চাঁদের_হাসি #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ৩৪

0
18

#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৩৪

সবাই এখন হাসপাতালে ৷ অথচ যার হাসপাতালে থাকা বেশি জরুরি সেই বাড়িতে রয়ে গেছে ৷ অনন্যা উঠানে বসে নিষ্পলক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ হঠাৎ অলির ভেজা শার্টের দিকে নজর যেতেই ওর ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ শার্টের পকেটে কাগজের মতো কিছু একটা দেখা যাচ্ছে ৷ অনন্যা বসা থেকে উঠে সেদিকে এগিয়ে গেল ৷ অতঃপর কাগজটা বের করল ৷

বৃষ্টিতে ভেজার কারনে কাগজটার অবস্থা খারাপ ৷ তাই ও সাবধানে কাগজের ভাঁজ খুলল ৷ ভাঁজ খুলতেই চোখে পড়ল কিছু লেখা,

প্রিয় অনন্যা,
প্রিয় বলার অধিকার হয়তো হয়নি কিন্তু ডাকতেই পারি ঠিক আছে? মাইন্ড করলে আমাকে বলবেন আমি মাফ চেয়ে নিব ৷ বেশি কথা না বাড়াই ৷ আসলে আমি বিরাট একটা গন্ডগোল বাঁধিয়ে ফেলেছি ৷ এই যে দেখুন গন্ডগোল টার কথা মনে পড়তেই আমার লজ্জায় মুখ কান লাল হয়ে গেল ৷

যাক সে কথা, আমার দ্বারা সংঘটিত অপরাধ টা হচ্ছে আমি বিনা অনুমতিতে আপনাকে জিজ্ঞাসা না করেই আপনার প্রেমে পড়ে গেছি ৷ কি লেভেলের কে*লেঙ্কারি করে ফেলেছি বলুন তো! একবার অন্তত জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল যে ‘আমি কি আপনার প্রেমে পড়তে পারি?’ যেহেতু ভুল করেই ফেলেছি সেহেতু আপনিও আমাকে মুখের উপর ঠাশ করে ভালোবাসার কথা বলে মাফ করে দিন তো, নয়তো কিন্তু আমি আবারও ভাত খাওয়া বন্ধ করে দিব ৷ বাই দা ওয়ে, আপনি আমাকে ভালোবাসার কথা বলার পর এই হুমকির জন্যেও আমি আপনার থেকে মাফ চেয়ে নিব ৷

ইতি
অলি আহাদ ওরফে আরাফাত প্রামানিক

পুনশ্চঃ আমাকে আর একবার ভাইয়া বলে ডাকলে আমি সত্যি বলছি এমন কান্না করব যে আপনি ছোট খাটো একটা পুকুরের পানি জমিয়ে ফেলতে পারবেন হুহহ! অবশ্য এই হুমকির জন্যেও বিয়ের পর মাফ চেয়ে নিব ৷

চিঠিটা পড়েও অনন্যার মুখমন্ডলের কোনো পরিবর্তন হলো না ৷ ওর মনে কি চলছে সেটাও বাইরে থেকে বুঝতে পারা যাচ্ছে না ৷ কিছুক্ষণ পর অনন্যা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ৷ ক্ষনকাল বাদে হুট করে ও হেসে ফেলল ৷ একটু পরেই ওর চোখের সামনে পাহাড়ে কাটানো দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল ৷ অলি নিজের শরীরের ময়লা ঝাড়তে ঝাড়তে এগিয়ে আসছিল আর অনন্যা ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল ৷ বলতে গেলে ঠিক সেই মুহূর্তেই অনন্যা অলির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল ৷ কিন্তু নিজের শারীরিক ত্রুটির জন্য সেটা লুকিয়ে রেখেছিল ৷

ও দূর থেকে অলিকে ভালোবেসে যাচ্ছিল ৷ লিলির মনের কথা শুনে ওর প্রচন্ড ভয় হয়েছিল কিন্তু উপরে সেটা বুঝতে দেয়নি ৷ অলির লিলির প্রতি মনোভাব শুনে ও কিছুটা শান্ত হয়েছিল ৷ তারপর হুট করে অলি ওর ভাই হয়ে গেল ৷ এতে করে অনন্যার মনে ক্ষীণ আশা জাগল ৷ এবার হয়তো অলিকে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে ৷

