মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_০৫

0
34

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_০৫

পরদিন ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে এল, রিমি তখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। সারা রাত পেটের ভেতরটা যেন এক আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলেছে। ঠিকমতো ঘুমও হয়নি। অতিরিক্ত ঝাল আর মানসিক চাপের সংমিশ্রণে ওর গ্যাস্ট্রিকের ব্যথাটা এখন অসহ্য রূপ নিয়েছে। ঠিক সেই সময় দরজায় টোকা পড়ল। ইনায়া তৈরি হয়ে এসেছে। প্রতিদিনের মতো আজও ওদের একসঙ্গে বেরোনোর কথা। ইনায়ার কণ্ঠস্বর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল….

“এখনও রেডি হসনি? লেট হয়ে যাবে তো”

রিমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। অনেক কষ্টে নিজেকে টেনে তুলে আধবোজা চোখে দরজাটা খুলে দিল সে। ইনায়া ভেতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালো। রিমির আলুথালু চুল, বসা চোখ আর কুঁকড়ে থাকা ভঙ্গি দেখে ওর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ইনায়া এগিয়ে এসে রিমির কপালে হাত রাখল।

“এ কী! তোর এই অবস্থা কেন? শরীর খারাপ নাকি?”

রিমি আলতো করে ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ স্বরে বলল…

“আজ আমি যেতে পারবো না রে। পেটে খুব ব্যথা করছে, মাথাটাও কেমন যেন ঘুরছে।”

ইনায়া অবাক হয়ে বলল, “হঠাৎ পেটে ব্যথা? কাল রাতে তো ঠিকই ছিলি। পিরিয়ড চলছে? ডাক্তার দেখাতে হবে?

“অত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা হবে হয়তো। ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। তুই যা, আমার জন্য তোর ক্লাস মিস করার দরকার নেই”

“ঠিক আছে, ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাক। কোনো দরকার পড়লে অবশ্যই আম্মুকে ডাকবি”

ইনায়া বেরিয়ে যাওয়ার পর রিমি আবার ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘরের নিস্তব্ধতায় আরশানের সেই শীতল কণ্ঠটা আবার ওর কানে বাজতে লাগল “Finish This Right Now!” রিমি বুঝতে পারছে না, এই মানুষটা আসলে কী চায়? কেনই বা ওকে এমন তুচ্ছ বিষয়ে এতো শাসন করছে? এসব ভাবনা মাথায় নিয়ে চোখ বন্ধ করতেই কোত্থেকে যেনো রাজ্যের ঘুম এসে জুটলো। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে রিমির হিসেব নেই, ঘুম থেকে উঠে দেরিতে নাস্তা করতে যেতেও ইতস্তত বোধ করছিলো কিন্তু আরশানের মা সুরভী বেগম কিছুই বলেননি উল্টে রিমির কিছু লাগবে কিনা, শরীর এখন ঠিক লাগছে কিনা এসব জিজ্ঞাসা করেছেন। আরশান অফিসে চলে গেছে শুনে বেশ স্বস্তি পেয়েছে রিমি, আজকে দিনে অন্তত বাসায় একটু শান্তিতে থাকতে পারবে!
_____________________________

ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের ক্লাস মানেই সেখানে কারুকার্য আর সাহিত্যের এক আলাদা আভিজাত্যের মিশ্রণ। আজ প্রফেসর সাহেব প্রথম প্রেজেন্টেশনের ঘোষণা করতেই ক্লাসরুমে যেন শেক্সপিয়র আর মিল্টনের গম্ভীর আলোচনার বদলে আধুনিক বাস্তবতার এক অস্থিরতা জেঁকে বসল। প্রফেসর রহমানের গলায় আজ সেই পরিচিত রাশভারী সুর। তিনি ডায়াসের ওপর রাখা রেজিস্টার খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন….

“Welcome to your first formal presentation, students! টপিক হলো “The Influence of Victorian Morality in Contemporary Society”। আপনারা জানেন, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে শুধু পড়া নয় বরং সেটাকে উপস্থাপন করতে পারাও একটা বড় দক্ষতা। আর প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে আপনারা কে কতটা দক্ষ”

এ কথা শোনামাত্র পুরো ক্লাসে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেল। ইনায়া একাই বসে ছিল, রিমির খালি জায়গাটা আজ বড্ড বেশি চোখে পড়ছে। প্রফেসর যখন গ্রুপগুলোর নাম ঘোষণা করতে শুরু করলেন, ইনায়া মনে মনে শুধু এটুকুই চাইছিল যেন রিমির সাথে তার গ্রুপটা ঠিক থাকে…

“Group – 05: ইনায়া, রিমি, আবিদ এবং শাফিন”

