#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_০৪
সেই পার্টিতে আরশানের আচরণ দেখে রিমির মধ্যে অদ্ভুত এক ভয় কাজ করতে শুরু করেছিল। এতদিন সে শুধু দূর থেকে আরশানকে দেখেছে, যদিও দিনের বেশির ভাগ সময় ও অফিসে থাকে। তবুও নিত্যদিনের সীমিত আচরণ আর পার্টিতে ওর আচরণের মধ্যে তফাৎ এত বড় যে রিমি সত্যিই হতবাক হয়ে যায়। সে ঠিক বুঝতে পারছিল না আরশান কি সত্যিই এমন, নাকি শুধু তার সঙ্গে এমন আচরণ করছে? আর যদি ইচ্ছে করেই করছে, তার কারণও রিমির বোধের বাইরে। কদিন ধরে এসব ভেবে ভেবে রিমির মাথার রগগুলো টনটন করে উঠছিল। সেই পার্টির পরে আরশান ফার্মের কাজের কোনো একটা সমস্যার জন্যে আবার চলে গেলে রিমি যেন একটু মানসিক স্বস্তি পেল। ভয় কমেছে বটে আর এটাও ঠিক করে নিয়েছে যে আরশানের আদেশ শুনতে ও রাজি নয়! কোনো এক সকালে…ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রিমি চুল আঁচড়াচ্ছিল। চিরুনিটা একপাশে ফেলে সে আয়নার দিকে তাকালো, নিজের মুখ ও শরীরের ভাষার দিকে মনোযোগ দিল। কোমরে দু হাত রেখে খানিকটা গম্ভীর ভঙ্গিতে, আরশানের কণ্ঠের নকল করার চেষ্টা করে বলল…
“যাদের বাড়িতে থাকছ, তাদের কাউকে এভাবে এড়িয়ে যাওয়াটা খুব ভদ্রতা নয়। আরেকটা কি যেনো…ওহ হ্যাঁ, I’m not a gentleman. So remember what I said today”
এরপর ও নিজের উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে বলল…
“বললেই হলো নাকি! যাকে ভালো না লাগে, তাকে তো এড়িয়েই যাওয়া হয়। আর আমার ওনার সঙ্গে তেমন প্রয়োজনও নেই যে, ওনাকে এড়িয়ে গেলে সমস্যা হবে। এটা কোনো অভদ্রতা না। হুহ! না জানি কি ভাবে নিজেকে। আমি এখন থেকে অপ্রয়োজনে আর এই ঘর থেকেও বের হবো না, না উনি আমাকে দেখবে, না আমি ওনাকে। ঝামেলা শেষ।”
নিজের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপচারিতা শেষে রিমি একটু পড়তে বসলো। ওদিকে ইনায়া ঘর আটকে পড়ে আছে, ওর মন খারাপ। কারণ ওই ছেলে মানে ওদের ফ্যামিলি লয়ারের ছেলেকে যে ও পছন্দ করতো..ওই পার্টিতে গিয়ে জানতে পেরেছে যে ছেলেটার বিয়ে নাকি পরিবার থেকে ঠিক করে ফেলেছে আর ছেলেও রাজি। এ কথা শোনার পর ইনায়া নিজের প্রেমের তরী ভাসানোর আগেই ডুবিয়ে দিয়েছে।
______________________________
রিমিদের আজকের ক্লাস একটু দেরিতে, দুজনে একসাথে বেরিয়েছিল কিন্তু মেইন গেটের বাইরে গিয়ে রিমি দেখলো ফোন নিতে ভুলে গেছে। তো ও আবার বাসায় এলো ফোন নিতে। করিডোরে তখন সিঁড়ি বেয়ে আরশানের মা ও ওপরে উঠছেন। তাঁর পেছন পেছন গৃহকর্মী মহিলাটিও এসেছে, হাতে ঝাড়ু আর একটা বালতি। মহিলাটা করিডোরে এসে প্রথমে ঝাড়ু দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। বালতিটা একপাশে রেখে ধীরে ধীরে ঝাড়ু দিতে শুরু করল। রিমিকে দেখে আরশানের মা বললেন….
