যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৩৭]

0
30

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩৭]

রাতে বাড়ি ফিরতে নাজিরের দেরি হলো। চারিদিকে তখন বিরাজ করছে ঘোর নিস্তব্ধতা। উঠোনের হলদে বাল্বের আলোয় চারপাশের ঘন অন্ধকার মিলিয়ে গেছে। সেই আলোকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে সদ্য পাখা গজানো পিপীলিকার দল।
কলপাড় থেকে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে এসে মাটিতে মাদুর পেতে বসলো নাজির। তার অপেক্ষাতেই এতক্ষণ জেগে ছিল ঘরের ঘরণী। ছোটো একটা গামলা থেকে থালে ভাত বেড়ে স্বামীর দিকে এগিয়ে দিলো মিছরি। সাথে রাখলো মাংসের একটা বাটি। সন্ধ্যায় মিল্টন বাজারের ব্যাগটা বাড়িতে দিয়ে যেতেই তৎক্ষণাৎ কুপি জ্বালিয়ে রান্না করেছেন ফরিদা। আলু দিয়ে কলিজা ভুনা আর আলাদা ঝোল ঝোল করে গরুর গোশত। তারপর বাড়ির সবার খাওয়া শেষে তিনি নিজ হাতে মেপে মেপে মিছরি আর নাজিরের জন্য খাবার বেড়ে দিয়েছেন।

ভাত সামনে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে রইল নাজির। স্ত্রী খেতে বসা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। মিছরি থালা টেনে নিতেই তার চোখ আটকে গেলো সেখানে। ছোটো একটি বাটিতে হাড়সহ এক টুকরো গোশত, দুই টুকরো কলিজা আর আলু একসঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাতের পরিমাণও বেশ কম। অথচ নাজিরের থালার চিত্র ভিন্ন। তাকে আলাদা দুটি বাটিতে দেওয়া হয়েছে দুই রকম তরকারি। মাংসের ভাগও স্ত্রীর তুলনায় স্পষ্টতই বেশি। নাজির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,“গরুর গোশ আর কলিজা তুমি পছন্দ করো না?”

চুকা পাতা ভর্তাটা মিছরি খেলো না। সরিয়ে রেখে দিলো এক পাশে। খেতে খেতে বললো,“করি তো। তবে খাসি পছন্দ না।”

“তাইলে এইটুকু আনছো ক্যান? কম তো কিনা আনি নাই। কলিজাই হইছে দুই কেজি, লগে গোশও দুই কেজি। আবার দেহি লগে আলুও দিছে।”

“আমি আনিনি, বড়ো চাচী বেড়ে দিয়েছেন।”

“বড়ো চাচী দিবো ক্যান? তোমার হাত নাই?”

“আসার পর থেকেই হয় বড়ো চাচী খাবার বেড়ে দেন নয়তো ভাবি বেড়ে দেয়। একবার তাদের না পেয়ে আমি নিজ থেকে তরকারি বেড়ে নেওয়ায় অনেক কথা শুনতে হয়েছিল। তাই এখন আর আগ বাড়িয়ে কিছু করি না।”

কথা বলার সময় একবারও মাথা তুলে তাকালো না মিছরি। নাজিরের গলা দিয়ে আর খাবার নামলো না। নিজের বাটিটা বদলে নিলো স্ত্রীর সঙ্গে। মিছরি এবার চট করে সামনে তাকালো। অপ্রস্তুত ভঙিতে বললো, “বদলাচ্ছেন কেন? আমার এইটুকুতেই হয়ে যাবে।”

নাজির শুনলো না সেকথা। জিজ্ঞেস করল,“আব্বায় খাইছে?”

“হ্যাঁ, আমি খাইয়ে দিয়েছি।”

“আব্বার খাওনও তারাই বাইড়া দেয়?”

“হ্যাঁ।”

“গোশ, কলিজা দুইডাই দিছে?”

