মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_০২

0
29

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_০২

পরদিন সকালটা যেন একটু অচেনা লাগছিল রিমির কাছে। নতুন ঘর, নতুন পরিবেশ সবকিছুই এখনও পুরোপুরি আপন হয়ে ওঠেনি। ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ বিছানায় চুপচাপ শুয়ে ছিল সে। মনে হচ্ছিল, কোথায় আছে যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তারপর ধীরে ধীরে আগের দিনের সবকিছু মনে পড়তেই উঠে বসলো। ফ্রেশ হয়ে কিছুটা সময় ঘরেই কাটিয়েছিল রিমি। বাইরে যাওয়ার আগে তার মনে একটা অদ্ভুত দ্বিধা কাজ করছিল। এই বাড়িতে সে এখন অতিথি কিন্তু কতদিনের জন্য, সেটাও তো ঠিক জানা নেই। তাই অকারণে কারও সামনে পড়তে তার একটু সংকোচই লাগছিল। শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সে। করিডোর ধরে হেঁটে সিঁড়ির পাশের খোলা জায়গাটায় এসে থামলো। দুই তলা বাড়িটা এমনভাবে করা যে ওপর থেকে নিচের ড্রইংরুমটা বেশ পরিষ্কারই দেখা যায়। সিঁড়ির রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে একটু নিচে তাকাতেই রিমির চোখে পড়লো ড্রইংরুমে সবাই প্রায় বসে আছে। প্রথম সোফায় বসে আছেন আরাফাত সাহেব। মুখটা গম্ভীর, কথাবার্তার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা চলছে। তার পাশে বসে আছে আরশান। ছেলেটা মন দিয়ে বাবার কথা শুনছিল। আরাফাত সাহেব ধীর গলায় বলছিলেন…

“ফার্মের কাজটা কিন্তু আর দেরি করা যাবে না, আরশান। নতুন ডেইরি ইউনিটের কাজ প্রায় শেষ। এখন প্রসেসিং সেকশনটা ঠিকমতো সেটআপ করতে হবে। আমি চাই না উদ্বোধনের আগে কোনো ঝামেলা হোক”

আরশান মাথা নাড়লো — “কোনো সমস্যা হবেনা, প্রয়োজন হলে আমি আবারও সাইটে যাবো। ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা হয়েছে। সবকিছু সময়মতো শেষ হয়ে যাবে।”

রিমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিচের দৃশ্যটা দেখছিল। গতকাল ইনায়া বলেছিল তাদের কয়েকটা বড় এগ্রো ফার্ম আছে শহরের বাইরে। কথাবার্তা শুনে মনে হলো সেগুলোর কাজ নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। তার চোখ অজান্তেই চলে গেল আরশানের দিকে। গতরাতে বারান্দা থেকে দূর থেকে দেখেছিল ছেলেটাকে, আজ একটু পরিষ্কার করে দেখা যাচ্ছে। লম্বা গড়ন, গম্ভীর একটা ভাব। কথাবার্তার ভঙ্গিতে বোঝা যায়, বাড়ির বড় ছেলের দায়িত্বটা সে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই সামলায়। গত রাতে চশমা পড়া ছিলো, আজ চশমা ছাড়া খানিকটা অন্যরকম লাগছে। ঠিক তখনই করিডোর দিক থেকে পায়ের শব্দ এলো। আয়ান নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিচের ড্রইংরুমে ঢুকলো। তার চোখ একবার ওপরের দিকে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু রিমি রেলিংয়ের পাশে একটু আড়ালেই দাঁড়িয়ে ছিল বলে হয়তো ঠিকভাবে চোখে পড়েনি। সে সোজা গিয়ে সোফায় বসে পড়লো। মুখটা এখনও একটু গোমড়া। রিমি বুঝতে পারছিল না নিচে নামা ঠিক হবে কি না। পরিবারের সবাই যখন একসঙ্গে বসে আছে, সেখানে তার উপস্থিতিটা যেন একটু অস্বস্তিকর লাগছিল। মনে হচ্ছিল, চুপচাপ আবার নিজের ঘরে ফিরে গেলেই হয়তো ভালো হতো। তখনই রান্নাঘরের দিক থেকে ইনায়া বেরিয়ে এলো। তার হাতে একটা ট্রে, যাতে চা আর কফির কাপ সাজানো। ড্রইংরুমে ঢুকেই সে কাপগুলো টেবিলে রাখলো, তারপর হঠাৎ মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাতেই রিমিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো….

