#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_০৬
ক্লাসরুমে তখন প্রেজেন্টেশন নিয়ে মৃদু গুঞ্জন চলছিলো। রিমিদের গ্রুপ সামনে দাঁড়িয়েছে। ও ছিলো তৃতীয় বক্তা, প্রথম দুই বক্তার বক্তব্য শেষে রিমি ভিক্টোরিয়ান মোরালিটির ওপর নিজের বক্তব্য রাখছিলো ঠিকই কিন্তু ওর অবচেতন মনে তখনও সকালের সেই নাস্তার টেবিলের ঘটনাটা দপদপ করছে। প্রতিবার স্লাইড চেঞ্জ করার সময় ওর মনে হচ্ছিল, অডিটোরিয়ামের একদম পেছনের সারিতে নেভি ব্লু শার্ট পরা একজন দাপুটে পুরুষ বসে আছে আর ওর প্রতিটি শব্দ মেপে দেখছে। যদিও আরশান সেখানে নেই, পুরোটাই রিমির কল্পনা। প্রেজেন্টেশন শেষ হতেই ক্লাসের সবাই হাততালি দিলো। ওদের গ্রুপটা আজ সত্যিই অনবদ্য পারফর্ম করেছে। শিক্ষকও বেশ প্রশংসা করেছে। প্রেজেন্টেশন শেষে গ্রুপ লিডার হিসেবে আবিদ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল…
“আমাদের সবার পরিশ্রম আজ সার্থক। এই খুশিতে আজ বিকেলে আমার পক্ষ থেকে একটা গ্র্যান্ড ট্রিট পাওনা রইল সবার।”
শাফিন ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল…
“বড়সড় ট্রিট তো হবেই। তবে রাজকুমারীরা যদি এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে কফি খেতে রাজি হয় তাহলে সাধারণ কফিও অমৃত মনে হয়। কী বলো?”
রিমি এখন সোজা বাসায় যেতে চাইছিল কিন্তু আবিদ ওকে রাজি করাতে থাকে, এই ফাঁকে সুযোগ বুঝে শাফিন ইনায়াকে ফিসফিসিয়ে বললো…
“ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রেজেন্টেশন তো শেষ, এবার না হয় বর্তমান যুগে ফিরে আমার সাথে একটু কফি শেয়ার করো?”
ইনায়া বরাবরের মতো লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল, শাফিনের এই ফ্লার্টিং সামলানো ওর জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। রিমি হাসল ঠিকই, কিন্তু ওর মনটা যেন বারবার বাসায় ফেরার জন্য ছটফট করছিল। কেন সেটা ও নিজেও জানে না।ওদিকে…আরশানের অফিসের কেবিনটা সাউন্ডপ্রুফ। কাঁচের বিশাল দেয়ালের ওপারে ব্যস্ত শহরটা দেখা গেলেও ভেতরের পরিবেশটা গুমোট, অবশ্য এমনটাই ওর পছন্দ। আরশান নিজের বিশাল ডেস্কের পেছনে বসে নীরবে ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। ঠিক সেই সময় ওর নতুন সেক্রেটারি ইয়াসির দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ছেলেটা কিছুদিন আগেই সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দিয়েছে, আগের সেক্রেটারিকে আরশান বের করে দিয়েছিলো কারণ তার কাজে প্রচুর ভুল হতো যা আরশান মানতে রাজি নয়। ইয়াসির হাতে থাকা ফাইলটা এগিয়ে দিলো — “স্যার… এই রিপোর্টটা…”
আরশান ফাইলটা হাতে নিয়ে মাত্র দুই সেকেন্ড চোখ বুলালো। তারপর খুব ধীরস্থিরভাবে ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখল। ওর শান্ত কণ্ঠে কোনো চিৎকার ছিল না, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ইয়াসিরের মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বইয়ে দিল।
“মি. ইয়াসির! আপনি একই ভুল দুবার করলেন। প্রথমবার আমি আপনাকে সুযোগ দিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার এটাকে আমি আর ভুল বলতে পারছি না, এটা এখন অবহেলা।”
ইয়াসির তোতলাতে শুরু করলেন, “স্যার… আসলে আমি একটু…”
আরশান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। ওর চোখে কোনো রাগ নেই, আছে এক ধরণের হিমশীতল শূন্যতা। ও গম্ভীর গলায় বলল…
“Being imperfect is not an option here, Mr. Yasir. Precision is not just a choice, it’s a mandate. As long as you are working with me, you better adapt to this standard soon”
একটু থেমে ও আবার যোগ করল…
“আপনার অযোগ্যতা যদি আমার সময়ের অপচয় করে, তবে সেই দায়ভার আপনার ক্যারিয়ারে পড়বে। ফাইলটা নিয়ে যান এবং ১৫ মিনিটের মধ্যে ঠিক করে আনুন। অন্যথায়, আপনার টেবিলটা আজকেই খালি করে দেবেন।”
ভয়ার্ত সেক্রেটারি ফাইলটা নিয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন। আরশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত রাখল। ডেসকের ওপর থাকা পেনহোল্ডারটা অন্যদিনের তুলনায় আজ সামান্য বাঁকা হয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে ওর। আরশান ভ্রু কুঁচকে ওটা ঠিক করল, কিন্তু তাতেও মনের খচখচানিটা গেল না। ইদানিং ওর এই অবসেশনটা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আরশান নিজেই টের পাচ্ছে, ওর বহু বছরের গড়ে তোলা সুশৃঙ্খল জীবনে কোথাও একটা ফাটল ধরেছে। আর সেই ফাটলটার নাম “রিমি”!
