চাঁদের_হাসি #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ১২

0
20

#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১২

দূর থেকে একটা পাখি ডেকে উঠল ৷ সেই পাখির ডাকে অলি চমকে উঠল ৷ ও এখনও শোভন আর সানার সাথে বসে আছে ৷ অলি ফ্যালফ্যাল করে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে মিনমিন গলায় বলল,,,

সত্যি? মিথ্যা বলছো না তো?

শোভন কাটকাট গলায় বলল,,, বং মানে গরু হলে বল ছোঁড়ার কাহিনী টাও সত্যি ৷

অলি মাথায় হাত দিয়ে বলল,,, তাহলে তো সত্যি!

শোভনের মনে ক্ষীণ আশা জন্মেছিল যে হয়তো অলি ওকে ক্ষ্যাপানোর জন্য মিথ্যা বলেছে ৷ বং এর মানে ভালোবাসা রিলেটেড কিছুই হবে ৷ কিন্তু অলি ওর সমস্ত আশায় পানি ঢেলে দিল ৷ ও নিজেও অলির পাশে গালে হাত দিয়ে বসে পড়ল ৷ দুজনে অসহায় মুখে একদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ তবে এই দুই ডিপ্রেসড মানুষের মাঝে সানা ছিল সম্পূর্ণ উৎফুল্ল ৷

ও তখন থেকেই হেসে চলেছে ৷ এতো মজা মনে হয় জীবনে কোনোদিন পায়নি ৷ ও হাসতে হাসতে বলতে লাগল,,,

এতো ফান কাভি নেহি পায়িং ৷

অলি আর শোভন একই সাথে সানার দিকে তাকাল ৷ পর মুহূর্তে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে গেল ৷ বেশ কিছুক্ষণ ওদের সাথে বসে একা একা হাসার পর সানা বসা থেকে উঠে পড়ল ৷ এদের দুজনের সামনে থাকলে ও হাসতে হাসতেই ম**রে যেতে পারে ৷

সানা ঘুরে ঘুরে আশেপাশের জায়গা দেখতে লাগল ৷ আদিবাসীদের গায়ের পোশাকগুলো অনেক রঙিন আর আকর্ষণীয় ৷ ওদেরকে বেশ মানিয়েছে পোশাকগুলো ৷ ও যখন এসব দেখতে ব্যস্ত তখন মাহি ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল,,,

এই যে বাচ্চা অলিকে দেখেছো?

সানা কপাল কুঁচকে মাহির আপাদমস্তক একপলক দেখল ৷ অতঃপর কঠিন গলায় বলল,,,

আমি বাচ্চা না ৷ আমার বয়স পনের, ক্লাস নাইনে পড়ি ৷

মাহি মিথ্যা ভয় পাওয়ার অভিনয় করে বলল,,, ভীষণ ভুল হয়ে গেছে ৷ দয়া করে যদি একটু মাফ করে দিতেন বড় বাচ্চা ৷

সানার কপাল আরো কুঁচকে গেল ৷ তা দেখে মাহি চট জলদি টপিক চেঞ্জ করে বলল,,,

অলি কোথায় জানো?

ম*রার মতো এক জায়গায় বসে আছে ৷ খুঁজলেই পাবেন ৷

কথাটা গম্ভীর মুখে বলার পরপরই সানা ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ৷ ওর ভীষণ রাগ লাগছে ৷ কেউ ওকে বাচ্চা বললেই ওর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় ৷ টিনেজ মেয়েরা নিজেদের সবসময় বড় দেখানোর চেষ্টা করে ৷ নিজের বয়সের থেকে খানিকটা বড় বড় আচরণ করে ৷ সানার মধ্যেও সেই জিনিসটা প্রকট ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

অনন্যা এতোক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল ৷ হঠাৎ ক্লান্ত লাগছে ওর ৷ শোভন আর সানার অস্বাভাবিক আচরণ না দেখতে পেয়ে ওর ভালো লাগছে না ৷ দুজনের মা*রামারি না দেখলে ওর যে এতো খারাপ লাগবে সেটা ও ভাবতেই পারেনি ৷ অবশ্য অলির জন্য ওর মন টা বেশি করে ত্যক্ত হয়ে আছে ৷ তাই সবকিছুই অসহ্য লাগছে ৷

