্বয়ের মাঝখানে সরু ভাঁজ পড়ল তার। দূরে এক ছেলে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে কলপাড়ের দিকে। নাজির কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে উঁচু কণ্ঠে বললো,“এই, এই, কে রে তুই?”

আচমকা ডাকে ছেলেটা যেন ঘাবড়ে গেলো। চট করে পিছু ফিরে তাকালো। মুখখানা দেখে সহজেই চিনে ফেলল নাজির। বললো,“সোহেল না? এনে কী তোর?”

সোহেল জোরপূর্বক হাসলো। থুতনি চুলকে আমতা আমতা করে জবাব দিলো,“একটা কাজে কাছাকাছি আইছিলাম। তাই ভাবলাম ফুফুরে দেইখা যাই।”

“তোর ফুফু কী কলপাড় থাহে?”

“না মানে একেবারে হাত-মুখ ধুইয়া ভাবলাম ভিতরে যাই।” বলেই দ্রুত ঢুকে গেলো আমিরুল শাহর দালানে।

কলপাড় থেকে পানির শব্দ ভেসে আসছে। বুঝাই যাচ্ছে কেউ যে গোসল করছে। নাজির আর সেদিকে গেলো না। পুকুর থেকে হাত-পা ধুয়ে ঘরে এলো। শহর থেকে চিঠি এসেছে। প্রেরক আর কেউ নয়, নওশাদের শ্বশুর। খুব শীঘ্রই তিনি তাকে যেতে বলেছেন ওখানে। নালিশ জানিয়েছেন ভাইয়ের নামে। নাজির এসবে বিরক্ত। এমনিতেই নিজের জ্বালায় বাঁচে না তার মধ্যে আবার ভাই কী কান্ড ঘটিয়েছে কে জানে?

গোসল শেষে উঠোনে কাপড় মেলে দিয়ে ঘরে এলো মিছরি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠিক করতে লাগলো পরনের শাড়ি। তাকে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল নাজির। জিজ্ঞেস করল,“ওহ, কলপাড় তুমি আছিলা?”

“হ্যাঁ, কার সঙ্গে কথা বলছিলেন?”

“কেউ না।”

ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঝেড়ে চোখে মোটা করে কাজলরেখা টানলো মিছরি। কানে দুল জোড়া পরে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,“কেমন লাগছে?”

“দিনের বেলা ঘরে চাঁন নাইমা আইছে।”

লাজুক হাসলো সে। পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল খাটে। চুল আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বললো,“ভাবছি এবার নাক ফুটো করবো।”

“ডর গেছে গা?”

“না, তবে নাকফুল পরতে ইচ্ছে করছে। নাকফুলে আরো সুন্দর লাগবে না আমাকে?”

“কিজানি? আন্দাজে আমি কিছু কইতে পারি না।”

“তাহলে দেখে বলতে হবে। বাড়ি যেতে দিবেন কবে? সবসময় আমাকে আটকে রাখেন।”

নাজির বসা থেকে উঠে আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। উপরের ড্রয়ার খুলে কিছু একটা বের করে ফিরে এসে বসলো মেঝেতে, মিছরির সামনে। পা জোড়া টেনে নিজের কাছে নিয়ে বললো,“আইচ্ছা, কাইল যাইয়ো।”

মিছরি নড়েচড়ে উঠলো,“পা ধরেছেন কেন? ছিঃ, উঠুন বলছি। পায়ে হাত দিতে নেই। পাপ হবে।”

নাজির শুনলো না। পা জোড়া নিজের কোলে রেখে পরিয়ে দিলো সুন্দর এক জোড়া নূপুর। বললো,“কে কইছে এইসব? পায়ে ধইরা সালাম করলে, ঝুঁকলে পাপ হয়। এমনি ধরলে আবার পাপ কীয়ের?”

“কি সুন্দর নূপুর জোড়া! এগুলো আমার?”

