#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩৯]
আকাশে ধূসর মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে। চারপাশে বইছে মৃদু হাওয়া। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এসেই মুমিনুল শাহর ঘরদোর পরিষ্কার করে ঝাড়ু হাতে নাজিরের ভিটের দিকে ছুটলেন কলিমের মা। আজ তাঁর মন মেজাজ বিশেষ ভালো নেই। দাঁতে দাঁত পিষে খিটখিটে মেজাজে উদ্ধার করছেন কারো বংশকুল। উঠোনে দাঁড়িয়ে রোজকার মতো হাঁসেদের খাবার দিতে দিতে কৌতূহল নিয়ে মর্জিনা জিজ্ঞেস করলেন,“মাথা এত গরম ক্যান, কলিমের মা? তোর আবার সাতসকালে কী হইছে?”
নারিকেল কাঠির ঝাড়ুটা চৌকির নিচে আর ঢুকালেন না মহিলা। কাজে ভীষণ ফাঁকিবাজ কিনা! কপাল কুঁচকে গজরাতে গজরাতে বললেন,“ঝন্টুর বউডা আস্ত একটা ডাইনী। কাইল আমারে দিয়া নামার ক্ষেত থাইক্যা চাইর পাতি কালা মাডি আনাইয়াও ট্যাহা দেয় নাই। আমি কী আজাইরা মানুষ? গায়ে গতরে কাম কইরা খাই। ভেইন্না কালে গিয়া ট্যাহা চাইতেই কয়, চাইর পাতি ঠিকমতো ভরছিল? কত্ত বড়ো খবিশ মহিলা, কন তো?”
“আগে ট্যাহা লইতে পারলি না?”
“আমি কী জানি নাকি হেয় যে এমন করবো?”
কথা বলতে বলতে এবার সুবহান আলী শাহর ঘরে প্রবেশ করলেন কলিমের মা। গতকাল দুপুর থেকে এই ঘরে পা রাখেননি তিনি। তাই কেমন যেন বিদঘুটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। ময়লাগুলো বারান্দায় বের করে ঘরের জানালার কপাট খুলে দিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকাতেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো। অন্যান্য দিন লোকটার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশিই ঘন চলে, ওঠানামা করে মেদহীন পেট। তবে আজ তার কিছুই হচ্ছে না। সন্দেহ নিয়ে এগিয়ে গেলেন কলিমের মা। বাম হাতের আঙুল রাখলেন নাকের কাছে। মুহূর্তেই চমকে উঠলেন যেন। হাতের ঝাড়ু ছুঁড়ে ফেলে দৌড়ালেন বাইরে। চিৎকার করে বললেন,“ভাবি গো, সুবহান ভাইয়ে দেহি নড়েচড়ে না। মইরা গেছে নাকি?”
মর্জিনা চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে বললেন,“এইসব কী কথা? কাইল দুপুরে, হাইনজায় আমি খাওন খাওয়াইছি। রাইতে আমগো নাজমুলে ঘরে লাইট জ্বালাইয়া তালা দিয়া আইছে।”
“আমনে দেইখা যান, ভাবি।”
ভাতের চাল ধুতে কলপাড় যাচ্ছিলেন মর্জিনা। কথাটা শুনে মাঝপথ থেকেই ফিরে এলেন। তাঁর পিছুপিছু নিম গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করতে থাকা জাহিদও এলো। প্রথমে চাচার নাকে, বুকে হাত রেখে পরে হাতের শিরা পরীক্ষা করল। বিস্ময় ভরা চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো, “চাচা আর নাই, আম্মা!”