“না, শুধু কলিজা দিয়েছে। কলিজার থেকে আলুই বেশি পড়েছে। আরো দুই পিস চাইতেই বললো, অসুস্থ মানুষ এত খেতে পারবে না।”

নাজির এবার বুঝতে পারলো, কেন তার অসুস্থ বাপটা এত রুগ্ন। সে তো শুধু দু’বেলা খাওয়াতো। সকাল আর রাতে মানুষ অল্পই খায়। আসল খাওয়া তো হয় দুপুরে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে খাওয়ায় একবেলা, তাও শুধু সকালে। বললো,“আগে কও নাই ক্যান?”

“জিজ্ঞেস করেননি।”

“না জিগাইলে কইবা না?”

মিছরি উত্তর দিলো না। খাবারের প্রতি নাজিরের অরুচি ধরে গেলো। তবুও চুপচাপ খেতে লাগলো। পেটে ক্ষুধারও যে কমতি নেই! শেষ পর্যায়ে জিজ্ঞেস করল,“আমগো বিয়ার কয় মাস হইছে?”

মিছরি মনে করার জন্য সময় নিলো। বললো,“এই মাস শেষ হলে তিন মাস হবে।”

“এই তিন মাসে কাজকাম কতটুকু শিখছো? বিশেষ কইরা রান্নাবান্না?”

“উনুন ধরাতে পারি, মরিচ আর রসুন কাটতেও পারি। পেঁয়াজ তেমন একটা কুচি হয় না। তবে ভাত রাঁধতে পারি, ডিম ভাজতেও পারি।”

“মাশাআল্লাহ, একটা আকাইম্মার ঢেঁকি জুটছে কপালে। এমন কইরাই কচ্ছপের লাহান শিখতে থাক, আর আমার কপালে জুটুক বাড়তি খরচা। আজ যদি তুমি রান্নাবান্না পারতা তাইলে কী আমারে এত বাজার করতে হইতো? নাকি হেগো লগে খাইতে হইতো? এত্তগুলা গোশ কিনলাম অথচ বাপ আর বউয়ের ভাগে জুটলো এইটুকুন। তার উপরে এই একবেলাই ভাগে পড়ছে। সকাল হইলে সব হেগো পেটেই যাইবো গা। খাওন দাওনেও যে মাইনষে এত হিংসা করে সেইডা আবার জানলাম আইজ।”

মিছরির মুখটা ছোটো হয়ে গেলো। বললো,“এখানে আমার কী দোষ? বিয়ের আগে রান্নাবান্না পারি কিনা জিজ্ঞেস করলেন না কেন? আমাদের যৌথ পরিবার। আমি বড়ো হয়েছি নানার বাড়ি। কীভাবে শিখবো? কে শেখাবে?”

“শুরু হইয়া গেছে অভিমান।” নাজির মুখ কুঁচকে নিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল,“আলাদা হইয়া যামু?”

“জানি না আমি।”

“ক্যান জানো না? এমন কইরা চললে খাওয়ার কষ্ট করতে করতে হেগো বাড়ির কুদ্দুসের মার মতো হইয়া যাইবা। সবার কটু কথা হুনতে হইবো। কয়দিন আমি হেগো লগে তর্ক কইরা তোমার পক্ষ নিমু?”

“আমি একা একা কীভাবে সব সামলাবো? যদি না পারি? কখনো এসব করেছি?”

“চেষ্টা করলে মানুষ কী না পারে? আমি যহন প্রথম অন্যের ক্ষেতে ধান চারা লাগাইতে গেছিলাম তহন ঠিকমতন লাগাইতে পারতাম না। ত্যাড়া ব্যাকা হইতো, বেশি ডাইবা যাইতো, আবার কোনোডা তো নষ্ট পর্যন্ত হইয়া গেছিলো। তার লাইগা কত মাইনষে যে আমারে কাম দেয় নাই!কেউ কেউ তো সারাদিন কাম করাইয়া পয়সাও দেয় নাই‌। পায়ে জোঁকে কামড়াইছে, হাতে ঠোসা পড়ছে, শরীরের বিষে জ্বর পর্যন্ত আইছে। তাতে কী আমি মইরা গেছি? নাকি সারাজীবন আকাইম্মাই রইয়া গেছি? মানুষ ভুল করতে করতেই শিখে। অনেক সময় আপন মানুষগো কথা ভাইবা শিখতে হয়। আর এইডা তো একটা সংসার মাত্র।”

