#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩৮]
পুবাকাশ পেরিয়ে পশ্চিমাকাশে এসে থেমে দাঁড়িয়েছে সূর্যটা। নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে বিকেলে পরিণত হলো নাজিরের যাত্রা। শহরের বিকেল গ্ৰামের বিকেলের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। কোথাও কোনো পশুপাখির কোলাহল নেই, নেই বাচ্চাদের মধ্যে লাটিম কিংবা ডাঙ্গুলী খেলার উন্মাদনা। আছে শুধু যানজটের অস্থিরতা, ট্রাফিক সিগন্যালের রঙিন আলো আর কাঁধে আস্ত এক ভবিষ্যতের ভার নিয়ে ব্যস্ত পায়ে ছুটে চলা কিশোর-তরুণের দল।
লিলিদের বাড়িতে প্রবেশ করতেই বসার ঘরে ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো নাজিরের। সোফার এক কোণে শান্ত বালকের মতো বসে আছে। পৃথিবীর কোনো দুঃশ্চিন্তাই যেন তাকে ছুঁতে পারছে না।
“কেমন আছোস?”
প্রশ্নটি শুনে চট করে মাথা তুললো নওশাদ। বড়ো ভাইকে দেখে যারপরনাই অবাক হলো সে। নাজির এগিয়ে এসে তার পাশে বসলো। তবে রাগ দেখালো না, সামান্য হাসলো না, এমনকি মুখের দিকে আর ফিরেও তাকালো না।
“ভাই, তুমি?” কণ্ঠে তার বিস্ময়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ফারুক সাহেব। নাজির তাকে সালাম দিলো। তারপর এলেন রেবেকা, সঙ্গে কাজের মেয়ে সালমা। নাশতা পানি টেবিলে রেখে চলে গেলো সে ভেতরে। যাওয়ার আগে নাজিরের নিয়ে আসা পাকা কলা, আনারস আর মিষ্টান্নগুলোও নিতে ভুললো না।
কিছুক্ষণ পর সবার সাথে এসে যোগ দিলো নয়ন। তবে ছোটো ভাই সেখানে উপস্থিত নেই। সে স্ত্রী নিয়ে আলাদা খায়। বোন পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে তার প্রতি সমগ্র আগ্ৰহ যেন সে হারিয়েছে। নওশাদ তাদের উদ্দেশ্য শান্ত স্বরে বললো,“আপনারাই তবে আমার ভাইকে ডেকে এনেছেন?”
ফারুক সাহেব প্রত্যুত্তর করলেন,“তুমি যা শুরু করেছো তাই ডাকতে বাধ্য হয়েছি।”
তাদের কথা শুনে নাজির জিজ্ঞেস করল,“কী করছে ওয়?”
সঙ্গে সঙ্গে কেউ কোনো উত্তর দিলো না।ফারুক, নয়ন কথা শুরু করার আগে ভাবার জন্য সময় নিচ্ছে। নওশাদ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“কারো কথা শোনার প্রয়োজন নেই। এতদূর থেকে ওরা তোমায় ডেকে এনেছে? কীভাবে? চিঠি পাঠিয়ে? চলো আমার সঙ্গে।”
নাজির উঠলো না। বরং টেনে ছোটো ভাইকে পাশে বসিয়ে দিয়ে বললো,“চুপ, এতদূর পর্যন্ত যহন আইয়া পড়ছি, কী ঘটনা ঘটছে হুইন্না যাই। বস তুই।”
নয়ন বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলো,“দেখেন, কেমন অভদ্র আপনার ভাই। কী ব্যবহার তার! শ্বশুর, সম্বন্ধি কাউকে মান্য করে না।”
নাজিরের মুখভঙ্গি স্বাভাবিক। শান্ত স্বরেই জবাব দিলো,“সারাজীবন দেইখা আইছি মাইয়ার পরিবাররে ডাইকা আইন্না মাইয়ার নামে নালিশ দেওয়া হয়। কিন্তু এহন দেহি ঘটনা উল্টা! করছে কী ওয়? খুইল্যা কন, ভাই। সন্ধ্যা হইয়া গেছে। আবার বাড়িত ফিরতে হইবো।”