“রিমি, যেসব জামাকাপড় ধোয়ার আছে ওনাকে দিয়ে দিও। উনি মেশিনে দিয়ে দেবেন”
রিমি মাথা নাড়ল — “আচ্ছা অ্যান্টি”
কাজের ফাঁকে হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়ে যাওয়ার মতো করে আরশানের মা বললেন…
“শোনো, ঝাড়ু দেওয়া হয়ে গেলে আরশানের ঘরটাও একটু পরিষ্কার করে দিও। ও আজকে বাসায় নেই, গিয়ে ওর টেবিলটা মুছে দিও, শেলফগুলোও দেখে নিও”
কথাটা শুনতেই গৃহকর্মী মহিলাটি ঝাড়ু দেওয়া থামিয়ে দিল। হাতের ঝাড়ুটা মেঝেতে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল…
“না আপা, আমি ওই ঘরে কিছু করতে পারবো না”
রিমি ফোন নিয়ে চলেই যাচ্ছিল কিন্তু এ কথা শুনে একটু অবাক হয়ে দাঁড়ালো। আরশানের মা শান্ত স্বরেই জিজ্ঞাসা করলেন —” কেন?”
মহিলাটা একটু ইতস্তত করে বলল…
“কয়েক সপ্তাহ আগে ছোটো সাহেব বাসায় ছিলেন না বলে এ ঘরে ঢুকে একটু ধুলো মুছে দিয়েছিলাম। উনি থাকলে তো এ ঘরে যাওয়া যায়না। টেবিলের ওপরের জিনিসগুলো একটু সরিয়েছিলাম”
সে একটু থামল, যেন পরের কথাটা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে
“পরে ছোটো সাহেব যখন ফিরলেন তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো আমি ও ঘরে গেছিলাম কিনা। আমি জানি উনি ওনার জিনিস ধরা পছন্দ করে না কিন্তু আমি পরিষ্কার করার পর যে জিনিস যেভাবে ছিলো সেভাবেই রাখার চেষ্টা করেছিলাম তবুও উনি হয়তো বুঝে গেছিলো। উনি শুধু চুপ করে তাকিয়ে ছিলেন কতক্ষন আমার দিকে। তারপর একে একে সব জিনিস আগের জায়গায় রেখে দিলেন। আর বললেন যে আমার জিনিসে হাত দেওয়ার দরকার নেই
মহিলার কণ্ঠ একটু নিচু হয়ে গেল…
“এমনভাবে তাকিয়ে ছোটো সাহেব কথাটা বললো যে তারপর থেকে ওই ঘরে ঢোকার সাহস হয় না। আপা, আমি পারবো না”
কথাটা শেষ করে সে আবার ঝাড়ু দিতে শুরু করল। আরশানের মা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখে তেমন কোনো বিস্ময় নেই, যেন ছেলের এই আচরণ তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। তিনি স্বাভাবিকভাবেই বললেন…
“আচ্ছা, থাক। তুমি বাকি কাজ করো। ওর ঘরটা আমি পরে দেখে নেব”
রিমি পাশেই দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। বুকের ভেতর হালকা কেঁপে উঠল। হঠাৎ মনে পড়ল সে রাতের পার্টিতে তার গম্ভীর দৃষ্টি আর ঠান্ডা কণ্ঠ। বাইরে থেকে তাকে যতটা নিখুঁত ও নিয়ন্ত্রিত মনে হয় তার ভেতরে কোথাও যেন এক অদ্ভুত কঠোরতা লুকিয়ে আছে। আর সেই কঠোরতার সামান্য আভাস আজই পেল রিমি! ক্লাস শুরু হয়েছে, কিন্তু রিমির মন পুরোপুরি এখানে নেই। খোলা বইয়ের দিকে চোখ থাকলেও তার মন এখনও আজকের সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনায় আটকে আছে। গৃহকর্মীর কথাগুলো কানে বাজছে আর ও ভাবছে আরশান এমন কেনো? যে মানুষটাকে এড়িয়ে চলার কথা, না চাইতেও সেই মানুষটার কথাই ভেবে চলেছে রিমি। এসব ভাবতে ভাবতে সে কখনো বইয়ের পৃষ্ঠায় অল্প চোখ রাখে, কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করছে বাইরে আলো কেমন পড়ছে। শিক্ষকের কথা মাঝে মাঝে তার কানে আসে, কিন্তু তা যেনো ঠিকমত ওর মস্তিষ্কে প্রবেশ করছেনা কারণ ওর মস্তিষ্কজুড়ে এই মুহূর্তে অন্য কারো বিচরণ। সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে নাস্তা করতে বসেছিলো তখনই আরশান বাসায় ফেরে। ওকে দেখামাত্রই