মিছরি বেশ অবাক হলো। খাওয়া থামিয়ে বললো, “আপনি অন্যের অধীনে কাজ করেছেন? কিন্তু আমি তো শুনেছি, আমাদের বংশের পর এই গ্ৰামে নাকি আপনারাও অন্যতম ধনী বংশ।”

“ভুল কিছু শোনো নাই।”

“তাহলে?”

“আমার আব্বার অবস্থা তো দেখছোই। যহন তার এই অবস্থা হইছে‌ তহন আমার বয়স মাত্র পাঁচ। নওশাদও তহন ছুডো মানুষ। মায়ের কথা তো জানাই। জমিজমা থাকলেও চাচারা আমগো ঠকাইছে। দায়িত্ব বলতে ওই দুইবেলা শুধু ভাত দিতো। কহনো পান্তা ভাত, ঝাল ভর্তা আবার কহনো মনে দয়া হইলে ছুডো চাচী দিতো মাছ। এহন যা দেখতাছো সব আল্লাহর রহমতে আমার একলার পরিশ্রমের ফল।”

ঘৃণায় গা রি রি করে উঠলো মেয়েটার। মুখ ভার করে বললো,“কত খারাপ মানুষ! এতদিন ভাবতাম, আমি শত্রু বাড়ির মেয়ে বলে শুধু আমার সাথেই তারা এমন করে।”

নাজির শব্দহীন হাসলো। খাওয়া শেষে থালেই ধুয়ে নিলো হাত। মিছরি বললো,“তবে আমার চাচা খুব ভালো মানুষ, সাথে চাচীও।”

“মাথার উপরে বাপ, দাদা আছে তো তাই ভালা। তারা না থাকলে বুঝতা, বাস্তবতা আসলে কী জিনিস। দুনিয়াত কোনো মানুষই ভালা না। সবাই স্বার্থপর।”

মিছরি চুপচাপ শুনলো। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সামনে বসে থাকা লোকটা যা সবাইকে দেখায় তা সে নয়। তার ভেতরেও না বলা অনেক কষ্ট রয়েছে। যা কেউ কখনো দেখেনি, জানে না।

খাওয়া শেষে দরজা খুলে বাইরে চলে গেলো নাজির। কিছু সময় পেরোতেই উঁকি দিলো ঘরে। ফিসফিস করে ডাকলো,“তাল মিছরি!”

সব গোছগাছ করে বিছানায় সবে শুয়েছিল মিছরি। শোয়া থেকেই জবাব দিলো,“কী?”

“বাহিরে আইয়ো।”

শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালো মিছরি। মাথায় আঁচল টেনে ঘর থেকে বের হলো। আকাশে আধফালি চাঁদ। ধরণীতে গভীর অন্ধকার। নাজির উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডেকে হাঁটতে লাগলো আগে আগে। মিছরি তার পিছু নিলো। নাজির থামতেই সেও থেমে গেলো। জিজ্ঞেস করল, “এখানে কেন এসেছি? আপনার মাথায় আবার কী চলছে?”

নাজির মুখে কিছু বললো না। আচমকাই তার হাতের কব্জি ধরে টেনে এনে দাঁড় করালো সামনে। আঙুল তাক করে বললো,“তাকাও।”