ছেলেটা যে গ্ৰামের সাদাসিধে, সহজ-সরল ছেলে না তা ফারুকের অজানা নয়। পালিয়ে যাওয়ার পর প্রথম মেয়েটার খোঁজ পেয়ে বনখড়িয়া গ্ৰামে গিয়ে বেশ হাঙ্গামা তিনি করেছিলেন। দুই চাচার সাথে তর্ক-বিতর্ক পর্যন্ত লেগে গিয়েছিল। শেষমেশ এই ছেলে এসেই সব সামলে নিয়ে রাজি করিয়েছিল দুই পরিবারকে। সেকথা মনে পড়তেই তিনি নরম স্বরে বললেন,“হাত গুটিয়ে বসে আছো কেন? আগে চা, মিষ্টি খাও। তারপর না হয় কথা বলি।”
“আইছি যহন, তা না হয় খামু, তালোই। আমনে আগে কন, এই পোলায় কী বেয়াদবি করছে? বড়ো গো লগে তো কহনো উঁচা গলায় কথা পর্যন্ত কয় না। নামকরা ভদ্র পোলা, শুধু আমনের মাইয়া লইয়া পলানের কারণে যা একটু নাম খারাপ হইছে। অভদ্র, বেয়াদব হইলাম আমি। তাও নামকরা! তাই যা কওয়ার কইয়া ফেলেন।”
নাজিরের কথা বলার ভঙ্গি অন্যরকম। ঠোঁটের কোণে অম্লান হাসি রেখে বলে ফেলে তিক্ত, সত্য সব কথা। নয়ন কঠিন গলায় বললো,“ও আমাদের সঙ্গে চরম বেয়াদবি করেছে। এখানেও দুদিন খবর পাঠানোর পর আজ এসে হাজির হয়েছে। এমনকি আমার ভোলাভালা বোনটাকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করে এখন বলে তালাক দেবে! এ নিয়ে আপনার কী বক্তব্য?”
ভ্রু যুগলের মাঝখানে ভাঁজ পড়ে নাজিরের। জবাবের জন্য সময় নেয় না। বলে,“আমনের বোইন ভোলাভালা? আমার ভাই তারে ফুঁসলাইয়া বিয়া করছে?”
“কোনো সন্দেহ?”
“পুরাডাই সন্দেহ। পরপুরুষ যহন মাস্টর হইয়া বাড়ির মাইয়ারে পড়াইতে আইছিল তহন আমনেরা কই আছিলেন? কী পড়ায়, কেমনে পড়ায় দেখা কী আমনেগো দায়িত্ব না? তারচেয়ে বড়ো কথা, মাইয়ারে তো ওয় ভাগায় নাই, মাইয়া নিজে ভাইগা গেছে, হুমকি দিয়া বিয়া করছে। কেমন পারিবারিক শিক্ষা? ব্যাডা মাইনষের দিল নরম। মাইয়া মানুষ দেখলেই গইল্লা যায়। কিন্তু মাইয়া মাইনষে ক্যান পলাইবো? দোষ দিতে হইলে দুইডারে দিবেন; একটারে সাধু সাজাইয়া আরেকটার অসাধু সাজাইয়া না।”
নয়ন রেগে গেলো,“কথা ঠিকভাবে বলবেন। এটা গ্ৰাম নয়, শহর। যেই বাড়িতে বসে আছেন সেই বাড়িটাও আমাদের।”
ভাইয়ের অপমান সহ্য হলো না নওশাদের। কঠোর স্বরে বললো,“আমার ভাইয়ের সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বললে আমি মেনে নেবো না। নিজ থেকে সে আসেনি, আমার অনুমতি ছাড়া আপনারাই ডেকে এনেছেন। এবং পুরো শহরটাও আপনাদের একার নয়।”
নয়ন তেড়ে আসতে লাগলো,“কী বললে তুমি? বোন জামাই বলে শুধু ছাড় দিচ্ছিলাম এতদিন। তোমাদের কোনো যোগ্যতা আছে আমাদের সামনে বসে কথা বলার?”
ফারুক ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,“মারামারি করবি নাকি এখন? শান্ত হয়ে বোস।”
নাজির অধরে হাসি রেখেই বললো,“শহরে দুই কাঠা জমির উপরে দুই তলা একটা বাড়ি কইরাই অনেক যোগ্যতা ওয়ালা মানুষ হইয়া গেছেন?”