মর্জিনা অবাক হলেন। প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। একসময় সজাগ হয়ে উঠলো বাড়ির সকলে। মৃত্যু সংবাদ শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছতেই চারিদিকে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। ফরিদা সিঁড়িতে বসে মুখে আঁচল গুঁজে হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। পিতার আদেশে জাহিদ ছুটে গেলো মসজিদে, জানিয়ে এলো এই মর্মন্তুদ সংবাদ।
ধীরে ধীরে বেলা বাড়তে লাগলো। গ্ৰামে কেউ মারা গেলে তার মৃত্যু সংবাদ বাতাসের থেকেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। সুবহান আলী শাহর ক্ষেত্রেও তাই হলো। দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটে এসে ভিড় জমালো শাহ বাড়ির আঙিনায়। বারান্দায় একটি মাদুরে শুইয়ে রাখা প্রাণহীন, নিথর দেহখানার দিকে তাকিয়ে কেউ বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলো, “আহারে, এত বছর ধইরা কত কষ্টডাই না করছে ব্যাডায়! সেই কষ্ট থাইক্যা আল্লাহ তারে আইজ মুক্তি দিলো।”
জন্ম, মৃত্যু শব্দ দুটো একে অপরকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। জন্ম মানেই মৃত্যু নামক পথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনিবার্য এক যাত্রা। যেই যাত্রা পথে কেউ স্রষ্টার ভয়ে বেছে নেয় সততার পথ আবার কেউ বা স্রষ্টাকে ভুলে লোভ আর ক্ষমতার মোহে পড়ে হয়ে ওঠে নির্মম, নিষ্ঠুর, অমানুষ।
উঠোনের একপাশে মৃতদেহের গোসলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ছেলেরা গিয়েছে বরই পাতা আর শেষ বাজার করে আনতে। চুলায় ফুটছে পাতিল ভরা পানি।
মুমিনুল শাহ মর্মাহত হয়ে বসে আছেন বড়ো ভাইয়ের লাশের পাশে। লোকজন মাঝেমধ্যে এসে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে।
নাজির এখনো ফেরেনি। বাবার মৃত্যু সংবাদটা হয়তো বা পৌঁছায়নি তার কান অবধি। মসজিদের মাইকে এমন একটি ঘোষণা শুনেই নাতনিকে নিয়ে লাঠিতে ভর করে আকবর মিয়া এসে পৌঁছেছেন শাহ বাড়ির দোরগোড়ায়। বুড়োকে দেখেই সঙ্গে সঙ্গে আমিরুল শাহ গজরে উঠলেন,“আইয়া পড়ছে আমার আব্বার খুনি। আমার ভাইডার শেষ পরিণতি দেইখা মজা লইতে আইয়া পড়ছে। হেরা না থাকলে আইজ আমার ভাইডারও সুন্দর একটা জীবন হইতো, শান্তির মরণ হইতো। কিন্তু তারা দিলো না, দিলো না।”
পাগলের মতো বিলাপ করতে লাগলেন তিনি। অথচ চোখেমুখে নেই কোনো দুঃখ বা অনুশোচনার ছাপ। আকবর মিয়া মানুষের চোখমুখ দেখে ভেতরকার মনোভাব বুঝতে পারেন।তাই ওই লোক দেখানো মায়া কান্না আর হাপিত্যেশ করতে থাকা লোকটার চোখে যে আনন্দ জ্বলজ্বল করছে তা খুব ভালো করেই বুঝে গেলেন তিনি। ফাঁকা স্থানে মশারী টাঙিয়ে মৃতদেহ গোসল করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেদিকে পা বাড়াতেই মুমিনুল শাহ বাঁধা দিয়ে বললেন,“ভিতরে আওয়ার দুঃসাহস করবেন না। যান এইখান থাইক্যা, ভাগেন।”
তাদের পিছুপিছু রুহুল আর সুজনও এসেছে। একা এমন একটি বাড়িতে বৃদ্ধ দাদাকে তো আর তারা ছেড়ে দিতে পারে না। আকবর মিয়া এদের সাথে আর তর্কে জড়ালেন না। মৃত্যু সংবাদ শুনে তিনি বিমূঢ় হয়ে আছেন। শরীরটা কেমন করে যেন কাঁপছে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। এদের দুই ভাইকে সুক্ষ্মভাবে পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন তিনি। মিছরি গিয়ে ঘর থেকে এনে দিলো চেয়ার। প্রথমেই তিনি বসলেন না। এগিয়ে গেলেন লাশের দিকে। পুনরায় বাঁধা দিলেন আমিরুল শাহ,“আমগো ভাইয়ের লাশ দেখতে আমনেরে দিমু না। যান এন্তে। লগে আমনেগো মাইয়াও লইয়া যান। ওর এই বাড়িতে কোনো জায়গা নাই।”
উপস্থিত মানুষেরা সেসব দেখছে। একে অপরের সাথে ফিসফিস করছে। সুজন ধমকালো,“বাড়ি কী আমনেগো একলার? নাজির কই? জানে ওয়?”
