মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #বোনাস_পর্ব [𝗙𝗲𝗮𝗿 𝗼𝗿 𝗙𝗮𝘀𝗰𝗶𝗻𝗮𝘁𝗶𝗼𝗻?🥀]

0
30

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#বোনাস_পর্ব [𝗙𝗲𝗮𝗿 𝗼𝗿 𝗙𝗮𝘀𝗰𝗶𝗻𝗮𝘁𝗶𝗼𝗻?🥀]

ভিক্টোরিয়ান মোরালিটির ওপর প্রেজেন্টেশন স্লাইডগুলো সাজাতে গিয়ে চারজন মিলে গত কয়েকদিন ধরে বেশ খাটছে। রিমির হাতে এখন একগাদা রেফারেন্স বই, আর সামনে ল্যাপটপ। ইনায়া পাশে বসে কাজ করলেও ওর মনটা আজ ঠিক প্রেজেন্টেশনে নেই। লাইব্রেরির এক কোণের টেবিলটায় ওরা চারজন বসেছে। আবিদ খুব মনোযোগ দিয়ে স্লাইডগুলোর ডেটা চেক করছে, মাঝে মাঝে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে রিমির দিকে তাকাচ্ছে। শাফিন অবশ্য বরাবরই ব্যতিক্রম। ওর সামনে ডায়েরি খোলা থাকলেও পেন দিয়ে সে কেবল আঁকিবুঁকি কাটছে আর আড়চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।

শাফিন গলার স্বরটা একদম নামিয়ে ইনায়ার কানের কাছে একটু ঝুঁকে বলল…

“আচ্ছা ইনায়া, হুট করে একটা বিষয় জানার ইচ্ছা হচ্ছে। কেমন হতো যদি তুমি ভিক্টোরিয়ান যুগের কোনো রাজকুমারী হতে? আর কোনো পুরুষের প্রেমে পড়তে, তাহলে কি সেই যুগের সব কঠিন নিয়ম ভেঙে তার হাত ধরে পালাতে?”

ইনায়া থমকে তাকালো। শাফিনের কথা বলার এই ধরণটা ওর কাছে একেবারেই নতুন। শাফিন যেভাবে সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে, তাতে ওর গাল দুটো অকারণেই লাল হয়ে ওঠে। ও নিচু গলায় বলল…

“মোটেই না! আমি নিয়ম ভাঙতে যাব কেন? অকারণে শাস্তি পাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার।”

শাফিন এবার চেয়ারটা টেনে আরও একটু কাছে এসে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললো…

“নিয়ম তো মাঝে মাঝে ভাঙার জন্যই তৈরি হয়। আর তোমাকে দেখলে কেন জানি মনে হয়, তুমি নিজের ভালোবাসার জন্য সব নিয়ম ভেঙে শাস্তি ভোগ করতেও প্রস্তুত থাকতে পারো।”

ইনায়া এবার সত্যিই ঘাবড়ে গেল। ওর সারা জীবন গার্লস স্কুল আর কলেজে কাটানোর অভিজ্ঞতা শাফিনের এই ঝানু ফ্লার্টিং স্কিলের সামনে বড্ড নড়বড়ে। ও দ্রুত চোখ সরিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ওর বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা শাফিন বোধহয় টের পাচ্ছিল। টেবিলের অন্যপাশে আবিদ রিমির দিকে একটা বই এগিয়ে দিয়ে বলল….

“রিমি, এই চ্যাপ্টারটা আমার মনে হয় তোমার ল্যাঙ্গুয়েজ আর এক্সপ্রেশনের জন্য পারফেক্ট। তুমি এই অংশটা প্র্যাকটিস করো।”

রিমি বইটা নিতে গিয়ে দেখল আবিদ ওর দিকে একটু অন্যরকম দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। আবিদ ছেলেটা পড়াশোনায় খুব সিরিয়াস, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সে রিমির সাথে একটু বেশিই কথা বলার চেষ্টা করছে। রিমি এই মুহূর্তে কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাইছে না, তাই আবিদের ‘আই কন্টাক্ট’ যথাসম্ভব এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইনায়া শাফিনের এই বাঁকা কথার জালে বন্দি হয়ে নিজের অজান্তেই যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করেছে।
_______________________________