“চাষাভূষা তো আর নই।”
“অথচ আমনেগো যোগ্যতা সম্পন্ন বইয়ের পাতায় লেখা আছে, বাংলাদেশ হলো কৃষিপ্রধান দেশ। করেন তো সরকারি চাকরি। এককথায় জনগণের কামলা। মাস শেষে যা মাইনে পান তার থাইক্যা বেশি খরচ করেন। বাকি ট্যাহা দুর্নীতির। তা দেশে আমনেগো কতটুকু অবদান আছে? আমগো যা জমিজমা, ট্যাহা পয়সা আছে তা আমনেগো তিন পুরুষের স্বপ্ন। ট্যাহা পয়সার অহংকার দেখাইয়েন না। সৎ পথে রক্ত পানি কইরা এই ভাইরে লেখাপড়া শিখাইছি, শহরে পাঠাইছি। লেখাপড়া শেষ হইলে ওয়ও আমনেগো মতোই চাকরি করবো। না করলেও অবশ্য সমস্যা নাই। ব্যবসা আমি নিজে দাঁড় করাইছি। চাইলে হেনেই কামলা দিয়া খাইতে পারবো। তাই বুইঝা কথা কন।”
ফারুক চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“ওর কথায় কিছু মনে করো না। রাগের মাথায় কী না কী বলে ফেলছে।”
“মোদ্দা কথায় আইয়েন, তালোই। প্যাঁচ ঘোচ আমার পছন্দ না। আমনের মাইয়া কই? তারেও ডাকেন। হেরে লইয়াই তো কথা হইতাছে।”
“ও ছোটো মানুষ, এখানে থেকে কী করবে?”
“প্রেম, বিয়া বুঝা আর পলাইয়া যাওয়া মাইয়া কহনো ছুডো হইতে পারে না, তালোই। বয়সের দিক দিয়া ছুডো হইলেও মানসিকতার দিক দিয়া বড়ো। ডাকেন তারে।”
ফারুক সাহেব মেয়েকে ডাকলেন না। বরং এলেন মূল প্রসঙ্গে।
“যতদিন না চাকরি বাকরি হচ্ছে ততদিন তোমার ভাইকে বলেছিলাম, আমার বাড়িতেই থাকতে। একা মেয়েটাকে কীভাবে ছাড়ি বলো তো? কিন্তু তোমার ভাই লিলিকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেলো। কী একটা আধভাঙা বাড়ি ভাড়া নিলো! আমার মেয়ে তো ওখানে থাকতে পারে না। তাই কিছু আসবাবপত্র পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার ভাই এই সামান্য কারণে লিলিকে বকাঝকা করল। মেয়েটা এসে কি কান্না! শেষে আমরা বাড়িতে গিয়ে কথা বলতেই মুখের উপর বলে দিলো, আপনাদের মেয়ে আপনারা নিয়ে যান। ওকে আমি আর রাখবো না। এটা কী ঠিক?”
নওশাদ চুপ করে শুনলো। যদিও কথাটায় সত্যটার উপস্থিতি রয়েছে আংশিক। নাজির দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো,“একদম ঠিক না।”
ফারুক সাহেব সন্তুষ্ট হলেন। বললেন,“এখন তুমিই বলো, কী করবে?”
“আমগো বংশ হইলো উচ্চ বংশ, তালোই। দাদা, পরদাদার আমল থাইক্যাই। আমগো বংশের পোলারা ঘরজামাই থাকে না। তাই আমিই ওরে ভাড়া বাড়িতে থাকতে কইছিলাম।”
অধরের সন্তুষ্টি ভাবটা মলিনতার নিচে চাপা পড়ল ফারুক সাহেবের। নাজির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“ঘটনা কী? আসলেই তুই তালাকের সিদ্ধান্ত নিছোস? সামান্য ঝগড়া, কথা কাটাকাটি প্রত্যেক সংসারেই হয়। তার লাইগা এইসব কী সিদ্ধান্ত?”