“না, পাশের বাড়ির সম্পা ভাবির।”

সে কথায় গুরুত্ব দিলো না মিছরি। বসা থেকে উঠে সারা ঘর জুড়ে একপ্রকার দৌড়াতে লাগলো। নাজির মেঝে থেকে উঠে বিছানায় বসেছে। মেয়েটার আনন্দ দেখে তার নিজের ঠোঁটেও ফুটে উঠেছে তৃপ্তিময় হাসি। একসময় থেমে গেলো মিছরি। চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,“শব্দ হয় না কেন? ঘুঙুর লাগাতে ভুলে গেছে বোধহয়।”

“আমিই লাগাইতে নিষেধ করছি।”

“কেন? শব্দ না হলে নূপুর পরে মজা আছে?”

“দিনকাল ভালা না। ঝনঝন শব্দ হুনলে আশেপাশের চেংড়ারা আমার বউয়ের প্রেমে পইড়া যাইবো। বোঝদার সোয়ামি হিসাবে এই ভুল আমি করতে পারি না।”

পূর্বের মতো আবারো পাশে এসে বসলো মিছরি। বললো,“আপনি একটা যা তা।”

“রূপার নূপুর। চাইছিলাম স্বর্ণের বানাইতে কিন্তু পরে হুনি পায়ে নাকি স্বর্ণ পরা যায় না? তাই এইডাই বানাইছি। পছন্দ হইছে?”

“হয়েছে। কবে আনলেন?”

“পরশু, ফেরার পথে।”

“অথচ দিয়েছেন আজ।”

নাজির এড়িয়ে গেলো। গামছা, লুঙ্গি কাঁধে নিয়ে যেতে যেতে বললো,“গোসল কইরা আসি।”

ভাতিজা আসার খুশিতে কী করবেন, না করবেন তা যেন ভেবে পাচ্ছেন না ফরিদা। পুত্রবধূকে ডেকে এনে পাখা দিয়ে বাতাস করার নির্দেশ দিলেন। মিছরি খাবার নিতে এসেছে। তাকে দেখেই ফরিদা বললেন, “বউ, তুমি ওরে খাবার বাইড়া দেও।”

শাশুড়ির কথা শুনলো বিথী। সোহেল ভাত মাখাতে মাখাতে মাথা তুলে তাকালো। কেমন অদ্ভুত তার চাহনি। হেসে বললো,“আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন, ভাবি?”

লোকটার চাহনি পছন্দ হলো না মিছরির। অপ্রস্তুত হয়ে বললো,“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

“আইয়েন একলগে দেওর, ভাবিতে মিল্যা গপ্পো করতে করতে খাই।”

ফরিদা বললেন,“দেওর কেডায়? সম্পর্কে তুই ওর ভাসুর লাগোস। নাজির না তোর ছুডো?”

ফুফুর কথায় বিরক্ত হলো সোহেল। কিন্তু প্রকাশ করল না। বললো,“পাঁচ ছয় মাসের পার্থক্য। এইডা কোনো বিষয় না, ফুফু।”

ফরিদা মিছরির উদ্দেশ্যে বললেন,“তোমার খাওন লইয়া যাও শুধু। নাজিরে কই? ওরে কও এনে আইতে। কতদিন পর সোহেল আইছে!”

মিছরি মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। তার কিছুক্ষণ পরেই ভেজা চুলে, গামছা গলায় নাজির এসে হাজির হলো। বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ করল দুজনে। ফরিদার জোরাজুরিতেও সোহেল আর থাকলো না। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে অবশ্য মিছরির থেকে বিদায় নিতেও ভুললো না।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো। আচমকা কিছু একটা মনে পড়তেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো নাজির। মিল্টনকে নিয়ে সোজা চলে গেলো হাটে। আজ সোমবার। অথচ কোনো এক বিশেষ কারণেই কসাই জবাই করেছে গরু। মিল্টনের উদ্দেশ্যে নাজির বললো,“দৌড়া, বল্টু। কইলজাডা আইজ আমিই কিনমু।”