নামটা শুনে ইনায়া কিছুটা স্বস্তি পেলেও পরক্ষণেই ভাবল, রিমি আজ অনুপস্থিত। এই সময়ে গ্রুপ মেম্বারদের সাথে পরিচিত হওয়া আর টপিক নিয়ে আলোচনার শুরুটা খুব দরকার ছিল। আবিদ ক্লাসের বেশ ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত, সবসময় একটু গম্ভীর থাকে। আর শাফিন ঠিক তার উল্টো পড়াশোনার চেয়েও ক্যাম্পাসের আড্ডা আর গিটার নিয়েই তার সময় কাটে বেশি। ক্লাস শেষ হতেই শাফিন আর আবিদ এগিয়ে এল ইনায়ার দিকে। সিয়াম হাসিমুখে বলল…

“ইনায়া, আমরা তো একই গ্রুপে। কিন্তু তোমার বান্ধবী রিমিকে তো আজ দেখছি না”

“ও অসুস্থ তাই আজ আসেনি”

আবিদ তার স্বভাবসুলভ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল…

“ঠিক আছে, ওকে জানিয়ে দিও। Victorian morality” নিয়ে কাজ করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কাল লাঞ্চ ব্রেকে আমরা চারজন যেন লাইব্রেরিতে একবার বসতে পারি। আমাদের হাতে সময় খুব কম”

একটু কথা বলে আবিদ চলে গেলো। ও যাওয়ার পর শাফিন আর ইনায়া করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। ইনায়া যখন নিজের ব্যাগটা কাঁধে গুছিয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করতে যাবে, তখনই শাফিন কিছুটা চটপটে ভঙ্গিতে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। আবিদ পাশে থাকলে শাফিন কিছুটা মেপে কথা বলে, কিন্তু ও চলে যেতেই ওর চেহারায় সেই পরিচিত চপলতা আর চোখেমুখে এক ধরণের শিকারি হাসি ফুটে উঠল। শাফিন আলতো করে গলার স্বর নামিয়ে বলল…

“ইনায়া, তোমার ওই বান্ধবী রিমি, ওকে দেখতে যতটা শান্ত আর গম্ভীর লাগে, তুমি কিন্তু ঠিক তার উল্টো। তোমার কথা বলার ধরনটা বেশ…চনমনে। I like bubbly girls”

কথাটা বলেই শাফিন তার চোখ টিপলো, সঙ্গে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটলো। ইনায়া এক মুহূর্তের জন্যে থ হয়ে তাকিয়ে রইল। তেমন বড় কিছু না হলেও খুব ছেলের বলার ভঙ্গিটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। শাফিনের ব্যক্তিত্বে কেমন একটা ‘ব্যাড বয়’ ইমেজ আছে, যা এই মুহূর্তে ইনায়ার জন্য একেবারেই নতুন। সারা জীবন গার্লস স্কুল আর কলেজে কাটানোর ফলে ছেলেদের সাথে সচরাচর কথা বলা বা মেলামেশার সুযোগ ওর খুব একটা হয়নি। ক্লাসের ছেলেদের সাথে নোট আদান-প্রদান বা টপিক নিয়ে আলোচনা পর্যন্তই ছিল ওর দৌড়। কিন্তু এভাবে সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা বা হালকা খুনসুটি মেশানো কথা আগে কখনো শোনেনি ও। বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। শাফিন ওর নীরবতা দেখে আরেকটু হেসে যোগ করল…

“ঘাবড়ে গেলে নাকি? আসলে আমাদের গ্রুপে রিমি আর আবিদের মতো দুইটা সিরিয়াস মানুষের মাঝখানে তোমার মতো কাউকে খুব দরকার ছিল, নইলে তো প্রেজেন্টেশন বানাতে গিয়ে আমরা ডিপ্রেশনে পড়ে যেতাম”

ইনায়া কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু শুকনো হাসি দিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “না না, ঘাবড়াব কেন? কাল রিমির সাথে কথা বলে জানাব তোমাদের। এখন আসি”

পেছন থেকে শাফিনের হালকা হাসির শব্দ শোনা গেল, কিন্তু ইনায়া আর পেছনে ফিরে তাকাল না। ওর মাথায় তখনো শাফিনের সেই আধো-হাসি মেশানো চোখের চাহনিটা ভাসছে। প্রথমবার কারো ফ্লার্টের মুখোমুখি হয়ে ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না ওর কেমন অনুভূতি হওয়া উচিত। অদ্ভুত এক দ্বিধা আর ঘোর নিয়ে ও ভার্সিটির গেটের দিকে পা বাড়াল।
_______________________________

