যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৪৮]

0
29

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৪৮]

ভর দুপুর। অথচ তেজস্বী সূর্যকে আজ দেখা যাচ্ছে না কোথাও। আকাশটা মেঘলা, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই সফেদ কুয়াশায় ঢাকা। শুক্রবারের জুমার নামাজ শেষে মসজিদে মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে শেষ হলো মরহুম আকবর মিয়ার মৃত্যু পরবর্তী চারদিনের মিলাদ। আত্মীয়-স্বজন যারা এলো তারা মিলাদ শেষে চলে গেলো নিজেদের গন্তব্যে। মসজিদ থেকে বের হতেই নাজির, নওশাদের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন নজরুল আলম এবং কাশেম আলী দুই ভাই। তাদের সঙ্গে অলিউল খানের পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিশেষ করে নওশাদকে। লোকটার হাবভাব দেখে বুঝাই গেলো, ছেলেটাকে যে বেশ মনে ধরেছে তাঁর।

কথাবার্তা শেষে ভিন্ন পথ ধরলো দুজন। নওশাদ মিনমিন করে বললো,“লোকটার হাবভাব খুব একটা সুবিধার লাগলো না। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমায় দেখছিল। কী কথা হয়েছে তোমাদের মধ্যে?”

পেছনে দুই হাত রেখে সামনে তাকিয়ে নাজির হাঁটছে। প্রত্যুত্তরে সরাসরি বললো,“তোর বিয়ার ব্যাপারে কথা হইছে।”

নওশাদ পথিমধ্যে থেমে দাঁড়ালো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“মানে?”

“ওই লোকের নাম অলিউল খান। তোর ভাবির মেজো ফুফা। তার মাইয়ার লগে তোর বিয়ার প্রস্তাব রাখছে আমার কাছে।”

“তুমি কী বলেছো?”

“এহনো কিছু কই নাই।”

“না করে দিবে।”

“ক্যান? মাইয়া, বংশ সবই তো ভালা। তোর ভাবির ফুফাতো বোইন লাগে। সংসারে অশান্তি হইবো না, একলগে মিলমিশ কইরা দুইডায় সংসার করবো।”

“তালাক হয়েছে মাস ছয়েকও হয়নি। এর মাঝে আবার বিয়ে?”

“লিলি না কলি জানি নাম? ওয় তো ঠিকই তালাকের পর বিয়া করতে যাইতাছে। তাইলে তোর কী সমস্যা? পুরুষ মাইনষের এত দুর্বল হইলে চলে না, নওশাদ। প্রেম, ভালোবাসা বলতে এই দুনিয়াত কিচ্ছু নাই। যে তোরে যতটুকু গুরুত্ব দিবো, তুইও তারে ঠিক ততটুকু দিবি। বেশি দিতে গেলে মাগনা মারা খাবি।”

“তুমি জানলে কীভাবে?”

“জানছি একভাবে। তোরে যে আবার ভূমি আফিসে যাইতে কইছিলাম, গেছিলি?”

“হ্যাঁ।”

“কী বুঝলি?”

“তুমি যা বলেছো তাই ঠিক। জায়গা জমির পরিমাণ আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি। মূল শহরের মধ্যেই বেশ কয়েক বিঘা জমি রয়েছে। কয়েকদিন পর তো দাম আরো বাড়বে।”

“কার নামে?”

“দুই চাচারই আছে। তবে বড়ো চাচার একটু বেশি। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে সিরাজ মামুরও কিছু শতাংশ সেখানে আছে।”

“জানোয়ারের বাচ্চারে মামু কইস না। মাথায় রক্ত উইঠা যায়।”

“আমি বুঝতে পারছি না, এতগুলো সম্পদ তাদের নামে গেলো কীভাবে? জমিজমা ভাগ হয়েছে তো দাদার মৃত্যুর পর। তাহলে? আব্বা কেন পেলো না?”

“বলদ, আব্বার টিপসই নিয়া নিজেগো নামে সব করছে।”

“আব্বা টিপসই দিবে কেন?”

“তুই অকেজো, চলতে পারোস না, স্পষ্ট কইরা কথা কইতে পারোস না, তোর আগে পিছেও সাহায্যের কেউ নাই। আছে শুধু ছুডো ছুডো দুইডা পোলা। এহন আমি যদি বন্ধ ঘরে ঢুইকা তোর দুর্বল আঙুলডা ধইরা দলিলের মধ্যে নিজে নিজে টিপসই দেই তাইলে কিছু করতে পারবি? যদি কই, মুখ খুললে তোর পোলা দুইডা মাইরা ফেলাইমু তারপরেও কী মুখ খুলবি? বাপ হিসেবে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা নাই?”

