মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #বোনাস_পর্ব

0
31

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#বোনাস_পর্ব

রিমি নিজের বাজেটসই একটি কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল। সে ভাবছিল, যেখানে খরচ কম, সেখানে ভর্তি হওয়াই এখন তার জন্য ভালো। কিন্তু আরাফাত সাহেব স্বেচ্ছায় রিমিকে নিজের মেয়ের সঙ্গে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রিমি দ্বিধা করেছিলো, ও জানিয়েছিলো যে নিজের পড়াশোনার জন্য সে নিজস্বভাবে টাকা জমিয়েছে, তাই খরচ চালাতে পারবে। কিন্তু আরাফাত সাহেব শান্ত, দৃঢ় ভঙ্গিতে ওকে বলেন…

“ওই জমানো টাকাগুলো যদি তুমি ভাঙতে শুরু করো তাহলে দু’দিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে, রিমি। এই সময়ে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের জন্য নিজস্ব সঞ্চয় থাকা খুব জরুরি”

রিমি চিন্তায় পড়ে গেল। সত্যিই তো, আজকের যুগে নিজের টাকা না থাকলে চলা মুশকিল। টাকা না থাকলে দাম নেই সেটা ও নিজের বাড়িতে থাকা অবস্থায় চাচা চাচীর আচরণ দেখেও বুঝেছিলো। আরাফাত সাহেব শুনেছিল তার পরিচিত কিছু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার যাবতীয় খরচ তিনি নিজে বহন করেন। রিমিও সেসব ছেলেমেয়েদের মধ্যে একজন! শেষপর্যন্ত, চিন্তাভাবনা করে রিমি রাজি হয়ে গেলো। আরাফাত সাহেব ভর্তি করিয়ে দিলেন কিন্তু রিমি তার নিজের সঞ্চয় থেকে ভর্তি খরচের অর্ধেক দেয়। আরাফাত সাহেব কোনো আপত্তি করেননি। বরং ভার্সিটিতে যোগাযোগ করে রিমির বেতনও অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিলেন। তার সুপারিশে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী কম খরচে পূর্বেও ভর্তি হতে পেরেছে। রিমি যখন পরবর্তী ধাপের খরচ নিয়ে চিন্তা করছিলো তার আগেই আরাফাত সাহেব ওকে জানান এইসব নিয়ে ওকে ভাবতে হবেনা, উনি ব্যবস্থা করে দেবেন।

রিমির প্রতি আরাফাত সাহেবের এই দয়ালু মনোভাবের পেছনে একটা গভীর কারণও ছিল। ইনায়া যখন হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল, তখন ও অন্যদের তুলনায় একটু ভিন্ন ধরনের ছিলো। একা থাকতে ভালোবাসতো, কারো সঙ্গে খুব বেশি মিশতো না। যারা কথা বলতে চাইতো, তাদেরকে মাঝে মাঝে বিরক্ত মনে হতো। বাড়ির সবার সঙ্গে আচরণও অনেকটা এমনই ছিলো। ডাক্তার দেখিয়েও বিশেষ লাভ হচ্ছিলো না। আরাফাত সাহেব মেয়ের এই ভিন্ন ধরনের মনোভাব নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ইনায়াকে যে স্কুলে ভর্তি করা হয় সেখানে রিমি আগে থেকেই পড়াশুনা করতো। শুরুতে ইনায়া ঠিক আগের মতোই চুপচাপ, স্বাভাবিকভাবে অন্যদের সঙ্গে মিশতে চায়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে রিমি ওর পাশে বসে কথা বলতে শুরু করে। রিমি ছিলো বেশ মিশুক প্রকৃতির, ইনায়া ওর প্রশ্নের উত্তর না দিলে ও নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর করতো। শুরুতে বিরক্ত হলেও পরে ও রিমির কান্ডগুলো ইনজয় করতে শুরু করে। সপ্তম শ্রেণীতে ওঠার পর ইনায়া রিমির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে এবং তার স্বভাবেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। সেই অভিজ্ঞতার ফলে, আরাফাত সাহেব রিমির জন্য দয়া এবং শিক্ষার সুযোগে কোনো সীমা আরোপ করেননি বরং তিনিও চাইছিলেন রিমি এখনও ইনায়ার সঙ্গেই থাকুক।
_____________________________

