#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৪৭]
ঠান্ডায় নিমজ্জিত, কুয়াশার চাদরে মোড়ানো একটি নিস্তব্ধ রাত। গ্ৰামের মানুষ ঘুমে বিভোর। কোথায় কি হচ্ছে সেদিকে কারো কোনো খেয়াল নেই। হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজে গোয়ালের গরুগুলো চিৎকার করে উঠলো। তবে সেই চিৎকার বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পরিচিত মুখ দেখে থেমে গেলো তারা। ভেতর থেকে ভেসে এলো আমিরুল শাহর ঘুমন্ত কণ্ঠের চিৎকার, “কেডা রে!”
চাদরের আড়ালে লুকায়িত মুখগুলো আরো সতর্ক হলো। শব্দহীন পা ফেলে খুঁটি থেকে শক্ত বাঁধন খুলে গোয়ালের সুস্থ এক জোড়া ষাঁড় গুরু, আর একটি দুধেল গাভী নিয়ে শাহ বাড়ির পেছনের ফটক দিয়ে বেরিয়ে এলো।
শুনশান মহাসড়কের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে একটি পিকআপ। চালকের আসনে বসে ঘুমে টলছে মিল্টন। জানালার কাঁচে আচমকা টোকা পড়ল। তাতেও ঘুম না ভাঙায় নাজির দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো,“উঠ, গোলামের পুত।”
লাফিয়ে উঠলো ছেলেটা। দরজা খুলে বেরিয়ে এসে জোরপূর্বক হেসে বললো,“সারাদিন খাটাইছেন, এহন আবার রাইতেও কাম করাইতাছেন, ভাইজান। তাই ঘুমাইয়া গেছিলাম।”
“এই গরু তিনডা বিল্লাল ভাইয়ের দোকানের পাশের গোডাউনে নিয়া বাইন্ধা রাখবি। আমার কথা কইলেই ব্যবস্থা কইরা দিবো।”
মিল্টন মাথা নাড়ালো। তিনজনে মিলে গরু তিনটা বহু কসরতে গাড়িতে তুলে শক্ত করে বাঁধলো। ইতস্তত করে বললো,“এইডা কী ঠিক হইতাছে, ভাইজান? আমরা চুরি করতাছি! যদি হেরা জাইন্না যায়?”
“আইছে আমার সৎ মানুষ। মাইনষের গাছের আম, হরবি চুরির সময় মনে থাহে না?”
“ওইগুলা আর গরু কী এক?”
“একই, চুরি মানে চুরিই। কিন্তু আমারডারে চুরি কয় না। ওরা আমার গরুরে বিষ দিয়া মারছে। কিন্তু আমি তো আর হেগো মতো জালেম না। তার উপর এমন কইরা চলতে থাকলে খুব তাড়াতাড়িই আমি ফকির হইয়া যামু, তোর কামও ফুরুস। তাই এইডাই শোধ নেওয়ার সঠিক পথ। এই গরুগুলা চড়া দামে বেইচ্চা..
কথা শেষ না করে থেমে গেলো নাজির। নওশাদ বলে উঠলো,“আবার গরু কিনবা?”