“এই! তুই ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

রিমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল — “না, এমনি”

“এমনি মানে কী? নিচে আয়, বস”

ইনায়ার ডাকে আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক মনে হলো না। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো রিমি। এই সময়েই আরশান পাশ ফিরে তাকালো। প্রথমে তার দৃষ্টি পড়লো রিমির ওপর, রিমি যে তার বোনের বান্ধবী এটা সকালে মায়ের কাছে শুনেছে তাই নতুন করে আর ওর ব্যাপারে আরশান কোনো প্রশ্ন তুললো না। রিমি নিচে নেমে সোফার এক পাশে চুপচাপ বসে পড়লো। নতুন পরিবেশে নিজেকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে রাখার চেষ্টা করছে যেন। হঠাৎই তার মনে হলো কেউ তাকিয়ে আছে। চোখ তুলে তাকাতেই আরশানের দৃষ্টি তার সঙ্গে মিললো। রিমি তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে নিল। আরশানও আবার বাবার কথায় মন দিল। ইনায়া তখন সবার সামনে কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বললো…

“ভাইয়া, এই কফিটা নাও। আজ কিন্তু আমি বানিয়েছি”

পাশ থেকে আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো..

“তাহলে আমি চা নেবো। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে চাই না”

ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙ্গালো আর তখনই ড্রইংরুমে ছোট্ট একটা হাসির আবহ তৈরি হলো। রিমি চুপচাপ বসে রইলো। নতুন বাড়ির পরিবেশটা বোঝার চেষ্টা করছে যেন। চারপাশে কথাবার্তা চলছে, আর এই ড্রইংরুমেই প্রথমবারের মতো সে এই পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে আছে! ড্রইংরুমের আড্ডাটা বেশিক্ষণ চললো না। সকালের নাস্তা শেষেই আরাফাত সাহেব নিজের ঘরে চলে গেলেন। ফার্মের কাজ নিয়ে হয়তো আবার ফোনে কথা বলতে হবে। আয়ানও বেশিক্ষণ বসে থাকলো না, একটু পরেই প্রাইভেটে যেতে হবে ভেবেই ফোনটা হাতে নিয়ে গোমড়া মুখেই নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। কয়দিন পরেই ওর একাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষা! ইনায়া আর রিমি তখন কিছুক্ষণ বসে গল্প করলো। তারপর ইনায়া বললো—

“চল, তোর ঘরটা গুছিয়ে ফেলি। দুপুরের আগেই সেট করে ফেলি, পরে আবার আলসেমি লাগবে”

রিমিও রাজি হলো। দুজনেই ওপরতলায় উঠে গেল। ওদিকে দুপুরের দিকে বাইরে থেকে ফিরে আরশানও বাসায় ঢুকলো। সকালে একটু কাজ ছিল, তাই বের হতে হয়েছিল তাকে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই করিডোরের শেষের দিকের একটা ঘরে নড়াচড়ার শব্দ পেল। দেখলো, দরজাটা খোলা। ভেতরে ইনায়া দাঁড়িয়ে বিছানার চাদর ঠিক করছে। আরশান একটু থেমে জিজ্ঞেস করলো—

“কী করছিস?”

ইনায়া মাথা তুলে তাকালো।

“ওহ ভাইয়া! তেমন কিছু না, এই ঘরটা একটু রেডি করছি”

“কার জন্য?”

