#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১০
দুপুরের খাবার শেষ করে সকলে আদিবাসী গ্রামে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো ৷ অলি সকলকে নিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে হাঁটছে আর মাঝে মাঝে বিভিন্ন কথাবার্তা বলছে ৷ ওর কথাবার্তার মূল বিষয় হলো আদিবাসীদের জীবন বৈচিত্র্য ৷ তবে অলির মুখমন্ডল থমথম করছে ৷ কারনটা কি সেটা এখনও বোঝা যায়নি ৷ একটু পর হয়তো বোঝা যাবে ৷
পিকু বরাবরের মতো অলির সাথে সাথে যাচ্ছে ৷ এবার অবশ্য পিঠে চড়ে বসেনি ৷ ওর হাঁটতে মজা লাগছে ৷ বিল্টু মাহির সাথে মাথা নিচু করে হাঁটছে ৷ বিল্টুর দিকে নজর যেতেই পিকু অলির হাত ছেড়ে দিয়ে গুটিগুটি পায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল ৷ অতঃপর বলতে লাগল,,,
বিল্টু ভাইয়া চলো একসাথে যাই ৷
বিল্টু মাথা নিচু রেখেই বলল,,, নাহ ৷
এই যাবে না কেন?
বিল্টু জবাব দিল না ৷ পিকু এতে করে রেগে গেল ৷ ও বিল্টুর পেটে বেশ কয়েকটা চিমটি কাটল কিন্তু এতেও বিল্টুর কোনো ভাবান্তর হলো না ৷ শেষে ব্যর্থ হয়ে পিকু অলির কাছে ফিরে গেল ৷ ও অলির হাত ধরে মিনমিন গলায় বলতে লাগল,,,
বিল্টু ভাইয়া খুব খারাপ হয়ে গেছে ৷
অলির ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ ও চট জলদি বলতে লাগল,,, কেন? আবার কি করেছে ও?
আমার সাথে কথা বলে না ৷
অলির চিন্তিত মুখটা নরম হয়ে এলো ৷ ও সামান্য হেসে বলল,,,
তুমি আমার সাথে কথা বলো ৷ বিল্টু পচা ৷ ওর সাথে কথা বলতে যেও না ৷
পিকু মন খারাপ করে নিশ্চুপ হয়ে থাকল ৷ তবে সেটা অল্পক্ষণের জন্য ৷পরমুহূর্তে আশেপাশের জায়গাগুলো দেখে নানান প্রশ্ন করতে লাগল ৷ এই যেমন,
গাছটা ওমন বাকা হয়ে আছে কিভাবে? ওর কোমড় ব্যাথা করে না? পাখিটা আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? ওর কি লজ্জা নেই? আচ্ছা অলি ভাইয়া পাখিরা কি শোভন ভাইয়ার মতো পা*দু করে?
পিকুর এমন অদ্ভুত সব প্রশ্ন শুনে অলির মাথা আউলা হয়ে গেল ৷ ও বহুকষ্টে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে আর যেগুলোর উত্তর খুঁজে পায়নি সেগুলো প্রশ্ন শুনেও না শোনার ভান করে ছিল ৷ তবে অলি যে কয়টার উত্তর দিয়েছে সেগুলোও প্রশ্নের মতোই ইন্টারেস্টিং ৷ যেমন,
গাছ তার বউকে দেখার জন্য একটু বাকা হয়েছিল ৷ বউয়ের রুপ এতোই তীব্র ছিল যে সোজা হতে ভুলে গেছে ৷ যে সোজা হওয়ার কথা ভুলে যায় সে নিশ্চয়ই ব্যাথার কথাও ভুলে গেছে ৷ আরেকটার উত্তর হচ্ছে, মানুষের মধ্যে যেমন বেলজ্জা রয়েছে, পাখিদের মধ্যেও তেমন বেলজ্জা আছে ৷ এই পাখিটা মনে হয় বেলজ্জাদের বংশধর ৷
পিকু এরপরেও আরও অনেক প্রশ্ন করেছে ৷ কয়েকটার উত্তর অলি দিয়েছে আর কয়েকটা না শোনার ভান করে ছিল ৷ প্রশ্ন করার পর্ব আপাতত পিকু শেষ করেছে ৷ তবে বলা যায় না আবার কখন স্টার্ট হয়ে যায় ৷ তাই অলি পকেট থেকে কয়েকটা চকলেট বের করে পিকুকে খেতে দিয়েছে ৷ পিকুর মনোযোগ এখন চকলেট খাওয়ায় ৷
অলির মুখের থমথমে ভাবটা কিন্তু এখনও আছে ৷ পিকু খাওয়ার পাশাপাশি বারবার অলির দিকে তাকাচ্ছে ৷ অলিকে ওর অনেক ভালো লাগে তাই সবসময় তাকিয়ে থাকে ৷এই তাকানোর কারনে অলির থমথমে ভাবটা ওর নজরে আসল ৷ পিকু চকলেট খেতে খেতে বলল,,,
ভাইয়া তোমার মুখটা ওমন করে রেখেছে কেন? মনে হচ্ছে চারদিন থেকে হা**গু আটকে রেখেছো!
