চাঁদের_হাসি #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ৩৭ (শেষ পাতা)

0
23

#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৩৭ (শেষ পাতা)

দশ বছর পর,
সকাল সকাল অনন্যা ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ৷ আজ ওদের খাগড়াছড়ি যাওয়ার কথা ৷ পাহাড়ী এলাকায় কয়েক টা মাস কাটিয়ে আবার এখানে ফিরে আসবে ৷ অবশ্য বছরের মাসগুলো ভাগ করে করে ওরা ঢাকা টু খাগড়াছড়ি করতে থাকে ৷ অনন্যা যখন ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত অলি তখন নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত ৷ ওর দিকে নজর যেতেই অনন্যা ভ্রু কুঁচকে বলতে লাগল,,,

এতো সাজছেন কার জন্য? ভুলে যাবেন না আপনি এখন এক বাচ্চার বাপ ৷

অলি বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,,, আমাকে কি আপনার এতোই বেকার মানুষ মনে হয়? আমার অনেক কাজ আছে বুঝলেন? সো এসব অকাম করে আপনার পায়ে ঝুলে থেকে মাফ চাওয়ার পর্যাপ্ত সময় আমার নেই ৷

অনন্যা কিছু বলল না ৷ ভ্রু কুঁচকে রেখেই ওর থেকে নজর সরিয়ে নিল ৷ তবে মুখ আড়াল হতেই ও ফিক করে হেসে ফেলল ৷ আসলেই অলির মাফ চাওয়ার মতো সময় নেই ৷ বিগত দশ বছরে যতগুলো মাফ চেয়েছে তা দিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে ৷ কিছু সময় পর অলি বলে উঠল,,,

ভালো কথা ৷ আমার মেয়ে কোথায় মনের রানী?

পিকুর সাথে চকলেট কিনতে গিয়েছে ৷

হায় আল্লাহ ওকে পিকু বলো না মনের রানী ৷ ও এখন বড় হয়েছে ৷ ওকে এখন সারা বলে ডাকতে হবে আমাদের ৷

আমি ওতো ঢং করতে পারব না ৷ আপনি ডাকুন গিয়ে ৷

অলি হেসে ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল ৷ আলু দাদু আর বাবার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে ও বাড়ি থেকে বেরোতে যাবে সেই সময় পিকু আর ইভা প্রামানিক চলে আসল ৷ ওহ হো ভালো কথা, ইভার এই নামটা দেওয়া নিয়ে প্রামানিক ভবনে সাত বছর আগে প্রলয় সংঘটিত হয়েছিল ৷ ‘আ’ দিয়ে নাম না রেখে ‘ই’ দিয়ে নাম রাখার জন্য ইয়াসির প্রামানিক জেদ শুরু করেছিলেন ৷

সেই জেদ আলমগীর প্রামানিক মেনে না নেওয়ায় উনি ইভাকে নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ৷ পাক্কা পাঁচ ঘন্টা অতিক্রম করার পর আলমগীর প্রামানিক হার মেনে নিয়েছিলেন এবং তারপর ইয়াসির প্রামানিক ইভাকে নিয়ে দাঁত কেলিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ৷

পিকু অলিকে দেখতেই মুচকি হেসে বলল,,, সবকিছু ঠিকঠাক? এখন আমরা রওয়ানা হবো তো অলি ভাইয়া?

হ্যাঁ রে পিকু ৷ তৈরি ৷

পিকুর হাসিহাসি মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল ৷ ও কঠিন গলায় বলল,,,

আমার এখন ১৭ বছর ভাইয়া ৷ আমি বড় হয়ে গেছি ৷ আমাকে সারা বলে ডাকবে ৷

অলি জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলল,,, ভুল হয়ে গেছে রে ৷ মনে ছিল না ৷ পরেরবার আর ভুল হবে না , সত্যি বলছি পিকু ৷

