#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৭৩]
আকাশে মেঘ জমেছে। গাছের দোলাচলে মনে হচ্ছে এ যেন বসন্তকাল। হাসপাতাল থেকে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে নিজের নতুন ঠিকানায় এসে পৌঁছেছে নাজির। শাহ বাড়ি থেকে তার সব জিনিসপত্র মিল্টন, লতিফকে দিয়ে আনিয়ে পুরোনো সংসারটা আবার নতুন করে সাজিয়েছে। টিনের এক চালা দিয়ে পাশেই একটি রান্নাঘর। বৃষ্টির পানি যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারে তাই হাঁটু সমান উঁচু মাটির দেয়াল দেওয়া। জায়েদার মাকে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে তিনটি চুলা; দুটো জোড়া, আরেকটি আলাদা। রোদের অভাবে সেই চুলা এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। কিছুটা দূরে পাশাপাশি পাকা কলপাড় আর ল্যাট্রিন।
ঘরের সামনে একটি হাসনাহেনা গাছ খুঁটিতে প্যাঁচিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছে ঘরের চালে। ফটকের দুধারে বেশ কতক বেলী ফুলের গাছ। ঢুকতেই চোখে পড়ে। তবে আকারে এবং বয়সে এখনো ছোটো। গোবর দিয়ে লেপা বড়ো একটি উঠোন। মিল্টনের মা এসে লেপে দিয়ে গিয়েছে। তবে টানা বৃষ্টিতে তা প্রায় ধুয়ে কর্দমাক্ত অবস্থা। বাম দিকে বিশাল বড়ো বড়ো গর্ত করা। ওখানেই পাকা দালান তোলার জন্য ঢালাই দেওয়া হবে।
স্ত্রীর মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে নাজির জিজ্ঞেস করল, “তালমিছরির নতুন বাড়ি পছন্দ হইছে?”
মিছরি মাথা নাড়ালো,“হয়েছে, আমার ভাবনার চেয়েও অনেক সুন্দর।”
কেদারা এনে নাজির তাকে বারান্দায় বসালো। ছেলে বাবার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। মিছরি বললো,“এত বড়ো হাসনাহেনা গাছ আবার কবে কবে হলো?”
“মতিনের বাড়ি থাইক্যা তুইল্যা আনছি। তোমার নাকি ফুল অনেক পছন্দ?” থেমে বললো,“আর বাদবাকি যা ইচ্ছা হয় তুমি নিজ হাতে লাগাইয়ো। এই ভিটেবাড়ি সংসারের বড়ো বউ এহন থাইক্যা মিছরি। কেউ তারে বাঁধা দেওয়ার নাই, বকার নাই। যা ইচ্ছা তাই করতে পারবা।”
মিছরি হাসলো,“যা ইচ্ছে করা যাবে না। স্বৈরাচার হলে শত্রুতা বাড়বে। আমার সাথে সাথে নওশাদ ভাইয়ের বউ হিসেবে সংসারটা শালিক আপারও।”
নাজির হেসে মাথা নাড়ালো। স্ত্রীকে নিয়ে ঘরে এলো। নজর ঘুরিয়ে আশেপাশের সবকিছু দেখলো মিছরি। জিনিসপত্রগুলো তার পরিচিত, শুধু ঘর সংসারটাই যেন অপরিচিত। বিয়ের পর অন্য একটা ঘরকেই সে নিজের সংসার বলে জেনে মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছিল। আজ সেসব অতীত। শোবার খাট বদলেছে, আগের তুলনায় এটা বড়ো। পাশে ঠাঁই পেয়েছে সুন্দর একটি দোলনা। নাজির ছেলেকে সেখানে শুইয়ে দিয়ে বললো,“এহন বৃষ্টি, বাদল লাইগাই থাকবো। হেরপর আইবো শীত। তাই নক্ষত্রের লাইগা নতুন কাপড় চোপড় আর খেলনা কিনতে গেছিলাম। দোকানদার কইলো, বর্তমানে এই দোলনাগুলা নাকি খুব চলে। উপরে ঝুনঝুনি দেখতাছো না? একলা থাকলে, ঘুম ভাঙলে এগুলা দিয়া খেলব। তাই লইয়া আইলাম।”
মিছরি কিছু বললো না। বিছানায় বসে নিজের ঘুমন্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। দেখতে দেখতে ছোট্ট মিছরিটা বড়ো হয়ে গিয়েছে, সে নিজেও এখন মা। ভাবতেই আশ্চর্য লাগে। নাজির তার ভাবনার জাল ছিঁড়ে বললো,“তুমি এহন বিশ্রাম নেও একটু।”
“গোসল করবো। কতদিন করি না! মাথা যন্ত্রণা করছে।”
“এহন গোসল করা ঠিক হইবো?”