হতভম্ব হয়ে গেলো নওশাদ। সে এসব জটিলতা নিয়ে এত গভীরভাবে ভাবতে পারে না। চোয়াল শক্ত করে বললো,“জালেম সবকয়টা।”

“যেইডা কইছি সেইডা করছোস?”

“কথা বলে এসেছি। একটু সময় লাগবে।”

“আর পাসপোর্ট আফিস? গেছিলি? ট্যাহা পয়সা কত লাগবো? আগে আগে না কইলে সময়মতো জোগাড় করমু কেমনে?” থেমে জিজ্ঞেস করল,“ভাষা শিখতে হইবো না? লেখাপড়া তো কম করোস নাই। ইংরেজি তো পারোস নাকি?”

“আমি কোথাও যাচ্ছি না। তোমার সাথে এখানেই থাকবো।”

নাজির রেগে গেলো,“থাপড়াইয়া তোমার আ, উ বাহির কইরা দিমু। এনে থাইক্যা কী ছিঁড়বা? বেকার খাওয়া চলবো না। শত্রুর মাঝেও থাকার দরকার নাই।”

“তুমি যা করো তাই করবো। তবুও কোথাও যাবো না। সব কষ্ট তুমি একাই কেন সারাজীবন বহন করবে? সব দায়িত্ব কী শুধু তোমার?”

“দেখ নওশাদ, তর্ক করবি না।”

“এটাকে তর্ক বলে না। এমনিতেই আমি স্বার্থপরের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছি, আমায় দিয়ে এসব আর সম্ভব নয়। আমার কী দায়িত্ব বলতে কিছু নেই? সব জানার পরেও তোমাকে একা রেখে চলে যাবো? কখনো না। বাবা-মা আমারো, তাই সবকিছুর হিসাব নেওয়ার দায়িত্বও আমার আছে।”

ধমকাতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো নাজির। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল। গম্ভীর স্বরে বললো,“তোর সামনে দুইডা বিকল্প আছে। হয় বিয়া কর, নয়তো বিদেশ যা। তুই কোনডা করবি তা তোর ব্যাপার। আর কোনো সময় তোরে দেওয়া হইবো না। যা করার কর, তবে এই বছরই।”

“আমার সময় লাগবে।”

“হ, সময় লইয়া একলা একলা মরো। আমার বউয়ের ঠ্যাকা পড়ে নাই তোমারে রাইন্ধা খাওয়াইতো।”

নওশাদ ভিন্ন পথ ধরলো। নাজির চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কই যাস? কী রে?”

নওশাদ উত্তর দিলো না। গন্তব্যহীন পথে হাঁটা ধরলো। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাজির। সেও আর দাঁড়ালো না, চলে গেলো নিজের কাজে। বিল্লাল ভাইয়ের দোকানে গিয়ে গরুগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। বিল্লাল ভাই হচ্ছেন মিষ্টি দোকানের মালিক।যেখানে প্রতিদিন নাজিরের খামার থেকে দুধ যায়। বাড়ি থেকে গরু হারানোর শোক এখনো যায়নি। তার মধ্যে এই ভাইটাকে নিয়ে যে সে কী করবে!
_______

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে মিছরির নানাবাড়ির সবাইও বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। পারুল রান্নাবান্না করে তাদের খাবার দিয়ে দিলেন। বাবার ডায়াবেটিস, বাইরের খাবার খেতে পারেন না। কিছু মুহূর্তের মধ্যেই মাস্টার বাড়িটা হয়ে গেলো শুনশান, নীরব। মাহবুব চলে গেলেও ফাহমিদা গেলো না। বাপের বাড়িতে কয়েকদিন সে থাকবে।
মাগরিবের নামাজ পড়ে শ্বশুরবাড়ি এলো নাজির। মিছরি যেন তার অপেক্ষাতেই এতক্ষণ বসে ছিল। আপাদমস্তক কালো বোরখা, নিকাব দিয়ে আবৃত। নাজির শহর থেকে এনে দিয়েছিল তাকে। দীর্ঘদিন সংসার ছেড়ে বাপের বাড়িতে আর মন টিকছে না তার। এই বিশাল বাড়িটা দাদাজান ছাড়া শূন্য লাগে।

বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো দুজনে। বহুদিন পর পাশাপাশি হাঁটছে তারা। দূরের কোনো এক গাছে পেঁচা ডাকছে। গুরুজনরা থাকলে নির্ঘাত বলতো, অসময়ে পেঁচার ডাক মানে অশুভ কিছু হতে চলেছে। খারাপ লক্ষণ। কিন্তু নাজির কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। আমাদের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি থাকতে জগতের কোনো অশুভ শক্তির ক্ষমতা আছে নাকি সৎ, বিশ্বাসী মানুষদের অনিষ্ট করার?