“রিমির জন্য। কাল তো আমার ঘরেই ছিল। আজ থেকে এই ঘরটা ও থাকবে। ওহ হ্যাঁ, বলতেই ভুলে গেছি। তোমাকে আমার বান্ধবীর কথা বলেছিলাম না? ওই সে, আমাদের বাসায় থাকবে এখন থেকে”

আরশান হালকা মাথা নাড়লো। বিশেষ কিছু বললো না। সব যেহেতু জানে তাই বিষয়টা তার কাছে নতুন কিছু নয়। ঠিক তখনই ইনায়ার ঘরের দরজা খুলে গেল। রিমি নিজের ছোট ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো। সম্ভবত নিজের জিনিসগুলো নতুন ঘরে নিয়ে আসছিল। ঘরের সামনে এসে হঠাৎই সামনে আরশানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু থমকে গেল সে। মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। রিমি তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল। কোনো কথা না বলেই ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে সেই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল যেখানে ইনায়া দাঁড়িয়ে ছিল। আরশান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর যেন কিছু মনে পড়তেই হাতে ধরা ব্যাগটা ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।

“এইটা তোর জন্য এনেছি”

ইনায়া অবাক হয়ে ব্যাগটা নিল — “এত কী?”

“কিছু খাওয়ার জিনিস আছে”

কিছুটা থেমে তারপর হালকা গলায় বললো…

“তোর বান্ধবীর সঙ্গে ভাগ করে খাস”

কথাটা বলেই আরশান আর দাঁড়ালো না। ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।ইনায়া কৌতূহল নিয়ে ব্যাগটা খুলে ভেতরে উঁকি দিতেই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

“ওহহ! ভাইয়া আমার ফেভারিট চকোলেট কেক এনেছে”

রিমি তখন নিজের ব্যাগটা বিছানার পাশে রাখছিল। ইনায়ার কথায় তাকিয়ে হালকা হাসলো। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বললো…

“এইটা কিন্তু আমরা দুজনেই খাবো। ভাইয়া নিজেই বলেছে ভাগ করে নিতে”

রিমি মৃদু হাসলো। নতুন ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকালো সে। দুপুরের রোদ উঠোনে পড়ে আছে, চারপাশটা শান্ত।
______________________________

বিকেলের সূর্য জানালার কাচে হালকা হলুদ আলো ছড়াচ্ছিল। রিমি জানালার পাশে বসে বাইরে তাকালো। উঠোনে ধীরে ধীরে ছায়া পড়ছে, গাছের পাতায় বাতাসে নরম দুলন, দূরে আকাশে হালকা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। ইনায়া বিছানার পাশে বসে আছে, তখনই হুট করে বলে উঠলো…

“রিমি, জানিস তো, অনার্সের ভর্তি শুরু হয়ে গেছে। আমি তো ঠিক করে নিয়েছি কোন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবো”

রিমি হালকা মাথা নাড়লো। ও জানে ইনায়া কোনো এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। কিন্তু ওর সঙ্গে সেখানে যাওয়া সম্ভব হবেনা, খরচ বেশি। রিমি নিজস্বভাবে ভাবছে, কোন কলেজে ভর্তি হলে ব্যয় কম হবে, সেটাই তার জন্য ভালো হবে। ইনায়া মুখে আনন্দ নিয়ে বললো…

“আমরা একসাথে ভর্তি হবো, একসঙ্গে যাবো। তারপর ক্লাস, কুইজ, আড্ডা, ঘোরাঘুরি সব মিলিয়ে একসাথে অনেক মজা করবো”

রিমি হালকা হেসে জানালার দিকে তাকালো, নিজ মনে সিদ্ধান্তটা স্থির করে নিল। ঘরের দরজা খোলা ছিলো, আয়ান করিডোর দিয়ে হেঁটে ওপরে ছাদে যাওয়ার সময় দুজনের কথার কিছুটা শুনে হেসে বললো…

“ওহও! মনে হচ্ছে দুই পেঁচা মিলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা করছে। দেশটা বুঝবি এবার ডুবেই যাবে”

ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ ধমকে উঠলো — “চুপ কর বেয়াদব! আগে ইন্টার পাশ কর তারপর অন্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করিস”

আয়ান মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল। রিমি হালকা হেসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। বিকেলের হালকা বাতাস গরম আর রোদ দুটো মিলিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে প্রশান্তি নিয়ে আসছিল। রিমির মনে হলো, নতুন পরিবেশে নিজের পথ খুঁজে নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইনায়ার উচ্ছ্বাস শুনলেও সে নিজের পরিকল্পনা ঠিক করে নিয়েছে যে কলেজে খরচ কম, সেখানে ভর্তি হবে।

চলবে….

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1C9Bb8QhAG/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here