“হ্যাঁ, ডাক্তার বলেছে। আমার তো সিজার হয়নি।”
“কাপড় লইয়া আইয়ো।”
“পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে?”
“সব করা শেষ। তোমার কী লাগবো খালি কইয়ো। এহন শুধু তোমার বাপের বাড়ির মতন একটা দালান করা বাকি। ওইডাও কয়েক মাসে হইয়া যাইবো, আমার আব্বাজান হাঁটতে শিখার আগেই।”
মিছরি পোশাক বের করল। কাশেম আলী জামাতার উপরে নারাজ। বলেছিলেন সোজা যেন মাস্টার বাড়ি যায়, কিন্তু ছেলেটা গেলো না। বরং চলে এলো নতুন ভিটেয়। যদিও এখান থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব খুব একটা নয়।
কাদার মধ্য দিয়ে স্ত্রীকে কলপাড় পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এলো নাজির। মিল্টন হাতে বড়ো একটা ডেকচি নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো। তাকে দেখতেই বারান্দায় ডেকচিটা রেখে বললো,“আমনেরা আইবেন হুইনাই আম্মায় ভেইন্নাবেলা আমারে দিয়া বাজার করাইয়া রাইন্ধা এই যে খাওন পাঠাইছে। দুপুর আর রাইতের খাওন, ভাইজান।”
“কষ্ট করার কী দরকার আছিলো? এইডা কমু না। ভালাই করছোস।”
মিল্টন ঘাড় চুলকে বললো,“আবার বিহালে আইমু নে, ভাইজান। দুধ দোহাইতে হইবো।”
“আমন ধানের ক্ষেতে গেছিলি? আগাছা বাড়ছে কইছিলাম না?”
“আমনে কইবেন আর আমি যামু না? মোখলেছ আর আমি মিল্যা কাইল সব পরিষ্কার করছি। কচু গাছটি ভালাই ডাঙর হইতাছে। আমগো দেহাদেহি ওই বাড়ির ফজলুও দেখলাম করছে।”
“ভালা হইলেই ভালা। এইসব ব্যবসায় পোষাইতাছে না আর। মিল শুধু চৈত্র, বৈশাখেই ভালা চলে। বাদ বাকি মৌসুম অনুযায়ী মাছের ব্যবসা, সবজি চাষ আর গরুর দুধ ধোয়াইয়া চলতে হয়।”
“আবার নতুন ব্যবসা খোলার ফন্দি আঁটতাছেন নাকি?”
“হ, এমন ব্যবসা যেইডা সারা বছর মাস চলবো। সাথে চাহিদাও থাকবো বেশি, দুই হাতে পয়সা কামাইয়া বড়লোক হইয়া যামু।”
“কী ব্যবসা, ভাইজান?”
“দই, মাখন, গুড়ের ব্যবসা কেমন হইবো? আমগো নিজেগো গরু, মহিষ আছে। আল্লাহর রহমতে অনেক দুধ দেয়। দই, মাখনের চাহিদা দাম দুইডাই বাজারে বেশি। শীতে গেরামের সবার খেজুর গাছ কিন্না রস নামামু আর গুড় বানামু। তোর মায় তো ভালাই গুড় বানাইতে পারে। দরকার হইলে লগে আরো মানুষ নিমু না হয়। গেরামে বেকার মাইনষের অভাব? ব্যবসা দাঁড়াইয়া যাইতে পারলেই কেল্লাফতে!”