প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না আমিরুল শাহ। বরং মাস্টার বাড়ির মানুষগুলোকে তাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। আকবর মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে গিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। বেলা বাড়লো, মানুষের সংখ্যাও বাড়লো। কত রকমের আত্মীয়-স্বজন যে এসে পৌঁছে গেলো!
বাঙালির বেশকিছু খারাপ স্বভাবের মধ্যে অন্যতম এক স্বভাব হচ্ছে, মনুষ্যত্বের অভাব। কোথাও কেউ আহত হলে, মারা গেলে তারা অযথাই গিয়ে সেখানে ভিড় জমায়। যেন কারো ক্ষতি হয়নি বরং মনোরঞ্জক মেলা বসেছে। একসময় সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে তারা বের করে মানুষটির দোষত্রুটি। সেখান থেকে মোড় নেয় বাড়িতে কী হয়েছে, না হয়েছে সহ জগতের সব ধরণের সমালোচনা আর কুটিলতায়।
নাজির আর নওশাদ গ্ৰামে এসে পৌঁছালো যহরের ওয়াক্তের কিছুক্ষণ আগে। গাড়ি থেকে নামতে না নামতেই পিতার মৃত্যু সংবাদ তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। নাজির কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। হুঁশ ফিরতেই দ্বিগিদ্বিক হারিয়ে সেখান থেকে দৌড়ে এলো বাড়ি পর্যন্ত। এতটুকু দৌড়েই সে হাঁপিয়ে গেছে, বুকে এসে আটকে গেছে নিঃশ্বাস। মাছির মতো ভিড় জমিয়ে রাখা লোকগুলোকে ঠেলেঠুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই বুকটা ধক করে উঠলো, ঘোলাটে হয়ে এলো আঁখি যুগল। ততক্ষণে মৃতদেহের গোসল শেষে গায়ে জড়ানো হয়েছে কাফনের কাপড়। মসজিদ থেকে আনানো হয়েছে খাটিয়া।
নাজিরের মাথা কাজ করছে না। একপ্রকার ছুটে এসে বসলো বাবার শিয়রে। ফেরার পথে বাবার জন্য বেশ কয়েকটা লুঙ্গি আর ফতুয়া কিনে এনেছিল সে। এনেছিল মুড়কি আর মিষ্টান্ন। বাবা খেতে খুব পছন্দ করেন। এখন কী হবে সেসবের?
সারাক্ষণ অনর্গল কথা বলতে থাকা ছেলেটার মুখ দিয়ে আজ আর শব্দ বের হতে চায় না। হাত কাঁপছে, বুক কাঁপছে। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ বাবাকে দেখতে ভীষণ সুন্দর লাগছে। একেবারে নওশাদের মতো ধবধবে ফর্সা, স্নিগ্ধ মুখ। ছেলেবেলায় নাজিরও তো এমন ফর্সাই ছিল! তারপর সে বুঝতে শিখলো, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে রোদে খাটতে লাগলো, অর্থের পেছনে পুড়িয়ে ফেলল ত্বকের উজ্জ্বলতা।
পিতার অধরের হাসিটা দেখে নাজির ভীষণ অবাক হলো। চোখে সুরমা দেওয়ায় হাসিটা একটু বেশিই ধরা দিচ্ছে। কম্পিত হাতটা উঠিয়ে রাখলো সে ভেজা চুলে। ধীরে ধীরে তা নেমে এলো গাল পর্যন্ত। কোমল অথচ বিষাদগ্ৰস্ত কণ্ঠে ডাকলো,“আব্বা! আব্বা! ও আব্বা! এই দেহো, আমি আইয়া পড়ছি। আব্বা!”
এই প্রথম তার ডাকে বাবা সাড়া দিলো না, চোখ খুলে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতো হেসে উঠলো না। বাবার এই নির্লিপ্ততা দেখে নাজিরের অভিমান হয়। ফিরতে দেরি হওয়ায় কী বাবা রাগ করেছে তার উপর? অস্থির হয়ে শরীর ঝাঁকায়,“আব্বা, ওঠো না। ও আব্বা!”