অলি থতমত খেয়ে গেল ৷ সাথে লজ্জাও খানিকটা পেয়েছে কারন ওর কান দুটো লাল হয়ে গেছে ৷ ও ইতস্তত করে বলতে লাগল,,,
আ-আ-আমি নিয়মিত প্রাকৃতিক কাজ শেষ করি ৷ তাই এসব কথা বলবে না পিকু ৷
পিকু খিকখিক করে হাসতে লাগল ৷ অলির অবস্থা দেখে ওর ভীষণ হাসি পাচ্ছে ৷ ওর হাসি চলতেই থাকল ৷ এরই মাঝে ওরা আদিবাসী গ্রামে প্রবেশ করল ৷ অলি সকলের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,,,,
সাজেকের সবচেয়ে বড় আদিবাসী গোষ্ঠী হচ্ছে লুসাই ৷ তারপর পাংখোয়া আর ত্রিপুরা ৷ আমরা সর্বপ্রথম লুসাইদের জীবন বৈচিত্র্য দেখব ৷ চলুন যাওয়া যাক ৷
অলি ওদের নিয়ে লুসাইদের বাসস্থানে গেল ৷ কয়েকজন অলিকে দেখতেই ছুটে এলো ৷ বারবার আসার কারনে ওর সাথে চেনা জানা হয়ে গেছে ৷ ওরা অলিকে যেমন হাসিমুখে গ্রহণ করল তেমন অলিও হাসিমুখে ওদের সাথে কথা বলতে লাগল ৷
অনন্যা দেখল কয়েকজন অদ্ভুত এক ভাষায় নিজেদের মাঝে কথা বলতেছে ৷ অলি একবার বলেছিল ওদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে ৷ যদিও ওরা বাংলাতেও কথা বলে ৷ তাই ভাষা নিয়ে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না ৷ একটা ছোট্ট আদিবাসী মেয়ে অনন্যার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে ৷
মেয়েটার পড়নে অনেক জাকজমকপূর্ণ পোশাক ৷ আদিবাসীদের পোশাক অনেক নজরকাড়া হয় বিশেষ করে নারীদের ৷ অনন্যা মুগ্ধ নয়নে সকলের দিকে তাকাতে লাগল ৷ ওদের কি সুন্দর করে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন ৷ অন্যরকম সৌন্দর্য খেলা করছে সকলের মুখবিবরে ৷
সেই মেয়েটা এখনও অনন্যার দিকে তাকিয়ে হাসছে ৷ অনন্যা মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল ৷ অতঃপর মিষ্টি করে হেসে বলল,,,
তোমার একটা ছবি তুলি কিউটি?