“স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লাগা আর সেই ঝগড়ায় শ্বশুরবাড়ির হস্তক্ষেপ দুটোই আলাদা বিষয়। আমি একটা মানুষ, আমার নিজস্ব পছন্দ আর সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিন্তু কেউ তা বুঝতেই চাচ্ছে না। এই বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আলাদা হয়ে যাওয়ার পরেও নিজের মতো থাকতে পারছি না। যৌতুক নিতে রাজি না হওয়ায় উনারা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। লিলি পর্যন্ত সামান্য কিছু হলেই বাপের বাড়ি এসে নালিশ করে, তোমাদের সঙ্গে ওর আচরণ তো দেখেছোই! প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মা-ই যদি মেয়েকে কানপড়া দেয় তাহলে কীভাবে ঠিক হবে? আমি এসবে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছি। আমার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব নয়। এভাবে চলতে থাকলে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবো নয়তো মরে যাবো।”
নাজির বুঝতে পারলো, এটা যে সে সমস্যা নয় বরং জটিল সমস্যা। যা আপাতত অনেক দূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। নওশাদ হুটহাট রেগে যাওয়ার মতো ছেলে নয়। সে নাজিরের বিপরীত স্বভাবের। নাজির আগুন হলে নওশাদ ঠান্ডা পানি। তাই ছেলেটাকে ঠান্ডা মাথায়, নিরালায় বোঝাতে হবে। সে বললো,“বিয়ার পর মাইয়া মাইনষের অভিভাবক তার স্বামী। স্বামী যদি ভালা হয় তাইলে আমনেগো তো কথা বলার কিছু দেখি না। ভালা সংসারগুলা আমনেগো পাকনামির লাইগাই নষ্ট হয়। মাইয়ারে ডাকেন।”
রেবেকা লিলিকে নিয়ে এলেন। এসেই সর্বপ্রথম স্বামীর দিকে তাকালো লিলি। অথচ ছেলেটা মুখ তুলে তাকে একপলক দেখলো না। লিলি একপাশে চুপচাপ বসলো। নাজির বললো,“সোজাসাপ্টা কথা কই। তুমি কী কও? নওশাদের লগে সংসার করবা?”
“হ্যাঁ, সংসার করার জন্যই তো সবার বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করেছিলাম।”
“তাইলে স্বামীর সম্মানের তোয়াক্কা সবার আগে করতে হইবো। তোমার বাপ, ভাই কোনো কিছুতে হস্তক্ষেপ করতে পারবো না। শ্বশুরবাড়ির সবার লগে মিলমিশ কইরা চলতে হইবো। গেরামে গিয়া সংসার করতে হইবো। রাজি?”
রেবেকা আঁতকে উঠে বললেন,“আমার মেয়ে এসবে অভ্যস্ত নয়। তোমরা যা তা সিদ্ধান্ত ওর উপর চাপিয়ে দিতে পারো না।”
নাজির মহিলাকে বিশেষ পাত্তা দিলো না। লিলির উদ্দেশ্যে পুনরায় বললো,“রাজি?”
ভাববার জন্য সময় নিলো লিলি। তবে উত্তর দিলো না। নওশাদ উঠে দাঁড়ালো। টেনে তুললো ভাইকেও। বললো,“আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। এরা কখনো শোধরানোর নয়। আমি থেকেছি তাই জানি। তুমি যা বলবে এবার থেকে আমি তাই শুনবো, ভাই। তবুও তুমি আর আমায় জোর করো না। এমন চলতে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাবো। আমি আর পারছি না। ঝোঁকের মাথায় একটা ভুল করে ফেলেছি। এবার তা শোধরানোর পালা।”
নওশাদ আর দাঁড়ালো না সেখানে। দ্রুত হেঁটে চলে গেলো। নাজির দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। সবার উদ্দেশ্যে বললো,“আইজ তবে আসি। সংসার কহনো একপক্ষের চেষ্টায় তৈরি হয় না। দুই পক্ষেরই চেষ্টা লাগে। মাইয়ারে বুঝান, আমি না হয় আমার ভাইরে বুঝামু।”
তারপর সেও ছোটো ভাইয়ের পিছুপিছু বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। রাস্তায় নেমে বুক ভরে শ্বাস নিলো। এখন একটু স্বস্তি লাগছে। এসব বড়ো বড়ো ইট পাথরের বাড়ি তার ভালো লাগে না।
দূরের কোনো মসজিদে মাগরিবের আজান দিচ্ছে। পথের ধারের টং দোকানে জ্বলে উঠতে লাগলো আলো। দুই ভাই পাশাপাশি হাঁটছে। দুজনার মধ্যে চলছে তুমুল নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে নওশাদ বললো,“তোমার রাগ হচ্ছে না, ভাই? কিছু জিজ্ঞেস করবে না?”