“না, পরে ভাইবা দেখমু। এহন দুইডায় গিয়া আসল কাম কইরা আয়। বল্টুরে বিশ্বাস নাই, গাড়ি চালানের সময় আবার না ঘুমাইয়া যায়। আর হ, মুখ যাতে বন্ধ থাহে। কাকপক্ষী যদি টের পায় তাইলে তোরে আমি ইচ্ছামতো খিঁচা দিমু রে, বল্টু।”
মিল্টন দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরলো। মাথায় হাত রেখে দুদিকে নাড়িয়ে বললো,“কী যে কন না, ভাইজান! আমনে যা করেন তাই আমার কাছে ঠিক। যে আমনের শত্রু সে আমারো শত্রু। কেউ জানবো না। এই মিল্টন সবসময় আমনের লগে আছে।”
নাজির সন্তুষ্ট হলো। মিল্টনকে সে নিজের ভাইয়ের থেকেও বেশি ভরসা করে। তাই কাঁধে হাত রেখে বললো,“এর লাইগাই তো সব গোপনীয়, গুরুত্বপূর্ণ কাজে তোরে ডাকি।”
মিল্টন খুশি মনে চালকের আসনে গিয়ে বসলো। নওশাদ বসলো তার পাশের আসনে। নাজির দুজনের উদ্দেশ্যে বললো,“ভোর হওয়ার আগে গেরামে ফিইরা আওয়ার চেষ্টা করবি। না হইলে লোকে সন্দেহ করতে পারে। কাইল তোর ছুটি, বল্টু। সারাদিন বিশ্রাম নেইস, হাজিরা পাঠাইয়া দিমু।”
মিল্টন মাথা নাড়িয়ে ইঞ্জিন চালু করল। কিছু সময়ের ব্যবধানে কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে গেলো গাড়িটি। নাজির সেখান থেকে বাড়িতে চলে এলো। ফটকের দরজা ভালো করে লাগিয়ে ঘরে ঢুকে খিল দিলো। আজ তার শান্তিতে ঘুম আসবে। মনে হচ্ছে জীবনের প্রথম দারুণ একটা প্রতিশোধ নিতে পেরেছে সে।
ভোরের আলো ফুটে যখন সকাল হলো তখনি শাহ বাড়িতে গতকালের মতো চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। তবে আজকের চেঁচামেচির কারণ ভিন্ন। বাইরে থেকে ফরিদার আহাজারি ভেসে আসছে। সেই শব্দে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেলো নাজিরের। দুই হাত মাথায় তুলে আড়মোড়া ভেঙে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো।
উঠোনে মোটামুটি শাহ বাড়ির সবাইকেই দেখা যাচ্ছে। সাথে আছে আশেপাশের প্রতিবেশীরাও। নওশাদ বসে আছে বারান্দায়। একপলক তাকে দেখে নিমের ডাল ভেঙে মেসওয়াক করতে লাগলো নাজির। বললো,“প্রত্যেক ভেইন্নাকালে গাইরালনিগো মতন চিল্লাচিল্লি করেন। সমস্যা কী? বাড়িত কী আর থাকতে পারমু না?”
ক্রন্দনরত কণ্ঠে কাউকে অভিশাপ দিচ্ছেন ফরিদা। নাজির কটাক্ষ করে মনে মনে বিশ্রী এক গালি দিয়ে বললো,“তোর মতো মাগীর দোয়া কবুল হইবো না কহনো। তোরে কুপাইলেও আমার মন শান্তি পাইবো না।”
সামিউল আর শাহরিয়ার মিলে পুরো বাড়ি আরেক বার চক্কর দিয়ে এসেছে। পেছনের ফটক দিয়েই যে গরুগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা তারা নিশ্চিত। তবে নিলো কে? এত সাহস কার? একজনের পক্ষে এমন কাজ করা তো সম্ভব নয়। তবে? এ যে কোনো ধুরন্ধর চোরের কাজ তা আর বুঝতে বাকি থাকে না। সামিউল বললো,“কাইল রাইতে মনে হয় ডাকাত আইছিল। আমগো গোয়ালের দুইডা গরু লইয়া গেছে। লগে একটা গাইও আছিলো।”
আমিরুল শাহ দুর্বল কণ্ঠে বললেন,“কয়দিন আগেও একজন দাম করছিল, কিন্তু আমি বেচি নাই। পরের ঈদে হাটে উঠামু ভাবছিলাম। অথচ হারামজাদারা সব লইয়া গেলো। সব খাটাখাটুনি শেষ।”
লোকটার সাথে বাকিরাও হায়হুতাশ করলেন। একের পর এক ঘটনায় ইতোপূর্বে গ্ৰামবাসীর মনে মারাত্মক ভয় ঢুকে গিয়েছে। দিনদিন গ্ৰামটি মানুষের বসবাস অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এত ভয় নিয়ে থাকা যায়? অথচ একটা সময় রাতবিরেতেও উঠোনে ঘুমিয়েছে গরমের হাত থেকে বাঁচতে। পারভেজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“চাচার গরু নিলো না, নাজির ভাইয়ের গরু নিলো না কিন্তু আমগো গরু নিয়া গেলো। তাও আবার তিন তিনডা!”