পিকু কটমট দৃষ্টিতে অলির দিকে তাকাল ৷ অলি থতমত খেয়ে গেল তাই ও গলা খাকারি দিতে লাগল ৷ ওদিকে বাবার অবস্থা দেখে ইভা খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল,,,

এই বাবা তুমি দেখছি বুড়ো হয়ে গেছো! কিছুই মনে থাকে না ৷

অলি সামনে এগিয়ে গিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে বলল,,, আমার সামনে আমাকে বুড়ো বলেছো ঠিক আছে ৷ কিন্তু তোমার মাম্মার সামনে বলতে যেও না যেন ৷ উনি কিন্তু ভীষণ রেগে যাবেন ৷

এমন সময় অনন্যা স্যুটকেস হাতে সেখানে উপস্থিত হয়ে বলল,,, রাগারাগির কি আছে? বুড়োকে বুড়ো বলবে না তো কি বলবে? মাথার চুল দুই একটা পেকে গেছে আপনার ৷

অলি দ্বিতীয় দফায় থতমত খেয়ে গেল ৷ না নিজের মান সম্মান বলতে কিছুই থাকল না ৷ ওর এমন অবস্থা দেখে পিকু আর ইভা খিলখিলিয়ে হাসতে লাগল ৷ হাসির পর্ব শেষ হলে পিকু আলমগীর প্রামানিকের সামনে গিয়ে বলল,,,

কি গো পটল দাদু যাবে না আমাদের সাথে?

আলমগীর প্রামানিক হাই তুলে বললেন,,, আমার এই হাড় মড়মড় করা শরীর নিয়ে গেলে গাড়িতেই এক হাড্ডি আরেক হাড্ডির সাথে লেগে তবলা বাজানো শুরু হয়ে যাবে ৷ তোমরা যাও মামনি রা ৷

পিকু হাসতে লাগল ৷ ওর হাসার মাঝেই শোভন সানা সেখানে উপস্থিত হলো ৷ ২৬ বছরের শোভনকে দেখলে এখন আর ওর মাঝে বাচ্চা ভাবটা পাওয়া যায় না ৷ কেমন একটা পুরুষালী গাম্ভীর্যতা চলে এসেছে ৷ তার পাশাপাশি অত্যধিক সুদর্শন হয়েছে ছেলেটা ৷ অন্যদিকে সানার বিয়ে হয়েছে তিন বছর ৷ কালকেই জানতে পেরেছে ও প্রেগনেন্ট ৷ তাই ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রেগনেন্সির এই সময়টা পাহাড়ী এলাকার সবুজের সমারোহে কাটিয়ে দিবে ৷ ওর স্বামী কর্মব্যস্ততার জন্য যেতে পারবে না তবে মাঝে মাঝে গিয়ে ওর সাথে দেখা করে আসবে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

গাড়ি চলছে খাগড়াছড়ি অভিমুখে ৷ পিকু জানালা দিয়ে বাইরের সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত ৷ ওর মুখে অমায়িক এক হাসি ফুটে উঠেছে ৷ হয়তো মনে মনে কাউকে কল্পনা করে চলেছে ও ৷ শোভন সানা ওর পাশেই বসে আছে ৷ অনন্যাও পিকুর মতো বাইরে তাকিয়ে আছে ৷ তবে অলি ইভাকে কোলে নিয়ে ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত ৷ ও বলছে,,,,

শালা তোর চাকরির মুখে লা*ত্থি মা*রতে পারিস না? একটুও ছুটি দিতে চায় না ৷

চাকরির মুখে লা*ত্থি মা*রলে দারিদ্রতা আমার মুখে লা*ত্থি মা*রবে! তখন আমার সাথে বসে রাস্তায় ভিক্ষা করিস শালা ৷

বাজে কথা বলিস না তো ৷

আরে ক্ষেপছিস কেন? আমি তে বললাম পরের মাসে যাব ৷ আর আমার ছেলেটাও একটু অসুস্থ ৷ ও আগে সুস্থ হোক তারপর যাব ৷

মিহাদ এখনও সুস্থ হয়নি?

