দাদীর মৃ’ত্যুর মাস চারেক পর থেকেই নিজের বাড়িতেই থাকা দুষ্কর হয়ে উঠেছিল রিমির জন্য। রিমির বাবার মৃ’ত্যুর পর তার মা অন্যত্র বিয়ে করলেও পুত্রশোক কমাতে রিমিকে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন দাদী। তখন রিমির বয়স প্রায় তেরো। মায়ের নতুন সংসারে সে বোঝা হতে পারে এই বোধটা মেয়েটার মনে তখনই তৈরি হয়েছিল বলেই মায়ের সঙ্গে থাকার জন্য কোনো জেদও করেনি। রিমির উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই দাদী মারা যান। তারপর থেকেই সেই বাড়িতে থাকা তার জন্য ক্রমশ কষ্টকর হয়ে উঠতে থাকে। বড় চাচীর কথামতো সব কাজ করার পরেও বড় চাচা, চাচী কিংবা চাচাতো বোন কারো মনই জিততে পারেনি সে। দিনদিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে নিজের মাকে সব জানায় রিমি। কিন্তু তার মা কিছুটা সময় চান। এখন তিনি অন্যের সংসারে—চাইলেই তো আর হুট করে মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে আসা যায় না। উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্টের পর যখন সেই বাড়িতে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন রিমির সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ইনায়া তাকে তাদের বাসায় পেইন-গেস্ট হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেয়। শুরুতে রাজি হয়নি রিমি। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের বাড়িতে থাকলে সে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে এই ভয়টা তার ছিল। তাছাড়া তার মা যেহেতু কিছুদিন সময় চেয়েছেন, রিমির বিশ্বাস ছিল শেষ পর্যন্ত মা তাকে নিজের কাছে নিয়ে যাবেন। রিমির বাবা রিমির নামে ব্যাংকে একটা বই করেছিলেন যেখানে প্রায় লাখ চারেক টাকা আছে, ওর চাচা চাচী জানেনা। রিমির যেহেতু আঠারো পূর্ন হয়ে গেছে তাই এই টাকা ও নিজের অনার্সের পড়ার জন্যে কাজে লাগাতে পারবে, শুধু থাকার একটা জায়গা দরকার। সবদিক বিবেচনা করেই শেষ পর্যন্ত নিজের বেস্টফ্রেন্ডের বাসায় থাকতে রাজি হয়ে যায় সে।
ইনায়ার সঙ্গে রিমির বন্ধুত্ব অনেক পুরনো—ক্লাস সিক্স থেকে। ইনায়াকে সে ভীষণ ভরসা করে। তাই তার প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল। তাছাড়া অন্তত কিছুদিন শান্তিতে থাকা যাবে এই ভেবেও সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল রিমি। রিমি বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুনে তার চাচা-চাচী বিন্দুমাত্র আপত্তি করেনি। উল্টো যেন একটু স্বস্তিই পেয়েছিল। যেন কোনো আপদ বিদায় হচ্ছে। রিমি অবশ্য ওনাদের কাছ থেকে এর বেশি কিছু আশা করেওনি। ইনায়াদের পরিবার বেশ প্রভাবশালী। ইনায়ার বাবা আরাফাত সাহেব শহরের নামকরা ব্যবসায়ী। স্বভাবটা কঠোর হলেও মেয়ের কোনো কথা তিনি খুব একটা অগ্রাহ্য করেন না। তাই মেয়ে যখন বান্ধবীকে এনে রাখতে চেয়েছিল, তিনি আপত্তি করেননি। ইনায়ার মায়েরও তেমন আপত্তি ছিল না। তবে বাড়িতে পা রাখার পরই রিমি বুঝতে পারলো—তার এখানে থাকা নিয়ে ইনায়ার ছোট ভাইয়ের ভীষণ আপত্তি আছে।
“এটা কিন্তু অন্যায়। ওর বান্ধবীর বেলায় বলছো যতদিন ইচ্ছে থাকুক, আর আমার বন্ধু বাসায় আনারই অনুমতি নেই! এইভাবে তুমি নিজের ছেলেমেয়ের মধ্যে ভেদাভেদ করো আব্বু?”