মিল্টন দুই হাতে মুখে চাপলো। আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললো,“ভাইজান জিন্দাবাদ! এত বুদ্ধি রাখেন কই? আমার মাথায় তো কহনো আইয়ে না।”
“আইচ্ছা, এহন বাড়িত যা। দুপুরে তো খাইছোস বইল্যা মনে হয় না। আর হুন, আইজ থাইক্যা রাইতে এনে আর থাকতে হইবো না।”
“ক্যান, যদি আবার কিছু হয়?”
“আর কিছু হইবো না। হওয়ানের মাইনষেরা জেলে হাওয়া খাইতাছে।”
“আমনের চাচায় ছাড়া পাইছে। কয়দিন আগে হাসপাতাল থাইক্যা পারভেজে লইয়া আইলো দেখলাম।”
কথাটা এড়িয়ে গেলো নাজির। জিজ্ঞেস করল, “বড়জনরে বাজার কইরা দিয়া আইছিলি?”
“হ, এত দয়া আমনের মনে যে কইত্তে আইয়ে বুঝি না বাপু। গেলাম আমি।”
মিল্টন বিড়বিড় করতে করতে চলে গেলো। সেই পথে একপলক তাকিয়ে নাজির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দৃষ্টি সরিয়ে আকাশের দিকে স্থির করল। দেরিতে হলেও সে বুঝেছে, রক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়া সবসময় প্রতিশোধ নয়। অনেক সময় শত্রুর অপকর্ম সম্পর্কে জেনেও তার সঙ্গে হেসে কথা বলা, তার উপকার করা, তাকে একাকিত্বের যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখা এক ধরণের নীরব প্রতিশোধ। যেই খেলা ফরিদার সাথে নাজির খেলছে।
গোসল শেষে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হলো। মিছরির শরীর এখনো দুর্বল। এইটুকু বয়সে সন্তান জন্ম দেওয়া কী মুখের কথা? খাওয়ার মাঝখানে নক্ষত্রের ঘুম ভেঙে গেলো। মিছরি খাওয়া শেষ করে তারপর ছেলেকে খাইয়ে, কান্না থামিয়ে নিজে ঘুমিয়েছে।
নাজির ছেলেকে কাঁথায় মুড়ে বারান্দায় বসে আছে। ছেলেটা ভীষণ শান্ত। বিশেষ করে, বাবার কোলে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ বাবার মুখের দিকে নিষ্পাপ নয়নে তাকিয়ে থাকে। এখনো তাই করছে। নাজির ছেলের দুই গালে চুমু দিয়ে কোমল স্বরে বললো, “তাড়াতাড়ি বড়ো হইয়া যাও, আব্বা। নিজের আব্বার লগে তো পারলাম না, তবে তোমারে লইয়া আমি পুরা গেরাম, শহর সব ঘুরমু। একলগে পুসকনিতে সাঁতার কাটমু, ধান লাগামু, রাইতে মাছ ধরমু। বাবার লগে মাছ ধরবা না? ঘুরবা না?”