ইশারায় সামনে তাকাতেই অবাক হলো মিছরি। পুকুর পাড়ের চারিদিকে উড়ে বেড়াচ্ছে জোনাকি পোকার দল। কিছু আবার বসে আছে পাড়ে, সবুজ ঘাসের উপর। তা দেখে মিছরি চমকালো। একসঙ্গে এত জোনাকি পোকা পূর্বে কখনো দেখেছে কিনা সন্দেহ। স্ত্রীর আনন্দিত, চমকিত মুখখানা দেখে নাজিরের চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠলো। আবারো হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো পুকুর পাড়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছের কাছে। উঁচু ডালে ঝুলছে দড়ি আর কাঠ দিয়ে তৈরি বিশাল এক দোলনা। অবাক চোখে মাথা তুলে লোকটার দিকে তাকায় মিছরি। কিন্তু তাকে কিছু বলার সুযোগ দেয় না নাজির। কাঁধে ধরে বসিয়ে দেয় দোলনায়। ফিসফিস করে বলে,“শক্ত কইরা ধরো, দিলাম ধাক্কা।”

“কখন বাঁধলেন এটা?”

“আইজ সকালে।”

দোলনায় ধাক্কা দিতে লাগলো নাজির। মিছরি আনন্দে আটখানা হয়ে উঠলো। নিস্তব্ধ নিশীথে চাঁদের আলোয় ঝলমল করা স্বচ্ছ পানি আর জোনাকি পোকার ক্ষীণ হলদে আলোর আভায় পরিবেশটা হয়ে উঠেছে অপূর্ব সুন্দর। দুলতে দুলতে কখন যে চুলের খোঁপা খুলে গিয়ে মৃদু বাতাসে উড়তে লাগলো তা টের পেলো না সে। শাড়ির আঁচলটাও মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিন্তু সেসবে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। বরং তার চোখে নেমেছে গোধূলির মতো কোমল মুগ্ধতা, মনে উঠেছে ঘূর্ণির মতো এক অন্তহীন আনন্দের ঢেউ।

খুশিতে ছন্নছাড়া হয়ে ওঠা কিশোরী মেয়েটির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে নাজির। আজকের এই সুন্দর রাত, মৃদু বাতাস, জোনাকির দলবদ্ধ ছুটে চলা সবকিছুই যেন উৎসর্গ করা হয়েছে শুধু মিছরি নামক মেয়েটির জন্যই।

হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে মেয়েটির কপালে পড়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো। মিছরি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। সেই হাসিতে নাজির থমকায়, চমকায়, অবস হয়ে আসে তার সারা দেহ। আচমকা দুলতে থাকা দোলনার দড়ি টেনে থামিয়ে দেয় সে। মিছরি চমকে ফিরে তাকায়। চোখেমুখে প্রশ্নের ছটা। নাজির মুখে কিছু বলে না। সামনে এসে দাঁড়িয়ে দুই হাত দুই পাশের হাতলে রেখে তাকে আটকে নেয় নিজ বাহু বন্ধনে। একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,“এইবার মনে হয় আমার ডায়াবেটিস হইছে।”

উশখুশ করতে করতে মিছরি জিজ্ঞেস করল,“হঠাৎ! কীভাবে?”

“এই যে আস্ত একটা তাল মিছরি ঘরে তুলছি।”

লজ্জারাঙা হয়ে উঠলো মেয়েটি। শক্ত পুরুষালি বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চাইলো নিজেকে, কিন্তু পারলো না। তার আগেই শিকারির ন্যায় নাজির তাকে খপ করে ধরে ফেলল। বললো,“হইলে হোক, তবুও আমার পুরা তাল মিছরিই লাগবো। এক্ষুনি।”

মিছরি প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পেলো না। আচানক তার কম্পিত ঠোঁট জোড়ায় দখলদারিত্ব চালালো লোকটা। বাতাস ভারী হলো। কিছু সময় পেরোতেই দূর কোথা থেকে ভেসে আসতে লাগলো মেয়েলি কণ্ঠে কান্নার শব্দ।

নাজিরের শক্তপোক্ত দেহের ভারসাম্য বজায় নেই। ধীরে ধীরে তার স্পর্শ গভীর হচ্ছে। মিছরি শক্ত করে তাকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো দোলনা থেকে। নাজিরের ললাটে ভাঁজ পড়ে‌। সেও উঠে দাঁড়ায়। ঘাড়ে হাত চেপে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা চালিয়ে বলে,“চলো বউ, ঘরে যাই।”

হাস্যোজ্জ্বল অধরে আচানক ভয় নেমে এলো মিছরির। টেনে ধরলো স্বামীর ফতুয়া। নিচু স্বরে বললো,“কে যেন কান্না করছে। ওই যে শুনুন।”

নাজির যে শুনলো না এমন নয়। মিছরিকে টেনে নিয়ে ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো,“তাতে তোমার কী?”