আরশান ছোটবেলা থেকেই সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকতে অভ্যস্ত। পড়াশোনা হোক বা ক্যারিয়ার সব জায়গাতেই তার পারদর্শিতা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত মহলে সবাই তাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েই দেখে। কিন্তু আরশান নিজে মানুষের এই বাড়তি আগ্রহকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। কেউ কথা বলতে চাইলে সংক্ষেপে উত্তর দেয়, কেউ কাছে আসতে চাইলে দূরত্ব বজায় রাখে। এভাবেই সে নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য সীমারেখা তৈরি করে রেখেছে যার ভেতরে কার কখন আসার অনুমতি আছে আর নেই সেটা শেষ পর্যন্ত তারই সিদ্ধান্ত আর এই সীমার মধ্যে যা আসবে তাকে কিভাবে চালনা করবে সেটাও ওর ইচ্ছেতেই হবে। এখনও অবি তাই হয়ে এসেছে কিন্তু রিমি যেনো ওর সেই অদৃশ্য নিয়মের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। মেয়েটা আসার পর থেকেই আরশানের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে। ও নিখুঁত ফাইল চায়, নিখুঁত ঘর চায়, কিন্তু রিমি? রিমি তো উল্টো! ওর সবচেয়ে বিরক্তিকর একটি দিক হলো আরশানকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া। যদিও ইদানিং ভয় পেয়ে আরশান কিছু বললে উত্তর দেয় কিন্তু সেটা তো ইচ্ছে করে করেনা। আরশান যখন করিডোরে থাকে, রিমি তখন নিজের দরজা আটকে দেয়। আরশান যখন ডাইনিং টেবিলে বসে, রিমি তখন এমনভাবে তাকায় যেনো প্লেট নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে। এই যে ওকে ইগনোর করার চেষ্টা, এটাই আরশানের মাথার ভেতরে এক ধরণের ‘System Error’ তৈরি করছে। ওর অবচেতন মন বারবার বলছে — “Everything must be in its place, and everyone must acknowledge my presence”। আরশান জানালার কাঁচের প্রতিফলনে নিজের শক্ত চোয়াল দেখল। ওর মাঝে মাঝে মনে হয়, রিমিকে যদি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা নিজের চোখের সামনে বসিয়ে রাখা যেতো। একদম ওর ডেসকের সামনের চেয়ারটায়, যেখানে ওর প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি পলক নিজের নজরের সামনে রেখে রিমির ভেতরের এই ‘বিশৃঙ্খল’ সত্তাটাকে শাসন করে নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলতে পারলে হয়তো ওর ভেতরের এই অস্থিরতা কমতো। হঠাৎই যেনো নিজের পারফেক্ট জগতে আগমন করা “রিমি” নামক অবাধ্য অংশকে বশ করার অদ্ভুত এক জেদ জেগেছে আরশানের মনে!