কথামতো মিল্টন সত্যিই দৌড়ালো। কসাইয়ের কানে কানে কিছু বলতেই ব্যাগে ভরে দিয়ে দিলো কলিজা। নাজির এগোলো,“লগে দুই কেজি গোশতও ওজন করেন।”

মিল্টন হেসে বললো,“আমিও এক কেজি নিমু, ভাইজান। আমনে দাম কইরা দিতে কন।”

“রাইতে তো তুই আমগো লগেই খাবি।”

“আম্মায় গোশ অনেক পছন্দ করে।”

“আচ্ছা, আলাদা ব্যাগে আরো দুই কেজি দেন।”

“না, না, ভাইজান। এক কেজি।”

“চুপ, ব্যাটা। এক কেজিতে এত্তগুলা মাইনষের কী হয়? আমগো শুধু রাইতে খাইবো। দুপুরে মনে হয় রাইতের সহ রানছে। তাই শুধু দুই কেজি নিতাছি।”

নাজির নিজেই টাকা দিলো। বাজারের ব্যাগগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“আগে আমার ব্যাগটা তোর ভাবি পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিয়া আইবি। কইস, আমার ফিরতে একটু রাইত হইবো। তবে একলগে গিয়া খামু।”

“কই যাইবেন, ভাইজান?”

“সামাদ মিয়ার কাছে। অনেকদিন দেখা হয় না। কাম আছে একটু।”

মিল্টন বিদায় নিয়ে চলে গেলো। চারিদিকে সন্ধ্যা নেমেছে। মাগরিবের আজান দিলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। পাশের মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে তারপর সোজা ঘাটে চলে গেলো নাজির। ইউনিয়নের এমন কোনো খবর নেই যা সামাদ মিয়ার কাছে নেই, এমন কোনো মানুষ নেই যাকে সামাদ মিয়া চেনে না। অথচ লোকটার কথা কিনা নাজিরের মনে পড়ল আজ।

সামাদ মিয়ার মাছ ব্যবসা চলছে রমরমা। আশ্বিন মাস প্রায় শেষ হতে চললো। দিনগুলো যেন চোখের পলকেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপর আসবে কার্তিক। কার্তিকের পর অগ্ৰাহায়নের শেষে ঠান্ডা পড়বে। তখন আবার বেলাই বিলের পানি ধীরে ধীরে কমে আসবে। মাছগুলো চলে যাবে সব নদীতে। তাই বর্ষাই মাছ ধরার উপযুক্ত সময়।

সামাদ মিয়ার ট্রলারের দেখা ঘাটে এসেই পেয়ে গেলো নাজির। মাগরিবের পরপরই শুরু হয়ে যায় তাদের এই আয়োজন। তাকে দেখে যারপরনাই অবাক হলেন লোকটা। যদিও বরাবরই নাজির তাকে অবাক করে দিয়ে হুটহাট অসময়েই চলে আসে।

হেসে বললেন,“বিয়ার পর থাইক্যা তো নাজির মশাইরে দেহাই যায় না। তা হঠাৎ কী মনে কইরা?”

“কামেই নিশ্চয়ই আইছি। ট্রলার ছাড়বেন কহন?”

“এই তো ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই। হৃদয়রে আইজ আনি নাই। জাকির গেছে বাড়িত।”

“ওহ।”

“কী কাম, নাজির? কিছু লাগবো নাকি?”

“কিছু জিগামু। যদিও অনেক আগেই জিগানো উচিত আছিলো কিন্তু জিগাইতে পারি নাই। ঘরের কথা পরেরে কইয়া লাভ কী?”