মাটিতে থুথু ফেলে চোখ রাঙিয়ে পারভেজের দিকে তাকালো নাজির। এতগুলো মানুষ না থাকলে নির্ঘাত ছেলেটার পাছায় দুটো লাথি মারতো সে। ইচ্ছেটা দমন করে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,“নাজির ভাইয়ের দুইডা গরুরে যে তোমার বাপ আর মামায় মিল্যা বিষ দিছে তহন তো একটা কথাও কও নাই। এহন নাজির ভাইয়ের গরু নেয় নাই দেইখা হোগায় জ্বালা উঠছে? জ্বালা মিটাইয়া দিমু একেবারে। চোখ দিয়া দেহো না গোয়ালে যে তালা মারা?”
পারভেজ চুপসে গেলো। আমিরুল শাহ আচানক রেগে গেলেন,“কী কইলি? আমি তোর গরু মারছি?”
“আমনে ছাড়া আর কেডায় মারবো? ছুডো চাচা বা চাচী আমনেগো মতো হিংসুইট্টা না। মারলে আমনে মারছেন নয়তো আমনের শালায় মারছে।”
“নাজির!”
“পাডার মতো চিল্লাইবেন না। আমার কান ঠিক আছে।”
“তুই এই কাম করছোস!”
“প্রমাণ ছাড়া চুরির অপবাদ দিলে আমনের খবর কইরা ছাড়মু। এমনিতেই নিজের জ্বালায় বাঁচি না। কত বড়ো একটা লস খাইলাম! আবার বউডাও বাপের বাড়িত। ধুর, ভাল্লাগে না।”
কলপাড় চলে গেলো নাজির। মুমিনুল শাহ ঠোঁট টিপে হেসে চলে গেলেন ঘরে। যাই হোক, নাজির যে তাকে বিশ্বাস করে তা আর বোঝার বাকি রইল না। এদিক কার চিন্তা আপাতত কমলো।
মুখ ধুয়ে কলপাড় থেকে বেরিয়ে এলো নাজির। হাঁক ছেড়ে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“বলদের মতো এনে বইয়া রইছোস ক্যান? খাইছোস কিছু?”
নওশাদ দুদিকে মাথা নাড়ালো। চোখ দুটো ঘুমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নাজির তাড়া দিয়ে বললো,“রানতে পারমু না। আয়, বাজার থাইক্যা খাইয়া আহি। হেরপর আবার বাহির হইতে হইবো। কত কাম আমার!”
মর্জিনা রান্নাঘর থেকেই বললেন,“আমার রান্ধা শেষ। বাড়ির বাহিরে খাওয়া চলবো না।”
“আমনে খান।”
“দুইডা বাড়ি মারলে চোপা যাইবো গা। চুপচাপ খাইতে আয়, গোলাম।”
তর্কে জড়ালো না নাজির। নিজের কিছু হারালেই ফরিদা অসুস্থ হয়ে যান। আজও ব্যতিক্রম হলো না। নাকের পানি চোখের পানি এক করে তিনি ঘরে চলে গেলেন। রান্না বসালো বিথী। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় আমিরুল শাহ চাপা ক্ষোভ নিয়ে বললেন,“তুই ছাড়া আর কারো এমন সাহস হইবো না, নাজির। কামডা ঠিক করলি না।”
অবুঝের মতো করে তাকিয়ে রইল নাজির। মুখ ভার করে বললো,“এমন একটা কথা আমারে কইতে পারলেন, প্রাণের চেয়েও প্রিয় চাচা? এর আগেও তো বাড়িত ডাকাত আইছিল। আইয়ে নাই? আমিই তো সেই ডাকাত ধরছি। গত রাইতে আমনের সামনে আমি ঘরে ঢুকছি, আবার আমনের সামনেই সকালে শব্দ হুইন্না বাহির হইছি। তাইলে?”
“ফজরের নামাজ পড়োস নাই তুই? তহন দেহোস নাই?”
“নিজের গরুই তো মরা দেখছি ভোরে। আমনেরটা আছে না গেছে কেমনে জানমু?”