“বড়ো চাচার দালান থেকে আসছে।”

“সামিউল ভাইয়ে নেশা কইরা আইয়া বউ পিডাইতাছে। তারই কান্নার শব্দ।”

ঠোঁট টিপে হাসে নাজির। মিছরি আঁতকে উঠলো, “মজা করছেন?”

“না তো, হাছা কথা। হেগো বাপ পুত দুইডারই চরিত্রে দোষ আছে। কিছু হইলেই বউ পিডানো স্বভাব। মহিলা দুইডারও দোষ কম না। সারাদিন অন্যের দোষ খুঁইজা বেড়ায়, আর রাইত হইলে জামাইয়ের লাত্থি, উষ্ঠা খায়।”

“মারলে তো ব্যথা পাবে! আপনার থামানো উচিত।”

“প্রয়োজন নাই। হেগো ঘরের ভিতরে যা ইচ্ছা করুক, আমগো কী? ভাবি কী কহনো আইয়া আমার কাছে কইছে? তাইলে যামু ক্যান? আগ বাড়াইয়া কহনো কারো উপকার করতে যাইবা না। চোখ, কান সব বন্ধ। বোবা আর বয়রা মাইনষের শত্রু থাকে না।”

ঘরে এসে নিঃশব্দে খিল দিলো নাজির।
__________

বছরের প্রত্যেক দিনই শাহ বাড়িতে কিছু না কিছু নতুন ঘটনা লেগেই থাকে। এই যেমন আজ সকালেই ঘটক লাল মিয়া এসেছেন বাড়িতে। তাঁর আগমনী সংবাদ পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছে নাজমুল, শাহরিয়ার দুই ভাই।

বড়ো ভাইয়ের সাথে পারভেজ ব্যবসায় যোগ দিয়েছে সপ্তাহ দুয়েক হবে। বাবাই তাকে জোর করে পাঠিয়েছে। বড়ো ছেলেকে বলে দিয়েছেন, যাতে সব কাজকর্ম তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়। নাশতা সেরে সবে বের হচ্ছিলো সে। তখনি ফরিদা তাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন ঘটকের সামনে। বললেন,“আমার এই ছুডো পোলার লাইগাও একটা মাইয়া লাগবো, ঘটক সাব।”

চোখে সমস্যা থাকায় গত মাসে নতুন চশমা নিয়েছেন লাল মিয়া। সেই চশমা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে পারভেজকে দেখলেন। বললেন,“আমনে গো বাড়িত দেহি বিয়া উপযোগী পোলার অভাব নাই।”

মর্জিনা বললেন,“আগে আমার নাজমুলের বিয়া দিমু, তারপরে শাহরিয়ারের। তাই তাড়াতাড়ি মাইয়া দেহান। কাজকর্ম জানা উচ্চ বংশের সুন্দরী, পরহেজগার, লম্বা মাইয়া লাগবো। শাশুড়ির কথা হুইন্না চলবো।”

ফরিদাও তাল মেলালেন,“হ, আমারো এমনই লাগবো।”

ঘটক চোখমুখ কুঁচকে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। বললেন,“আমনেগো চাহিদা বেশি। সুন্দরী মাইয়া দিয়া কী করবেন? সেই তো সারাদিন আগুনের তাপে, রোদে বসাইয়া কাম করাইবেন। এমনিতেই কালা হইয়া যাইবো গা।”

মর্জিনা বললেন,“আমি আটাইশ বছর ধইরা সংসার করতাছি। কই, কালা হইছি?”