নওশাদ খাটিয়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কঠোর বড়ো ভাইয়ের অস্থিরতা, পাগলামি দেখে বুক ভার হয়ে আসছে তার। জীবনের এই প্রথম বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে। নামমাত্র বাবাটাও তাদের আর নেই। আজ থেকে তারা অনাথ। পুরোপুরিভাবে অনাথ। সামিউল এসে চাচাতো ভাইকে টানতে টানতে বললো,“মাত্র লাশটা গোসল করানো হইছে। এমনে ধরিস না, এতদূর থাইক্যা আইছোস! ময়লা লাগবো।”
লাশ! তার বাবা লাশ! শব্দটা শুনেই সামিউলের দিকে চট করে মাথা তুলে তাকালো নাজির। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। টোকা দিলেই যেন কঠোর পুরুষের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে রক্ত। সামিউল খানিকটা ইতস্তত করে দূরে সরে গেলো। আমিরুল শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“এমনিতেই জীবনে অনেক কষ্ট করছে তোর বাপে। তারে আর কষ্ট দেইস না, বাপ। মরছে সেই রাইতে, অসুইখ্যা মানুষ তাই শরীরে পঁচন ধরবো। যা দুই ভাইয়ে গোসল কইরা আয়। নামাজের পর হের জানাজা।”
নাজির একবার চাচাকে দেখে, চোখ ঘুরিয়ে উপস্থিত সকলকে দেখে। শুধু দেখে না খাটিয়ায় নিথর পড়ে থাকা লোকটার জন্য কারো চোখে একটু অশ্রু। এই বিশাল দুনিয়ায় নাজির ছাড়া ওই লোকটার জন্য একটু কষ্ট পাওয়ার মতো একটা মানুষও দেখে না। সবার মধ্যে শুধু আফসোস। যেন বেঁচে থেকে তিনি মহাভুল করে ফেলেছেন। সবার ভাষ্যমতে, আরো আগেই তাঁর মরে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাঁচা, মরা কী আর মানুষের হাতে থাকে? ভাগ্য, ভবিষ্যৎ, জন্ম, মৃত্যু সবই তো লিখেছেন সৃষ্টিকর্তা, মহান রাব্বুল আলামীন।
ক্লান্ত শরীরটা অতি কষ্টে ঘরে টেনে নিয়ে যায় সে। পোশাক বদলে করে আসে গোসল। সাদা পাজামা- পাঞ্জাবী গায়ে জড়িয়ে আতর মেখে তৈরি হয়। উঠোনে পা ফেলার মতো জায়গা নেই। এত এত মানুষ কোথায় ছিল এতগুলো বছর? তখন তো একবারও দেখতে আসেনি সুবহান আলী শাহ কেমন আছেন। অথচ মৃতের আশেপাশ আজ তাদের কত অভিনয় আর আহাজারি! তবে কি মানুষ মরলেই তাঁর কদর বাড়ে?
নওশাদ তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে খাটিয়ার পাশে।
ঘর থেকে নাজির বেরিয়ে আসতেই আমিরুল শাহ, মুমিনুল শাহ তাদের তাড়া দিলেন,“আয়, আয়, যহরের নামাজ শুরু হইয়া যাইবো।”
“আমনেরা খাটিয়ার পায়া ধইরেন না।”
নাজিরের কথায় থেমে দাঁড়ালেন দুই ভাই। মুমিনুল শাহ বললেন,“ধরমু না মানে? তাইলে নিবি কেমনে?”
“আমরা দুই ভাই আছি না? সুবহান আলী শাহর পোলা।”
“বাকি দুইডা কেডায় ধরবো? তোরা পোলা হইলে আমরা তার ভাই। আপন মায়ের পেডের ভাই।”
“ভাই! এই পরিচয় আর দিয়েন না। আল্লাহ গোস্বা করবো। শেষ মুহূর্তে আমি চাই না অমানুষগো ছোঁয়ায় আমার আব্বার আত্মা কষ্ট পাক।”
হতভম্ব হয়ে গেলেন দুই ভাই। আলাদা যা বলার এই ছেলে বলে। কিন্তু আজ কিনা এতগুলো মানুষের সামনে এমন কথা! আমিরুল শাহ ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠলেন,“মুখ সামলাইয়া কথা ক, নাজির। আমরা অমানুষ?”