সামাদ মিয়া হুক্কায় টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন বাতাসে। মনোযোগী হয়ে অল্প বয়সী ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নদীর অবাধ্য স্রোতের দিকে তাকিয়ে রইল নাজির। সেই নীরবতা ভেঙে একসময় বললো,“আমার চাচারা কয় আমার দাদারে নাকি মারছে মাস্টর বাড়ির আকবর মিয়া আর তাঁর পোলারা। আব্বার এই অবস্থাও নাকি সে করছে। এই ব্যাপারে আমনের কী মতামত, ভাই? কেউ কী স্বচোক্ষে দেখছে?”

“হঠাৎ এই প্রশ্ন? এত বছরে তো জিগাস নাই কহনো। আমি তুললে উল্ডা রাগ করতি।”

“ইচ্ছা হইলো আরকি।”

“আকবর মিয়ায় কিছু কইছে?”

“না, কী কইবো? হাবভাব এমন যে সে নিরপরাধ।”

“আমি তো অতশত জানি না। তহন আমি হৃদয়ের বয়সী আছিলাম। ব্যবসা বাণিজ্য সামলাইতো আমার আব্বায়। আকবর দাদা আর তোর দাদার মধ্যে ভাই ভাই সম্পর্ক আছিলো। মাঝখানে ঝামেলা আছিলো কিনা তা জানি না। তবে হুট কইরা গেরামে ছড়াইয়া গেলো তোর দাদার খুনের খবর। দুইদিন পর খুনি সন্দেহে মামলা হইলো আকবর দাদা আর নজরুল চাচার নামে। পরে তো আপোষে আইয়া সব ধামাচাপা দেওয়া হইছিল। বহু বছর আগের কথা। তোর বাপের বেলায়ও একই কাহিনী। সে ও হেইদিন মরতো কিন্তু ভোরবেলায় ঘাটে আইয়া ট্রলার থামতেই আমার আব্বার দলের লোকেগো চোখেই সর্বপ্রথম পড়ল। পরে হেরা গিয়া মাস্টর বাড়িত খবর দিয়া ধরাধরি কইরা তারে নিয়া ভর্তি করল হাসপাতালে। আব্বায় সবসময় কইতো, কোনো একটা ঘাপলা আছে। কিছু একটা সবার চোখের আড়ালে ঘটছে। আকবর মিয়া এমন কাম করতেই পারে না।”

“কেউই তাইলে দেখে নাই? এত মাইনষের মধ্যে কেউ না? একই বাড়ির একটা মানুষ খুন হইলো, একটা মানুষরে খুনের চেষ্টা করা হইলো, একটা মানুষ নিখোঁজ হইয়া গেলো অথচ কেউ কিচ্ছু জানলো না, দেখলো না? বিশ্বাস করা যায়, ভাই?”

“পুলিশ আইছিলো, কয়দিন তদন্ত চলছে। দেশের আইন সম্পর্কে তোর তো জানাই। শেষে চেয়ারম্যানের লগে কয়দিন ঘুরাঘুরি কইরা মামলা বন্ধ। প্রমাণ থাকলে না তদন্ত চলবো, বিচার হইবো। প্রমাণই তো নাই। ভর দুপুরবেলা মাইনষে বাড়িত থাহে, আর সন্ধ্যা হইলেই গেরামের মানুষ ঘুমে অচেতন। নিশাচর পাখির মতো জাগনা থাকোন লাগে আমগো মতন ব্যবসায়ী গো। দিনে ঘুমাই, রাতে সজাগ থাকি। তবে…

“তবে কী?”

“একজন পুরা দৃশ্যডা দেখছে।”

“কেডায়?”