এত যুক্তির সামনে হার মেনে নিলেন আমিরুল শাহ। নাজির হেসে বললো,“খেলা এহনো শুরু হয় নাই, বড়ো চাচা। যহন শুরু হইবো তহন আর অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাইবেন না। মনে আছে, একবার আমি আমনেরে কইছিলাম, আমি আমার বাপের মতন না। আইজ আবার কইতাছি। তবে একটা ভুল শুধরাইয়া নিতাছি, আমি আমনের মতনও না। বুইড়া একদিন আমারে কইলো, তুই একেবারে তোর দাদার মতন হইছোস, নাজির। একেবারে সাহসী, সৎ। মিথ্যারে এককথায় পায়ের নিচে ফেলার ক্ষমতা তোর আছে। আমি হেইদিন অনেক ভাবলাম। দেখলাম, আসলেই আমি দাদার মতন হইছি। কারণ আমার চাচারা তো অমানুষ, মিথ্যুক, ভীতু। তারা অন্যায় করে লুকাইয়া, কিন্তু আমি যা করি সবার সামনে দিয়া।”
কথা শেষ করে সোজা ঘরে চলে গেলো নাজির। আমিরুল শাহ হতভম্ব হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। বুড়ো আর কী বলেছে? কীসের খেলার কথা বলছে নাজির? শীতের মধ্যেই কপালে ঘাম জমলো তাঁর। বাম হাতের উল্টো পিঠে মুছে ঘরে চলে গেলেন। সিরাজ নেই, গতকাল বিকেলেই বাড়ি ফিরে গিয়েছে। এর কোনো ঠিক নেই। নিজের মর্জি মাফিক চলে, যেখানে খুশি যায়, যা ইচ্ছে করে। অথচ নিজের প্রয়োজনে আমিরুল শাহ তাকে কখনোই পান না।
_________
আকবর মিয়ার মৃত্যুর আজ তৃতীয় দিন। বাড়ির সব কিছু আপাতত স্বাভাবিক। রান্নাঘরে রান্না চলছে, খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে, একে অন্যের সাথে কথোপকথন চলছে, চলছে দৈনন্দিন জীবনের সব কাজকর্ম। শুধু সৈয়দুন নেছার জীবনটাই স্বাভাবিক হয়নি, একজন বয়োজ্যেষ্ঠের মৃত্যুর শোক গেঁথে আছে সবার মনে।
সারাদিনের কাজ শেষে বাড়িতে গিয়ে গোসল সেরে খাবার খেলো নাজির। বিশ্রাম না নিয়েই ফিটফাট হয়ে সোজা চলে এলো শ্বশুরবাড়ির ফটকের সামনে। কালো রঙের লোহার দরজা হাট করে খোলা। ভেতর থেকে ভেসে আসছে পুরুষদের কথাবার্তা। এতশত না ভেবে গলা ঝেড়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই নাজিরের ললাটে ভাঁজ পড়ল। উঠোনের একপাশে তৈরি বাঁশের মাচায় বসে আছেন কয়েকজন লোক। চেনা বলতে শুধুই সুজন।
ভদ্রতার সহিত সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিলো নাজির। সবাই সালামের জবাব নিতেই সুজনের উদ্দেশ্যে বললো,“আমার বউ কই? ডাক দেও।”
সবার কৌতূহলী দৃষ্টি তার দিকেই স্থির। সুজন বসা থেকেই বললো,“লইয়া যাইতে আইছোস? বাড়ির অবস্থা কেমন জানোসই তো। কয়টা দিন থাকুক।”
“পরে না হয় আবার আইয়া বেড়াইয়া যাইবো। এহন আমার বউ আমারে ফেরত দাও।”
সুজন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ছেলের কথার ধরণ আর কখনো বদলাবে না। ইলিয়াস হোসেন জিজ্ঞেস করলেন,“কেডায় এইডা?”
