চাঁদের_হাসি #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ৩

0
28

#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৩

সব বন্দোবস্ত হয়ে গেছে ৷ অনন্যা ব্যাগপত্র আগেই গুছিয়ে রেখেছে ৷ এবার শুধু নিজে তৈরি হওয়া বাকি ৷ ওর সাজা বলতে একটা বোরকা আর হিজাব পড়বে ৷ আলমগীর প্রামানিক গলা উচিয়ে বললেন,,,

লালকুমারী হয়েছে তোমার?

অনন্যা ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল,, জ্বি দাদু ৷

আলমগীর প্রামানিক নিজের নাতনিকে ভালোবেসে লালকুমারী বলে ডাকেন ৷ কারন অনন্যা বেশি হাসলে ওর গালদুটো লালচে হয়ে যায় ৷ অনন্যা চলে আসতেই ওর বাবা বলতে লাগল,,,

জলদি চলো মামনি ৷ ৮ টায় বাস ৷ দেরি করা যাবে না ৷

অনন্যা নিজের মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বাবা আর দাদুর সাথে বাস অভিমুখে রওয়ানা হলো ৷ ওদের মূল গন্তব্য সাজেক ভ্যালি ৷সাজেক ভ্যালি মূলত রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে সাজেক ভ্যালিতে যাতায়াত সুবিধাজনক ৷ তাই ওরা ৮ টার শান্তি পরিবহন বাসে চড়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল ৷ আপন প্রামানিক মেয়ে আর বাবা কে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন ৷

জানালার সাথের সিটে অনন্যা বসেছে ৷ ওর দৃষ্টি জানালা গলিয়ে বাইরের দিকে ৷ প্রকৃতি, আকাশ এসব দেখতে ওর বরাবরই প্রচন্ড ভালো লাগে ৷ তাছাড়া খাগড়াছড়ি যেতে যেতে ১১ টা ৪৫ বেজে যাওয়ার কথা ৷ তাই এতো সময় প্রকৃতি দেখতে খুব একটা খারাপ লাগার কথা না ৷

দেখতে দেখতে সময় চলে গেল ৷ ওরা খাগড়াছড়িতে পৌঁছে গেছে ৷ আজ রিসোর্টে বিশ্রাম নিবে ৷ ঘোরাঘুরি শুরু হবে কাল ৷ আলমগীর প্রামানিক নাতনিকে নিয়ে মেঘপুঞ্জি রিসোর্টের দিকে চলে গেলেন ৷ সেখানে দুটো রুম ভাড়া নিয়ে বিশ্রামের জন্য চলে গেলেন ৷ অনন্যা রুমে গিয়ে বোরকা খুলে ফ্রেশ হয়ে নিল ৷ তারপর আবারও প্রকৃতি দেখার প্রতি মনোযোগী হয়ে গেল ৷ নামের মতোই রিসোর্ট টা সুন্দর আর মনোরম ৷ একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

ছাগলের ম্যা ম্যা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ৷ অলি কিছু কচি ঘাস নিয়ে গিয়ে ওদের সম্মুখে রেখে দিল আর স্ট্রিট অভিভাবকদের মতো বলতে লাগল,,,

দেখুন মহাজন আজ কিন্তু বাইরে নিয়ে যাব না ৷ কারন মনজু চাচার ছাগল দুটো আজ বাইরে ঘাস খাচ্ছে ৷ আমি কোনো রিস্ক নিতে রাজি না ৷ তবে সমস্যা নেই ম্যাডাম আপনাকে আমি বাইরে নিয়ে যাব ৷বান্ধবীদের সাথে গিয়ে ভাব করুন আর নিজের ভাইদের থেকে ওদের দূরে থাকার সৎ পরামর্শ দিন ৷

ওর কথাগুলো আদৌ ছাগলগুলো বুঝল কিনা বোঝা গেল না ৷ তবে অলি নিজের কথামতো শুধু মেয়ে ছাগলটাকে নিয়ে ঘাসের মাঝে ছেড়ে দিল ৷ আর ছেলে ছাগল দুটো জুলজুল চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকল ৷ অলি ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে না ইশারা করল ৷ এমন সময় বিল্টু দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ওর কাছে চলে আসল ৷ এসে আগে কয়েক দফা শ্বাস নিল ৷ টানা দৌঁড়ানোর কারনে বেচারার দম আটকে যাওয়ার উপক্রম ৷ ওর অবস্থা দেখে অলি বলতে লাগল,,,

এভাবে দৌঁড়াতে কে বলেছিল? তোর বউকে খুঁজে পেয়েছিস নাকি?

বিল্টু নিজেকে সামলে নিয়েছে ইতোমধ্যে ৷ ও চোখমুখ কুঁচকে বলতে লাগল,,,

দূর কি যে বলো! তোমার মাথায় সবসময় দেখি বউ ঘোরে!