হয়েছে তবে পুরোপুরি না ৷ আচ্ছা একটা জরুরি কথা শোন ৷

কি?

বউয়ের বোনকে বলে শালি
লিলির সাথে গিয়ে করিস না ছিলিছিলি
মারো তালি;

ফোন রাখ!

অলি ফট করে ফোন কেটে দিল ৷ ওর মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে ৷ লিলির বিয়ে হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে ৷ ছেলেটাও অত্যন্ত ভালো ৷ তবুও মাহির এই ছ্যাবলামো মার্কা কথাগুলো গেল না ৷ অলির মনোযোগ ফিরল মেয়ের কথায় ৷ ইভা শোভনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,,,

আচ্ছা তুমি এমন মুচুরমুচুর করে হাসছো কেনু?

শোভন সামান্য চমকে উঠে বলল,,, কই না তো ৷

ইভা ভ্রু আরো খানিকটা কুঁচকে বলল,,, মিথ্যা কথা বলবে না ৷ আমি জানি ঠোঁট বাকা করাকে হাসি বলে ৷ আমি একদিন মুরগিকেও হাসতে দেখেছি ৷

ওর কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল ৷ একটু পর শোভন আর সানা সমস্বরে বলল,,,

আর আমরা ছাগলকে হাসতে দেখেছি ৷ তাও আবার অলি ভাইয়ার রামছাগলকে ৷

এতো বছর অতিক্রম হওয়ার পরও ওদের দু ভাইবোনের একসাথে কথা বলার অভ্যাস টা যায়নি ৷ ইভা কপাল কুঁচকে ওদের দুজনের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলতে লাগল,,,

তোমরা কি ভুত?

ওর প্রশ্নে সবাই হেসে ফেলল ৷ তা দেখে ইভা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,,, হাসছো কেন? আমি কি হাসার কথা বলেছি? এটা অনেক জরুরি প্রশ্ন ৷

শোভন সানা একত্রে বলে উঠল,,, হ্যাঁ আমরা ভুত ৷

তাহলে তোমাদের আমি দেখতে পাচ্ছি কিভাবে? ভুত রা তো দিনের বেলা সাক্ষাৎ দেয় না ৷

আমরা মানুষ ভুত ৷

মানুষ ভুত হয় না ৷ সত্যি করে বলো তোমরা কি ভুত!

পিকু হাসতে হাসতে বলল,,, হায় আল্লাহ তুমি কত প্রশ্ন করো ৷

আশ্চর্যজনক ভাবে ইভা ব্যতীত সকলে একই সাথে বলে উঠল,,, ঠিক যেমন তুমি করতে আমাদের ৷

পিকু থতমত খেয়ে গেল ৷ সকলের নজর থেকে বাঁচার জন্য ও বাইরে তাকাল ৷ তা দেখে সবাই হাসতে লাগল ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা খাগড়াছড়িতে পৌঁছে গেল ৷ এবং সাথে সাথেই শোভন বলে উঠল,,,

অলি ভাইয়া সাজেক ভ্যালির আদিবাসী গ্রাম থেকে আগে একটু ঘুরে আসি?

অলি অবাক হয়ে বলল,,, কেন?

শোভন উত্তর দিল না ৷ ওর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ৷ অবশ্য সানাও মুখ লুকিয়ে হাসছে ৷ ওদের মতিগতি অলি কিছুই বুঝতে পারল না ৷ তবুও গাড়ি সাজেক ভ্যালির আদিবাসী গ্রামের দিকে নিয়ে যেতে বলল ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

শোভন অস্থির ভাবে পায়চারি করছে ৷ হেনিনকে ডেকে পাঠানো হয়েছে ৷ ওর থেকে খানিকটা দূরে অলিরা দাঁড়িয়ে আছে ৷ ওরা এখন সবকিছু জানে ৷ সানা বলেছে ওদের ৷ অলি কথাটা শোনার পর থেকে বুকে হাত দিয়ে আহাম্মক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ জরুরি কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু কেউ ওকে পাত্তা দিচ্ছে না ৷

হেনিন চলে এসেছে ৷ ও আসতেই শোভন বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে বলল,,,

আমাকে চিনেছেন?