“তো কী মানুষ? অযথা কথা বাড়াইয়েন না। আগে আগে হাঁটেন।”
তাঁরা আর এগোলো না সামনে। খাটিয়ার সামনের দুই পায়া ধরলো নাজির, নওশাদ। আর পেছনের দুটো ধরলো মিল্টন, লতিফ। চাচাতো ভাইদেরও ধরতে নিষেধ করে দেওয়া হলো। অথচ সেই নিষেধাজ্ঞা মানলো না শুধু পারভেজ। লতিফকে সরিয়ে দিয়ে সে এসে ধরলো। আমিরুল শাহ, মুমিনুল শাহ চুপচাপ অপমানটা হজম করে নিলেন। ধীরে ধীরে সবাই মসজিদের দিকে অগ্ৰসর হলো। চিরদিনের জন্য শাহ বাড়িকে বিদায় জানিয়ে সুবহান আলী শাহর নিথর দেহ নিয়ে যাওয়া হলো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। মসজিদের পাশেই বিশাল বিদ্যালয় মাঠটি অবস্থিত।
আকবর মিয়া অনেক আগেই নাতিদের নিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। গোসল করে তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে সোজা মসজিদে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর চারিদিকে তাঁর দুই পুত্র আর নাতিরা দাঁড়িয়ে আছে। সাথে এসেছে সিফাতও। দাঁড়িয়ে আছে চাচা মাসুমের হাত ধরে। নাজির, নওশাদকে দেখে বুড়ো এগিয়ে এলেন কিন্তু তারা কেউই তাঁর সঙ্গে কথা বললো না। এড়িয়ে গিয়ে দাঁড়ালো দ্বিতীয় কাতারে। আকবর মিয়া মন খারাপ করলেন না। ছেলে দুটোর জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
নামাজ শেষে বিশাল মাঠটিতে রোদ মাথায় নিয়েই পড়ানো হলো জানাজা। পরিচিত, অপরিচিত অনেকে এসেই শেষবারের মতো মৃত মুখখানি দেখে গেলেন একপলক। আকবর মিয়া এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, কেঁদেই দিলেন। দেহের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লেন নিচে। কাশেম আলী এসে পেছন থেকে আগলে ধরলেন পিতাকে। পুনরায় কাফন ঠিক করে জানাজা শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হলো উত্তর পাড়ার পারিবারিক কবরস্থানে। এখানেই ফতেহ আলী শাহ আর তাঁর স্ত্রীর পাশাপাশি কবর। সুবহান আলী শাহর কবরটা খোঁড়া হয়েছে একেবারে পিতার কবরের বাম পাশের ফাঁকা স্থানে। কড়া রোদ থাকার পরেও কবরে পানি উঠেছে। মিল্টন দৌড়ে গিয়ে কলাগাছ কেটে আনলো। পাজামা হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে সেই কলাগাছ নিয়ে নাজির নেমে পড়ল নিচে। ঠিকমতো বসিয়ে উঠে এলো উপরে। লাশটা বিছানো কলাগাছের উপরেই শোয়ানো হবে।
আফাজ উদ্দিন সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। জানাজা পড়ে এখানে এসেছেন। আমিরুল শাহ, মুমিনুল শাহর উদ্দেশ্যে বললেন,“তোরা কবরে নামবি না? ভাইস্তা গো কথা ধরলে হইবো? ছুডো মানুষ ওরা। সদ্য বাপ হারাইছে, তাই মাথা ঠিক নাই। নিজেগো মাইনষে কবরে নাইম্মা মাটি দিলে ভালা।”
মুমিনুল শাহ কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। একবার লোকমুখে শুনেছিলেন, দূর গ্ৰামে মৃত বোনকে মাটি দিতে নেমে এক লোক নাকি ওখানেই আটকে পড়েছিলেন। তারপর অনেক চেষ্টা করেও তাকে আর বের করা যায়নি। কবরের মাটি তাকে টেনে নিয়েছিল নিজ গর্ভে। পরে জানা যায়, সেই লোক বোনকে বঞ্চিত করে নিজে একাই আত্মসাৎ করেছিল পিতার সমস্ত সম্পদ। তাই ঝুঁকি নিলেন না তিনি। তাকে পিছিয়ে যেতে দেখে আমিরুল শাহও পিছিয়ে গিয়ে বললেন,“বয়স বাড়ছে, মাজায় বিষ। ওরাই দিক।”
নাজির, নওশাদ, পারভেজ, মিল্টন মিলে লাশটা কবরে নামালো। এই শেষ মুহূর্তে এসে চোখটা জ্বলে উঠলো নওশাদের। গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু। নাজির তার কাঁধে হাত রাখলো। দোয়া পড়তে পড়তে মাটির নিচে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে চাপা দিয়ে উঠে এলো দুজনে। ধীরে ধীরে উপস্থিত জনসমুদ্রের ঢেউ কমতে কমতে একসময় মিলিয়ে গেলো।
আচমকাই রোদ মিলিয়ে গিয়ে সূর্য ঢাকা পড়ল ধূসর মেঘের ছায়ায়। পলিথিনের আস্তরনে ঢেকে দেওয়া হলো কাঁচা মাটির কবর। উপরে গেঁথে দেওয়া হলো কাঁচা খেজুর গাছের ডাল। নাজির ওখানেই বসে রইল। বুকের ভেতর কেউ বোধহয় ভারী পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। ভাইকে ছেড়ে নওশাদ গেলো না। সেও বসে রইল পাশে। একসময় আস্তে করে বললো,“আর কতক্ষণ বসে থাকবে? এবার বাড়ি চলো।”
“আব্বা তো কথা কইতে পারে না। কবরের ফেরেশতারা প্রশ্ন করলে কেমনে উত্তর দিবো? আমগো আব্বা তাঁর অর্ধেক জীবন বিছানায় কাটাইছে, কোনো অন্যায় করে নাই। হেরে আল্লাহ আযাব দিবো না তো?”