আরাফাত সাহেব ছোট ছেলের কথায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বললেন—
“তোমার বন্ধুগুলো যদি তোমার মতো বাদর না হতো, তাহলে তাদেরও আসার অনুমতি থাকতো”
এ কথা শুনে ইনায়া ফিক করে হেসে উঠলো!
“ঠিক বলেছো আব্বু। যেমন ও, তেমন ওর বন্ধুরা। বাঁদর আর তার সৈন্যদল!”
আয়ান রেগে বললো— “আমার বন্ধুরা বাঁদর হলে তোর বান্ধবী পেঁচা। ঐতো চেহারা! যেমন তুই তেমন তোর বান্ধবী। দুইটাই পেচী মুখী!”
ছেলেমেয়ের ঝগড়া দেখে বিরক্ত হয়ে আরাফাত সাহেব ধমকে উঠলেন—
“আহহা! বাসায় একটা মেহমান এসেছে, তারপরও তোমরা এভাবে ঝগড়া করছো কোন আক্কেলে? বিন্দুমাত্র বোধবুদ্ধি নেই। চুপ করো দুজনেই!”
বাবার ধমক শুনে দুজনেই চুপ হয়ে গেল। তবে আয়ানের রাগ তখনও যায়নি। আর সেই রাগটা যেন সবচেয়ে বেশি রিমির ওপরই। কেন এখানে এলো সে? ইনায়া ততক্ষণে চলে গেছে রিমির ঘরে, রিমির জন্যে এসে দেখে রিমি চুপচাপ বসে আছে। ব্যাগটা এখনও পাশেই রাখা, খোলেনি।
“একি! তুই এখনও ফ্রেশ হসনি কেন? আজ আমার ঘরেই থাকবি, কালকে আমার পাশের ঘরটা গুছিয়ে দেবো তোর থাকার জন্যে”
আয়ান এত জোরে কথা বলছিল যে রিমি ঘর থেকেই সব শুনেছে। তাই একটু দ্বিধা নিয়েই বললো—
“আমার এখানে থাকা নিয়ে যদি সমস্যা হয় তাহলে…”
“আব্বু যখন অনুমতি দিয়েছে, তখন কোনো সমস্যা নেই। তুই ওই বাঁদরের কথায় কান দিস না। আব্বু আমাকে একটু বেশি ভালোবাসে তো, তাই ও একটু জেলাস। বাদ দে ওর কথা”
বান্ধবীর কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে রিমি ফ্রেশ হয়ে এলো। কিছুটা বিশ্রাম দরকার ছিল। দুপুরে সে এ বাসায় এসেছিল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরই পায়নি। ঘুম ভাঙতেই হঠাৎ হুড়মুড় করে উঠে বসলো রিমি। ঘরের ভেতর তখন আধো অন্ধকার, জানালার ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যার আলো ঢুকছে। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ইনায়া একটা পিরিচ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
“উঠে গেছিস? আসলে তুই খুব আরাম করে ঘুমাচ্ছিলি, তাই আর বিরক্ত করতে ইচ্ছে হয়নি”
“তাই কি? আমায় ডাকবি তো! অ্যান্টি কি ভাববে?”
