চাঁদের_হাসি #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ৯

0
17

#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৯

দূর থেকে কয়েকটা পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ ভেসে আসল ৷সেই আওয়াজের পাশাপাশি একজনের কান্নার আওয়াজ কানে বাজছে ৷ কান্নার মালিক আর কেউ নয়, সেটা হচ্ছে বিল্টু ৷ অলি ওকে একটা গাছের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে দিয়েছে ৷ বিল্টুর মাথা মাটির দিকে আর পা আকাশে ৷

অলি চুপচাপ কোমড়ে দু হাত দিয়ে ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ৷ বিল্টুর কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে ৷ এখানে অলি আর ও ছাড়া আর কেউ নেই ৷ অলি ঘাসের উপর বসে বলতে লাগল,,,,

কি রে বিল্টু বাবু প্রেম করবি না?

বিল্টু খুব জোরে কেঁদে উঠে বলল,,, নাহ ৷

আরে কর কর ৷ প্রেম করার কুরকুরি যখন উঠেছে তখন একটা প্রেম করেই ফেল ৷

বিল্টু হেঁচকি তুলে বলতে লাগল,,, ও অলি ভাইয়া ভুল হয়ে গেছে ৷ আসলে এতো মিষ্টি মেয়ে জীবনে দেখিনি তাই গলে গিয়েছিলাম ৷

হ্যাঁ হ্যাঁ গলে যাহ ৷ আমি তো মানা করিনি ৷ তোর প্রেম করার খবর আমি কুত্তা সংক্রান্ত আমার ভাইরালের মতো ভাইরাল করে দিব ৷ তুই তো সেলিব্রেটি হয়ে যাবি রে!

ভাইয়া তোমার পায়ে ধরসি দয়া করে আমাকে মাফ করে দাও ৷ তুমিও তো মাফ না নেওয়া পর্যন্ত ভাত খাও না তাহলে আমাকে মাফ করছো না কেন?

তোর বয়স কত রে? সেদিন আমার চোখের সামনে ফুটে বেরলি আর আজকেই প্রেম করতে চাস বদের হাড্ডি?

বিল্টুর কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে, চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে ৷ তবুও ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল,,,

তো ছোট বাচ্চা একটু ভুল করে ফেলেছে তাই বলে মাফ করবে না?

অলি বসা থেকে উঠে বলল,,, নতুন একটা অভিজ্ঞতা তৈরি কর বিল্টু ৷ উল্টো ঝুলে দেখ পৃথিবীটা দেখতে কেমন লাগে ওকে?

কথাটা বলে অলি জায়গা প্রস্থান করল ৷ উপজাতি দের জীবন বৈচিত্র্য দেখতে যাওয়ার কথা দুপুরের খাবারের পর ৷ এখনও অনেক সময় বাকি আছে তাই অলি বিল্টুকে একটা আচ্ছা মতো শিক্ষা দিতে চাচ্ছে ৷ আপাতত ও আশেপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করবে ৷ তারপর বিল্টুকে সোজা দুনিয়া দেখাবে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

অনন্যা আর পিকু মুখোমুখি বসে আছে ৷ অনেকক্ষন থেকে ওরা এভাবেই নিশ্চুপ বসে আছে ৷ পিকুর চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে ৷ অনন্যা সেই অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,,,

এসব কি পিকু?

পিকু ঠোঁট উল্টে বলল,,, রোবট আপু আমি কিছু করি নি ৷ বিল্টু ভাইয়াই আমার সাথে প্রেম করতে চেয়েছিল ৷

বুঝলাম ৷

পিকু চোখের পানি মুছে বলতে লাগল,,, না তুমি বোঝোনি ৷ তুমি এখন আমাকে মা**রবে ৷

আশ্চর্য! তোমাকে মা**রব কেন?

হ্যাঁ আমি জানি ৷

ভুল জানো ৷ আমি তোমাকে কিছু করব না ৷ তবে একটা কথা বলতে চাই ৷ শুনবে?

পিকু মাথা উপর নিচ করে হ্যাঁ বোঝাল ৷ অনন্যা পিকুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,,,

এটা নিশ্চয়ই খারাপ হয়েছে ৷ তোমার বিল্টু ভাইয়া ভুল করেছে ৷ দ্বিতীয়বার কেউ এমন কথা বললে তৎক্ষণাৎ তোমার আব্বু আম্মুর কাছে গিয়ে সব বলে দিবে ঠিক আছে?

হু ঠিক আছে ৷ এটাও বলব?