দুই হাত নাড়িয়ে হাসলো নক্ষত্র। এটাকেই ছেলের সায় ধরে নিলো নাজির। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,“আবার বাপ-পুত একলগে তোমার মায়ের ঠ্যাঙানিও খামু।”
হাসতে হাসতে নাজিরের চোখের কোণে অশ্রু জমে। উদাস হয়ে বলে,“আমগো আসল বাড়ি এর থাইক্যাও অনেক সুন্দর। তহন কী দিনই না আছিলো! সব যে ক্যান বদলাইয়া গেলো? তবে তোমার জীবনে এত ভয়ংকর কিছু আমি আইতে দিমু না। যেমন দেই নাই নওশাদের জীবনে? হুনো, তোমার চাচার মতন নরম আর দাদার মতন দুর্বল কহনো হইয়ো না। এই দুনিয়ার মাইনষে সব সময় নরম, দুর্বল মাইনষের উপরেই যত জুলুম করে। কহনো মায়ের মনে কষ্ট দিবা না। আল্লাহ তোমার মায়রে আমার জীবনে পাঠাইছে বইল্যাই আইজ আমি তোমারে পাইছি, এত সুন্দর একটা সংসার পাইছি, ভুল যাত্রা থাইক্যা ফিরা আইছি।”
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই নাজির হাতের উল্টো পিঠে তা মুছে নিলো। নক্ষত্র এই পর্যায়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। নাজির অবাক হলো। বাবাও তাকে উদাস দেখলে অস্থির হয়ে যেতো। নাজির তার বাবাকে খুব ভালোবাসতো। মনে হলো, তার বাবাই যেন ফিরে এসেছে। ছেলে তো বাবাই হয়। তার কান্না থামাতে নাজির বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে বললো,“কান্দে না, আব্বা। তোমার মায়ের ঘুম ভাইঙা যাইবো। ওই দেহো কাউয়া।”
নক্ষত্রের কান্না একসময় থামলো। বিকেল পর্যন্ত সেখানেই বসে রইল নাজির। আছরের পর কাশেম আলী আর মাসুম এলো। তাদের সাথে সুজাতা, সিফাত। এসেই তার কোল থেকে ভাগ্নেকে একপ্রকার কেড়ে নিলো মাসুম। খেক খেক করে বললো,“মামা হইয়া গেলাম অথচ ভাগিনারে এহনো কোলে লইতে পারলাম না। বেয়াদবি ছাড়বি কবে? সোজা এনে আইয়া পড়ছে।”
“গত বছর আমার বেগুন ক্ষেতে দাঁড়াইয়া তোরে কথা দিছিলাম, এই বছর বোইন বিয়া দিলে পরের বছর মামা বানাইয়া কোলে ভাগিনা ধরাইয়া দিমু। কথা কিন্তু রাখছি।” বলেই নাজির হাসলো।
মাসুম চোখমুখ কুঁচকে নিলো। নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে বললো,“তোর বাপটা ঘাউড়া। আয় মামা ভাগিনা আমগো বাড়িত যাইগা।”
অপরিচিত মুখ দেখে চোখমুখ খিচে কেঁদে দিলো নক্ষত্র। নাজির বললো,“দেখ, তোরে ডাকাইত ভাইবা কানতাছে। দে আমার পোলা।”
মাসুম দূরে সরে গেলো,“আইছে, তুই ওরে কানপড়া দিছোস। কান্দে না, মামা। তোমারে মেলা থাইক্যা বউ আইন্না দিমু।”
“বউ ওর না তোর দরকার, মফিজ। আর কতকাল একলা থাকবি?”
মাসুম না শোনার ভান করে ভাগ্নের কান্না থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সুজাতা হাত বাড়িয়ে বললো,“চাচা, আমার কোলে দেও।”
“অনেক ছুডো, পইড়া যাইবো। আমার কোল থাইক্যাই দেখ।”
কাশেম আলী এদের ঝগড়ায় নীরব ভূমিকা পালন করে বারান্দার কেদারায় গিয়ে বসলেন। ডেকে বললেন,“সবাই তগো লাইগা এতক্ষণ ধইরা অপেক্ষা করতাছিল। আর তুই এনে আইলি?”
“আমার ইচ্ছা আছিলো প্রথম সন্তান আমার বাড়িতে হইবো। কিন্তু পরিস্থিতি তো হইতে দিলো না। তাই হাসপাতাল থাইক্যা সোজা ওগো এনে আনছি। আইজ রাইতটা এইখানেই থাকুক।”
“মিলাদ না পড়াইয়া নতুন ঘরে থাকবি? আগে এই জায়গা দিয়া শিয়াল, জ্বীন, পরী ঘুরতো।”
“মিলাদ পড়াইতে হয় না। কাইল হুজুররে ডাইকা আইন্না দোয়া পড়াইছিলাম। আমিও ফজরের নামাজ পড়ছি। আর কী হইবো?”
“রাইতে একলা থাকবি কেমনে? আমি মাসুমরে খাওন লইয়া পাঠাইয়া দিমু। দুপুরে খাইছোস?”