সুজন উত্তর দেওয়ার আগেই মাহবুব বলে উঠলো, “নাতিন জামাইকে চিনতে পারছেন না? মিছরির জামাই।”
মামা, নানা, মামাতো ভাই উভয়েই বেশ অবাক হলেন। বিয়েতে উপস্থিত থাকলেও নাতজামাইয়ের মুখ ইলিয়াস হোসেন ঠিক করে দেখেননি। তাই চিনতে বেশ অসুবিধা হলো। ইতোমধ্যে সিফাত মারফত অন্দরে তার আগমনের খবর পৌঁছে গিয়েছে। এত মানুষের ভিড়ে মিছরি আর লজ্জায় এলো না। কাশেম আলী বেরিয়ে এলেন। মুখ বেজার করে বললেন, “মরছিলি কই? ভিতরে আয়, মাইয়া এহন দিমু না।”
নাজির অবাধ্য হলো না। সৈয়দুন নেছার সঙ্গে একটু দেখা করার ইচ্ছে আছে। আকবর মিয়ার সঙ্গে নদীর ধারে সেদিন কথা বলে সে বুঝেছিল, বুড়ো বুড়ি এই যুগের শিরিন-ফরহাদ। কে জানে বুড়োকে হারিয়ে তাঁর কী অবস্থা? যেতে যেতে বললো,“আমার বউ আমনে দেওয়া না দেওয়ার কেডা? আমার যহন ইচ্ছা লইয়া যামু।”
“দেখমু নে।”
“আমনের আম্মায় কই?”
“ঘরে, আয়।”
কথা বলতে বলতে দুজনেই দালানের ভেতরে চলে গেলো।
আরিফের বাবা বললেন,“পোলার বয়স দেহি অল্প। মনে হয় মাসুমের বয়সী হইবো।”
সুজন প্রত্যুত্তরে বললো,“ওর থাইক্যা একটু বড়ো। রুহুলের পিঠাপিঠি। আমনেরা কী ভাবছিলেন, বয়স্ক নাকি?”
ছোটো মামা মাথা নাড়ালেন,“তোমার দাদায় যেমনে গুণগান কইলো তাতে মনে না হওয়ার কিছু নাই।”
“আমগো দাদাজানে কহনো কাউরে লইয়া বাড়তি গুণগান করে না। যতটুকু ঠিক ততটুকুই কন। শুরুতে আমগোও মতামত আছিলো না। পোলা ভালা হইলেও রগচটা, ত্যাড়া। তাই ভাবছিলাম হয়তো মিছরি সুখী হইবো না। কিন্তু পরে আইয়া হুঁশ ফিরলো, আমগো দাদাজানে কহনো নিজের পরিবারের মাইনষেগো লাইগা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।”
“গেলো গা তো! ডাহো একটু কথা কই, একমাত্র ভাগ্নি জামাই বইল্যা কথা! পরিচিত না হইলে হয়?”
“ভিতরে গেছে, কথা শেষ কইরা আসুক।”
সৈয়দুন নেছা খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন। পাশেই বসা মিছরি, পারুল আর বেয়াইন সেলিনা। কাশেম আলী অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। পারুল ঘর থেকে চলে গেলেন। নাজিরের চোখাচোখি হলো মিছরির সাথে। ইশারায় কিছু বলতেই সেও ঘর থেকে চলে গেলো। সেলিনা সালামের জবাব নিয়ে বললেন, “নাতজামাই না?”
বৃদ্ধাকে চিনতে পারলো না নাজির। কাশেম আলী বললেন,“মিছরির নানী। তোর নানী শাশুড়ি।”
তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে সৈয়দুন নেছার সঙ্গে কথা বললো নাজির।বৃদ্ধার মনের অবস্থা ভালো নয়। একটু পরপর শুধু আঁচলে চোখ মোছেন। খারাপ লাগলো নাজিরের। বুড়োকে হিংসেও হলো। কি সুন্দর একটা পরিবার পেয়েছে সে? বেঁচে থাকাকালীন সবার থেকে পেয়েছেন সম্মান আর মৃত্যুর পর সবাই তাঁর জন্য ফেলছে চোখের পানি। অথচ তার বাপ, দাদার কপাল কতটা খারাপ! না, সবচেয়ে খারাপ তার মায়ের কপাল। ভদ্রমহিলা ন্যায্য বিচার পেলেন না, সম্মান পেলেন না, পেলেন না একটু মাটি।
সেখানে আর বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলো না সে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই আবারো মিছরির দেখা পেলো। গ্ৰিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নাজির বললো, “জামাই ছাড়া থাকতে কষ্ট লাগে না? যাও তৈয়ার হইয়া আইয়ো। বাড়িত যামু।”
কাশেম আলী পেছন থেকে বললেন,“আম্মার অসুখ। আব্বারে ছাড়া একটুও থাকতে পারতো না। কেউরে তো হের লগে থাকা প্রয়োজন।”
“আমনেগো বাড়িত তো মাইনষের অভাব নাই। কিন্তু আমার ঘর বাড়ি তো খালি পইড়া রইছে। কাইল দুইডা গরু মরছে, ঘরের কি অবস্থা! রান্নাঘর খালি। এইসব ঝামেলা না থাকলে নিতে আইতাম না।”
কাশেম আলী বুঝলেন তার পরিস্থিতি। বললেন, ”তাও ঠিক, আইজ রাইতটা শুধু থাকুক। মিলাদের পর লইয়া যাইস।”
আর দ্বিমত করল না নাজির। একপলক স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে শ্বশুরের পেছনে হাঁটা ধরলো। মিছরি আবারো চলে গেলো দাদীর ঘরে। কাশেম আলী বললেন,“আব্বায় কী কইছিলো মনে আছে?”