নীরবে দুজন হাঁটছে। এই লোকের নীরবতা এখন আর মিছরির ভালো লাগে না। তাই সে নিজেই বলে উঠলো,“বাড়িতে গিয়ে রান্না বসাতে হবে। বাজার সদাই কিছু আছে? দুপুরে কী খেয়েছেন?”

“বাড়িত গিয়া চুপচাপ শুইয়া থাকবা। তোমার কিছু করতে হইবো না।”

“তাহলে খাবো কী?”

“দুপুরে ছুডো চাচীর ঘরে খাইছি। সকালে বাজার কইরা আনছিলাম। বিকালে রাইতের লাইগা তারে দিয়াই রান্ধাইছি।”

মিছরি সন্তুষ্ট হয়ে মুচকি হাসলো। স্বামীর হাত জড়িয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে আহ্লাদী সুরে বললো,“কত ভালো, যত্নশীল আমার স্বামী!”

“ঢং।”

হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল নাজির। কিন্তু মিছরি ছাড়লো না। বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত সেভাবেই শক্ত করে ধরে রাখলো।

উঠোনে নারীরা বসে গল্প করছে। রাত হয়ে যাওয়ার পরেও কলিমের মা আজ শাহ বাড়িতে বসে আছেন। কলিমকে নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে তারপর তাকে বাড়ি ফিরতে বলেছেন ফরিদা। তাদের দেখতেই ফরিদা জিজ্ঞেস করলেন,“আইয়া পড়ছোস তোরা?”

নাজির উত্তর দিলো না, তালা খুলে ঘরে ঢুকলো। আজকাল এই মহিলাকে সে এড়িয়ে চলে, ডাকলেও সাড়া দেয় না, মুখের দিকে তাকায় না। ইচ্ছে করে জানে মেরে ফেলতে। কিন্তু এত সহজ মৃত্যু কী আর এদের দেওয়া যাবে? আকাশসম পাপের সাজা কখনোই সহজ হতে পারে না।

ফরিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“পোলাডার যে কী হইছে! এহন আর কথা হুনে না, সংসার আলাদা হওনের পর থাইক্যা এড়াইয়া চলে।”

কলিমের মা বললেন,“এহনো বুঝতাছেন না, ভাবি? আমি তো আগেই কইছিলাম, কানপড়া দিছে। শত্রু বাড়ির মাইয়া ঘরে তুললে এই অবস্থাই হয়। হেরাই বিষ ঢালতাছে, তাবিজও করতে পারে‌‌।”

ফরিদা মুখ ভার করে বসে রইলেন। চিন্তা কিছুতেই যেন তাঁর মাথা থেকে যাচ্ছে না। আসলেই কী বউটা কানপড়া দিচ্ছে? সেও শাশুড়ির পথে হাঁটলে তো বড়োই অসুবিধে! মর্জিনা ফটকের দরজা লাগাতে লাগাতে বিদ্রুপ করে বললেন,“পোলার এতদিনে সুবুদ্ধি হইছে। কাল নাগিন চিইন্না ফেলছে।”

“তুই বুঝি ভালা? শুধু তোর জামাইয়ের লাইগা এহনো সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া থাকতে পারতাছোস।”

“জামাইয়ের লাইগা? আমার হেডমে দাঁড়াইয়া আছি। আমার বাপ, ভাইয়ের ক্ষমতায় এই শাহ বাড়িত রাজ কইরা খাইতাছি। এহন তো আমার আবার তিন তিনডা পোলাও আছে।”

“এত দেমাগ ভালা না।”

“আমিও তো এইডাই কই।”

ফরিদা চোখ রাঙালেন। মর্জিনাটা বেশ বাড় বেড়েছে। সরাসরি কিছু বলতেও পারেন না। পাছে না আবার ঝামেলা পাকায়। বিড়বিড় করে বললেন,“আগে জানলে এইডারেই রাস্তা থাইক্যা সরাইতাম। বিষ মাগী! এহন আবার লগে আরেকটা আইয়া জুটছে।”