“হ খাইছি, খাওন আইজ আর পাঠাইতে হইবো না। মিল্টন রাইতের সহ দিয়া গেছে। আমি থাকতে পারমু। জীবনে কত একলা রইছি! এহন তো বউ, পোলা লগে আছে।”
কাশেম আলীর মন তবুও মানে না। তাদের কথায় মিছরির ঘুম ভেঙে গেলো। ঘোমটা টেনে সেও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
______
পরেরদিন পুনরায় ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি গেলো মিছরি। নাজির এবার আর তাকে আটকালো না। বাচ্চার বাবা সে হলেও নানাবাড়ির মানুষদের নাতির উপর যথেষ্ট অধিকার রয়েছে। কম উপকার তো আর তারা করেনি নাজিরের। সেদিন বিকেলের দিকে একদল হিজড়া এলো বাড়িতে। যেই বাড়িতেই বাচ্চা হোক, কীভাবে যেন তাদের কান পর্যন্ত সেই সংবাদ পৌঁছে যায়। বাড়িতে এসে জোরজবরদস্তি করে নক্ষত্রকে দেখলো তারা, উঠোনে কতক্ষণ নাচানাচি, লাফালাফি করল। তারপর সর্দারনি মুখ বাঁকিয়ে বললো,“পোলার বাপ হইছোস, ট্যাহা দিবি না? দে ট্যাহা। নগদ পাঁচ হাজার লাগবো।”
নাজির ত্যাছড়া স্বরে বললো,“ট্যাহা কী তোমার বাপ আমার কাছে দিয়া গেছে? এক ট্যাহাও দিমু না।”
“ক্যান দিবি না? দিতেই হইবো। আইজ পর্যন্ত এই জমেলা সুন্দরীর ট্যাহা কেউ মাইরা খাইতে পারে নাই।”
“আইজ পর্যন্ত নাজির শাহর থাইক্যাও এক ট্যাহা কেউ ছিনাইয়া নিতে পারে নাই। ট্যাহা দিতে হইলে কোনো এতিমখানায় দিমু, তুমগো মতন সুস্থ সবল মাইনষেরে ক্যান দিমু?”
“দেখ, রাগ উঠাইস না কিন্তু। ট্যাহা দিবি নাকি কাপড় তুলমু?”
মিল্টন পাশ থেকে বলে উঠলো,“উঠা, উঠা, একটু দেহি।”
নাজির তাকে চোখ রাঙালো। শেষে কাশেম আলী আর সুজন মিলে অনেক কষ্টে হাজার দুয়েক টাকা ধরিয়ে দিয়ে তাদের বিদায় করল।
সপ্তাহ খানেক পর লোক জানিয়ে ধুমধাম করে নক্ষত্রের আকিকা দেওয়া হলো। সেদিন গোটা গ্ৰামের মানুষকে নাজির খাইয়েছে। ফাহমিদা, রেশমা, কাজল, তমিজা আর অলিউল খানও পরিবার নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এলেন। শালিক এবার বাবার সাথে আর বাপের বাড়িতে ফিরলো না। সরাসরি বলে দিলো, “এহন তো আর কোনো বিপদ নাই। আমি এনেই থাকমু। উনার লাইগা অপেক্ষা করমু।”
অলিউল খানের জোরাজুরিতেও কোনো ফায়দা হলো না। শেষে নাজির নিজেই লোকটাকে বুঝিয়ে ভাইয়ের বউকে রেখে দিলো।
আকিকার তেহারি পৌঁছে গেলো পশ্চিম পাড়ার মৃত্যুপুরী শাহ বাড়িতেও। গামলা ভরে মিল্টন নিয়ে এলো সেই খাবার। গোড়ালি অবধি লম্বা আগাছার উপর দিয়ে ফরিদা খালি পায়ে হাঁটছিলেন। বয়সের ভারে নেতিয়ে পড়েছে দেহ। তবে এখনো যেন শক্তি কমেনি। সপ্তাহ খানেক আগেই নাজিরের সন্তান হওয়ার সংবাদ তিনি পেয়েছিলেন। অবশ্য সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। মিল্টন গামলাটা বারান্দায় রাখলো। ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকিয়ে কোমরের গামছা খুলে ঝাড়লো। মাটিতে একদলা থুথু ফেলে যেতে যেতে বললো,“কী নির্লজ্জ মানুষ! মানুষ না অমানুষ, খুনি। আমি এই জায়গায় থাকলে এতদিনে গলায় দড়ি দিতাম। নেহাৎ আমগো ভাইজানের মনডা নরম।”