অলি মুখে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে বলল,,,জীবনে বউই তো আসল রে পাগলা ৷

তাহলে লিলি আপুর সাথে কথা বলতে চাও না কেন? লিলি আপু তো মনে হয় তোমার বউ হওয়ার জন্য আগ্রহী ৷

অলি হাসি খানিকটা বন্ধ করে বিল্টুর মাথায় চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,,,

এসব তুই বুঝবি না ৷ বউকে দেখলে যেমন মনের ভিতর উথাল পাতাল অনুভূতি হওয়া দরকার সেটা লিলিকে দেখলে হয় না ৷ ও আমার বোনের মতো , বউ না ৷

কি জানি বাপু! বড় মানুষের শুধু মাথামুন্ডুহীন কথাবার্তা ৷ আমার ছোট মাথায় ওসব ঢুকতে চায় না ৷

অলি হাসি অব্যাহত রেখে বলল,, বাদ দে ৷ এখন বল কি জন্য ছুটতে ছুটতে আমার কাছে আসলি?

তোমার প্রাণের সখা, মাহি ভাইয়া এসেছে ৷

অলির মুখের হাসি চারগুণ বেড়ে গেল ৷ ও উচ্ছ্বসিত গলায় বলতে লাগল,,,

সত্যি! ঢাকা থেকে কবে ফিরল ও?

সেটা তোমার বন্ধুই বলতে পারবে ৷ আমি মাহি ভাইয়া কে এলাকায় প্রবেশ করতে দেখেই তোমার কাছে ছুটে আসলাম যেন তুমি মাহি ভাইয়াকে গিয়ে বিপরীতমুখী সারপ্রাইজ দিতে পারো ৷

ওর কথা শেষ হতেই অলি এলাকার দিকে পা বাড়াল ৷ মাহি ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আসতেছে এখন অলি যদি ওর দিকে ছুটে যায় তাহলে মাহি পাল্টা সারপ্রাইজ পেয়ে যাবে ৷

তবে কিছুদূর যাওয়ার পর অলি থেমে গেল ৷ পিছু ঘুরে বিল্টুর কাছে ফিরে এসে কিছু বলতে ধরল ৷ অলি কি বলতে পারে সেটা আন্দাজ করে বিল্টু আঙুল উচিয়ে বলতে লাগল,,,

খবরদার অলি ভাইয়া মাফ চাবে না ৷

কেন চাব না? তোর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিলাম তার জন্য নিশ্চয়ই রেগে গেছিস তাই না?

না আমি রাগিনী ৷

তবুও মাফ করবি তুই আমায় ৷

বিল্টু বিরক্তিতে চ কারান্ত উচ্চারণ করল ৷ ও জানে অলি মাফ না পাওয়া পর্যন্ত জায়গা প্রস্থান করবে না ৷ তাই অস্ফুট স্বরে বলল,,,

আচ্ছা করেছি ৷ যাও এখন ৷

অলি হাসিমুখে আবার হাঁটতে লাগল ৷ কিছু একটা মনে পড়ায় বিল্টু পিছু ডেকে বলতে লাগল,,,

অলি ভাইয়া শোনো ৷

অলি পিছু ঘুরে বলল,, কি?

কাল দেখলাম কুত্তার দৌঁড়ানি খেয়েছো ৷ তুমি যে এতো জোরে দৌঁড়াতে পারো সেটা না দেখলে আমি বিশ্বাসই করতাম না ৷ পরেরবার সাবধানে চলাফেরা করো ৷

অলি মনে হয় লজ্জা পেল ৷ ও তৎক্ষণাৎ বিল্টুর সামনে এসে বলল,,,

খবরদার এ কথা কাউকে বলবি না ৷ নাহলে তোকে এবার আমি মাফ করব না ৷ একটুও মাফ করব না ৷ পা ধরে ঝুলে থাকলেও মাফ করব না ৷

আচ্ছা বলব না ৷

এর আগে না মানে আমার আগে কাউকে বলেছিস?

না বলিনি ৷

কথাটা শোনামাত্রই অলি চলে গেল ৷ তাই বিল্টুর পরের কথাটা শুনতে পেল না ৷ বিল্টু বলেছিল,, “শুধু মতিন দাদুকে বলেছিলাম ৷”

এলাকায় প্রবেশ করার পরপরই মতিন দাদুর বাড়ি ৷ অলিকে যেতে দেখে উনি বলতে লাগলেন,,,

এই অলি আহাদ শোন ৷

অলি সেদিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,, হ্যাঁ দাদু বলো ৷

তুই নাকি কুত্তার দৌঁড়ানি খেয়েছিলি?

অলির হাসিহাসি মুখটা লজ্জায় ছেঁয়ে গেল ৷ পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,,,

তোমাকে কে বলেছে দাদু?

কে আবার বিল্টু বলেছে ৷ ও নাকি কাল নিজ চোখে দেখেছে ৷ সে যাক গে কুকুরের সাথে লাগতে যাস না যেন ৷ সাবধানে চলবি ৷

আচ্ছা দাদু ৷

অলি দাদুর থেকে দূরে চলে এলো ৷ ও বিরবির করে বলতে লাগল,,,

বিল্টুর বাচ্চা! তোকে আমি দেখে নিব! জীবনেও একটা মাফ পাবি না আমার থেকে ৷

এভাবে বিরবির করতে করতে ও সামনের দিকে হাঁটতে লাগল ৷ যাওয়ার পথে লিলির সাথে ওর দেখা হয়ে গেল ৷ লিলি স্বভাবসুলভ ওকে দেখেই মুচকি মুচকি হাসতে লাগল ৷ অলি যথাসম্ভব ওকে পাশ কাটিয়ে যেতে ধরলে লিলি বলে উঠল,,,

অলি ভাইয়া তোমার পিছে নাকি কুকুর ধাওয়া করেছিল?