কলিমের মা কিছু বললেন কিন্তু তিনি তা শুনলেন না। উঠে দাঁড়ালেন,“কলিম আইলে ভিতরে ডাক দেইস। রাইতের খাওন খাইয়া বাড়িত ফিরবি।”

কলিমের মা খুশিমনে মাথা নাড়ালেন।

পোশাক বদলে হাত-মুখ ধুয়ে এসেছে মিছরি। যত্ন করে সাজানো গোছানো ঘরটার বিশ্রী অবস্থা দেখে রাগে ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো তার। সব জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে আছে, আলনার পোশাকগুলো ভাঁজ ছাড়াই একটার উপর আরেকটা রাখা। বিছানাটা কত দিন ধরে ঝাড়া হয় না কে জানে? বিয়ের পর পুরুষ মানুষগুলো কেন যে পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা ভুলে যায়? ওই অবস্থাতেই কোমরে আঁচল গুঁজে ঘর পরিষ্কার করল সে। জায়গার জিনিস জায়গায় গুছিয়ে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বসে পড়ল বিছানায়।

নাজির বাইরে থেকে এলো। ঘরে এসে পরনের শার্টটা বদলেই কোথায় যেন চলে গিয়েছিল। মিছরি তাকে দেখে অভিযোগের সুরে বললো,“পাডার মতো ঘর এলোমেলো করে রেখেছিলেন কেন? আগে তো এমন ছিলেন না।”

“তুই পাডি। আগে কী বউ আছিলো?”

“মুখ সামলে।”

“সামলামু না।”

“যান, কথা বলবেন না।”

“একশবার কমু। ঠিকই তো কইছিলা, জীবনে প্রেম করো নাই। ওইদিকে মামাতো ভাইয়ের লগে বিয়া ঠিক হইছিল, আমারে রাইখা পলাইয়াও যাইতে চাইছিলা। যুক্তি কী দিবা?”

“এসব কে বলেছে?”

“যার ইচ্ছা হইছে কইছে।”

“বিয়ে ঠিক হলেই যে প্রেম থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমি মেয়েটা খুবই ভালো এবং ভদ্র। এমন মেয়ে পাওয়া আপনার চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য। নাজির শাহ জিতেছে।” হাত তালি দিয়ে বাহবা দিলো মিছরি।

নাজির মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কাটলো। আলমারি থেকে একটা মোড়ানো ছাপা কাগজ বের করে পাশে বসলো। সরু চোখে তাকিয়ে তার কাজকর্ম দেখছে মিছরি। মোড়ানো কাগজটা খুলতেই বেরিয়ে এলো খয়েরী রঙের বেশ কতগুলো কাঁচের চুড়ি, সাথে একটি আলতার বোতল। স্ত্রীর হাত টেনে নিয়ে একে একে চুড়িগুলো পরিয়ে দিলো নাজির। ফর্সা হাত দুটোতে খয়েরী চুড়িগুলো যেন আরো বেশি ফুটে উঠলো। মিছরি জিজ্ঞেস করল,“কী উপলক্ষে?”

“হেইদিন না আবদার করলা?”

“বহু বছর পেরিয়েছে।”

“গুনতে পারো তুমি?”

“আপনার থেকে ভালো পারি।”

“আইচ্ছা!”

“এতদিন পর কী মনে করে?”

“কথায় কথায় রাগ কইরো না তো, তারামন বিবি। ঝামেলায় আছিলাম তাই কেনার কথা মনে আছিলো না, সময় সুযোগও পাই নাই। আইজ শহরে গেছিলাম, তাই ফেরার পথে লইয়া আইছি।”

“তারামন বিবি! আরেকবার এই নামে ডাকলে খবর করে ছাড়বো। এবার বলেন, শহরে গিয়েছিলেন কেন?”

“গোয়ালের গাভী দুইডা মইরা গেছে।”

চমকে উঠলো মিছরি,“কীভাবে?”

“কেউ বিষ দিছে।”

“কে?”

“কিজানি?”

“আপনি জিজ্ঞেস করেননি?”

“জিগাইলেই কইয়া দিবো?”

“তাও ঠিক, নিশ্চিত বাড়ির কেউই করেছে। নাহলে কার সাহস আছে এমন জাঁদরেল লোকের সম্পদে হাত দেওয়ার? জীবনের মায়া নেই?”