আজ রিমি ও ইনায়ার ওরিয়েন্টেশন ক্লাস। আজ ওদের পৌঁছে দিতে নিজেই বের হয়েছে আরশান। একই পথে আয়ানের কলেজ, ওর পরীক্ষা চলছে। যাওয়ার পথে ওকেও দিয়ে যাবে। রিমি আর ইনায়া দুজনেই তৈরি হয়ে নিচে নেমে এসেছে। গাড়ির দরজা খুলতেই রিমির চোখ পড়লো ব্যাক সিটে, আয়ান এমনভাবে লম্বা হয়ে বসে আছে যেন পুরো সিটটাই ওর একার। সেখানে আর দুজনের জায়গা হওয়ার প্রশ্নই নেই। ইনায়া একবার তাকিয়ে বুঝে গেল, আয়ানকে সরতে বলেও বিশেষ লাভ হবে না। উল্টো আরও ত্যাঁড়ামো শুরু করবে। এর মধ্যে দেরিও হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা দেখে আরশান সামনের সিট থেকে শান্ত গলায় বলল…

“তোমাদের মধ্যে কেউ একজন সামনে এসে বসো”

ইনায়া তখনই রিমির দিকে তাকিয়ে বলল— “তুই সামনে বস”

কথা বলেই সে আয়ানকে একটু ঠেলে সরিয়ে নিজেই পেছনে বসে পড়ল। রিমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। আর কোনো উপায় না দেখে ধীরে ধীরে গিয়ে সামনের সিটে বসে পড়ল। তবে আরশানের পাশে বসতেই কেন যেন রিমির বুকের ভেতর হালকা একটা অস্বস্তি কাজ করতে লাগল। ছেলেটা স্বভাবে খুবই গম্ভীর কম কথা বলে, আর মুখের ভাবটাও সবসময় বেশ কঠিন। এই বাড়িতে আসার পর থেকেই বিষয়টা রিমির নজরে পড়েছে। ওপর তলায় চারটা ঘর। মুখোমুখি ইউনিটে দুইটা বড় মাস্টাররুম, আর তার সঙ্গে লাগোয়া পাশে ছোটো একটি করে ঘর।ইনায়ার ঘরের ঠিক সামনেই আরশানের ঘর!রাতে মাঝে মাঝেই ওর ঘর থেকে উচ্চস্বরে কথা শোনা যায়। কাজের কোনো ভুলচুক হলেই ফোনে সেক্রেটারির ওপর ভীষণ রাগারাগি করে আরশান। দূরত্ব আছে কিছুটা তবুও রিমির ঘর থেকেও সেই গম্ভীর কণ্ঠের কিছুটা ভেসে আসে। সেই থেকেই যতটা সম্ভব ওর চোখের আড়ালে থাকার চেষ্টা করে রিমি। আর আজ কিনা সবকিছুর পর ওকে এসে বসতে হলো ঠিক আরশানের পাশেই! কিছুক্ষণ পরই আয়ানের কলেজের সামনে গাড়ি থামল। বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয় ওর কলেজ। গাড়ি থামতেই আয়ান ব্যাগটা কাঁধে তুলে নেমে পড়ল। ইনায়ার অনেক তৃষ্ণা পেয়েছে কিন্তু গাড়িতে পানি নেই, তাই ও পাশের দোকান থেকেই একটা পানির বোতল নিয়ে আসার জন্যে তাড়াহুড়ো করে নেমে গেল। গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই হঠাৎ করে ভেতরে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এখন গাড়িতে শুধু দুজন, রিমি আর আরশান। রিমির ভেতরটা কেমন যেন অস্বস্তিতে ভরে উঠল। একে তো আরশানকে দেখলেই ওর ভয় ভয় লাগে, তার ওপর আবার একসঙ্গে এভাবে গাড়িতে একা বসে থাকা। কী করবে বুঝতে না পেরে সে চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে তখন সকালের ব্যস্ততা। রাস্তার দু’পাশে মানুষজনের আসা-যাওয়া, দূরে কোথাও হালকা হর্নের শব্দ। ভেতরের অস্বস্তিটা একটু কাটানোর জন্য রিমি ভাবল জানালার কাচটা খুলে দিলে হয়তো একটু হাওয়া লাগবে। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সে কাচটা নামিয়ে দিল।কিন্তু কাচ পুরো নামার আগেই অপরপাশ থেকে সেটাকে আবার তুলে দিল আরশান!রিমি অবাক হয়ে পাশে তাকাল। আরশান স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখেই গম্ভীর স্বরে বলল…

“জানালা খোলা রাখা যাবেনা”

তার গলায় রাগ ছিল না, তবে বলার ভঙ্গিটা এতটাই কঠিন যে আপত্তি করার সুযোগও যেন নেই। রিমি কিছু বলার আগেই সে সংক্ষেপে যোগ করল — “আমার ডাস্ট অ্যালার্জি আছে”