সকাল থেকে ভালো কিছু ঘটেনি ৷ঘটার মধ্যে হেনিনের সাথে সাক্ষাৎ ই একটু আনন্দদায়ক ছিল ৷এতো সুন্দর একটা পরিবেশে মুখ গোমড়া করে থাকতে ভালো লাগছে না ওর ৷ তাই আশেপাশে একটু ঘোরার ইচ্ছা হলো ৷ আলমগীর প্রামানিক কে আদিবাসী গ্রামে আসার পর থেকে আর দেখেনি অনন্যা ৷ ও দাঁতে দাঁত চেপে বিরবির করে বলতে লাগল,,,

এই বুড়ো না জানি কোথায় গিয়েছে! একবার শুধু দেখা পাই তারপর মজা দেখাব!

কিছুদূর যেতেই অনন্যা নিজের দাদুর সাক্ষাৎ পেল ৷ উনি এক আদিবাসী মানুষের সাথে কুস্তি খেলছেন ৷ গায়ে শক্তি না থাকলেও বেশ উৎসাহের সাথে কুস্তি খেলছেন উনি ৷ অবশ্য ক্ষণে ক্ষণে উল্টে পড়তে হচ্ছে উনাকে ৷ তবে ব্যাপার না ৷

অনন্যার ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ এই বুড়োকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না! কখন মাথায় কোন পোকা কিলবিল করতে থাকে সেটা কেউ বলতে পারে না ৷ ও একটু এগিয়ে গিয়ে বলল,,,

এই বুড়ো কুস্তি করার মতো শক্তি তোমার আছে?

আলমগীর প্রামানিক এক ঝলক নাতনির দিকে তাকিয়ে মুখ সরিয়ে নিয়ে বললেন,,,

আমার শক্তি সম্পর্কে তোর কোনো ধারনা নেই ৷ আমি যে কতটা সামর্থ্যবান পুরুষ সেটা আজ বুঝিয়ে দিব লালকুমারী ৷

হ্যাঁ তা তো দেখতেই পারছি ৷ তোমার এতোই শক্তি যে বারবার মাটির সাথে গড়াগড়ি খেতে হচ্ছে!

অনন্যা সেখান থেকে চলে আসল ৷ ওর দাদুকে ও বেশ ভালো করেই চেনে ৷ একবার যেটা করতে ব্যস্ত হয়ে যায় সেটা থেকে লাখ টাকা অফার করেও উনাকে ফিরিয়ে আনা যায় না ৷ দাদুর কথা বাদ দিয়ে ও ক্যামেরা বের করে জায়গাটার ছবি তুলতে লাগল ৷ হঠাৎ দেখল বিল্টুকে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছে আর ওকে নানাভাবে বিরক্ত করে চলেছে ৷

দৃশ্যটা দেখে অনন্যার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ৷ ও জলদি সেদিকে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,,,

এখানে কি হচ্ছে?

যে বাচ্চাগুলো এতোক্ষণ হাসছিল তারা তৎক্ষণাৎ চমকে উঠে পিছু ঘুরে তাকাল ৷ অনন্যা দ্বিগুণ গম্ভীর গলায় বলল,,,

ওকে ছেড়ে দাও ৷

বিল্টু কাঁদতেছে ৷ কাঁদার ই কথা যেভাবে বিরক্ত করছিল! অনন্যা ওকে নিজের কাছে নিয়ে এসে রাগত স্বরে বলতে লাগল,,,

ওর সাথে এমন আচরণ করছিলে কেন? আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি ৷ তোমাদের খারাপ আচরণ দেখতে আসিনি ৷

বাচ্চাগুলো বলল,,, আমরা তো একটু মজা করছিলাম ৷

এটাকে মজা বলে? তোমাদের কাছে যেটা মজা মনে হচ্ছে সেটা অন্যদের কাছে য**ন্ত্রণাদায়কও হতে পারে তাই সাবধান ৷

কথাগুলো বলে অনন্যা বিল্টুকে নিয়ে অন্য জায়গায় যেতে লাগল ৷ তারপর একটা গাছের তলায় গিয়ে বসে পড়ল ৷ বিল্টু এখনও কেঁদে চলেছে ৷ অনন্যা ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলল,,,

কেঁদো না ৷ ওরা আর কিছু করবে না তোমাকে ৷

বিল্টু চোখের পানি মুছল ৷ অনন্যা পুনরায় বলতে লাগল,,,

তুমি একা কি করছিলে? তোমার অলি আর মাহি ভাইয়া কোথায়?