কিন্তু ওর ক্ষীণ আশা এতো তীব্র হবে সেটা ও ভাবতে পারেনি ৷ মেয়েরা খুব সহজেই বুঝে যায় কখন একটা ছেলে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে ৷ অলির সবসময় ওর দিকে তাকিয়ে থাকার বিষয়টা অনন্যার চোখে আড়াল হতো না ৷ ও বেশ খুশি ছিল ৷ ভাইয়া ডাকতে নিষেধ করার দিন অলির লজ্জা পেয়ে উল্টে পড়া অনন্যা দেখেছে ৷

কিন্তু হুট করে কোথা থেকে সাহিক চলে আসল ৷ অনন্যা অবশ্য অলিকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিল ৷ ওর মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শুনতে চেয়েছিল কিন্তু এই ছেলে যে এভাবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো কাজ করবে সেটা ও ভাবতে পারেনি ৷

আয়না থেকে কিছুটা দূরে সরে অনন্যা সাহিককে ফোন দিল ৷ দুইবার রিং পড়তেই ফোন রিসিভ হলো ৷ অনন্যা কিছু বলার আগে সাহিকই বলে উঠল,,,

বাহ আমার ভাগ্য দেখছি আজ অনেক ভালো ৷ তুমি নিজে থেকেই আমাকে ফোন দিয়েছো!

হু দিলাম ৷ মাঝে মাঝে মানুষকে খুশি করতে ভালো লাগে ৷

আমিও তোমাকে খুশি করতে চাই ৷ বলো কি করলে তুমি খুশি হবে ৷

আপনাকে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না ৷ আমাকে খুশি করার জন্য একজন আছে ৷

কে? পরিবারের কেউ?

পরিবারের তো অবশ্যই ৷ ওই যে বলেছিলাম না আমার ফুফামশাইয়ের ছেলের কথা?

হ্যাঁ যাকে ২১ বছর পর ফিরে পেয়েছো তোমরা ৷

জ্বি ৷ আমাকে খুশি করার জন্য উনিই যথেষ্ট ৷ আপনাকে এই দায়িত্ব নিতে হবে না ৷

ভাইয়ের দায়িত্ব তো থাকবেই ৷ তাই বলে আমাকে দায়িত্ব দিবে না?

না ৷

আচ্ছা ঠিক আছে দিও না ৷ বাড়ির মানুষজন কি করছে ৷ দাদু আর ফুফামশাই নিশ্চয় আবারও ঝগড়া করছে তাই না?

সম্ভবত করছে ৷

সম্ভবত বললে কেন? তুমি কোথায়?

আমি বাড়িতেই আছি কিন্তু বাকিরা হাসপাতালে গিয়েছে ৷

সেকি! কার কি হয়েছে?

আমার ওই ফুফামশাইয়ের ছেলে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলেছে ৷ যেন তেন জ্বর না ১০৬° জ্বর ৷ এখনও নাকি জ্বর নামেনি ৷

তাহলে তো অবস্থা বেশ খারাপ ৷ হঠাৎ এমন জ্বর আসার কারন কি?

বৃষ্টিতে ভিজেছিল ৷

বৃষ্টিতে ভিজল কেন?

আমার বিয়ে আপনার সাথে হচ্ছে জন্য ৷

মানে?

মানে উনি আমাকে বিয়ে করতে চান ৷ আমাকে বিয়ে না করতে পারলে এ যাত্রায় আর বাড়ি ফিরে আসবেন না ৷ ওখান থেকেই আল্লাহর কাছে চলে যাবেন ৷

বিপরীত পাশে নিস্তব্ধতা ৷ বেশ কিছুক্ষণ পর সাহিক শান্ত গলায় বলল,,, তুমি কি বলতে চাচ্ছ?

সম্ভবত আমার সাথে উনার খুব দ্রুতই বিয়ে হবে ৷ আপাতত এটাই বলতে চাচ্ছি ৷

এক মিনিট নিরবতার পর সাহিক ফোন কেটে দিল ৷ বোঝাই যাচ্ছে ও নিজে থেকে এবার বিয়েটা ভেঙে দিবে ৷ অনন্যা সেসব নিয়ে না ভেবে দ্রুত গিয়ে বোরকা পড়ে নিল ৷ ওকে এখন হাসপাতালে যেতে হবে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