সন্ধ্যায়…রান্নাঘরে নাস্তা বানানোর কাজে সুরভী বেগমকে একটু সাহায্য করে রিমি যখন ড্রয়িং রুমে এল, তখন ওর শরীরে হালকা ক্লান্তি থাকলেও মনটা বেশ ফুরফুরে। সুরভী বেগম কফির ট্রে হাতে দিয়ে জোরাজুরি করে ওকে পাঠিয়ে দিয়েছেন একটু জিরিয়ে নিতে। ড্রয়িং রুমে এসে আরাফাত সাহেবকে কফি এগিয়ে দিয়ে বসলো রিমি, সামনের বড় সোফাটায় বসে উনি নিউজপেপার পড়ছিলেন পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় আয়ান বসে একটা ম্যাগাজিন উল্টেপাল্টে দেখছিল, কিন্তু রিমিকে আসতে দেখেই সে ওটা টেবিলের ওপর কোনোমতে ফেলে রেখে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ম্যাগাজিনটা টেবিলের কাঁচের ওপর বেশ অবিন্যস্তভাবে পড়ে ছিল। ইনায়া ওপাশ থেকে বকবক করতে করতে এসে ম্যাগাজিনটা হাতে নিল এবং সোফার সামনের কাঁচের টেবিলের নিচের তাকে ওটা কোনোমতে ঢুকিয়ে রাখল।
ঠিক তখনই আরশান এলো। সোফায় বসার আগে তার চোখ গেল টেবিলের নিচের তাকটার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য ওর পা থমকে গেল, চোয়ালটা সামান্য শক্ত হলো। ও সোফায় বসার পর কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই চেয়ে রইল ম্যাগাজিনগুলোর দিকে। ঠিক যেভাবে রাখা উচিত ছিল, সেভাবে নেই। একটার কোণা অন্যটার চেয়ে সামান্য বেরিয়ে আছে — “এগুলো কে রেখেছে?”

ইনায়া এগিয়ে এসে বলল — “আমি রেখেছি ভাইয়া, আয়ান ওভাবে ফেলে রেখে গেল তো, তাই গুছিয়ে রাখলাম

আরশান শান্ত স্বরে বলল — “গোছানো ঠিকমতো হয়নি। আবার রাখ”

ইনায়া একটু অবাক হলো, তবুও ম্যাগাজিনগুলো বের করে আবার সাজিয়ে রাখল। কিন্তু আরশানের ভ্রু কুঁচকে আছে…

“ঠিক নেই। বড়টা নিচে হবে, আর প্রতিটা ম্যাগাজিনের স্পাইন যেন একদম এক সারিতে থাকে।”

ইনায়া দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল, কিন্তু হাত একটু কাঁপায় সামান্য এদিক-ওদিক হয়ে গেল। আরশান এবার সোজা হয়ে বসে বলল — “ওভাবে না, আবার কর”

তৃতীয়বার ইনায়া যখন অনেকটা মেপে মেপে ম্যাগাজিনগুলো একদম সমান্তরাল করে রাখল, তখন আরশান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ সরিয়ে নিল। ছেলের এই কর্মকাণ্ড এতক্ষণ নিরব দর্শক হয়ে দেখছিলেন আরাফাত সাহেব। এবার তিনি বেশ বিরক্ত হয়ে নিউজপেপারটা নামিয়ে রাখলেন।

“আরশান, এত বছর হয়ে গেল, এত কিছুর পরেও এই অভ্যাসটা বদলাতে পারলে না? একটা ম্যাগাজিন সামান্য বাঁকা হয়ে থাকলে তো আকাশ ভেঙে পড়বে না।”

আরশান বাবার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল — “Discipline maintenance is important, abbu. Don’t you always say that?”

ছেলের এই যুক্তির পিঠে আরাফাত সাহেব আর কোনো কথা বললেন না। তিনি শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে আবার পেপারে মন দিলেন। আরশানের আচরণ এবং আরাফাত সাহেবের নজর মুখের অদ্ভুত অভিব্যক্তি কোনোটাই রিমির নজর এড়ালো না। ও মনোযোগ দিয়ে সবটা লক্ষ্য করেছে। আরাফাত সাহেবের চোখে যেনো কোনো বিরক্তি নয়, বরং এক ধরণের সূক্ষ্ম অপরাধবোধ আর বিষণ্নতা খেলে গেলো ছেলের আচরণ দেখে। রিমি আরশানের দিকে দেখলো, তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে দিব্যি কফি খাচ্ছে। রিমির মনে একটা খটকা লাগল। সবকিছু কেন ওকে একদম কাঁটায় কাঁটায় মেপে রাখতে হবে? আরশানের সব বিষয়ে এই নিখুঁত হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা কি কোনো মানসিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ?

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/182NmviEM5/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here