থাক এটা বলা লাগবে না ৷ আমি আর তোমার অলি ভাইয়া যেহেতু জেনে গেছি সেহেতু বাকিদের সেটা বলার দরকার নেই ৷

আচ্ছা ৷

অনন্যা পিকুর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,,, হয়েছে কাঁদতে হবে না ৷ তুমি এখন তোমার আব্বু আম্মুর কাছে যাও ৷

পিকু মাথা হেলিয়ে জায়গা প্রস্থান করল ৷ ও চলে যেতেই অনন্যা আশেপাশে তাকাল ৷ কেউ নেই ৷ তাই ও মন খুলে হাসতে লাগল ৷ ওর কি যে হাসি পাচ্ছে বলার মতো না ৷ বেশ কিছুক্ষণ হাসল ও ৷ তারপর উঠে দাঁড়াল আলমগীর প্রামানিকের খোঁজ নেওয়ার জন্য ৷

রিসোর্টের রুমে প্রবেশ করতেই দেখল পিকু আলমগীর প্রামানিকের পেটের উপর বসে খিলখিল করে হাসছে আর সাদা দাঁড়িগুলো টানছে ৷ অনন্যা মুচকি হেসে ভিতরে প্রবেশ করল ৷ এই পিচ্চি মুহূর্তের মধ্যেই কান্না ভুলে গেছে ৷ আবারও আগের মতো দুষ্টুমি করা শুরু করে দিয়েছে ৷

অনন্যা ওদের সামনে গিয়ে বলল,, কি ব্যাপার পিকু তোমাকে না বললাম তোমার আব্বু আম্মুর কাছে যেতে?

পিকু মুখ ভেংচি কেটে বলল,,, কেন যাব? পটল দাদু অনেক মজাদার ৷ আমি তার ভাতের মতো সাদা দাঁড়ি নিয়ে খেলব ৷ তুমি ভাগো!

অনন্যা হেসে ফেলল ৷ পর মুহূর্তে কাটকাট গলায় বলল,,, এই যে বুড়ো তুমি দেখছি আমাকে ভুলেই গেছো! তোমাকে আর মায়ের চেয়ে চু*রি করে করে মিষ্টি খাওয়াতে পারব না ৷

আলমগীর প্রামানিক নাতনির কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না বরং আগের মতোই পিকুর সাথে দুষ্টুমিতে মেতে উঠল ৷ এমন ইগনোর পেয়ে অনন্যা হতাশ শ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল ৷ রুমের ভিতর থেকে আলমগীর প্রামানিক আর পিকুর খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ ভেসে আসছে ৷ অনন্যা মুচকি হেসে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল ৷

হাঁটতে হাঁটতে এবার শোভন আর সানার সাক্ষাৎ পাওয়া গেল ৷ ওরা এবার থাবড়াথাবড়ি শুরু করেছে ৷ একের পর এক থা*প্পড় পটপট করে ওদের গালে পড়ছে ৷ তবে বিন্দুমাত্র ব্যাথা পাওয়ার ছাপ ওদের মুখ মন্ডলে নেই ৷ অনন্যার মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি চলে আসল ৷ ও দৌঁড়ে গিয়ে রুম থেকে নিজের ক্যামেরা টা নিয়ে আসল ৷

ওদের থাবড়াথাবড়ির পর্ব এখনও চলছে ৷ অনন্যা সেই সুযোগে পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল ৷ এই রুপ দেখার অধিকার ওদের বাবা মায়ের আছে ৷ অনন্যার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল ৷ অনেক দিন পর নিজের মধ্যে এমন একটা রুপ খুঁজে পেল ও ৷

সেই ছোটবেলায় হুট করে চোখের সমস্যা টা শুরু হলে নানা কথা ওর কানে আসত ৷ প্রথমে সেসব না বুঝলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে বুঝতে লাগল এবং ওর চঞ্চল ভাবও হারিয়ে যেতে লাগল ৷ একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল ও ৷ কারো সাথে খুব বেশি কথা বলত না ৷ তবে এই ভ্রমণে এসে হুট করেই নিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখা সেই চঞ্চল ভাবটা আত্মপ্রকাশ করতে চাচ্ছে ৷

যাক সে কথা ৷ অনন্যা ক্যামেরা নিজের পিছনে লুকিয়ে রেখে ধীরপায়ে ওদের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ৷ এবার আর থাবড়াথাবড়ি চলছে না ৷ এখন চলছে ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি ৷ অনন্যা এদের দুজনকে যত দেখে তত হতভম্ভ হয়ে যায় ৷ এদের শরীর কি দিয়ে তৈরি? ও বলেই ফেলল,,,

তোমরা আদৌ মানুষ?

ক্ষণিকের জন্য নিজেদের কাজ বন্ধ রেখে শোভন আর সানা চকিতে অনন্যার দিকে তাকাল ৷অনন্যার কুঞ্চিত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে ওরা দুজন হেসে ফেলল ৷ সেই হাসিমাখা মুখেই ওরা সমস্বরে বলল,,,

আমাদের বাবা মা যেহেতু মানুষ সেহেতু আমরাও হয়তো মানুষ ৷

অনন্যা কিছু না বলে শুধু দেখেই চলল ওদের দিকে ৷ একটু পর শোভন বলল,,,

আমাদের সাথে খেলবে আপু?