ফিনাইলের কটু গন্ধ এসে নাকে লাগছে ৷ অলি সবকিছু বুঝতে না পারলেও কিছু কিছু বুঝতে পারছে ৷ ওর আশেপাশে ডাক্তার আর নার্স আছে ৷ তারা ওকে সুস্থ করার জন্য কিছু একটা করছে যেটা ও বুঝতে পারছে না ৷ তাছাড়া মাথার ভোতা য*ন্ত্রণা টা সারেনি বরং বেড়েছে তাই বেশি মাথা ঘামাল না ও ৷

চোখ খোলার মতো শক্তি ও নিজের মধ্যে পাচ্ছে না ৷ তবুও জোর করে খোলার চেষ্টা করে চলেছে ৷ এক পর্যায়ে ব্যর্থ হয়ে ও ঘুমিয়ে পড়ল ৷ দ্বিতীয়বার যখন জ্ঞান আসার মতো অবস্থা হলো তখন একটা নারীকন্ঠের কান্না ওর কানে ভাসতে লাগল ৷ এবার চোখ খোলার সামর্থ্য পাচ্ছে অলি ৷ প্রথম পর্যায়ে আধো আধো চোখ খুলে ও বলতে লাগল,,,

মা কাঁদছো কেন?

কিছুক্ষণ পর ভালোভাবে চোখ মেলতেই দেখল না ওটা ওর মা না, ওটা অনন্যা ৷ কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও ও স্বাভাবিক গলায় বলতে লাগল,,,

আপনি কাঁদছেন কেন? যদিও আমি আপনার ভাই তবুও প্রাপ্তবয়স্ক একটা ছেলের পাশে বসে কাঁদলে শুধু সাহিক কেন যেকোন ছেলেই মাইন্ড করবে ৷

অনন্যা ক্রন্দনরত গলায় বলল,,, আপনি বৃষ্টিতে ভিজলেন কেন?

সাহিক কি এসেছে? ও জানে আপনি আমার কাছে?

আপনার কি শরীর খুব বেশি খারাপ লাগছে? একটুও সুস্থ বোধ করছেন না?

সাহিকের অনুমতি না নিয়ে আসা ঠিক হয়নি ৷

আপনার জ্বর কেন কমছে না বলুন তো? আপনি কি চাচ্ছেন না আপনার জ্বর কমুক?

অলি অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,,, আপনি কিন্তু আমার কথার জবাব দিচ্ছেন না অনন্যা ৷

সেই একই কাজ আপনিও করছেন ৷ আপনিও আমার একটা প্রশ্নেরও জবাব দেননি ৷

আমার প্রশ্নগুলো বেশি জরুরি ছিল ৷ সাহিকের অধিকার আছে আপনার উপর ৷

আপনার সুস্থতার চেয়ে জরুরি আমার কাছে আপাতত আর কিছু নেই ৷ আর তাছাড়া সাহিক সম্ভবত বিয়েটা ভেঙে দেওয়ার কথা ভাবছে ৷

অলি ব্যস্ত গলায় বলল,,, কেন? আমার পাশে এসে বসে কাঁদার জন্য? আপনাকে আগেই বলেছিলাম এমন করবেন না ৷

অনন্যা চোখের পানি মুছে বলল,,, আপনাকে খুব দ্রুত আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি জন্য সাহিক বিয়েটা ভেঙে দেওয়ার কথা ভাবছে ৷ আমি তো আর দুজনকে বিয়ে করতে পারি না তাই না?

অলির মস্তিষ্ক ফাঁপা হয়ে গেল ৷ ও কিছু বুঝতে পারছে না ৷ অনন্যা এসব কথা আদৌই বলেছে নাকি ও জ্বরের ঘোরে ভুলভাল শুনছে? ও আশেপাশে তাকাল ৷ না সবকিছুর রঙ ও বুঝতে পারছে ৷ তার মানে স্বপ্ন দেখছে না ৷ স্বপ্নে কালার বোঝা যায় না ৷ ওর এসব চিন্তার মাঝে অনন্যা ওর হাতে হাত রেখে বলল,,,

ভালোবাসার কথা বলতে এতো সময় নিলেন কেন? সময় না নিলে আজ হাসপাতালে এভাবে পড়ে থাকতে হতো না ৷

অলি কি বলবে বুঝতে পারছে না ৷ তবে ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপতেছে ৷ এতো জ্বরের মাঝেও ওর মুখ আর কান টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করল ৷ তা দেখে অনন্যা চিন্তিত গলায় বলল,,,,,,

আপনার কি জ্বর বেড়েছে? ডাক্তার ডেকে আনব?