বং কে সহজে ভোলা যায়? আমি তো ভুলিনি ৷

শোভন হেসে ফেলল ৷ পর মুহূর্তে নিজের শার্টের পকেট থেকে একটা মালা বের করল যেটা ও এই আদিবাসী গ্রামে এসে কিনেছিল এবং সানা সেটা লুকিয়ে রেখেছিল ৷ সেই মালা টা সানার থেকে উদ্ধার করে ও যত্ন করে রেখেছিল ৷ আজ সেটা হেনিনের দিকে বাড়িয়ে বলল,,,

আমার সেই ছোটবেলার ভালোবাসা মিথ্যা ছিল না ৷ আমি আপনাকে আজও ভালোবাসি ৷ এই বং আপনাকে ভালোবাসে ৷ যদি মনে হয় আমার ভালোবাসা স্বীকার করা যায় তাহলে মালাটা হাতে নিন ৷

শোভন হাত বাড়িয়ে রাখল ৷ হেনিন সেটা নেওয়ার কোনো তাড়া দেখাল না ৷ বরং বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,,

দুঃখিত আমি গ্রহণ করতে পারছি না ৷

শোভনের মুখটা আ*তঙ্কে ছেঁয়ে গেল, ও ব্যস্ত গলায় বলল,,, কেন? আমাকে পছন্দ না? কি করলে আমাকে পছন্দ করবেন চিতা?

ভুল ভাবছেন ৷ আপনি অনেক সুদর্শন আর ভালো একটা ছেলে ৷ যে আপনাকে পাবে সে ভীষণ ভাগ্যবতী ৷

সেই ভাগ্যবতী আপনি কেন হতে চাচ্ছেন না?

হেনিন শোভনের অস্থির মুখটার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলতে লাগল,,, কারন আমি বিবাহিত ৷ গত বছর আমার বিয়ে হয়েছে ৷

শোভনের অস্থির ভাব হারিয়ে গেল ৷ ও একদম স্থির হয়ে গেল ৷ চোখের পলক পড়ছে না ওর ৷ হেনিন পুনরায় বলতে লাগল,,,

আর তাছাড়া আমি একজন বৌদ্ধ ৷ আমি বৌদ্ধ হয়ে আপনার মতো একটা মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করব সেটা আপনি ভাবলেন কিভাবে? যাক গে , আপনাকে কষ্ট দিয়ে আমি ভীষণভাবে লজ্জিত ৷ আমাকে দয়া করে মাফ করে দিবেন ৷ বিদায় ৷

হেনিন মমতাময়ী চোখে শোভনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীর পায়ে চলে যেতে লাগল ৷ শোভন এখনও স্থির হয়ে আছে ৷ ওর চোখের পলক পড়ছে না ৷ ওর হাত থেকে মালাটা শব্দ করে পড়ে গেল এবং ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ঠিক ওর মনের মতো ৷ সানা এসে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল ৷ অলি ওদের হেনিনের বিয়ের ব্যাপার টা একটু আগে বলেছে যেটা শুরুতে কেউ ওকে বলার সুযোগ দেয়নি ৷

সানা শান্ত গলায় বলল,,, ভুলে যা ভাই ৷ চিতা তোর জন্য ছিল না ৷ আমরা তো ভুলেই গিয়েছিলাম ও একটা বৌদ্ধ মেয়ে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

পাহাড়ী বাড়িটায় কিছুক্ষণ আগেই ওরা চলে এসেছে ৷ শোভনের সাথে ঘটা অপ্রীতিকর ব্যাপার টায় সবারই মন খারাপ হয়েছে ৷ কিন্তু কি আর করার? শোভন ঘাসের উপর বসে একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ অলি ধীর পায়ে ওর পাশে গিয়ে বসে বলতে লাগল,,,

মন খারাপ করো না ইয়াংম্যান ৷ দুনিয়ায় এরকম দুই একটা ধাক্কা খাওয়াই লাগে ৷ তবে এটা মাথায় রাখবে জীবন কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না ৷

শোভন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,,, জীবনে না বিয়ে করেও দিব্যি সুখে থাকা যায় তাই না ভাইয়া?