এ কদিন ধরে রিমি যে সাহস জুগিয়েছিল তা যেনো কমতে শুরু করলো। আরশান যেহেতু বাসায় ফিরেছে তাই ভেবেছিল ঘর থেকে অপ্রয়োজনে বের হবে না কিন্তু রাতেই ঘটলো এক বিপত্তি। তখন প্রায় মাঝরাত, কোনো একটা দুঃস্বপ্নে রিমির ঘুম ভেঙে গেলো। গলা শুকিয়ে আসছে, কিন্তু ঘরের জগে পানি নেই। এ মুহূর্তে পানি খাওয়া ছাড়া থাকাও সম্ভব না। পানি আনতে নিচে রান্নাঘরে যেতে হবে! ও আগে দরজা খুলে একটু দেখলো আরশানের ঘরে আলো কিনা, ও ঘুমিয়েছে সেটা নিশ্চিত করেই রিমি জগ নিয়ে নিচে গেলো। ফিল্টার থেকে পানি ভরার সময় ও বাড়ির বাইরের লোহার মেইন গেইট খোলার আওয়াজ পেলো, এতো রাতে কে এলো? এরপর বাসার মেইন দরজা খোলার আওয়াজ পেতেই রিমি ভয়ে চিৎকার দিতে যাচ্ছিলো তখনই ড্রইংরুমের লাইট জ্বলে উঠলো আর ও আরশানকে দেখতে পেলো, তার হাতে একটা প্যাকেট। এতো রাতে বাইরে থেকে এলো? রিমির ভয়ার্ত মুখখানা দেখে আরশান ভ্রু কুঁচকে নিতেই রিমি একটা ঢোক গিলে একটু হাসির চেষ্টা করে কিছু না বলেই দ্রুত পায়ে প্রস্থান করতে চাইছিলো কিন্তু লাভ হলো না। তখনই খপ করে এসে ওকে ধরে ফেললো আরশান
“সেদিন আমার বলা কথাগুলো মনে হচ্ছে তুমি বিশেষ গুরুত্ব দাওনি, শাস্তি না পাওয়া অব্দি হয়তো তোমার বোধ হবেনা”
রিমির চোখ বড় বড় হয়ে হলো — “কি!! শ..শাস্তি!”
রিমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরশান ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে ওপরে গেলো, এক হাতে জগ থাকায় হাত ছাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেনা তার ওপর আরশান এতোটাই জোরে ওর হাত চেপে ধরেছে হয়তো চাইলেও ছাড়াতে পারতো না! সিড়ি দিয়ে ওঠার সময় রিমির হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, একবার মনে হচ্ছিল চিৎকার করবে কিন্তু এতে তো বাসার মানুষ ভুল বুঝবে! এ মুহূর্তে কি করা উচিৎ বুঝেই উঠতে পারছিলো না। ওপরে যাওয়ার পর আরশান যখন ওকে নিজের ঘরে নিতে যাচ্ছিলো তখন রিমি কিছুটা জোরেই বলে ওঠে…
“আ..আমি আপনার ঘরে যাবো না”
“Fine, তোমার ঘরে যেতে আমার আপত্তি নেই”
“না! আ..আপনার আমাকে কিছু বলার থাকলে এখানেই বলুন। ক..কোনো ঘরে যাওয়ার দরকার নেই”
রিমির ঘরে যেতে আপত্তি শুনে কি একটা ভেবে আরশান ওকে নিয়ে আবার ছাদের দিকে পা বাড়ালো, রিমি বুঝতেই পারছেনা এই লোকটার মাথায় কি ঘুরপাক খাচ্ছে! কি করতে চাইছে? ওর সঙ্গে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করছে না তো? এরকম হাজারো নেতিবাচক ভাবনা এসে ওর মাথায় ভর করতে শুরু করলো। ছাদে অন্ধকার, তবে লাইট লাগানো আছে। আরশান লাইট জ্বেলে নিলো, ছাদের একটা কর্নারে সিমেন্টের তৈরি গোল টেবিল ও দু পাশে ছোটো টুলের মতো বানানো আছে! আরশান ওকে নিয়ে সেখানেই বসলো এবং হাতের প্যাকেটটা টেবিলের ওপর নামালো। রিমি শক্ত করে জগ ধরে রেখেছে এখনও, এটাই ওর অস্ত্র। যদি উল্টোপাল্টা কিছু করতে আসে তাহলে ঠিক করেছে এটাই ছুঁড়ে দিয়ে পালাবে। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে আরশান প্যাকেট থেকে অনেকগুলো চিকেন ড্রামস্টিক বের করলো। রিমি কিছু বুঝতে পারছেনা কি হচ্ছে। ও পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টায় ছিলো। হঠাৎ মুখ ফস্কে ওর মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো…
“এতো রাতে আপনি এগুলো আনতে বাইরে গেছিলেন?”