বিল্টু অস্ফুট স্বরে বলল,,, জানি না ৷ আমি ভাইয়াদের খুঁজে পাচ্ছি না ৷ ওই ছেলেগুলোর কাছে জিজ্ঞাসা করায় ওরা আমার সাথে ওসব করা শুরু করেছিল ৷

বলে ও আবারও কাঁদতে লাগল ৷ তা দেখে অনন্যা ব্যস্ত গলায় বলতে লাগল,,,

আহা হয়েছে কাঁদতে হবে না ৷ আমি তোমাকে উনাদের কাছে দিয়ে আসছি ৷ চলো ৷

অনন্যা বিল্টুকে নিয়ে অলিকে খুঁজতে লাগল ৷ কিছু দূর যেতেই দেখল অলি শোভনের সাথে গালে হাত দিয়ে বসে আছে ৷ ও দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল ৷ অলি অন্যমনস্ক হয়ে বসেছিল ৷ হঠাৎ কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ও মাথা তুলে তাকাল ৷ বিল্টুর দিকে চোখ যেতেই ও তৎক্ষণাৎ বসা থেকে উঠে পড়ল ৷ ব্যস্ত গলায় বলতে লাগল,,,

কি হয়েছে বিল্টু? কাঁদছিস কেন?

অলিকে দেখে বিল্টুর কান্না বেড়ে গেল ৷ ও দৌঁড়ে গিয়ে অলিকে জড়িয়ে ধরল ৷ এতে করে অলি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল ৷ ও বলতে লাগল,,,

বল না কি জন্য কাঁদছিস?

বিল্টুর হয়ে অনন্যা বলতে লাগল,,, কিছু বাচ্চা ছেলে ওকে বিরক্ত করছিল ৷

অলি চিন্তিত মুখেই অনন্যার দিকে তাকাল ৷ অনন্যা কাটকাট গলায় বলল,,,

একটা বাচ্চার দায়িত্ব আপনার উপর ৷ আপনি এভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো একটা কাজ করলেন কিভাবে?

অলি আসলেই লজ্জিত নিজের কান্ডে ৷ ও বিল্টুকে নিজের থেকে আলাদা করে ওর সামনে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল ৷ তারপর ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে নরম গলায় বলতে লাগল,,,

কাঁদিস না ভাই ৷ আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি ৷ মাফ করে দিবি না? শেষবারের মতো মাফ করে দে ৷

বিল্টু ক্রন্দনরত কন্ঠে বলতে লাগল,,মাফ করে দিলাম ৷

বিল্টু জানে মাফ না করলে অলি আবারও ভাত খাওয়া বন্ধ করে দিবে ৷ তাই যত তাড়াতাড়ি মাফ করে দেওয়া যায় ততই ভালো ৷ অলি বিল্টুকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,,,

শুকনো গলায় মাফ নিব না আমি ৷ তোকে আজ আদিবাসীদের বাজারে নিয়ে গিয়ে অনেক কিছু কিনে দিব ঠিক আছে?

বিল্টু অলির কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে থাকল ৷ ওর মন ভালো করার জন্য অলি বলতে লাগল,,,

এই বিল্টু নট ডু এনি ইটিশপিটিশিং ৷ আমার কাঁধে কি করতে চাচ্ছিস? তুই আমার রামছাগল দুটোর মতো নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছিস!

বিল্টু হেসে ফেলল ৷হাসিমাখা গলায় ও বলতে লাগল,, ইংরেজি না জানলে ইংরেজি বলো কেন অলি ভাইয়া?