আজ সবাই আগেই ডিনার করে নিয়েছে। ডিনার শেষে আরশান কাজ নিয়ে বসেছে। ওর স্টাডি রুমে নীলচে আলোর একটা ম্লান আভা ছড়িয়ে আছে। ঘরটা ঠিক যেমনটা সে পছন্দ করে, নিস্তব্ধ ও নিখুঁতভাবে সাজানো। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপ, ডায়েরি আর দামী ফাউন্টেন পেনটা একদম সোজাভাবে রাখা। আরশান ল্যাপটপের স্ক্রিনে কিছু ডকুমেন্ট চেক করছিলো কিন্তু গত দশ মিনিট ধরে সে একটা লাইনেই আটকে আছে। সে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। কপালে হাত রেখে চোখ দুটো বন্ধ করতেই অদ্ভুতভাবে একটা মুখ ভেসে উঠল— “রিমি”। কদিন ধরে মেয়েটা বড্ড ব্যস্ত, বাসায় তাকে দেখাই যাচ্ছে না। আরশান নিজেও কাজে ডুবে থাকে ঠিকই, কিন্তু রাতেও মেয়েটার দেখা পাওয়া এখন দুষ্কর।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই সেই রাতের ছাদের দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল। কাঁপা কাঁপা হাতে চিকেন ড্রামস্টিক ধরা রিমির সেই ভীতু চেহারাটা এখনও আরশানের চোখে ভাসছে। মেয়েটার চোখের কোণে জমা জল আর অতিরিক্ত ঝালে লাল হয়ে যাওয়া নাকটা কেন যেন আরশানের মস্তিষ্কের কোনো এক কোণে গভীর ছাপ ফেলে গেছে। আরশান বিরক্তি নিয়ে চোখ মেলল। উঠে গিয়ে শেলফ থেকে একটা ফাইল নিতে চাইল, কিন্তু হাতটা শূন্যে থমকে গেল। সে বিড়বিড় করে আপনমনেই বলতে শুরু করল…

“Damn it! কেন জানি বারবার ওর ওই বোকাসোকা চেহারাটা মাথায় আসছে?”

সে নিজের হাতের আঙুলগুলো একবার মটকে নিল। জানালার কাঁচের প্রতিফলনে নিজেকে দেখে সে আবার বলতে লাগল…

“I hate mess. And she is a living mess. ও আমাকে বিন্দুমাত্র সম্মান দেয় না, একটা কথার উত্তর দিতে গেলে দশবার থামে। Her hair is always messy, she is completely disorganized. But she trembles when she sees me, and strangely, I enjoy it”

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আরশান টেবিলের ওপর রাখা একটা কাঁচের পেপারওয়েট হাতে নিয়ে ঘোরাতে লাগল। আরশান হঠাৎ থেমে গেল। নিজের ওপরই ওর বিরক্তি লাগছে। এই নিয়ন্ত্রণহীনতা ওর স্বভাবের সঙ্গে যায় না।

“Control is everything, Arshan. Get a grip!”

সে নিজেকেই ধমক দেওয়ার মতো করে কথাটা বলল। কিন্তু অবাধ্য মনটা যেন আজ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। পেপারওয়েটটা টেবিলে রাখার সময় দেখল সেটা অন্যদিনের চেয়ে দুই ইঞ্চি ডানে সরে গেছে। অন্যদিন হলে সে এটা নিয়ে অস্থির হয়ে পড়ত, কিন্তু আজ সে ওভাবেই রেখে দিল। সে আলতো করে বিড়বিড় করল…

“She is just a distraction. But a very intensive one. Let’s see how I handle this ‘mess’.”

রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। শরীরকে ক্লান্ত করে ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করাই আরশানের একমাত্র পথ। শার্ট খুলে একপাশে রেখে ও ডাম্বেল নিয়ে ঘাম ঝরাচ্ছিল। শরীরচর্চায় ওর পেশিবহুল গড়নটা এখন বেশ সুসংজ্ঞায়িত। প্রশস্ত কাঁধ আর সুঠাম বুকের ভাঁজে ঘামের সূক্ষ্ম কণাগুলো চিকচিক করছে। ঠিক সেই সময় দরজায় টোকা পড়ল। আয়ানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো — “ভাইয়া, একটু দরজা খোলো।”

আরশান ব্যায়াম থামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দরজা খুলতেই আয়ান ওকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো…

“ওহ! এক্সারসাইজ করছিলে? আমি কেন যেন একটু হাঁটতে গিয়েই হাঁপিয়ে যাচ্ছি আজকাল।”

আরশান ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো — “কী চাই এখন?”

“তোমার ওই নতুন পারফিউমটা কি একটু দেওয়া যাবে? কালকে বন্ধুদের সঙ্গে একটু বেরোবো”

কথাটা বলতে বলতেই আয়ান ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল কিন্তু আরশান ওকে ভেতরে ঢোকার সুযোগ দিলো না — “দাঁড়া এখানে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে রিমি নিচ থেকে পানির জগ নিয়ে ওপরে উঠছিল। সিঁড়ি বেয়ে করিডোরে পা রাখতেই ওর চোখ গেল আরশানের ঘরের দিকে। করিডোরের সাদা লাইটের আলোয় আরশানের সেই অর্ধনগ্ন সুঠাম দেহটা রিমির চোখে যেন এক অচেনা বিস্ময় হয়ে ধরা দিল। সুঠাম পেশিবহুল এই পুরুষালি শরীর রিমি আগে কখনো এত কাছ থেকে দেখেনি। এক কিশোরী মেয়ের চোখে এই দৃশ্যটা যেমন কৌতূহলের, তেমনই এক ধরণের অজানা ভয়ের। রিমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আরশানের তপ্ত শরীর থেকে যেন এক ধরণের অদৃশ্য উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে করিডোরে। কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে রইল ও। হঠাৎ ওর হুঁশ ফিরল, আর সাথে সাথেই এক তীব্র লজ্জা আর অদ্ভুত ভীতি ওকে গ্রাস করল। রিমি অবচেতনেই একটা ছোট চিৎকার দিয়ে দৌড়ালো নিজের ঘরের দিকে। আরশান ভ্রু কুঁচকে ওপাশে তাকাল। রিমির দৌড়ে পালানো আর দরজার শব্দে ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল। আয়ানও কিছুটা হকচকিয়ে গেছে। এই শব্দ শুনে ইনায়া নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল — “কী হলো এখানে?”

আয়ান বোকার মতো বলল — “তোর বান্ধবীই জানে! এমনভাবে দৌড় দিলো যেন ভূত দেখেছে।”

আরশান আয়ানের হাতে পারফিউমটা ধরিয়ে দিয়ে নিস্পৃহ গলায় বললো — “Don’t bother returning it.”

ততক্ষণে আরশান নিজের ঘরের দরজাটা সজোরে আটকে দিল। ওদিকে নিজের ঘরের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে রিমি তখনও হাঁপাচ্ছে। ওর চোখের সামনে বারবার আরশানের সেই ঘামঝরা সুঠাম দেহের ছবিটা ভেসে উঠছে। এই অস্বস্তি আর ভালো লাগার মাঝামাঝি কোনো এক তীব্র অনুভূতি ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে।
______________________________