রিমি চুপ করে গেল। আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে সামনে তাকিয়ে বসে রইল। গাড়ির ভেতর আবারও নীরবতা নেমে এলো। শুধু এয়ারকন্ডিশনের হালকা শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। এই নীরবতাটা কেন যেন রিমির কাছে আরও অস্বস্তিকর লাগছিল। আরশানের পাশে বসে থাকতে থাকতে তার মনে হচ্ছিল, সময়টাও যেন অদ্ভুত ধীরগতিতে এগোচ্ছে!
____________________________

ভার্সিটির প্রথম দিনটা শেষ পর্যন্ত বেশ ভালোই কাটল রিমি আর ইনায়ার। নতুন ক্যাম্পাস, নতুন মুখ, আর চারপাশের ভিন্ন এক পরিবেশ সব মিলিয়ে দিনটা কেমন যেন ব্যস্ততার মধ্যেই কেটে গেল। ওরা ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে। যেহেতু আজ শুধু ওরিয়েন্টেশন ছিল, তাই ক্লাস তেমন একটা হয়নি। আনুষ্ঠানিক কিছু কথা, বিভাগ সম্পর্কে ধারণা আর কয়েকজন শিক্ষকের পরিচয়ের মধ্যেই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, অন্য দিনের তুলনায় আজ তারা বেশ আগেই বাড়ি ফিরে আসে। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই ড্রয়িংরুম থেকে হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসছিল। আয়ান আর ইনায়া দুজনেই তাদের মায়ের সঙ্গে খুনসুটি করছে। কখনো কেউ কাউকে দোষ দিচ্ছে, আবার কেউ মজা করে প্রতিবাদ করছে। তাদের সেই হালকা, নিশ্চিন্ত হাসির শব্দে পুরো ঘরটা যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। রিমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। দৃশ্যটা দেখতে ভালো লাগছিল বটে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ওর মনে হলো এই পারিবারিক উষ্ণতার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে দেওয়াটা যেন ঠিক মানায় না। চুপচাপ ও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল সে। ঘরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিল। তারপর ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে বিছানার একপাশে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে মায়ের নামটা ভেসে উঠতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে এলো।
ফোনটা রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল। মা – মেয়ের কিছুক্ষণ ব্যক্তিগত কথা চললো। ওপাশে মা মন দিয়ে শুনছিলেন। রিমি সংক্ষেপে দিনের কথা বলল ক্যাম্পাসটা কেমন, ওরিয়েন্টেশনে কী কী হয়েছে, ইনায়ার সঙ্গে কেমন সময় কাটল। মায়ের কণ্ঠে মাঝেমধ্যে মৃদু স্বস্তির সুরও শোনা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মা একটু দ্বিধাভরা গলায় বললেন…

“আমি ওই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলেছিলাম”

রিমি বুঝতে পারল, মা কী নিয়ে বলছেন।বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।

“কী বলল তারা?”

ওপাশে মা একটু থেমে বললেন — “আমি কথা বলেছি। আমার হাসবেন্ডের আপত্তি নেই কিন্তু আমার শাশুড়ি একটু আপত্তি করছে। তবে তুই চিন্তা করিস না, তার ছেলে যখন রাজি উনিও আপত্তি করবেন না। আর কয়েকটা দিন কষ্ট করে ওখানে থাক, তারপর তোকে আমার কাছে নিয়ে আসবো”

মায়ের কথাগুলো শুনে মনটা হালকা ভারী হয়ে উঠলেও সে সেটা গলায় প্রকাশ করল না। বরং শান্ত স্বরে বলল…

“আমি এখানে ভালোই আছি, তুমি চিন্তা করো না”

ওপাশে মা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিলেন মেয়েটা নিজেকে সামলে কথা বলছে। কথোপকথনটা আর কিছু সাধারণ খোঁজখবরের মধ্যেই শেষ হলো। ফোন কেটে যাওয়ার পর রিমি কিছুক্ষণ একইভাবে বসে রইল। ঘরের ভেতরটা নীরব। বাইরে কোথাও দূরে ইনায়া আর আয়ানের হাসির শব্দ এখনো ভেসে আসছে। রিমি ধীরে ধীরে চোখ তুলে জানালার দিকে তাকাল। জীবনটা যেন এখনো কোথায় গিয়ে থেমে আছে কিন্তু ঠিক কোন দিকে এগোবে, সেটার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1KcKfwrJxn/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here