আমার মতো ইংরেজি কেউ জানে না ৷ আমি ওই ব্রিটিশদের বানানো ইংলিশ হোয়াই বলব? আমি আমার বানানো ইংলিশ বলব ৷

আচ্ছা আমার থেকে ইংলিশে মাফ চাও ৷

অলি গলা খাকারি দিয়ে বলল,,, আই নিড একটা জিনিস ফ্রম তোর থেকে ৷ দ্যাট জিনিস ইজ মাফ ৷ সো গিভ মাফ আমাকে ৷

ওর ভুলভাল ইংরেজি শুনে বিল্টু হাসতে লাগল ৷ ওর কথায় গরু উপাধি পেয়ে মনে মনে হার্ট এ’ট্যাক করা শোভনও হাসতে লাগল ৷ অলি এমন আরও ভুলভাল ইংরেজি বলে বিল্টুর মন ভালো করে দিতে লাগল ৷ সেই দৃশ্য অনন্যা তখন থেকে দেখে চলেছে ৷ এই প্রথমবার ছেলেটাকে ওর কাছে ভালো মনে হলো ৷ অলি আর যাই করুক না কেন সকলকে মন থেকেই স্নেহ করে ৷ সেই স্নেহে কোনোরুপ ভান নেই ৷

অনন্যার মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠল ৷ ও আরও কিছুক্ষণ সামনে হাসতে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকে জায়গা প্রস্থান করল ৷ অলি বিল্টুকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সেটা খেয়াল করল না ৷ ওর এখন একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে বিল্টুকে অপরিচিত জায়গায় একা ছাড়ার মতো মারাত্মক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করা ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

অলি আবার সকলকে এক জায়গায় সমবেত করল ৷ কিছু জরুরি কথা বলার আছে ৷ সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে ও বলতে লাগল,,,

আপনারা কি আদিবাসীদের বানানো জিনিসপত্রগুলো কেনাকাটা করার পরই চলে যাবেন নাকি রাতের বেলা ওদের নিজস্ব উৎসব দেখে তবেই যাবেন?

সকলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে লাগল ৷ কয়েকজন ফিরে যাওয়ার কথা বলতে লাগল ৷ অলি তাদেরকে আশ্বস্ত করে বলতে লাগল,,,

সমস্যা নেই ৷ আমি আপনাদের সাবধানে রিসোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসব ৷ তার আগে কেনাকাটা করতে চাইলে করতে পারেন ৷

অলি সকলকে নিয়ে আদিবাসীদের বাজারে চলে গেল ৷ ওখানে আদিবাসীদের বানানো বিভিন্ন আকর্ষণীয় জিনিসপত্র রয়েছে ৷ অলি নিজের কথামতো বিল্টুকে অনেককিছু কিনে দিল ৷ বিল্টুর মন একদম ভালো হয়ে গেছে ৷ ও এখন অনেক খুশি ৷

শোভন ঝিনুকের তৈরি একটা মালা কিনল ৷ মালা টা ওর ভীষণ পছন্দ হয়েছে ৷ সানা হাস্যজ্জ্বল মুখে ওর দিকে এগিয়ে এসে গদগদ গলায় বলল,,,

আমার জন্য কিনেছিস তাই না ভাই?

শোভনের হাসিহাসি মুখটা হাসিশুণ্য হয়ে গেল ৷ ও বোনের গালে একটা থা*প্পড় মে*রে বলল,,,

আমার সময় এতো খারাপ যাচ্ছে না যে তোর জন্য মালা কিনতে যাব আমি! যা ভাগ ৷

সানা গালে হাত দিয়ে হতভম্ভ হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ শোভন মালাটার দিকে তাকিয়ে লাজুক হেসে বলতে লাগল,,,

এটা আমার চিতার জন্য ৷

সানা এক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে শোভনের গালে ঠাটিয়ে একটা চ*ড় মে*রে বলল,,,

গরুর সাথে চিতার একদম যায় না রে হাদা! তুই খাবি ঘাস আর চিতা খাবে তোর গোশত! তখন অলি ভাইয়ার মতো বলিস নট খাইয়িং মাই গোশত চিতা ডার্লিং ৷

চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here