“ধুর! কেউ কিছুই মনে করবে না। তুই তরমুজ খা, আম্মু দিয়েছে। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। আজ কেন যেন একটু বেশিই গরম লাগছে”
________________________
আয়ান রাতে বাবার ওপর রাগ করে ডিনারই করেনি। খাবার টেবিলে বসেও শেষ পর্যন্ত মুখ গোমড়া করে উঠে গেছে। বিষয়টা নিয়ে আরাফাত সাহেব আর কিছু বলেননি। তবে ইনায়া বেশ বিরক্তই হয়েছিল। তার ছোট ভাইয়ের এই অভিমানী স্বভাবটা মাঝে মাঝেই সবাইকে বিপাকে ফেলে। ডিনার শেষ হতে হতে রাত বেশ নেমে এসেছে। দিনের গরম যেন এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বরং বাড়ির ভেতরটা আরও গুমোট লাগছিল। তাই খাওয়া শেষ করেই ইনায়া রিমিকে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলো। বাইরে অন্তত একটু হালকা বাতাস পাওয়া যায়। বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ইনায়া বিরক্ত গলায় বললো…
“উফফ! আজকে কী যে গরম পড়েছে! মনে হচ্ছে পুরো শহরটাই আ’গুন হয়ে আছে। তার ওপর আমার ঘরের এসিটাও গতকালই নষ্ট হতে হলো!”
রিমি মৃদু হাসলো — “হুম… এ বছর শুনেছি গরম নাকি একটু বেশিই পড়বে”
দুজনেই গল্প করতে করতে বসে থাকলো। নিচের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। মাঝে মাঝে দু-একটা গাড়ি যাচ্ছে, আবার নীরবতা নেমে আসছে চারপাশে। দূরে কোথাও একটা কুকুরের ডাক ভেসে এলো। হঠাৎ গেটের সামনে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো।
“এইটা মনে হয় ভাইয়ার গাড়ি!”
বলেই সে দ্রুত রেলিংয়ের কাছে গিয়ে নিচে উঁকি দিল। বারান্দায় কোনো শিক নেই, তাই নিচের গেট আর ড্রাইভওয়েটা পরিষ্কার দেখা যায়। রিমিও কৌতূহল সামলাতে না পেরে একটু এগিয়ে এলো। এতদিন ধরে ইনায়ার ভাইয়ের কথা শুধু শুনেছে তাই না চাইলেও দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল। গাড়িটা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে থামলো। ড্রাইভওয়ের সাদা আলোয় পুরো জায়গাটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।গাড়ির দরজা খুলে একজন নামলো। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে হাত নাড়লো — “ভাইয়া!”
নিচে দাঁড়ানো ছেলেটা মাথা তুলে তাকালো উপরের দিকে। ঠিক তখনই রিমির চোখও পড়লো তার দিকে। বারান্দার নরম হলুদ আলোয় রিমির মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, আর নিচের সাদা আলোয় ছেলেটার মুখটাও পরিষ্কার ধরা পড়ছিল। আরশান প্রথমে বোনের দিকেই তাকিয়েছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার দৃষ্টি থেমে গেল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত মেয়েটার ওপর। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো। ভ্রু একটু কুঁচকে উঠলো তার মেয়েটাকে আগে কখনও দেখেনি সে। রিমিও কৌতূহল নিয়ে তাকিয়েছিল নিচের দিকে। কিন্তু হঠাৎ করেই যখন বুঝলো ওরা দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে তখন অকারণ অস্বস্তি আর সংকোচে তার বুকটা ধক করে উঠলো।সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। ইনায়া তখনও নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলে যাচ্ছে…
“ভাইয়া, এত দেরি করলে কেনো? ফোনও ধরছিলে না। আমি তো ভেবেছিলাম আজকেও ফিরবে না”
আরশান তখন বোনের কথায় মন দিল। সংক্ষিপ্ত গলায় বললো — “কাজের অনেক চাপ ছিলো!”
রিমি তখন আর তাকালো না। অকারণ অস্বস্তি এড়াতেই ধীরে ধীরে সরে গেল বারান্দা থেকে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আরশান একবার চোখ তুলে আবার বারান্দার দিকে তাকালো।মেয়েটা আর সেখানে নেই। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সে গাড়ির চাবিটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলো। মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ভেসে উঠলো ইনায়া আবার কাকে নিয়ে এলো?
#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#সূচনা_পর্ব