“আমি জাঁদরেল?” ভ্রু কুঁচকালো নাজির।

“তো কী? বউয়ের সামনেই মাঝেমধ্যে একটু মিষ্টি মিষ্টি। বাইরের লোকের সামনে ভয়ংকর। আমি জানি না ভেবেছেন?”

“হ, জাইনা উল্টাইয়া দিছো। অপ্রয়োজনীয় মাইনষের সামনে ভয়ংকর থাকাই ভালা। মানুষ সবসময় শক্তের ভক্ত, নরমের যম। ক্ষুধা লাগছে, পাকনামি বাদ দিয়া আইয়ো। খাইয়া ঘুমাইয়া পড়ি।”

“আপনি খান, আমি এখন পায়ে আলতা লাগাবো।”

“যা ইচ্ছা করো, আমার সামনে আইয়া রংঢং করবা না। আমি একটুও দেখমু না।”

“আপনি না দেখলে জাহিদকে ডেকে এনে দেখাবো।”

নাজির চোখ রাঙালো। দিনদিন তার বউটা একেবারে তার মতো হয়ে যাচ্ছে। মুখে কিছু আটকায় না।

নাজির একাই খেতে চলে গেলো। মিছরি রাত জেগে আলতা রাঙালো দুই পায়ে। চুড়িগুলো খুললো না, বরং পরনের পোশাক বদলে পরলো বিয়ের সেই লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি। তাকাবে না বলেও সেই রাতেই তার চিরল বিরল রূপ দেখে নাজির শাহ মারাত্মকভাবে পিছলে গেলো। কনকনে শীতের রাতে উঠলো প্রেমের ঝড়।
______

দুঃসময়ের মেয়াদ বেশি হলেও সুসময় আর শোকের দিনগুলো খুব দ্রুতই যেন কেটে যায়। পৌষের সপ্তাহ দুয়েক পেরোলো‌। ধরায় আগমন ঘটলো হাড় কাঁপানো শীতের। শহরের তুলনায় গ্ৰামে শীত পড়ে একটু বেশি। তবুও চারিদিকে বিরাজ করছে খুশির জোয়ার। আর কয়েক দিন পরেই বাড়িতে বিয়ে। নাজমুলের বিয়ে।

চেয়ারম্যানের ডেরায় ছোটোখাটো মদ্যপানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমিরুল শাহ, সিরাজ উল্লাহসহ বেশ কয়েকজন গন্যমান্য মানুষও উপস্থিত সেখানে। শুধু মুমিনুল শাহ অনুপস্থিত। মর্জিনা নেশা পানি খাওয়া পছন্দ করেন না। এই জন্য বিয়ের পর বঁটি নিয়ে একবার তাকে তাড়াও করেছিলেন। শ্বশুরবাড়ি খবর পৌঁছে যাওয়ার পর শ্বশুরমশাই এসেও জামাতাকে শাসিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও তিনি এখন আর বেঁচে নেই, তবে তাঁর দুজন ছেলে আছে। মেয়েটার তেজও কমেনি।

সিরাজ উল্লাহ এক বোতল ইতোমধ্যে শেষ করেছেন। মাতাল অবস্থায় বললেন,“বুইড়া মরছে, চারিদিকে শান্তি ফিরা আইছে। বেশি সৎ মাইনষের লাইগা এই দুনিয়া না।”

আতাউর রহমান তাল মিলিয়ে বললেন,“তবে দেরি কইরা ফেলাইছে। জীবনডা ঝালাপালা কইরা দিছিলো। আতাউর এইডা করো না ক্যান, ওইডা করো ক্যান? সৎ থাকো হেনতেন।”

আমিরুল শাহ আজ বেশি একটা খাননি। মাত্র এক গ্লাস খেয়েছেন। বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন,“তাতে তোমার কী, সিরাজ? তোমারে তো কহনো কিছু কয় নাই।”

“ওইসব আমনে বুঝবেন না, দুলাভাই। আমনে ইতর, লোভী হইলেও গাধা।”

“বেশি খাইয়া ফেলাইছো। যাও, বাড়িত যাও। তোমার পোলাগো মধ্যে কেউ আইছে? একলা একলা কেমনে যাইবা?”