“কত কথাই তো কইছে। কোনডার কথা কন?”
“নওশাদের বিয়ার কথা।”
“এহনি ভাবতাছি না। তালাকের বেশিদিন হয় নাই। এহনো ওয় কিছু ভুলতে পারে নাই। লগে পারিবারিক ঝামেলা তো আছেই। তার উপরে বেকার। আমি এহন চাইতাছি যেকোনো উপায়ে দেশের বাহিরে পাঠাইয়া দিতে।”
“দেশের বাহিরে পাঠাইয়া দিলেই কী সব সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবো?”
“বিয়া করলেই বুঝি সমাধান হইবো? একবার তো করছেই। এহন রোজগার শিখুক, তারপর না হয়।”
“সুযোগ কিন্তু সবসময় আইয়ে না। ওই বিয়া ভুল আছিলো, তাই বইল্যা পরেরটাও যে ভুল হইবো তার কী নিশ্চয়তা আছে?”
“সুযোগ?”
“বাপের এক পোলা হইয়াও আমার আব্বায় এই গেরামে এত বড়ো পরিবার গঠন কইরা কেমনে টিকা থাকতে পারছে, জানোস? বুদ্ধি লইয়া। জীবনে একলা একলা বেশিদূর আগানো যায় না। লাগে শক্ত বন্ধন। ট্যাহা কামানোই সফলতা না। তোর চাচারা তগো থাইক্যা শক্তিশালী। কারণ তাগো সন্তান আছে, বুদ্ধি আছে, ক্ষমতা আছে, পরিবার আছে। তোর কী আছে?”
নাজির উত্তর দিতে পারলো না। কাশেম আলী শ্বাস ফেলে বললেন,“প্রথম যহন আব্বা তোর লগে আমার মিছরির বিয়া ঠিক করছিল, তহন ভাবছিলাম হয়তো তোর মাধ্যমে ওই বাড়িত ঢুইকা তগো থাইক্যা আমগো বেইজ্জতির প্রতিশোধ নিবো। কিন্তু পরে জানলাম বিয়ার মূল কারণ, তোর পায়ের তলার জমিন মজবুত করার লাইগা তাঁর এই সিদ্ধান্ত। এহন হয়তো জিগাবি, কেমনে? তুই একটু চিন্তা করলেই বুইঝা যাবি। আগে মাইনষে শক্তি, ক্ষমতা বাড়ানোর লাইগা ক্ষমতাশালী পরিবারে পোলা, মাইয়া বিয়া দিয়া সম্পর্ক মজবুত করতো। এই যে আমগো বাড়ির প্রত্যেকটা মাইয়ার নামজাদা বাড়িত বিয়া হইছে।বড়ো বুবু তমিজার বিয়া হইছে মাওনার বেশ নামকরা রইস পরিবারে। মেজো বুবু আবেদার বিয়া হইছে কালীগঞ্জের প্রভাবশালী খাঁ বাড়ির বড়ো পোলার লগে। সরলার বিয়া হইছে ভুঁইয়া বংশে। কিন্তু জামাইডা অল্প বয়সে মইরা যাওয়ায় হের আইজ এই দুরাবস্থা। ভাইজানের দুই মাইয়ারও বড়ো পরিবারে বিয়া হইছে। আমার শ্বশুরবাড়ির মাইনষে শিক্ষিত, ভাইজানের ভায়রারা রাজনীতি করে। এইগুলাই হইলো আমগো শক্তি। এর লাইগাই কারো সাহস নাই সরাসরি আমগো ক্ষতি করার।”
“তো? পারিবারিক কাহিনী হুইন্না আমি কী করমু?”