ফরিদা হাঁটা থামিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এসব কথায় এখন আর তিনি অবাক হন না। গতকাল বিকেলে কলিমের মা বাড়ির সামনে দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। আশ্বিনের ঝড়ে ফটকের দরজা খুলে পড়ে গেছে। ঠিক করার কেউ নেই। অনেকদিন উঠোন কেউ লেপে না। আগে এটা কলিমের মায়ের কাজ ছিল। ছোট্ট আগাছাও জন্মাতে দিতেন না তিনি। ফরিদাকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করতেন। প্রশংসায় যেন পঞ্চমুখ। ফরিদার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সেই মহিলা থুথু ফেলে অভিশাপ দিয়ে বললো,“অমানুষে দুনিয়াডা ভইরা গেছে। আল্লাহ এত মানুষ উঠাইয়া নেও, হেগো দেহো না? ছ্যাহ, ছ্যাহ।”
ফরিদার বুকটা কেঁপে উঠলো। যাদের কাছে এতকাল ফরিদা বানু ভালো, নেককার নারী ছিল আজ তারাই তাকে ঘৃণার চোখে দেখছে, থুথু ছুঁড়ছে, মৃত্যু কামনা করছে। আজকাল ফরিদা নিজেও নিজের মৃত্যু চায়। পাপের ভারে সেই কবে ছেয়ে গেছে আত্মা। নিজের চরিত্রেও লেগেছে আজ কলঙ্কের দাগ। শেষ কবে যে ভালো কাজ করেছিলেন তাও ফরিদার মনে পড়ে না। এমন কোনো ভালো কাজ কী আদৌ আছে যা বুক ফুলিয়ে বলা যায় কাউকে? না নেই। হয়তো বা আবার আছে। কিন্তু পাপের কাছে তা নগন্য। যেমন নগন্য সমুদ্রের কাছে একবিন্দু শিশির কণা! সেই ভার তিনি আর বইতে পারছেন না। অথচ পাপ যখন করেছিলেন তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে এত গভীরভাবে ভাবেননি।
ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে নাজিরকে বলতে,“আমি তোর মায়ের খুনি। ছাড়বি ক্যান আমারে? মাইরা দে। আমারেও মাইরা দে। তাও এত দয়া করিস না। তোর দয়া, মাইনষের চোখের ঘৃণা দেখতে আমার ভাল্লাগে না। মৃত্যুর থাইক্যাও যন্ত্রণা দেয়।” কিন্তু বলা হয় না। আজকাল নাজিরও এদিকে আসে না। ফরিদা কী তার অপেক্ষা করেন? হয়তো না, আবার হয়তো হ্যাঁ। আচ্ছা, নাজির যদি সত্যের সম্মুখীন না হতো তখন কী করতেন ফরিদা? কী করতেন সিরাজ উল্লাহ বা আমিরুল শাহ? কী হতো ছেলেটার শেষ পরিণতি? হয়তো উল্টো হতো।
ধরণীতে সন্ধ্যা নামলো। মাগরিবের আজান দিচ্ছে। ফরিদা সিঁড়িতেই ভাবুক হয়ে বসে আছেন। মুমিনুল শাহর ভিটের সামনের বাল্বটা কেটে গেছে। আমিরুল শাহ, না না বর্তমানে পারভেজ শাহর দালানের সামনে জ্বলছে একটা হলদে বাতি। তবে আলো কম। অর্ধেক উঠোনও ঠিকমতো আলোকিত হয় না। তবে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় কবে যেন মুমিনুল শাহর দালানের বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেওয়া হয়।
ফরিদা কিছু একটা ভেবে উঠে গেলেন। গামলা থেকে একটা থালায় তেহারি বাড়লেন। জগ ভর্তি পানি আর খাবার ভর্তি থালা নিয়ে চলে এলেন দেবরের ঘরে। অন্ধকার ঘরে মুমিনুল শাহ চোখ বুজে শুয়ে আছেন। ভনভন করে কানের কাছে মশা ঘুরছে। আসবাবে জমেছে ধূলো। সুইচবোর্ড হাতড়ে আলো জ্বালাতেই তিনি চোখমুখ কুঁচকে বললেন,“কেডা রে?”