“রাগ হইবো ক্যান? তবে আমি কমু, হুটহাট সিদ্ধান্ত নেইস না। ঠান্ডা মাথায় ভাইবা চিন্তা সিদ্ধান্ত নে। ভাঙা খুব সহজ হইলেও গড়া খুব কঠিন।”
“তুমি তো দেখলেই ওদের আচরণ। আমি শেষ হয়ে যাবো, ভাই। তোমার অবাধ্য হওয়ার ফল যে এভাবে পাবো বুঝতেই পারিনি।”
“কোনো ফল টল না। শুরুতেই মেরুদন্ড সোজা রাখা উচিত আছিলো। যাই হোক, আপোষে কথা কইস। যদি রাজি থাকে তাইলে ঠিক কইরা নেইস।”
“আর রাজি না হলে?”
“নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকিস। কারো লাইগা কারো জীবন থাইম্মা থাকে না। মানুষ ভাঙে, গড়ে, ঠকে, আবার বিশ্বাস করে। এইটাই নিয়ম। জীবনে আগাইয়া যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাম।”
নওশাদ মাথা নুইয়ে নিলো। হাঁটতে লাগলো উদ্দেশ্যহীন পথে। নাজির বললো,“তোর পরীক্ষা টরীক্ষা আছে? লেখাপড়া শেষ হইতে কতদিন?”
“ফাইনাল পরীক্ষা গত সপ্তাহে শেষ হয়েছে।”
“এত তাড়াতাড়ি? আমি তো ভাবলাম আরো এক বছর লাগবো হয়তো।”
“রেজাল্ট বের হতে একটু সময় লাগবে।”
“চল, বাড়িত যাইগা। রাইতে ট্রেন পাওয়া যাইবো?”
“দশটায় একটা আছে।”
“ক্ষুধা লাগছে, হুনছি ঢাকার বিরিয়ানি নাকি অনেক জনপ্রিয়? আয় দুই ভাইয়ে মিল্যা খাইয়া আসি। হের পরে মার্কেটে যাইতে হইবো। তোর ভাবির লাইগা কিছু কেনাকাটা করমু। এই ভূমি আফিস কোনদিকে রে? রাইতে খোলা থাকে? যাওয়া প্রয়োজন। শহরে আবার কবে না কবে আইমু।”
“ভূমি অফিসে গিয়ে তুমি কী করবে?”
“কাম আছে, গেলেই দেখতে পারবি।”
“ভাবিকে বাড়িতে একা রেখে এসেছো?”
“না, বাপের বাড়ি রাইখা আইছি। চাচী, ভাবিরা সুযোগ পাইলেই কথা হুনায়, বেশি কাম করায়। অবুঝ মাইয়া নাও করতে পারে না।”
“তাহলে আজ রাতটা বরং এখানেই থেকে যাও। কাল না হয় প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে ফিরবে।”
“থাকা অবশ্য যায়। তা বিরিয়ানির দোকান কই? নিয়া চল। শহরের প্যাঁচ ঘোচ রাস্তা আমি চিনি না।”
নওশাদ মৃদু হাসলো। বড়ো ভাইকে নিয়ে উঠে পড়ল একটি বাসে। বহুদিন পর দুই ভাইয়ের মধ্যে খোশগল্প হলো, প্রাণ খুলে হাসাহাসি হলো, হলো কতশত গোপন কথা! কে বলবে দুই ভাইয়ের সম্পর্কও এত সুন্দর হয়?