মেয়েটা হাসিমুখে সম্মতি জানাল ৷ অনন্যা ওর বেশ কয়েকটা ছবি তুলল ৷ মেয়েটাকে একটুও বিরক্ত বলে মনে হচ্ছে না বরং ও বেশ মজা পাচ্ছে বিষয়টাতে ৷ মেয়েটা হাতে ইশারা করে ওকে নিজের সাথীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ৷ অনন্যা সকলের সাথে পরিচিত হলো ৷ ওর খুব ভালো লাগছে এই জায়গাটা, এই মানুষগুলোকে ৷
সেই মেয়েটার সাথে অনন্যার বেশ খানিকটা ভাব হয়ে গেছে ৷ বাচ্চাটার নাম কাঁকাত হেনিনচিতা ৷ অনন্যা ওকে ছোট করে হেনিন বলে ডাকছে ৷ হেনিন ওকে নিয়ে অলির দিকে এগিয়ে গেল ৷ অলির সাথেও যে হেনিনের ভাব আছে সেটা একটু পরেই বোঝা গেল ৷ ওরা দুজন হেসে হেসে অনেকক্ষন গল্প করল ৷
অনন্যা বাকিদের ছবি, জায়গাগুলো সবকিছু নিজের ক্যামেরায় বন্দী করে ফেলল ৷ এমন সময় অলি ওর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল,,,
মানুষ আজকাল ন্যায় অন্যায় ভুলে যাচ্ছে ৷ মাফ না পাওয়া স্বত্ত্বেও কেমন গপাগপ ভাত খেল ছ্যাহ!
কথাটা ও হেনিনের সাথে বলতে বলতে গেলেও অনন্যাকে উদ্দেশ্য করেই বলেছে ৷ সেই বল ছোঁড়ার ঘটনা এখনও মনের মধ্যে পুষে রেখেছে অলি ৷ এবার বোঝা গেল অলির মুখের থমথমে ভাবের রহস্য ৷ ওর মাফের মূল্য না দিয়ে ভাত খাওয়ায় বেচারা কষ্ট পেয়েছে ৷
অনন্যা অবশ্য ওকে কোনোরুপ পাত্তা দিল না কারন ও সম্পূর্ণ নির্দোষ ৷ তাই ভাত না খেয়ে থাকার প্রশ্নই আসছে না ৷ যারা আসল দোষী তারা তো দাঁত কেলিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ৷বাবা মা আশেপাশে থাকায় ওরা আবারও ভদ্ররুপে ফিরে এসেছে ৷
হেনিন ওদের সাথে গিয়েও কথা বলল ৷ তবে অবাক করা একটা বিষয় ঘটে গেল ৷ শোভন হেনিনের দিকে তাকানোর পরপরই চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল ৷ হা হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ ভাইয়ের অবস্থা দেখে সানা হেনিনের সামনেই শোভনের গালে ঠাশ করে একটা চড় বসিয়ে দিল ৷ তবুও লাভ হলো না শোভনের চোখের পলক পড়ছে না ৷
হেনিন চোখ সরু করে একপলক শোভনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ওদের থেকে দূরে সরে গেল ৷ ও যেদিকে যাচ্ছে শোভনও মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় ওর পিছু পিছু যেতে ধরলে সানা ওর পা’ছায় একটা লা*ত্থি মা*রল যার দরুন শোভন উল্টে পড়ল ৷
এবার ওর হুশ ফিরেছে ৷ বোনের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে সর্বপ্রথম ও সানার গালে একটা চ*ড় বসাল ৷ তারপর কিছু একটা বলল যেটা অনন্যা শুনতে পেল না ৷ তবুও দৃশ্যটা বেশ উপভোগ্য ছিল অনন্যার কাছে ৷ ছবি তুলে রাখতে পারলে ভালো হতো কিন্তু ছবি তোলার কথা মনে ছিল না ৷
অনন্যা ধীরপায়ে ওদের দুজনের দিকে এগিয়ে গেল ৷ তারপর কিছু বলতে ধরেও কেন যেন বলতে পারল না ৷ থাক ওদের দুজনকে একটু একা ছেড়ে দেওয়া ভালো ৷ দু ভাইবোন ওর দিকে চকিতে তাকাল ৷ তবে অনন্যা কিছু না বলে ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ায় ওরাও কিছু বলল না ৷
শোভনের অবস্থার কথা ভেবে অনন্যা মুচুর মুচুর করে হাসতে লাগল ৷ হঠাৎ একটা পুরুষালী কন্ঠস্বর শুনে ও মাথা তুলে তাকাল ৷ অলি আবারও বলতে বলতে গেল,,,
দেশটা রসাতলে চলে গেছে! কিভাবে ভাত খেতে পারল? ছ্যাহ ছ্যাহ!