ফরিদা ঠেস মেরে বললেন,“তুই কী কাম করোস নাকি? জোয়ান কালে করতাম আমি, সংসার আলাদা হওনের পর শুধু একটু চুলা গুতাস। বাদবাকি কাম তো করে কলিমের মায়। জামাইরেও খাওয়াইছোস চাইল পড়া। তাই বউয়ের কথায় উঠে আর বসে।”

“তুমিও খাওয়াও। না করছে কেডায়? খালি হিংসা করে।”

এদের ঠোকাঠুকি দেখে বিরক্ত হলো নাজির। জা নয় যেন সতীন দুজন। গোসল সেরে ঘরে এসে সে প্যান্ট পরল, শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মিছরি জিজ্ঞেস করল, “আবার কোথায় যাচ্ছেন? সত্যি করে বলুন তো, লোক চক্ষুর আড়ালে কী আরো বিয়ে করেছেন? নাহলে দুদিন পরপর সেজেগুজে যাচ্ছেন কোথায়?”

নাজিরের মুখখানা গম্ভীর। এগিয়ে এসে স্ত্রীর শাড়ির আঁচল টেনে মাথা মুছতে লাগলো। বললো,“ঘরের বউ ভাউ দেয় না। তাই আরকি….

“চোখ তুলে ফেলবো।”

“তুই পারবি? জোর আছে?”

“আমার বাপ, ভাইদের ঠিকই জোর আছে।”

“ডরাই নাকি?”

“উত্তর দিন।”

“কাইল নওশাদের চিঠি আইছে, তাই ঢাকা যামু। আবার কী গন্ডগোল জানি পাকাইছে।”

“ফিরতে তো তাহলে অনেক দেরি হবে, তাই না?” মুখ ভার করে বললো।

“তা হইবো। তোমার কিছু লাগবো? লাগলে কইয়া ফেলো, ফিরার পথে লইয়া আইমু।”

“সত্যি?”

“হুম, লেইখা দেও।”

হাস্যোজ্জ্বল মুখে টেবিলের দিকে দৌড়ালো মিছরি। কলম নিয়ে গটগট করে কিছু লিখে ফেলল খাতায়। কাগজটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে দিলো স্বামীর পকেটে। নাজির তা নিয়ে আর কিছু বললো না। জিজ্ঞেস করল,“কেমন লাগতাছে?”

“ভালো না।”

“মিথ্যুক।” চুল আঁচড়ে বললো,“আইয়ো বাপের বাড়ি দিয়া আসি।”

“কেন?”

“তুমি না যাইতে চাইছিলা? বোরখা পইরা তৈরি হও। চাইলে দুইদিন থাকতেও পারবা। তোমারে দিয়া আইয়া আমি যামু গা।”

“শ্বশুর আব্বাকে দেখভাল করবে কে?”

“কলিমের মায় আর জাহিদ আছে। আগে শহরে গেলে ওরাই দেখতো। তোমার চিন্তা করতে হইবো না।”

“এখান থেকে ওখানে যেতে বোরখা পরতে হবে?”

“হ, পরতে হইবো। গেরামের সবকয়ডা জাউড়া। মাইয়া মানু দেখলেই আগালে দিঘালে চাইয়া থাকে।”

“আমার বোরখা নেই।”

নাজির বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালো,“বোরখা নাই?”

“না, আমি তো সবসময় সালোয়ার কামিজ পরি। তাই কখনো কেনা হয়নি।”

“তাইলে যাওয়ার দরকার নাই।”

লোকটার মনোভাব বুঝা কঠিন। যখন তখন বদলে যায়। তাই এগিয়ে এসে তার হাত জড়িয়ে ধরলো মিছরি। বললো,“দয়া করে এমন করবেন না। আমি সালোয়ার কামিজ পরছি। ওড়না ভালো করে মাথায় মুড়ি দিচ্ছি।”

“যাত্রার আগে নাকি মিষ্টিমুখ করতে হয়? তাল মিছরি খাওয়াও। তাইলে রাজি হইতে পারি।”

“কে বলেছে এই কথা? আমি জানি না কেন?”