আজ প্রেজেন্টেশনের দিন। রিমি যথাসম্ভব চেষ্টা করছিল আরশানের সামনে না পড়তে কারণ ও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখতে চায়। সুরভী বেগম ব্যাংকে কোনো এক কাজে গেছেন, আরাফাত সাহেব বা আয়ান ও বাসায় নেই। আরশানও চলে গেছে ভেবে রিমি ঠান্ডা মাথায় ব্রেকফাস্ট করছিলো ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে আরশানের নেমে আসার শব্দ পাওয়া গেল। ও আজ অফিসের জন্য একদম তৈরি। পরনে নেভি ব্লু শার্ট, হাতাগুলো কব্জি পর্যন্ত নিখুঁতভাবে ফোল্ড করা। ওর অবয়বে কাল রাতের সেই ঘামঝরা পুরুষটির লেশমাত্র নেই, তবুও দেখতে কোনো দিক থেকেই কম আকর্ষণীয় লাগছেনা। রিমি এক পর্যায়ে বিড়বিড় করে নিজেকে ধমকে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে খাওয়া শেষ করতে চাইল, কিন্তু আরশান ওর ঠিক পাশের চেয়ারটা টেনে বসল। পুরো ডাইনিং রুমে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। আরশান কফি মগটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে আড়চোখে রিমির দিকে তাকাল। ও রিমির দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে নিচু গলায় বলল…

“You look a bit pale this morning, Rimi. ঘুম হয়নি?”

রিমি নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলো

“হ্যাঁ..ওই আর কি। ঘুমটা হয়নি ঠিকঠাক”

“Oh! So was it the ‘fear’ of what you saw last night that kept you awake…or was it the excitement?”

এ কথা শোনামাত্র রিমির চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেলো, আরশানের কোন ইঙ্গিতে কথাটা বলছে বোঝামাত্রই ও লজ্জায় রীতিমত কুঁকড়ে যাচ্ছিল। গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা কিন্তু উত্তর না দিলেও দোষ হবে, আরশান আবার যদি নতুন কোনো শাস্তি দেয়? রিমি নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে গটগট করে বললো…

“আসলে আজকে প্রেজেন্টেশন তো তাই চিন্তায় সেভাবে ঘুমাতে পারিনি।”

আরশান কফির মগটা টেবিলে রাখল। ওর আঙুলগুলো টেবিলের ওপর ছন্দবদ্ধ শব্দ করল — “Oh, I see!”

আরশান পানির জগটা এগিয়ে এনে নিজের গ্লাসে পানি ঢেলে দিলো। তারপর নিজের চেয়ারটা রিমির দিকে আরও এক ইঞ্চি এগিয়ে নিয়ে তার চোখের ওপর একদৃষ্টে চাইল। আরশানের সেই শীতল অথচ তীক্ষ্ণ চাহনি যেন রিমির শরীরের ভেতর দিয়ে এক ধরণের বিদ্যুৎ তরঙ্গ বইয়ে দিল। আরশান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে আরও গভীর গলায় বলল…

“I’m not a gentleman, Rimi. I never claimed to be one. তাই আমার প্রাইভেট স্পেসে ঢোকার আগে নিজের লিমিটটা বুঝে নেবে। এরপর থেকে করিডোরে হাঁটার সময় সামনে তাকিয়ে হাঁটবে। আর যদি কিছু দেখেই ফেলো, তাহলে ভালোভাবে দেখবে। অহেতুক ড্রামা আমার একদম পছন্দ না।”

কথাগুলো বলে আরশান একদম শান্ত ভঙ্গিতে নিজের নাস্তায় মন দিল। যেন কিছুই হয়নি, এমন একটা ভাব। কিন্তু রিমি আর নিজের জায়গায় নেই। আরশানের এই হঠাৎ কঠোর আবার পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ওর তরুণী হৃদয়কে কেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছে। নাস্তার প্লেট সামনে পড়ে থাকলেও রিমি যেন এক সম্মোহনে পড়ে আরশানকে দেখছিল। নেভি ব্লু শার্টে লোকটাকে আজ বড্ড বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। ভিক্টোরিয়ান মোরালিটির পাঠ নিতে গিয়ে রিমি কি নিজেই জড়িয়ে পড়ছে আরশানের তৈরি কোনো নিষিদ্ধ আকর্ষণে?

চলবে….

[নিন, এবার আপনারাই ঠিক করুন আরশানকে কোন নজরে দেখবেন! Psy’cho, cra’cked or per’vert 🤷]

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/1AZwrccH75/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here