“হুমম, আমার ঝাল জিনিস অনেক পছন্দ। এই দোকানটা নতুন খুলেছে। কাস্টমারদের রিভিউ ভালো দেখে নিয়ে এলাম”
“এতো রাতে দোকান খোলা ছিলো?”
আরশান ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বললো — “বোকা মেয়ে, এতো রাতে কেউ দোকান খোলা রাখে?”
রিমি কৌতূহল বশত জিজ্ঞাসা করলো — “তাহলে?”
“দোকানের যে মালিক তার বাসার নিচেই এই দোকান, ওকে ঘুম থেকে তুলে ভাজিয়ে এনেছি”
রিমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে, একটা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এমন কাণ্ড করতে পারে? আরশান এমনভাবে বললো যেনো এটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার কিন্তু রিমির এই মুহূর্তে ওকে মোটেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছেনা! ও একটু জড়োসর হয়ে বসলো, অনেকক্ষণ ধরে জগ ধরে থেকে হাতের কব্জি ব্যাথা করছে। ওটাকে টেবিলের ওপর রাখতেই আরশান বলে উঠলো…
“এগুলো খেয়ে শেষ করো”
একসঙ্গে খাওয়ার জন্যে ডেকেছে? রিমি অবাক হলো বটে, এতক্ষণ কি না কি ভাবছিল। মনে মনে নিজের প্রতিই উপহাস করে একটা ড্রামস্টিক তুলে নিলো খাওয়ার জন্যে। খিদেও পেয়েছে। ও একটার মুখে দিতেই দেখলো অনেক ঝাল! ও এতো ঝাল খেতে পারেনা কিন্তু মুখে দিয়েছে যখন রেখে দেওয়া ভালো দেখায় না তাই ও কোনোরকম কষ্ট করে ওটা খেয়ে নিলো কিন্তু আরশান দু হাত ভাঁজ করে বসে আছে, খাচ্ছেনা দেখে রিমি ওকেও খেতে বললো কিন্তু…
“আমি খাবো না, তুমি খাবে”
“আমি? কিন্তু এগুলো তো আপনি আপনার জন্যে এনেছিলেন তাইনা?’
“হ্যাঁ, এনেছিলাম কিন্তু এখন তুমি একাই খাবে”
“সবগুলো আমার পক্ষে একা খাওয়া সম্ভব না! আচ্ছা, আজ যতটুকু পারি…”
আরশান হিম শীতল কণ্ঠে বললো — “তুমি আমার কথা বুঝতে পারোনি, সবগুলো তুমি এখন এখানে বসেই শেষ করবে। তাও পনেরো মিনিটের মধ্যে”
রিমি তাও চুপ করে বসেছিলো, তখনই আরশান ধমকে বললো — “Finish this right now”
মেয়েটা কেঁপে উঠলো, চোখের কোণে ইতিমধ্যে পানি জমা হয়েছে। ও দ্রুত খেতে শুরু করলো। অনেক ঝাল খেতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু এখান থেকে পালানোর জন্য এগুলো শেষ করা জরুরি। আরশানের চোখদুটোতে অদ্ভুত এক চাহনি, কেমন এক হাড় কাঁপানো শীতল চাহনি কিন্তু ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। মনে হচ্ছে যেনো এই মুহূর্তে ওর কথা না শোনাটা বিরাট অপরাধ হয়ে যাবে। রিমির গা শিউরে উঠছে বারবার! এ কার পাল্লায় পড়লো?
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/18QuoDYWQe/?mibextid=oFDknk