অনন্যা হতভম্ভ চোখে ওর দিকে তাকাল ৷ শোভনের পরপর সানা বলে উঠল,,,

দেখে মনে হচ্ছে খেলবে ভাই ৷ চল খেলি ৷

অনন্যা অবাক হওয়ারও সময় পেল না ৷ তার আগেই সানা ওর মুখের দিকে পানি দিয়ে ভরা একটা ছোট বল ছুঁড়ে মা*রল ৷ বলটা পড়ার সাথে সাথেই সেটা ফেটে গিয়ে অনন্যার মুখটা পানি দিয়ে ভিজে গেল ৷ অনন্যা হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ ওর পুরো বিষয়টা এখনও হজম হয়নি ৷

হজম হওয়ার আগেই আরেকটা বল ওর মুখের উপর পড়ল ৷ না এবার আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না ৷ পাশ থেকে নিজে বল নিয়ে অনন্যা ওদের দুজনের দিকে ছুঁড়ে মা*রল ৷ তার আগে নিজের ক্যামেরা টা নির্দিষ্ট একটা জায়গায় রেখে আসল ৷

এভাবে অনেকক্ষণ বল ছোঁড়াছুঁড়ি চলল ৷ তিনজনই ভিজে গেছে ৷ অনন্যা জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলল,,,

তোমরা তো নিজেদের এই ভ*য়ঙ্কর খেলায় কাউকে নেও না তাহলে আজ এমন করলে কেন?

শোভন আর সানা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বাকা হাসল ৷ অতঃপর হাই তুলে একই সাথে বলল,,,

কে যেন আমাদের এই রুপের ছবি তুলছিল!

অনন্যার চোখ বড় বড় হয়ে গেল ৷ এরা দুই ভাইবোন এতোটা চালাক সেটা ও ভাবতেই পারেনি ৷ তৎক্ষণাৎ ও ছুটে গিয়ে ক্যামেরা চেক করল ৷ ও তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওদের দুজনের ছবি কয়টা খুঁজে পেল না ৷ ওর অবস্থা দেখে সানা মুচকি হেসে বলল,,,

লাভ নেই ৷ তোমাকে বল ছোঁড়াছুঁড়িতে ব্যস্ত রেখে এক পর্যায়ে শোভন গিয়ে ছবিগুলো গায়েব করে দিয়েছে ৷

অনন্যা আহাম্মক হয়ে বলল,,, তোমরা তো দারুন বি*চ্ছু!

এখনও তো কিছুই দেখলে না ৷ আমরা আরো বেশি বি*চ্ছু!

অনন্যা এবারও প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ পেল না তার আগেই ওর মুখে পরপর দুই তিনটা বল পড়ল ৷ পাল্টা জবাব দেওয়ার সুযোগ ই পাচ্ছে না অনন্যা ৷ রীতিমত থতমত অবস্থা হয়ে গেল ওর ৷ তবে হুট করে শোভন আর সানা থেমে গেল যদিও ওদের হাতে এখনও বল রয়েছে ৷

অনন্যা ওদের থেমে যাওয়ায় অবাক হলেও দু হাত ভর্তি করে কয়েকটা বল নিল ৷ ও ছুঁড়তে যাবে তার আগেই শোভন আর সানা বাকা হেসে সমস্বরে বলল,,,

আপু এবার ঠ্যালা সামলাও ৷

বলেই ওরা দুজন অনন্যাকে বল না ছুঁড়ে পিছু ঘুরে একজনকে উদ্দেশ্য করে বল ছুঁড়ল ৷ অতঃপর হুট করে দুজনে লুকিয়ে পড়ল ৷ অনন্যা হতভম্ভ চোখে সামনের ব্যক্তিটার দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ অলি দু হাত উচিয়ে নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ বল ফেটে গিয়ে ওর বুকের কাছের টিশার্ট টা ভিজে গেছে ৷

অলি নিজের হতভম্ভতা কাটিয়ে সামনে তাকাল ৷ অনন্যা থতমত মুখে বল হাতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে ৷ অলি অনন্যার হাতের বলগুলোর দিকে তাকাতেই অনন্যা সেগুলো তৎক্ষণাৎ নিচে ফেলে দিল ৷ ও মনে মনে বলল,,,

এভাবে ফাঁসিয়ে দিয়ে গেল বি*চ্ছু দুটো!

অলি অনন্যার দিকে খানিকটা এগিয়ে এসে গলা খাকারি দিল ৷ পরপর দুই তিনবার গলা খাকারি দিয়ে ও বলে উঠল,,,

আপনার নিশানা অনেক সুন্দর ৷ যাক গে আপনার থেকে আমার একটা মাফ পাওনা রইল ৷ তবে আমি দিব না ৷ আপনি এক বেলা ভাত না খেয়ে থাকবেন তারপর মাফ করব ৷

গড়গড় করে অনন্যাকে কথাগুলো বলা শেষ করে ও ফাটা বলটার দিকে এগিয়ে গেল ৷ তারপর সেটা হাতে তুলে নিয়ে নরম গলায় বলল,,,

আমার বুকে লেগে তোর অনেক ব্যাথা লেগেছে তাই না? মাফ করে দিস ভাই!

চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here