“শুক্কুর আলী। বছর সাতেক আগে মইরা গেছে। সে নাকি সবে ভাত খাইয়া বাড়ি থাইক্যা আইছে। তোর দাদার ক্ষেতে কাম করতো। বুইড়া ছায়ার নিচে বইয়া জিড়াইতাছিলো। দুইডা লোক আইয়া নাকি আচমকা ক্ষেতে ফালাইয়া ইচ্ছামতো তারে কুপাইলো। শুক্কুর আলী দেইখা তো দিছে এক চিক্কুর! তার চিক্কুরে ভয় পাইয়া নামা দিয়া দৌড় মারছে ওই দুইজনে। পরে সারা গেরামে সেই খবর ছড়াইয়া গেলো, ততক্ষণে তোর দাদার আত্মা দেহ ত্যাগ করছে। বুইড়ায় অনেক ভালা মানুষ আছিলো। না হইলে জানাজায় এত মানুষ কেমনে হয়? এত মানুষ আমি নেতাকর্মী ছাড়া আর কারোরটায় তেমন দেহি নাই।”

“মুখ দেহে নাই? তাইলে কয় নাই ক্যান কাউরে?”

“না, মাথা আর মুখে গামছা বান্ধা আছিলো। তাই মুখ দেখতে পারে নাই। মুখ দেখলে তো কাম হইতোই। হের কয়েক মাস পরেই তো তোর বাপের কী এক অবস্থা হইলো। তোর মায়ও গেলো গা। চাচী তো এমনিতে ভালা মানুষই আছিলো। বাড়িত গেলে না খাওয়াইয়া ছাড়তো না। ক্যান যে গেলো? হেরপর থাইক্যাই মাস্টর বাড়ির লগে হুনি তগো শত্রুতা।”

কথা শেষ করে সামাদ মিয়া আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালেন। কিছুটা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বললেন,“একটা গোপন কথা কই। কাউরে আবার আমার নাম কইতে যাইস না। আমি তো ব্যবসা কইরা খাই। এমনিতেই শত্রুর অভাব নাই।”

“কী কথা?”

“তোর চাচা দুইডা সুবিধার না। আগে তো বাপের কাছে হাত পাততো। বাপ মরার পর হঠাৎ কইরাই ফুইল্লা উঠছে, বদলাইয়াও গেছে অনেক। আমার আব্বায় কইতো, এইসবের পিছনে ওই দুই জাউড়ার হাত আছে। বাপের লগে নাকি বনতো না। মাইনষের সামনেই কইতো, এত মানুষ মরে কিন্তু আমগো বুইড়া মরে না ক্যান? ভাব, কত্ত বড়ো খারাপ! চেয়ারম্যানের লগে মিল মোহাব্বত বেশি। আমগো চেয়ারম্যানে তো হেগো মতোই শয়তান। হের নাকি আবার এমপির লগে ভালা খাতির আছে। তাই গেরামের কেউ কিছু কওয়ার সাহস পায় না। আমিও কই না। এড়াইয়া চলি। দরকার কী লাগার? কেমনে আবার ফাঁসাইয়া দেয়!”

নাজিরের কাছে সবকিছু যেন পানির মতো পরিষ্কার। এবার শুধু মায়ের সম্পর্কে জানার পালা। জিজ্ঞেস করল,“ভাই, মোতালেব নামে কাউরে চিনেন?”

“মোতালেব! খাঁ বাড়ির মোতালেব?”

“না, এই মোতালেব নাকি একসময় আমগো বাড়িত কাম করতো। সেই দাদার সময় থাইক্যা।”

সামাদ মিয়া কিছুক্ষণ ভাবলেন। হাঁক ছেড়ে ডাকলেন, “রহমত চাচা! মোতালেব নামের কাউরে চিনেন? শাহ বাড়িত নাকি কাম করতো?”

রহমত চাচা এগিয়ে এলেন। বয়সের ভারে লম্বাটে দেহে ভাঙন ধরেছে। উবু হয়ে চলেন। তবুও কাজ করেই খান। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে মনে করার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন,“আব্বাসের জেঠা না? ব্যাডা হুনছিলাম চুরি কইরা হেগো বাড়ি থাইক্যা পলাইছিল। একসময় ফতেহ ভাইয়ের অনেক বিশ্বস্ত লোক আছিলো।”

নাজির এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। মোতালেব তবে আব্বাসের বড়ো চাচা!

চলবে _________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here