বোঝদার পুরুষের মুখে এমন অবুঝ কথা শুনে দুর্বল হয়ে গেলো নওশাদও। আকবর মিয়া ছেলে, নাতিদের উদ্দেশ্যে বললেন,“যত কঠোর হোক, বাপের বেলায় এই পোলা দুর্বল। ছুডোটারে আগলাইয়া রাখার লাইগা নাজির আছে। নাজিরের লাইগা কেডায় আছে?”
নজরুল আলম বললেন,“আল্লাহ আছে, আব্বা।”
আকবর মিয়া আর কিছু বললেন না। চুপচাপ হাঁটা ধরলেন বাড়ির পথে। তালেবের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোর বোইন কই? বাড়িত দিয়া আয়। দুর্দিনে স্বামীর পাশে তার থাকা উচিত।”
তালেব মাথা নাড়িয়ে আগে আগে হেঁটে গেলো। শাহ বাড়ির লোকগুলো যেই দুর্ব্যবহার শুরু করেছিল তখন! ক্ষণে ক্ষণে তেড়ে যাচ্ছিলো তাদের দিকে। তা দেখে মিছরিকে ওখানে রেখে আসার সাহস পায়নি ভাইয়েরা। তাই আসার পথে রেখে এসেছিল বাড়িতে।
সামিউল, নাজমুল, শাহরিয়ার জোর করেই টেনেটুনে বাড়িতে নিয়ে গেলো নাজিরকে। কণ্ঠস্বর দুর্বল হলেও ছেলেটার শরীরে কী জোর! কিছুতেই যেতে চাচ্ছিলো না।
________
আশেপাশের বাড়ি থেকে সবার জন্য খাবার দিয়ে গিয়েছে। গ্ৰামে কুসংস্কারের অভাব নেই। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাড়িতে কেউ মারা গেলে প্রথম চার দিন পর্যন্ত চুলায় আগুন ধরানো নিষিদ্ধ। তাই এ কদিন প্রতিবেশীরাই দিয়ে যাবে খাবার।
নাজির বাড়িতে এসে দেখলো চাচাদের ঘরে উৎসব লেগেছে। সবাই খেতে বসেছে একসঙ্গে। সামিউল দুই ভাইকে ডাকলো,“আম্মায় ভাত বাড়ছে। আয়, খাইয়া যা। সারাদিন না খাওয়া।”
নাজির সেদিকে গেলো না। সদ্য পিতা হারানোর শোকের মধ্যে তার গলা দিয়ে কিছুতেই খাবার নামবে না। ছোটো ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“যা, খাইয়া আয়। রাবনের গোষ্ঠীর লাইগা পরে আর ভাগে পাবি না। খাইয়া-দাইয়া ঘরে গিয়া ঘুমাইয়া পড়।”
“ভাই, তুমি?”