শব্দ করে থালা, গ্লাস টেবিলে রাখলেন ফরিদা। জবাব দিলেন,“আমি ছাড়া আর কেডা?”
কৃত্রিম আলোয় মানিয়ে নিতে মুমিনুল শাহর সময় লাগলো। ভাবিকে দেখে চমকালেন না। তিনিই নিয়ম করে দু বেলা খাবার দিয়ে যান। উঠে বসার চেষ্টা করলেন মুমিনুল শাহ। পায়ের ব্যান্ডেজ এখনো খোলা হয়নি। মুখ আর ডান হাতটা খানিক বেঁকে গিয়েছে। কথা বলতে গেলে জড়িয়ে যায়। চলাফেরা তেমন একটা করতে পারেন না। পারভেজ শৌচাগারে যেতে সাহায্য করে। তবে সর্বদা সঙ্গী হিসেবে কাছে কারো থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কে থাকবে? নিঃস্ব মানুষদের আশেপাশে দুধের মাছি ঘুরঘুর করে না বললেই চলে।
ফরিদা খাবার ভর্তি থালাটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন,“খাইয়া লও।”
“তেহারি! কেডা রানছে?”
“নাজিরের পোলার আকিকার তেহারি।”
“নাজিরের পোলা!” অবাক হলেন বোধহয়।
“হ, কয়দিন আগে পোলার বাপ হইছে।”
“বউ কই? বাপের বাড়ি?”
“উত্তর পাড়ার ভিটেয় বাড়ি করছে। জমিডা তো সামিউলের বাপেরই আছিলো। ডর দেখাইয়া কাইড়া নিলো।”
কম্পিত হাতটা এনেও সরিয়ে নিলেন মুমিনুল শাহ। জোর বা ইচ্ছে পেলেন না। ফরিদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “কার ভাগ্যে যে কী লেহা আছে কেউ জানে না। এমন এক রাইতের আন্ধারে আমরা আস্ত একটা পরিবার শেষ কইরা দিছিলাম। ক্যান দিছিলাম? নিজেগো স্বার্থ হাসিল করার লাইগা। অথচ আইজ আমরা নিঃস্ব। নিজের মিহি চাইয়া দেহো, মুমিন। বউ, পোলাপাইন সব থাকার পরেও তুমি অচল। সুবহানের মতন অবস্থা হইছে তোমার। তাও তো সুবহানের শেষ কালে সেবা করার লাইগা বাপ ভক্ত একটা পোলা আছিলো। তোমার কী আছে? সবাই আমগো ঘৃণা করে। এমন কইরা চায় যেন আমরা নরকের কীট। শেষ বেলায় কিচ্ছু নাই। এইডাই কী আল্লাহর শাস্তি, মুমিন?”
মুমিনুল শাহ চুপ করে রইলেন। ফরিদা কতক্ষণ যে সেখানে বসে রইলেন হিসেব নেই। অন্যমনস্ক হয়ে বললেন,“নিজের যত্ন নিও, মুমিন। পাপের প্রায়শ্চিত্ত কইরো। পারলে নাজিরের কাছে মাফ চাইয়ো। ওর পাওনা সম্পদ ফেরত দিয়া দিও। তোমার বউয়ের কাছেও মাফ চাইয়ো। মাফ চাওয়ার মতো পাপ যদিও তুমি কর নাই। তবুও..”
“আমনে কই যাইবেন?”
“আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা শেষ। এই দুনিয়া আমার লাইগা আর না।”
“ভাবি!”
ফরিদা বসা থেকে উঠে গেলেন। দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। মাথায় কাপড় নেই, শাড়ির আঁচল মাটিতে গড়াচ্ছে। রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। নিজের ঘর, লকারের গহনা, আলমারির শাড়ি ছুঁয়ে দেখলেন একবার। শেষ সময়ে পারভেজের প্রতিবাদে বিথী আর সঙ্গে করে এসব নিয়ে যেতে পারেনি।
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো। মনে হয় পারভেজ এসেছে। ফরিদা ছুটে এসে ছেলের ঘরের সামনে দাঁড়ালেন। এত তাড়াতাড়ি দরজা আটকে দিয়েছে?বন্ধ দরজায় কড়া নাড়লেন,“পারভেজ আব্বা, তুই আইছোস?”
কেউ সাড়া দিলো না। ছেলেটা বদলে গিয়েছে। মায়ের ডাকে এখন আর সাড়া দেয় না। তিনি পুনরায় ডেকে বললেন,“ও আব্বা! খাইবা না?”
পারভেজ বিরক্ত হলো। ভেতর থেকেই চেঁচিয়ে বললো,“ডাকতে নিষেধ করছি না? তুমি মা নামের কলঙ্ক। তোমারে দেখতে মন চায় না।”
ফরিদার চোখে অশ্রু জমে না। মনে হয়, পাথর হয়ে গিয়েছেন! শান্ত কণ্ঠে বললেন,“মায়ের উপরে রাগ কইরা নিজেরে কহনো কষ্ট দেইস না, আব্বা। মায় যা করছে তগো ভালার লাইগাই তো করছে। সময় মতন খাইস, মনরে শক্ত করিস। বিয়াডা তো দিতে পারলাম না। তুই নিজের পছন্দ মতন করিস। তোর সুন্দর একটা সংসার হোক। বাপ, চাচাগো পথে হাঁটিস না। পারলে মায়রে মাফ কইরা দেইস।”
(ফলো- উপন্যাস)
তারপর হঠাৎ সব আওয়াজ থেমে গেলো। গোরস্থানের মতো নিস্তব্ধতা নেমে এলো শাহ বাড়িতে। মাটির কলস আর একটি দড়ি নিয়ে খালি পায়ে বারান্দা থেকে নেমে পড়লেন ফরিদা। শেষবারের মতো বাড়িটাকে একবার দেখে সমস্ত মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে এলেন। প্রথমে এসে দাঁড়ালেন পুব পাড়ার বট গাছের নিচে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সেদিকে।
আকাশে পূর্ণ চাঁদ আলো ছড়াচ্ছে। মানুষের সাড়া শব্দ নেই। দূরে কোথাও পেঁচা ডাকছে। অন্ধকারে ফরিদা ভয় পেলেও আজ পাচ্ছেন না। এটা অবশ্য ভয় পাওয়ার মতো সময় নয়। বটগাছ পেরিয়ে তিনি চলে এলেন বিলের ধারে। বানের জলে টুইটম্বুর বিল। ফরিদার মনে হলো, পানির স্রোত যেন তাকে ডাকছে। তাকে শুষে নেওয়ার জন্য ডাকছে। সেই ডাকে ফরিদা সাড়া দিলেন। গলায় কলস বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন অবাধ্য পানিতে। অথচ এই শেষবেলাও তিনি ফিরে আসার চেষ্টা করলেন না। রবের কাছে হাত তুলতেই ভুলে গেলেন, ভুলে গেলেন মাফ চাইতে।
বান্দার জন্য দুনিয়ার সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহ তায়ালার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। সে যখন ফিরে আসে তখনি আল্লাহ তায়ালা তাকে গ্ৰহণ করেন। কিন্তু পাপী ফরিদা ফিরলেন না। যৌবন থেকে শুরু করে যৌবনের শেষ সময়টুকুও হেলায়, পাপের মধ্য দিয়ে হারালেন।
চলবে_______