অলি চমকে উঠে বলল,,, তোকে কে বলেছে?

ওই তো মতিন দাদু বলল ৷ আমাদের সবার থেকে মাফ চাও সেটা ঠিক আছে ৷ কুকুরের থেকে মাফ চাইতে যেও না আবার ৷ ওরা তোমার মহানুভবতা বুঝবে না ৷

অলি দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করল ৷ তবে যাওয়ার পথে আরো অনেকের থেকে কুকুরের থেকে দুরে থাকার সতর্কবানী শুনল ৷ একজনের থেকে আরেকজনের কাছে যেতে যেতে পুরো এলাকায় ভাইরাল হয়ে গেছে যে অলি আহাদ কুত্তার দৌঁড়ানি খেয়েছে ৷ এসব দেখে অলি প্রচন্ড হতাশ ৷ বিল্টুকে পেলে ও আজ গাছের সাথে উল্টো লটকিয়ে রাখবে ৷

এসবের মাঝেই মাহির সাথে ওর দেখা হয়ে গেল ৷ পুরনো বন্ধুকে এতোদিন পর কাছে পেয়ে ওর মনটা ভালো হয়ে গেল ৷ দুজনে অনেকক্ষন নিজেদেরকে একে অপরের সাথে জড়িয়ে রাখল ৷ উষ্ণ আলিঙ্গনের পর দু বন্ধু একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল ৷ অলি বলতে লাগল,,,

তুই কবে এসেছিস?

ঢাকা থেকে সোজা তোর কাছেই এসেছি ৷ নিজের বাড়িতেও এখনও যাইনি শালা ৷

বাহ আমার প্রতি তোর এতো ভালোবাসা! তুই মেয়ে হলে আমি তোকেই বিয়ে করতাম ৷

মাহি হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,, মেয়ে হলে মনে হয় না তুই আমার সাথে কথা বলতি!

অবশ্যই বলতাম ৷

ঢপ মারিস না ৷ লিলিকে দেখেই সেটা বোঝা যায় ৷ ও তো তোকে কম ভালোবাসে না ৷ সেই যখন ঢাকা চলে গিয়েছিলাম তখন যেমন ভালোবাসা দেখে গিয়েছিলাম এখনও ঠিক তেমনই আছে ৷ একটু আগেই তো দেখা হলো ওর সাথে ৷

বাদ দে ওর কথা ৷ আমার মন সায় দেয় না ৷ কেমন অস্বস্তি বোধ হয় ৷

আচ্ছা বাদ দিলাম ৷ তোর ভাগ্যে যে শেষমেশ কে জোটে সেটা দেখার জন্যেই আমি বেঁচে আছি ৷

অলি সামান্য হাসল, কিছু বলল না ৷ একটু পর মাহি বলতে লাগল,,,

এই অলি আমাকে সাজেক ভ্যালি ঘুরিয়ে নিয়ে আসবি? আমাদের খাগড়াছড়ি থেকে তো বেশি দূরে না ৷ তাছাড়া তুই তো সেখানকার টুরিস্ট গাইড ৷ নিয়ে যা না ভাই ৷

আচ্ছা নিয়ে যাব ৷ কাল সকাল সকাল চলে আসিস ৷

এভাবে আরো কিছুক্ষণ দু বন্ধু গল্পগুজব করতে লাগল ৷ এতোদিনের জমানো সমস্ত কথা একসাথে বলতে লাগল ৷ ফোনে নিয়মিত কথা হয়েছিল তবুও সামনাসামনি কথা বলার ব্যাপার টাই আলাদা ৷ গল্পের এক পর্যায়ে মাহি চিন্তিত গলায় বলতে লাগল,,,

তা অলি তুই নাকি কুত্তার দৌঁড়ানি খেয়েছিলি কাল? কোথাও ব্যাথা ট্যাথা পাসনি তো?

অলি বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে বলল,,, তুই কিভাবে জানলি?

খোদেজা চাচী বলল ৷

হায় আল্লাহ ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেখছি! শালা আজকে এলাকার সবার কাছে মাফ চাওয়া থেকে আমি ইস্তফা নিলাম!

মাহি হেসে উঠে বলল,,, মাফ না চেয়ে থাকতে পারবি?

অলি কাটকাট গলায় বলল,,, ট্রাই করে দেখতে পারিস ৷ এই অলি আহাদের মাফ যেমন খাঁটি , প্রতিজ্ঞাও তেমন খাঁটি ৷ শালাহ কখন জানি এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে আমি কুত্তার সাথে গোল্লায় ছুট খেলছিলাম!

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here