“তুমি কেমনে জানবা? হাঁটুর বয়সী মাইয়া মানু।”

“ঘরে তাল মিছরি নেই। এনেছেন কখনো?”

“নাই মানে? কইলেই হইবো? তিন মাস আগে এই যে আস্ত একটা মিছরি আনছি। এইডার কী হইবো? কাছে আইয়ো।”

সঙ্গে সঙ্গে দু কদম পিছিয়ে গেলো মিছরি। আলমারি থেকে পোশাক বের করে স্বামীকে ঠেলেঠুলে ঘর থেকে বের করে দিয়ে বললো,“অপেক্ষা করুন, আমি তৈরি হয়ে আসছি।”

নাজির মুচকি হাসলো। কলিমের মা আর জাহিদকে ডেকে বলে দিলো, যেন বাবার খেয়াল রাখে। তারপর মিছরি তৈরি হয়ে বের হতেই দরজায় তালা দিয়ে চলে গেলো উত্তর পাড়া শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে। তাকে রেখে সে যাবে মিল্টনের কাছে। ওদের সব বুঝিয়ে দিয়ে রওনা দেবে গন্তব্যে।
_________

মাস্টার বাড়িতে উপস্থিত পুরুষ বলতে মাত্র তিনজন। বাকিরা বেরিয়ে গিয়েছে নিজ নিজ কাজে। সকালের রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া শেষে জলপাইয়ের আচার তৈরি করছেন দিলারা বেগম। সুজাতা সিঁড়িতে বসে আছে। পেটের ব্যথায় বিদ্যালয়ে যায়নি। মিছরিকে দেখতেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুললো সে। ফটক পর্যন্ত তাকে দিয়ে নাজির বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছে। তাই ভেতরে এসে ব্যাগটা রাখলো সে। সৈয়দুন নেছা গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,“আইজকাও একলা একলা আইছো?”

“উহুম, উনি দিয়ে গিয়েছেন।”

“নাতজামাই?”

“হ্যাঁ”

“কই সে?”

“চলে গিয়েছে।”

দাদীকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে চঞ্চলা কিশোরীর মতো সারা বাড়ি দৌড়ে সবার সঙ্গে দেখা করে এলো মিছরি। তালেব বাড়িতে নেই। আচারের বয়াম হাতে খাটে বসে পা দুলাতে দুলাতে আচার খাচ্ছে পলি। বিছানায় একটি বাটিতে পড়ে আছে বেদানা, পেয়ারাসহ আরো কী কী ফল যেন। ননদকে দেখতেই ব্যাকুল হয়ে উঠলো সে। একপাশে সরে গিয়ে বসতে দিলো বিছানায়। মিছরি প্রথমেই বসলো না। সন্দেহজনক দৃষ্টিতে আপাদমস্তক তাকে দেখলো। বললো,“রানীর হালে বসে আছো যে? অসময়ে আচার, ফলমূলও খাচ্ছো। ব্যাপার কী?”

পলি লাজুক হাসলো। আঙুল চেটে মুচকি হেসে উত্তরে বললো,“আমি খাইতাছি না।”

“তাহলে কে খায়?”

পেটের উপর হাত রাখলো সে। বললো,“তোমার রাক্ষস ভাইয়ের সান্ডায়।”

“হ্যাঁ?” বুঝলো না মিছরি।

“আরেহ, তুমি ফুফু হইবা। পেডে তোমার ভাতিজা, ভাতিজি। সে-ই খাইতাছে।”

অবাক হলো মিছরি,“তুমি গর্ভবতী! কবে কবে হলো?”

“কেডায় জানে? পরশু জানতে পারলাম। কী লজ্জার কাম কও তো? রাক্ষসটা আমারে পোলাপাইন কইতে কইতে পোলাপাইনের মা বানাইয়া দিতাছে।”

মিছরি হা করে পলির দিকে তাকিয়ে রইল। পলির দৃষ্টি নিজের গর্ভে। অধরে লাজুক হাসি।

চলবে _________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here