মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_০৩

0
31

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_০৩

ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো রিমি, হঠাৎ মনে পড়ল ওর ফোনটা ইনায়ার টেবিলের ওপর রয়ে গেছে। ডিনার শেষে গল্প করতে গেছিলো, পরে কথার তালে তালে বেরিয়ে এসেছিল। ফোন আনার উদ্দেশ্যে রিমি কিন্তু দরজা খুলেই যেন হঠাৎ থমকে গেল। করিডোরের বাতিটা জ্বলছে এখনও আর ঠিক সামনেই, নিজের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল আরশান। এক হাত পকেটে ঢোকানো, অন্য হাতে ফোনটা কানে ধরা। গলাটা নিচু, কিন্তু ভঙ্গিটা আগের মতোই গম্ভীর আর স্থির। মনে হচ্ছিল কোনো কাজের ব্যাপারেই কথা বলছে। এতো রাতে তাকে দেখামাত্রই রিমি চমকে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হয়ে গেল দুজনের আর ঠিক পরের মুহূর্তেই রিমি প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবার দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। ভেতরে ঢুকে দ্রুত দরজা আটকে দিল, যেন সে কোনো ভূত দেখেছে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা আরশান পুরো ঘটনাটা চোখের সামনে দেখল। সে ফোনে কথা বলছিল ঠিকই, কিন্তু রিমির এই আচরণটা তার নজর এড়াল না। কথা বলতে বলতেই সে কয়েক সেকেন্ড দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল। ভ্রু দুটো অল্প কুঁচকে উঠল তার। মেয়েটা তাকে দেখামাত্রই এমনভাবে ভেতরে ঢুকে দরজাটা এভাবে বন্ধ করে দিল কেন? বিষয়টা আরশানের মোটেই পছন্দ হলো না। ফোনের ওপাশে তখনো কেউ কিছু বলছে, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য আরশানের মনটা যেন অন্যদিকে চলে গেল। তার দৃষ্টি এখনো সেই বন্ধ দরজাটার দিকেই স্থির!

সপ্তাহ খানেক পরে….এক সন্ধ্যায় আরশানদের পারিবারিক উকিলের বাসায় একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠান ছিল। দীর্ঘদিনের পরিচিত হওয়ায় তাদের পুরো পরিবারকেই দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আরাফাত সাহেব তখন কোনো জরুরি কাজে শহরের বাইরে। তাই যাওয়ার দায়িত্বটা পড়ল আরশানের ওপর। কথা ছিল, সে একাই যাবে। গিয়ে একটু সময় কাটিয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু খবরটা শোনার পর থেকেই ইনায়া বায়না ধরল সেও যেতে চায়। আরশান নিতে রাজি হতেই ইনায়ার মুখ তখনই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আসলে এই যাওয়ার পেছনে ইনায়ার আলাদা একটা কারণ ছিল। উকিল সাহেবের বড় ছেলেটাকে সে বেশ পছন্দ করে। ছেলেটা ওই বাড়িতেই থাকে, তাই অনুষ্ঠানের খবর পাওয়ার পর থেকেই ইনায়ার ভেতরে উত্তেজনা কাজ করছিল। এই কারণেই সে রিমিকেও তৈরি হতে বলল। রিমি প্রথমে একটু ইতস্তত করেছিল। এই বাড়িতে নতুন এসেছে, তাই অচেনা মানুষের ভিড়ে যেতে খুব একটা স্বস্তি লাগছিল না তার। কিন্তু ইনায়া যখন একটু গোপন ভঙ্গিতে বলল…

“জানিস, ও আজকে বাড়িতেই থাকবে”

রিমির কৌতূহল তখন হঠাৎই বেড়ে গেল। গত কয়েকদিন ধরেই ইনায়া এক ছেলের কথা বারবার বলছিল। কথা বলতে বলতে কখনো হেসে ফেলত, কখনো আবার অকারণে চুপ হয়ে যেত। কিন্তু যতবারই রিমি ছবিটা দেখতে চেয়েছে, ইনায়া কেবল হতাশ মুখে বলেছে
ছেলেটার কোনো ছবি ওর কাছে নেই কারণ ওদের দেখাই হয় খুব কম! এই নিয়ে রিমির আগ্রহটা বেশ জমে ছিল। বেস্টফ্রেন্ডের পছন্দের মানুষটা কেমন, সেটা না দেখে কি আর থাকা যায়? অবশেষে কৌতূহলের কাছেই হার মানল রিমি। দুজনেই নিজেদের ঘরে গিয়ে তৈরি হতে শুরু করল। এদিকে ড্রইংরুমের সোফায় এলিয়ে পড়ে ছিল আয়ান। সামনে বই খোল কিন্তু চোখে-মুখে এমন এক ক্লান্ত ভাব, দেখলেই বোঝা যায় পরীক্ষার চাপে বেচারার অবস্থা বেশ করুণ।রিমি আর ইনায়া সেজেগুজে যখন ড্রইংরুম দিয়ে বেরোচ্ছিল, আয়ান একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল…

“আহা, কী আরাম তোমাদের!”