কথাটা বলতে বলতে অলি ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ৷ অনন্যা ভ্রু কুঁচকে ওর গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ অনেক কিছুই বলার ইচ্ছা হচ্ছিল কিন্তু শেষ মুহূর্তে অনন্যা বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল ৷ তবে আরেকবার কিছু বললে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ওর আছে ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
লুসাই সম্প্রদায়ের প্রধান খাবার ধান, ভুট্টা, মাছ আর মাংস ৷ তাছাড়াও ওদের বিভিন্ন আইটেমের খাবার রয়েছে যেগুলো শুধুমাত্র ওদের খাদ্যাভাস ৷ ঘুরে ঘুরে সবাই এসব দেখতে লাগল ৷ একটু পর ক্লান্ত হয়ে পড়লে ওরা সবাই এক জায়গায় বসে পড়ল ৷ আশেপাশে লুসাই সম্প্রদায়ের উৎসাহী কিছু মানুষও জড়ো হয়েছে ৷
সকলে গল্পগুজব করছে ৷ বিল্টু লোভীর মতো কিছু ফল খাচ্ছিল ৷ তা দেখে অলি ওর মাথায় চাটি মে*রে বলল,,,
আস্তে খা রে হালাকহাকরা ৷
খেতে দাও তো অলি ভাইয়া ৷ মা তো বাড়িতে আমাকে ডায়েট করায় ৷ এখানে অন্তত শান্তিমতো খেতে দাও ৷
মা যা বলে তাই করবি ৷ মা যদি বলে মশাকে চুমু খা তাহলে তুই মশাকে চুমু খাবি বুঝেছিস? পিঁপড়ার ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে বললে সেটাই করবি ৷ মায়ের অবাধ্য হওয়া ভালো কথা না ৷
ওর কথা শুনে সকলে হেসে ফেলল ৷ আলমগীর প্রামানিক কৌতূহল বশত বলে উঠলেন,,,
তোমরা আপন ভাই?
অলি তৎক্ষণাৎ বলল,,, নাহ ৷ ও আমার খোদেজা চাচীজানের ছেলে ৷
ও আচ্ছা ৷ তোমার মতো সন্তান পেয়ে তোমার বাবা মা নিশ্চয়ই গর্বিত ৷
সম্ভবত ৷
সম্ভবত কেন?
উনাদের গর্বিত করার সুযোগ পাইনি ৷ আমার বাবা মা মা’রা গেছেন সেই ছোটবেলায় ৷ যে দাদু আমাকে বড় করেছেন তিনিও আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন যখন আমার বয়স ১৩ ৷ তখন থেকে দুনিয়ার সবাই আমার আপনজন হয়ে গেছে ৷
কথাগুলো অলি হেসে হেসে বলল ৷ওর মুখের কোথাও ক’ষ্টের ছাপ নেই ৷ কিন্তু ওখানে উপস্থিত সকলের মুখ টা চুপসে গেল ৷ সবাই করুন চোখে অলির দিকে তাকাতে লাগল ৷ সবার এমন সহানুভূতি হয়তো অলির ভালো লাগছে না তাই ও আদিবাসী বাচ্চাদের সাথে গিয়ে গল্পস্বল্প করতে লাগল ৷
অনন্যা সেদিকে তাকিয়ে থাকল ৷এই প্রথমবার অলির জন্য ওর একটু খারাপ লাগল ৷ ছেলেটা নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে দিতে চায় না ৷ এমনভাবে হাসছে যেন ওর মতো সুখী মানুষ এই দুনিয়াতে নেই ৷
তবে অনন্যা বেশিক্ষণ অলির ব্যাপারে ভালো ধারনা ধরে রাখতে পারল না ৷ কারন অলি ওর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল,,,
হায় আল্লাহ এ কেমন দুনিয়া? মানুষের মনে তিল পরিমাণও নৈতিকতা বেঁচে নেই ছ্যাহ! এভাবে ভাত খেয়ে নিল?
কথাটা বলে ও অনন্যাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ৷ অনন্যা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল ৷ ও দাঁতে দাঁত চেপে বলতে লাগল,,,
ছাগলের লাদি! আমি দরকার পড়লে গামলায় গামলায় ভাত খাব তাতে আপনার কি?
চলবে,,,