“আমনে আছেন না? আমনের লগে যামু।”

“নাজির দেখলে তোমারে খবর কইরা দিবো। তার উপরে মাতাল।”

“হেরে ডরাই আমি? হ্লারপুতের উজানি উঠছে। আমার সোহেলরে চড় মারছে। একদিন পাইলে গলায় পাড়া দিয়া ধরমু।”

“অত সহজ না, সিরাজ। হেয় সুবহানের মতো নরম, একলা মানুষ না।”

“ওইসবে কিছু হয় না, দুলাভাই। বুইড়া এহন আর নাই। তাই ধরলে ছুটতে পারবো না।”

“আমি গেলাম, তোমারটা তুমি বুইঝা নেও।”

“নরম মাইনষেগো আচমকা থাবা দিয়া ধরতে হয়। কিন্তু কঠিন মাইনষেগো লগে খেলতে হয় অন্যভাবে। আগে তাগো দুর্বলতায় হাত দিতে হয়, তারপর তাগো কেচ্ছা খতম। ঠিক কইছি না, চেয়ারম্যান সাব?”

সিরাজ উল্লাহ শব্দ করে হেসে উঠলেন।তবে আতাউর হাসলেন না। লোকটাকে তিনি মোটেও পছন্দ করেন না। আমিরুল শাহর জন্যই শুধু সহ্য করেন।

আমিরুল শাহ সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন। দিনদিন ঘর সংসার থেকে তাঁর মন উঠে যাচ্ছে। এত বড়ো একটা বাড়ি, এতশত সম্পদ! অথচ নিজের বলতে কোনো মানুষই নেই। মাঝেমধ্যে বুকে ব্যথা ওঠে। এই তো সেদিন স্বপ্নে বাবাকে দেখলেন। দেখলেন, ছেলে বেলায় তিন ভাইয়েরা মিলে মাঠে লাটিম ঘুরাচ্ছেন। মা ডাকতেই ছুটে এসে তিনজনে মিলে নেমে পড়লেন পুকুরে। একসঙ্গে হাসতে হাসতে সাঁতার কেটে গোসল সেরে এসে খেলেন মায়ের হাতের সুস্বাদু ভাজা মাছ দিয়ে গরম ভাত মাখা। আহা, কি স্বাদ! তখনকার মতো এখন আর ভাতে স্বাদ নেই।

চোখ ঘোলাটে হয়ে উঠলো আমিরুল শাহর। দাড়িতে হাত রেখে বুঝলেন, পেকে গেছে। অবচেতন মনেই কবরখানার কাছে এসে উদাস চোখে আলো জ্বেলে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,“আর ফেরার উপায় নাই। একবার ভুল করলে শুধরানো যায়, কিন্তু বারবার ভুল করলে শুধরানো তো যায়ই না বরং তা ঢাকার লাইগা আরো ভুল করতে হয়।” উল্টো পথে হাঁটা ধরলেন তিনি। কিছুক্ষণ ভেবে নিজ মনে পুনরায় আওড়ালেন,“মানুষ ভুল করে না বুইঝা, কিন্তু আমি করছি বুইঝা। তাই এইডা ভুল না, এইডা অন্যায়। অন্যায় ঢাকার লাইগা যা করার সব করতে হইবো। সুবহান তুই হাইরা গিয়াও জিততা গেলি।”

কোনো প্রকার শব্দ না করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন তিনি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন পুরোনো মাটির ঘরের দিকে। এই ঘরে একসময় বাবা-মাসহ তাঁরা তিন ভাই বাস করতেন। আমিরুল শাহ দাঁতে দাঁত পিষলেন। দুদিকে মাথা ঝেড়ে বিড়বিড় করলেন, “সময় থাকতে এই বোধ কই আছিলো? এই বোধ, মায়া, স্মৃতি দিয়া এহন আমিরুল শাহ কী করবো?”

অন্ধকার, নিস্তব্ধ রাতে ভেসে এলো মেয়েলি কান্নার শব্দ। ছেলেটা আজও বউ পেটাচ্ছে। লোকটার সব রাগ তুঙ্গে উঠে গেলো। দালানের ভেতরে ঢুকেই বড়ো ছেলের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে বললেন,“জানোয়ার, নেমকহারাম, বউ পিটাস ক্যান? বাইড়াইয়া হাড্ডিগুড্ডি ভাইঙা দিমু। বাহির হ ঘর থাইক্যা। মামা আর বাপের মতন হইছোস?”

সমস্ত চেঁচামেচি মুহূর্তেই থেমে গেলো। পিতাকে ভীষণ ভয় পায় সামিউল। তাই দরজা সে খুললো না।

চলবে_________

ফলো- উপন্যাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here