ইনায়া চওড়া একটা হাসি দিয়ে রিমিকে বিয়ে বেরিয়ে এলো। আজ আর রিমিকে সামনে বসতে হয়নি। ইনায়ার পাশেই পিছনের সিটে বসেছে সে। যাওয়ার পুরোটা পথ দুজনে গল্প করছিল।কখনো ইশারা ইঙ্গিতে ওই ছেলেটার কথা, কখনো অনুষ্ঠানে কী হতে পারে এসব নিয়ে। রিমিও মাঝেমধ্যে হেসে সায় দিচ্ছিল। কিন্তু সামনের সিটে বসে থাকা আরশান পুরোটা রাস্তা প্রায় নীরবই রইল। প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলল না। মাঝে মাঝে শুধু রেয়ার ভিউ মিররে চোখ পড়ছিল তার, কিন্তু সে নিজেই যেন খেয়াল না করার ভান করে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল উকিল সাহেবের বাড়ির সামনে। বড়সড় বাড়ি, চারপাশে আলো ঝলমল করছে। ভেতর থেকে মানুষের কোলাহল আর কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে। গাড়ি থেকে নেমেই ইনায়া চারপাশে তাকাতে লাগল, চোখে যেন স্পষ্ট এক ধরনের খোঁজার ব্যস্ততা। কিছুটা ভেতরে যেতেই ইনায়া হঠাৎই থেমে গেল। তারপর খুব আস্তে করে রিমির হাত টেনে একদিকে ইশারা করল— “ওই যে, ওটাই”

রিমি তাকিয়ে দেখল, একটু দূরে কয়েকজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে এক ছেলে। লম্বা গড়ন, পরিপাটি পোশাক, হাসলে মুখটা বেশ উজ্জ্বল লাগে। রিমি চোখ সরিয়ে আবার ইনায়ার দিকে তাকাল — “ছেলেটা কিন্তু বেশ হ্যান্ডসাম, তোর পছন্দ আছে বলতে হবে”

ইনায়া হাসলো! কিছুক্ষণ পর সুযোগ বুঝে ইনায়া সত্যিই এগিয়ে গেল ছেলেটার দিকে। হয়তো কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেছে। রিমি তখন একা দাঁড়িয়ে, চারপাশে অনেক মানুষ। কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে, কেউ আবার ব্যস্তভাবে এদিক-সেদিক হাঁটছে। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেও হঠাৎ করেই নিজেকে একটু বেমানান লাগতে শুরু করল তার। কোথায় বসবে, কার সঙ্গে কথা বলবে কিছুই যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। ইনায়াকে চোখে পড়ছে ঠিকই, কিন্তু সে তখন ছেলেটার সঙ্গে কথায় ব্যস্ত।রিমি ওদের বিরক্ত করতে চায়না, ও একটু অস্বস্তি নিয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল ঠিক তখনই পাশে কারও উপস্থিতি টের পেল। মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল আরশান দাঁড়িয়ে আছে। কখন সে এসে দাঁড়িয়েছে, মেয়েটা খেয়ালই করেনি। রিমির বুকের ভেতরটা হঠাৎই ধক করে উঠল। প্রতিবারের মতোই সে স্বভাবতই একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু এবার আরশান যেন আগেই সেটা বুঝে ফেলেছিল। এক পা এগিয়ে এসে তার পথটা প্রায় আটকেই দিল। গলাটা নিচু, কিন্তু স্বরে স্পষ্ট বিরক্তি মিশে আছে…

“তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন?”

হঠাৎ এমন প্রশ্নে রিমি একেবারে থমকে গেল!

“চুপ করে আছো কেনো? খুব কঠিন প্রশ্ন তো করিনি”

মেয়েটা নীরব, চোখ নিচু করে আছে! এবার আরশান রিমির থুতনিটা এক হাতে উচু করলো, সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল…

“শুরু থেকেই দেখছি আমার সামনে পড়লেই তুমি সরে যাও! Am I a wolf to you, or what?

রিমি পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এত লোকজনের মাঝখানে এতটা কাছে এসে এমনভাবে প্রশ্ন করবে এটা ও একদমই আশা করেনি। ওর পা দুটো দুটো রীতিমত কাপতে শুরু করলো, ও ইতস্তত করে বলল…

“আমি..আমি তো আপনাকে এড়িয়ে চলছি না”

আরশানের ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠল — “সত্যি?”