_______
সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠেছে বাড়িতে। দিলারা, পারুল মিলে বানাচ্ছেন পুলি পিঠা আর দুধ চিতই। ঘর থেকে ভেসে আসছে সুজাতার স্বর থেকে ছড়া। সিফাত উঠোনে দৌড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফাহমিদাও এসেছে বেড়াতে। কয়েকদিন এখানে থাকবে। তারা সবাই মিলে বারান্দায় বসে গল্প করছে।
মিছরি ভোঁতা মুখে বসে আছে চুলার ধারে মায়ের কাছে। বিকেলের দিকে নাক ফুঁড়িয়েছে সে। দাদীকে বলতেই দিলারা বেগম নিজেই ফুঁড়িয়ে দিয়েছেন। ফর্সা নাকটা লাল টুকটুকে হয়ে আছে, জমাট বেঁধেছে রক্ত। আপাতত সেখানে রঙিন সুতা লাগিয়ে রাখা হয়েছে। ক্ষত শুকালে পরানো হবে নাকফুল। পারুল রুটির মতো করে খামি বেলতে বেলতে কঠিন স্বরে বললেন,“সবাই গাল গপ্পো করতাছে আর তুই চুলার তাপে আইয়া বইয়া রইছোস ক্যান? যা এন্তে।”
“না, পিঠা বানানো শিখবো। তোমাদের জামাইকে বানিয়ে খাওয়াতে হবে না?”
সৈয়দুন নেছা উঠোনে একটি চেয়ারে বসে আছেন। আকবর মিয়া লাঠি হাতে হাঁটাহাঁটি করছেন। বহুদিন পর বাড়িটা আবারো ভরে উঠেছে। বৃদ্ধা প্রশান্ত কণ্ঠে বললেন,“এই তো আমার নাতনির বোঝ হইছে। শিখাও বউ, শিখাও। ভবিষ্যতে কাজে লাগবো।”
পারুল বললেন,“হ, চাচী শাশুড়ির সংসারে খাইট্টা মরবো। হাত দেখলেই বুঝা যায়, কত কাম যে করায়।”
“উনি বলেছেন, কাজকর্ম শেখা হলে আমায় আলাদা রান্নাঘর তৈরি করে দেবেন। তাছাড়া একটা সংসারে কী আর সবাই ভালো হয়?”
“নাজিরে কই? ওরেও আইতে কইতি। কাছে থাইক্যা কাছে অথচ আইয়ে না একটু।” আকবর মিয়া বললেন।
মিছরিও মায়ের দেখাদেখি রুটিতে আকৃতি দিয়ে নারিকেল আর গুড়ের তৈরি পুর ভরতে লাগলো ভেতরে। হেসে উত্তর দিলো,“উনি বাড়িতে থাকলে তো আসবে।”
“কই গেছে আবার?”
“ঢাকা।”
কড়াই থেকে সদ্য নামানো গরম পিঠা ফুঁ দিয়ে খেতে খেতে সুজন বললো,“দুইদিন পরপর এত শহরে যায় ক্যান? সুবিধার লাগে না। জামাইরে টাইট দিয়া রাখবি। শাহ গো আমার এমনিতেই ভাল্লাগে না। তার উপর কয়দিন ধইরা ওর হাবভাব, আচরণও বদলাইয়া গেছে দেখলাম।”
মাসুম জিজ্ঞেস করল,“আবার কী বেয়াদবি করছে?”
“বেয়াদবি করলেও মানা যাইতো কিন্তু সমস্যা হইলো কোনো বেয়াদবিই করে নাই। সেদিন দেহি গাড়ির অপেক্ষায় চায়ের দোকানে বওয়া। ডাকতেই সুন্দর কইরা জবাব দিলো। কী অবাক কান্ড!”
মিছরি বললো,“লোকটা ভালো ব্যবহার করছে তাও তোমাদের ভালো লাগছে না?”
“হঠাৎ কইরা যদি বেয়াদবে বেয়াদবি ছাইড়া দিয়া মিষ্টি কথা কয় তাইলে কেমনে ভাল্লাগবো?”
ফাহমিদা তৎক্ষণাৎ মাঝখানে বলে উঠলো,“আগে ঘরে মিছরি আছিলো না তাই বেয়াদবি করছে। এহন ঘরে মিছরি আছে। তাই বেশি বেশি মিছরি খাইয়া মিষ্টি কথা কয়।”
পলি, জেসমিন, রুহুল একসঙ্গে হেসে উঠলো। মিছরি চোখ রাঙিয়ে তাদের দিকে তাকালো। খোলা আকাশের নিচে চুলা হওয়ায় বারান্দায় বসা সবাইকে দেখা যাচ্ছে। বয়সে বড়ো হওয়ার পরেও কোথায় কী বলতে হয় তা এখনো এই ফাহমিদা শেখেনি। লজ্জা লাগছে মিছরির। আকবর মিয়া জিজ্ঞেস করলেন, “ঢাকা গেছে ক্যান রে, মিছরি? কিছু কইছে? ফিরবো কবে?”