“যা তো।”
( ফলো- উপন্যাস)
ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু হয়ে চলে গেলো নওশাদ। তারও মন ভালো নেই। বাবার সঙ্গে কথা না বললেও সে কী বাবাকে ভালোবাসে না? অবশ্যই বাসে। হয়তো নাজিরের মতো অত গভীর নয়, তবে কমও নয়।
নাজির সোজা প্রবেশ করল বাবার ঘরে। বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠলো। মানুষটা মরতে না মরতেই তাঁর সকল চিহ্ন নষ্ট করে দেওয়ার জন্য বাড়ির বাকি মানুষগুলো যেন উতলা হয়ে উঠেছে। চৌকির বিছানার চাদর, বালিশের কভার বদলে দেওয়া হয়েছে, মেঝে কালো মাটির প্রলেপ দিয়ে লেপে দেওয়া হয়েছে। বাবা বাবা গন্ধটা আর চারিদিকে নেই। তার বদলে ঘুরে ফিরছে আগরবাতির গন্ধ। নাজির আর সেখানে দাঁড়ালো না। চলে এলো নিজের ঘরে। তাকে দেখে মিছরি উঠে দাঁড়ালো। সে ফেরার আগেই তালেব তাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে।
পরনের পোশাক বদলে বিছানায় বসলো নাজির। বুকের ভারটা কিছুতেই নামছে না। চোখ জোড়া সেই কখন ধরে জ্বলছে, মাথা ব্যথায় রগ ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। মিছরি এগিয়ে এসে স্বামীর মাথায় হাত রাখলো। বোঝদারের মতো বললো,“দাদাজান বলেন, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্ৰহণ করতে হয়। মৃত্যু মানে এই নোংরা দুনিয়া থেকে, পাপ থেকে মুক্তি। কষ্ট না পেয়ে আমাদের উচিত উনার জন্য দোয়া করা।”
নাজির চোখ তুলে মেয়েটির দিকে একপলক তাকালো। এভাবে কখনো কেউ তার মাথায় হাত রাখেনি, আশ্বাস দিয়ে বলেনি এতসব সুন্দর কথা। আসার পথে দাদা মিছরিকে আলাদা ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে বলেছেন। সে ছাড়া স্বামীর আর নিজের মানুষ বলতে আছে নাকি কেউ? নরম নরম হাত দুটো দিয়ে শক্তপোক্ত পেটানো দেহ জড়িয়ে ধরে মাথায় থুতনি ছোঁয়ায় মিছরি। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “দুঃখ সবসময় আড়াল করতে নেই। মাঝেমধ্যে কাঁদতে হয়, চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ার সুযোগ দিতে হয়, কাঁদলে বুক হালকা হয়।”
কিন্তু নাজির কাঁদলো না। অচেনা পরিবেশে গত রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। আজ সারাদিনও ঘুম হয়নি। তার মধ্যে এমন একটি শোকের ছায়া! সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মিছরিও পাশে শুয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
________
এভাবে সারা বিকেল কেটে রাত হলো। ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো ধরণীতে। টিনের চালে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো নাজিরের। উঠে বসলো সে। অন্ধকারে আলো দেওয়া হয়নি। পাশেই ঘুমে বুঁদ হয়ে আছে কিশোরী বউ। নাজির হারিকেন জ্বেলে টেবিলে রাখলো। আচমকা মনে পড়ল বাবার কথা। সেই দুপুরে অতদূরে মাটির নিচে বাবাকে শুইয়ে রেখে এসেছে। তার মধ্যে এই বৃষ্টি! বাবা থাকবে কী করে? ছাতা আর টর্চ লাইট নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। শিকল আটকে ঘরে তালা দিয়ে অন্ধকার রাতেই একা একা চলে এলো কবরের কাছে। পলিথিন থাকায় আলগা মাটি গলে পড়ছে না। তবুও নিজের মাথার উপরের ছাতাটা বাবার কবরের উপরে রেখে দিলো নাজির। এতক্ষণ ধরে কষ্ট করে সামলে রাখা অবাধ্য চোখের পানি উন্মুক্ত করে দিলো। বৃষ্টির সময় কাঁদতে সুবিধা হয়। কেউ দেখে না, জানে না, ধরতে পারে না। নাজিরের জীবনের একমাত্র দুর্বলতা ছিল তার বাপ। অথচ সেই বাপ আর নেই। আজ থেকে তাঁর ঠাঁই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে।
নাজির নাক টেনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ডাকে,“আব্বা! আমনের কী ওইখানে কষ্ট লাগতাছে? এই দুনিয়ার থাইক্যাও বেশি কষ্ট?”
চলবে __________