রিমি একটু গলা সামলে বলল — “হ্যাঁ সত্যি, হয়তো আপনি ভুল বুঝছেন”

কয়েক সেকেন্ড দুজনের মধ্যে নীরবতা নেমে এল। আরশান স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এরপর হাঁটতে শুরু করে বললো — “come with me”

ইনায়া ব্যস্ত আছে দেখে রিমিও আরশানের পিছু পিছু চললো, ওরা গিয়ে একটা টেবিলে বসলো। আরশান সফট ড্রিংকস আর কিছু স্ন্যাকস নিলো। রিমির অনেক খিদে পেয়েছে তাই ও খেতে শুরু করে দিলো, কিছুটা শুকনো খাবার খাওয়ার পর যেই জুসে একটু চুমুক দিয়েছে অমনি একপ্রকার বিরক্তি মাখা কন্ঠে আরশান প্রশ্ন ছুড়ে দিলো…

“সেদিন করিডোরে আমাকে দেখেই দরজা বন্ধ করলে কেন?”

কথাটা শুনে রিমির গলায় যেনো জুস আটকে গেছিলো, কোনোরকম তা গিলে নিয়ে ও চুপ করে গেল। ওই ঘটনাটা যে আরশানের নজর এড়ায়নি, সেটা বুঝতেই তার আরও অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। রিমি চোখ নামিয়ে একটু অপ্রস্তুত গলায় বলল…

“আসলে আমি আপনাকে ফোনে কথা বলতে দেখেছিলাম। তাই ভাবলাম বিরক্ত করা ঠিক হবে না”

আরশান কয়েক মুহূর্ত কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। মনে হচ্ছিল, সে যেন কথাটার ভেতরে অন্য কিছু খুঁজছে।তারপর ধীরে ধীরে বলল — “তাই নাকি?”

রিমি বুঝতে পারছিল না, এই কথোপকথনটা এখানেই শেষ হয়েছে কিনা। কিন্তু আরশানের চোখে তখনও সেই একই অদ্ভুত স্থির দৃষ্টি।যেন সে সত্যিই বুঝে নিতে চাইছে মেয়েটা কি সত্যিই তাকে এড়িয়ে চলে না, নাকি ইচ্ছে করেই দূরে থাকার চেষ্টা করে। তার চোখ এখনো রিমির দিকে স্থির, রিমিও একটু পর চোখ তুলে ওর দিকে তাকালো। আরশানকে দেখামাত্রই সে স্বভাবতই সরে যায়। কখনও পেছনে হেলায়, কখনও সামান্য দূরে দাঁড়ায়, যেন তার উপস্থিতি এড়ানো যায়। এতদিন সে এভাবে নিজের পথ বের করতে শিখেছে। কেউ কাছে এলেই চুপচাপ নিজেকে সরিয়ে নেওয়া বা সামান্য দূরে দাঁড়ানো। কিন্তু আজ আরশান শুধু সামনেই বসে নেই বরং তার চোখে এক ধরনের কড়া আদেশসূচক দৃষ্টি যেন স্পষ্টভাবে বলছে, “তুমি আমার সামনে এভাবে সরে যাবে না”।আরশান কঠোর কন্ঠে বললো…

“তোমার এমন স্বভাব মানায় না। যাদের বাড়িতে থাকছ, তাদের কাউকে এভাবে এড়িয়ে যাওয়াটা খুব ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না”

কথাটা বলার ভঙ্গিটা এতটাই সোজাসাপটা ছিল যে রিমি মুহূর্তের জন্য একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে সত্যিই আশা করেনি আরশান এভাবে বলবে। এতদিন দূর থেকে তাকে দেখে তার মনে একটা আলাদা ধারণা তৈরি হয়েছিল চুপচাপ, গম্ভীর, নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত একজন মানুষ। কিন্তু এই মুহূর্তে তার কথার ভঙ্গিতে যেন অন্যরকম একটা তীক্ষ্ণতা রয়েছে। রিমি হালকা কণ্ঠে বলল…

“আপনি ভুল বুঝছেন, আমি…”

আরশান রিমির দিক থেকে চোখ সরিয়ে খাওয়ায় মন দিলো যেন রিমির কোনো কথা তার কাছে কোনো গুরুত্ব রাখে না। এর মধ্যে কেউ একজন ডাকলো আরশানকে, ও উঠে যাওয়ার সময় একনজর রিমির দিকে তাকিয়ে টেবিলে এক হাতে ভর দিয়ে হুট করেই রিমির অনেকটা কাছে এসে শীতল কণ্ঠে বললো…

“I don’t care what you think about me, but one thing you should know…I’m not a gentleman. So remember what I said today”

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/18dAYrqt8B/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here