না যায় না ৷ এসব আবেগী কথা রাখো ৷ কেউ একলা থাকতে পারে না ৷ সেটা এখন না বুঝলেও বৃদ্ধ বয়সে গিয়ে বুঝবে ৷ তুমি বিয়ে করবে এবং একটা ক্রিকেট টিমের বাবা হবে ৷ আমি নিজে তোমার জন্য পাত্রী সিলেক্ট করব ৷ ভাবতে পারবে না কত মেয়ে আমার কাছে এসে ইনিয়ে বিনিয়ে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করে ৷

শোভন কিছু বলল না ৷ অলিও জোর করল না ৷ এই মুহূর্তে এসব কথা ওর মাথায় ঢুকবে না ৷ তবে কিছুদিন পর ঠিকই বুঝবে এবং বিয়েও করবে ৷ অলি ওর সাথেই বসে থাকল ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

পাহাড়ী বাড়িটায় আরো দুই তিনটা রুম যোগ করা হয়েছে ৷ পিকু সেটাই ঘুরে ঘুরে দেখছে ৷ হুট করে সামনে একটা সুদর্শন যুবককে দেখতেই ও ইষৎ চমকে উঠল ৷ বিল্টু ওর দিকে তাকিয়ে হাস্যজ্জ্বল মুখে বলল,,,

তুমি নিশ্চয়ই পিকু? অনেক বড় হয়ে গেছো ৷

পিকুর রাগ লাগল না এবার ৷ মনে হলো পিকুই তো ওর নাম ৷ ও লাজুক হেসে বলল,,,

বড় তো আপনিও হয়েছেন ৷

বাহ এতো সম্মান! সোজা আপনি বলে ডাকছো ৷ যাক ব্যাপার না ৷

পিকু ইতস্তত করতে লাগল ৷ তা দেখে বিল্টু বলল,,, কিছু বলবে?

হু ৷ আমাকে একটু পাহাড় টা ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াবেন?

কেন নয়? চলো ৷

পাহাড় ঘোরার কোনো ব্যাপার নয় ৷ আসলে পিকু বিল্টুর সাথে একটু সময় কাটাতে চায় ৷ বিল্টু ওকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,,,

আগে অলি ভাইয়ার বাড়িটাই ভালোমতো দেখাই কি বলো?

জ্বি ৷

বিল্টু ওকে নিয়ে অলির ছাগলগুলোর কাছে গিয়ে বলল,,, সবচেয়ে জরুরি বিষয়টা হচ্ছে অলি ভাইয়ার রামছাগল দুটোকে মনজু চাচার ছাগলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে ৷ বলতে গেলে মনজু চাচার ছাগলকে কিনে এনে তবে বিয়ে দিতে হয়েছে ৷

পিকু খিলখিল করে হাসতে লাগল ৷ হাসতে হাসতে বলল,,, বাহ ছাগলেরও বিয়ে হয়? অলি ভাইয়ার কোনো তুলনা নেই ৷

দেখবে ছাগলের বিয়ে?

কিভাবে?