অলি হড়বড় করে বলল,,, হাত ছাড়ুন , হাত ছাড়ুন ৷ আমার লজ্জা লাগছে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

হাসপাতালের করিডরে সকলে বসে আছে ৷ মাহিও এসেছে নিজের বন্ধুর এমন অবস্থা শুনে ৷ তবে এসে যে এমন বিরাট শখ পাবে সেটা ও ভাবেনি ৷ কিছুক্ষণ আগেই অনন্যা সকলকে বলেছে ও অলিকে বিয়ে করতে চায় ৷ সকলে বর্তমানে তব্দা মেরে বসে আছে ৷ আলমগীর প্রামানিক কিছুক্ষণ পর নাতনির দিকে এগিয়ে এসে কানে কানে বললেন,,,

লালকুমারী কমেডি করছো?

অনন্যা ভ্রু কুঁচকে দাদুর দিকে তাকিয়ে বলল,,, এই বুড়ো আমি কমেডি করার মানুষ? নাকি ফুফামশাইয়ের মতো লুঙ্গি দিয়ে ফাঁস দিলে তবে বিশ্বাস করবে?

আলমগীর প্রামানিক থতমত খেয়ে গেলেন ৷ পর মুহূর্তে গলা খাকারি দিয়ে বললেন,,, লুঙ্গি দিয়ে হবে না লালকুমারী ৷ তুমি ওড়না দিয়ে ট্রাই করতে পারো ৷ লুঙ্গির বিষয়টা ওল্ড ফ্যাশন হয়ে গেছে ৷

অনন্যা এমন ভাবে চোখ পাকালো যে আলমগীর প্রামানিক এক প্রকার লাফ দিয়ে ওর থেকে দূরে সরে গেলেন ৷ আর ভুলেও নাতনির দিকে তাকালেন না ৷ দাদুর থেকে চোখ সরিয়ে অনন্যা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল ৷ তবে অলির লজ্জা পাওয়ার দৃশ্যটা মনে পড়তেই ও মুচুরমুচুর করে হাসতে লাগল ৷ তবে মুখে হাত দিয়ে হাসল যেন সেটা কেউ বুঝতে না পারে ৷

ও তো স্বাভাবিক ভাবেই আছে ৷ কিন্তু বাড়ির প্রতিটা মানুষ হতভম্ভ হয়ে গেছে ৷ ওদের হতভম্ভতা এখনও কাটেনি ৷ ইয়াসির প্রামানিক বেঞ্চে বসে গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে আছেন ৷ উনার ভাবনার মূল কেন্দ্র বিন্দু হলো অনন্যা আর অলির বিয়ে হলে কার সাথে কার কি সম্পর্ক হবে ৷ উনি বিরবির করে বলতে লাগলেন,,,

অনন্যা আমার দিক দিয়ে ভাতিজী, আহিয়ার দিক দিয়ে ভাগ্নি আর আরাফাতের সাথে বিয়ে হয়ে গেলে হবে বউমা ৷ অন্যদিকে আরাফাত আমার ছেলে, অনন্যার দিক দিয়ে ভাবলে ও আমার ভাগ্নি জামাই অথবা ভাতিজী জামাই ৷ হায় আল্লাহ কিসব আউলা ঝাউলা সম্পর্ক ছিহ!

ইয়াসির প্রামানিক সম্পর্কের কথা ভুলে গেলেন ৷ সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে গেলে উনাকে সোজা পাবনায় গিয়ে শিফট হতে হবে ৷ অন্যদিকে মাহি এক এক করে সকলের দিকে তাকাচ্ছে ৷ অলির জ্বর খানিকটা কমেছে জন্য ওর বিষয়ে কিছু ভাবছে না ৷ মাহি এবার তাকাল অনন্যার দিকে ৷ অনন্যার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল,,,

এমন হবে সেটা আগে জানলে আমি নিজ দায়িত্বে অলির সাথে জ্বরের বিয়ে দিতাম রসুনের সাহায্যে ৷ বাপরে বাপ কিসব ভুতুড়ে কান্ড!

ও একটু পর বলে উঠল,,
টিভির পর্দায় মুখ ব্যাকা চ্যাকা করাকে বলে নাটক
জ্বর নাকি অলির বিয়ের ঘটক
মারো তালি;

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here