“শহর থেকে চিঠি এসেছিল, তাই উনার ভাইয়ের কাছে গেছে। বলেছে, ফিরে এসে আমায় নিয়ে যাবে। আর দুদিন আগে গিয়েছিল জেলা শহরে। ব্যবসায়িক কিছু কাজে।”
“ওর আবার ব্যবসায়িক কাজ কীয়ের? আজাইরা।” রুহুল বললো কথাটা।
আগে লোকটাকে নিয়ে কিছু বললে মিছরির কিছুই যায় আসতো না। তবে এবার রাগ হলো। মুখের উপরই জবাব দিলো,“উনি মোটেও আজাইরা নয়। বরং তোমাদের থেকেও ব্যস্ত। যা করে নিজ পরিশ্রমে করে।”
পারুল ধমকালেন,“বড়ো ভাইয়ের লগে এই কেমন দ্বারার কথাবার্তা?”
“তো বড়ো ভাই ছোটো বোনের স্বামীকে নিয়ে যখন বলে?”
রুহুল টিটকারী মেরে বললো,“বিয়ার আগে ঠিকই কাইন্দা ভাসাইতাছিলো, বিয়ে করবো না বইল্যা ভাই- বোইনে পলাইতাছিলো পর্যন্ত। অথচ সেই মিছরি এহন জামাইয়ের নামে কিছু হুনলেই ছ্যাত কইরা উঠতাছে। নাজির শাহ কী জাদু করছে আমগো বোইনডারে?”
পলি বললো,“পিরিতের জাদু করছে।”
বাকিরা শব্দ করে হেসে দিলো। মিছরি ফুঁসে উঠলো। বসা থেকে উঠে তাদের পাশ কাটিয়ে ঘরে যেতে যেতে বললো,“তোমাদের সঙ্গে আড়ি। কথাই বলবো না।”
সৈয়দুন নেছা নাতিদের ধমকালেন,“দিলি তো মাইয়ারে রাগাইয়া? দেখিস, আইজ রাইতে খাইবোই না।”
আকবর মিয়া বললেন,“সংসারে মাইয়ার মন লাগছে। আগে জামাইরে সহ্য করতে পারতো না, এহন কটু কথা হুনলেই রাইগা যায়। ভুল মাইনষের লগে কিন্তু নাতিন বিয়া দেই নাই। কী কও?”
কথাটা বলে তিনি মাসুমের দিকে তাকালেন। দাদার চাহনি দেখে মাসুম বসা থেকে উঠে চলে গেলো ঘরে। মিছরি ঘর থেকে বের হলো সন্ধ্যার পর, বাবার ডাকাডাকিতে। জম্পেশ গল্প করতে করতে পিঠা আর রাতের খাওয়া শেষ হলো। দুধ চিতই পিঠা খাওয়া হবে সকালে। সব ভাই-বোনেরা একসঙ্গে হওয়ায় রাতে ঘুমাতে যেতে দেরি হলো।
শেষরাতে ফাহমিদা মিছরির সঙ্গে মিছরির ঘরেই ঘুমালো।
_________
রাতের পর ভোর এলো জলদি। প্রকৃতি আজ কেমন যেন ঝিমিয়ে আছে। জ্বলন্ত চুলার আগুন থেকে ধোঁয়া নিঃসৃত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। ছেলে-মেয়েরা আমপারা হাতে মক্তব থেকে ফিরছে বাড়ি। তাদের কোলাহল ভেদ করে আচমকাই মসজিদের মাইকে আওয়াজ হলো। খানিক বাদে ভেসে এলো ইমামের দুঃখ ভারাক্রান্ত স্বর,“একটি শোক সংবাদ! বনখড়িয়া গ্ৰাম নিবাসী, পশ্চিম পাড়ার মরহুম ফতেহ আলী শাহর পুত্র সুবহান আলী শাহ ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
চলবে _________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