আমার ফোনে ভিডিও আছে ৷

বিল্টু পিকুকে ছাগলের বিয়ের ভিডিও দেখাতে লাগল ৷ পিকু সেটা দেখতে দেখতে প্রচুর হাসল ৷ বিল্টু আড়চোখে ওর হাসির দিকে বারবার তাকাতে লাগল ৷ মেয়েটা বড় হয়ে আরো রুপবতী হয়েছে বলে বিল্টুর ধারনা ৷ ভিডিও দেখানো শেষে বিল্টু ওকে পাহাড় ঘুরিয়ে নিয়ে দেখাতে লাগল ৷ বিকেলের দিকে ওরা আবারও অলির বাড়িতে ফিরে আসল ৷ সকলে মিলে ওখানে মজা করতে লাগল ৷ শোভন এখন খানিকটা স্বাভাবিক হয়েছে ৷ অবশ্য এর ক্রেডিট অলির উপর যায় ৷ ও শোভনকে অনেককিছু বুঝিয়েছে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

রাত দশটার দিকে অনন্যা বাইরে চলে আসল ৷ আজ আকাশে বিশাল এক চাঁদ উঠেছে ৷ ও মুগ্ধ হয়ে পাহাড়ের উপরে এসে পড়া জোৎস্না দেখতে লাগল ৷ ওর পিছু পিছু অলিও চলে আসল ৷ ভিতরে বাচ্চারা আলমগীর প্রামানিকের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছে ৷ অবশ্য শোভন মাহির সাথে কথা বলছে ৷ মাহিও অলির মতো ভালোই সান্ত্বনা দিতে পারে ৷

অলি অনন্যাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে চুমু খেল ৷ এতে করে অনন্যা ইষৎ কেঁপে উঠল ৷ একটু পর অলি ঘোর লাগানো কন্ঠে বলল,,,

নিজে চাঁদ হয়ে আরেকটা চাঁদকে দেখছেন? এ তো ভারী অন্যায়!

প্লিজ লজ্জা দিবেন না আমাকে ৷

অলরেডি দিয়ে ফেলেছি মনের রানী ৷

অলি অনন্যাকে নিয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল ৷ চাঁদের আলো এসে সমস্ত জায়গাটাকে রহস্যময় এক সৌন্দর্যে মুড়িয়ে দিয়ে গেছে ৷ ওরা যখন এই সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত তখন ভিতর থেকে সবার খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ ভেসে আসল ৷ সেই শব্দ শুনে অনন্যাও হেসে ফেলল ৷ ওর হাসির দিকে তাকিয়ে অলি ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে থাকার পর শান্ত গলায় বলল,,,

আপনার হাসি আমার কাছে চাঁদের হাসি মনের রানী ৷ বরং তার চেয়েও বেশি কেননা চাঁদের হাসি তে খুঁত থাকতে পারে কিন্তু আপনার হাসিতে কোনো খুঁত নেই ৷ আঙ্গা নাখনু নামনিকা ৷

অনন্যা লজ্জা পেয়ে গেছে তবে শেষের কথাটা শুনে ও ভ্রু কুঁচকে বলল,,, এর মানে কিন্তু আমি এখনও জানি না ৷

অলি সামান্য হেসে বলল,,, আমি তোমাকে ভালোবাসি ৷

অনন্যা কপাল চাপড়ে বলল,,, ইশশ! আমিই প্রথমে ভালোবাসার কথা বলেছিলাম ৷

ওর হতাশার মাঝেই অলি আচমকা ওর ওষ্ঠের সাথে নিজের ওষ্ঠ মিলিয়ে দিল ৷ প্রথম দফায় চমকে উঠলেও পর মুহূর্তে অনন্যা নিজেকে সামলে নিল ৷ ও দু হাত দিয়ে অলির পিঠ আঁকড়ে ধরল ৷ এই মানুষটা ওর জীবনের সমস্ত দুঃখ নিঃশেষ করে দিয়েছে ৷ এতো সুন্দর সুন্দর মানুষের সাথে ওর পরিচয় করাতে সাহায্য করেছে তাই ও এই মানুষটাকে আজীবনেও ছাড়ছে না!

~~~সমাপ্ত~~~

[চাঁদের হাসি হাসাতে হাসাতে বিদায় হলো ৷ এতোদিন পাশে থাকার জন্য জাযাকিল্লাহ❤🌼]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here