“না হুনলে বুঝবি কেমনে? মেজো দুলাভাইয়ের দুই মাইয়া এক পোলা। বড়োজনের বিয়া দিছে ভোগড়া গেরামের চেয়ারম্যানের নাতির লগে। কয়দিন পর চেয়ারম্যান হইবো পোলার বাপে। হেরা খাঁ বংশের মানুষেরা খুব প্রভাবশালী। ভাব, একবার যদি নওশাদের লগে হের মাইয়ার বিয়া হয় তাইলে আত্মীয়তার সম্পর্ক কতটা মজবুত হইবো? আওয়া যাওয়া লাইগাই থাকবো। এইদিকে আমরা আছি, ওইদিকে খাঁ বংশ। শক্তি বাড়বো, তোর চাচারা কিছু করার আগে দশবার ভাববো। দুই বোইনেও এক বাড়িতে মিলমিশ কইরা সংসার করবো। পরে বিদেশ পাঠাইতে হইলে না হয় পাঠাইস।”
নাজির সতর্ক হয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো। আচানক মনে পড়ে গেলো বুড়োর সেদিনকার কথা। তার মানে! বললো,“সব জানার পরেও মাইয়ার বাপ রাজি হইবো ক্যান?”
“না হওয়ার কারণ নাই। মাইয়ার লাইগা উপযুক্ত পোলা খুঁজতাছে। আমি নওশাদের কথা কইছি, লগে আব্বার যে ইচ্ছা আছিলো হেইডাও কইছি। আব্বার কথা অনেক মানতো।”
“রাজি?”
“তাইলে? পৃথিবীতে যত গন্ডগোল আছে সব ওই অর্থ, সম্পদ আর ক্ষমতা লইয়া। হের অনেক সম্পদ কিন্তু পোলা মাত্র একটা। তাও ছুডো। হেইগুলা চাচতো ভাইগো থাইক্যা রক্ষার লাইগা তো মাইয়া জামাই এহন একমাত্র ভরসা। নওশাদের কাছে মাইয়া দিলে হেই মাইয়া আমগো গেরামে আমগো কাছেই থাকবো। তো রাজি হইবো না ক্যান?”
“ভাবার লাইগা সময় লাগবো।”
“ভাব, তবে বেশি সময় দেওয়া যাইবো না। আমরা তোর শত্রু না, নাজির। তুই আমার একমাত্র আদরের মাইয়ার স্বামী। তোর ক্ষতি কইরা আমগো কী লাভ? কাগো লাভ তা তুই ভালা কইরাই জানোস। আমার মিছরির ভালার লাইগা যতদূর যাওয়া প্রয়োজন আমি যামু।”
বিপরীতে নাজির নীরব রইল। আরিফের বাবা তখনি ডাকলো,“কী গো, কাশেম! মাইয়া জামাইয়ের লগে পরিচয় করাইবা না?”
কাশেম আলী হেসে বললেন,“আইতাছি! আমনেগো ভাগ্নি জামাই, আমি কী পরিচয় করামু?” গম্ভীর কণ্ঠে জামাতার উদ্দেশ্যে বললেন,“মিছরির বড়ো মামা। সরকারি কলেজের মাস্টর। তাঁর এক বন্ধু আবার ডিজি। আমগো মিছরিরে নিজের পোলার বউ হিসাবে ঘরে তোলার ইচ্ছা আছিলো। কিন্তু আব্বা শেষ মুহূর্তে রাজি হন নাই। হের লগে খুব চতুরতার সাথে কথা কইতে হইবো।”
নাজির হ্যাঁ, না কিছুই বললো না। শুধু লোকগুলোকে দেখলো।
চলবে ________