___________________________________
সুরভী বেগম আজ মেয়েকে নিয়ে বাবার বাসায় গেছেন কারণ ইনায়ার নানু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ছুটির দিন, তাই রিমি আজ সারাদিন ঘরেই ছিলো। ইনায়া যাওয়ার পর পুরো ওপরতলাটা যেন এক বিশাল জনমানবহীন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। ডিনারটা সবার সঙ্গে বসেই করেছে রিমি, আরাফাত সাহেব বেশ ভালো মনের মানুষ। রিমির একা থাকতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা সেই কথাও উনি জিজ্ঞাসা করেছেন। ডিনারের পর রিমি ঘরে চলে যায়, কিন্তু নিচতলায় আরাফাত সাহেব ছোট ছেলেকে কোনো এক বিষয়ে বকছিলেন। মাঝে মাঝে ওনার গলার গম্ভীর আওয়াজ ওপরের করিডোরে এসে প্রতিধ্বনি তুলছে। সারাদিন কোনো রকমে কাটলেও রাতে রিমি নিজের ঘরে একা বসে থাকতে থাকতে যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। মনটা হালকা করতে ও ছাদে গিয়েছিল, ওখানে বসেই ইনায়ার সঙ্গে ভিডিও কলে একটু কথা বলল। এরপর ডিপার্টমেন্টের মেসেঞ্জার গ্রুপ ঘেঁটে একবার দেখে নিল। ওদিকে….আরশান একটা জরুরী একটা ফাইল নিয়ে বাবার স্টাডি রুমে এসেছে। আরাফাত সাহেব নিজের ডেস্কে বসে চশমাটা ঠিক করছিলেন। আরশান ফাইলটা টেবিলের ওপর একদম সোজা করে রাখল। ঠিক তখনই ওর নজর পড়ল টেবিলের কোণে রাখা পেন-হোল্ডারটার দিকে। ওটা কলমগুলোর ভারে সামান্য কাত হয়ে আছে। আরশান খুব শান্তভাবে হাত বাড়িয়ে পেন-হোল্ডারটা একদম মিলিমিটার মেপে সোজা করে দিল। আরাফাত সাহেব কলমটা রেখে হেলান দিয়ে বসলেন। এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্য ভরা চোখে ছেলের এই নিখুঁত হওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করলেন।
“তোমার এই খুতখুতে স্বভাবটা তো এখনো গেল না আরশান। এতো বছর ধরে ট্রিটমেন্ট নিচ্ছ, এখনো সামান্য একটা কলমদানি বাঁকা থাকলে তোমার অস্বস্তি হয়? ফলো আপে ঠিকঠাক যাচ্ছ তো? নাকি শুধু শুধু টাকাগুলো নষ্ট করছ?”
আরশান এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চেহারায় কোনো উত্তেজনা নেই, বরং ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। ও খুব শান্ত গলায় বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল….
“যা ভুলভাবে আছে সেটাকে ঠিক করে দিচ্ছি, এতে তো তোমার খুশি হওয়ার কথা। হঠাৎ ফলো আপের কথা কেনো টেনে আনছ?”
আরাফাত সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন। ওনার চোখে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। আরশান খুব ধীরলয়ে পেন-হোল্ডারটা আবার একটু স্পর্শ করে বলল…
“তোমার মনে আছে? হাই স্কুলে থাকতে একবার আমি স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগ আর ড্রেস কোনোমতে বিছানায় ফেলে খেলতে চলে গিয়েছিলাম। তুমি সেদিন রাতে আমাকে না খাইয়ে ড্রয়িংরুমের সেই কোণে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলে, কারণ আমি ঘর অগোছালো করে রেখে গিয়েছিলাম। I was so ‘imperfect’ at that time, right?”
আরাফাত সাহেব কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। ওনার হাতটা টেবিলের ওপর রাখা ফাইলের দিকে এগোলেও যেন থমকে গেল। আরশানের সেই নিস্পৃহ কণ্ঠস্বর আর শীতল অভিযোগ ওনাকে এক মুহূর্তের জন্য নিজেরই তৈরি করা কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল!
___________________________________
অনেক রাত হয়েছে, তাই বেশিক্ষণ ছাদে বসল না। সময় কাটিয়ে নেমে আসার সময় রিমির নজর পড়ল আরশানের ঘরের দিকে। ঘরের দরজাটা আজ বেশ খানিকটা খোলা। আরশানের ঘর মানেই যেন এক রহস্যময় জগত, যেখানে ঢোকার অনুমতি কারও নেই। এ কদিনে ইনায়া বা আয়ানকেও ওর ঘরে ঢুকতে দেখেনি রিমি। হঠাৎই ওর মস্তিষ্কের এক কোণে সেই রাতের দৃশ্যটা বারবার হানা দিতে শুরু করল।আরশানের সেই ঘামঝরা সুঠাম দেহ, উন্মুক্ত চওড়া কাঁধ। ইনায়ার মুখে শুনেছে রাতে কসরতের অভ্যাস আছে আরশানের। ওর দরজা খোলা পেয়ে রিমির অবাধ্য মনটা আজ যেন হুট করেই একটু বেশিই কৌতূহলী হয়ে উঠল! রিমি খুব সাবধানে একদম পা টিপে টিপে আরশানের ঘরের দরজার দিকে এগোল। করিডোরের মৃদু আলোয় ওর নিজের ছায়াটাই যেন ওকে ভয় দেখাচ্ছিল। ও দরজার কাছে গিয়ে একটু ঝুঁকে উঁকি দিতে চাইল। ভেতর থেকে সেই নীলচে আলো আর রুমস্প্রের কড়া একটা ঘ্রাণ ওর নাকে এল! তখনই — “কারো পার্সোনাল স্পেসে উঁকি দেওয়াটা কিন্তু খুব একটা ‘Graceful’ কাজ নয়, রিমি।”
পিছন থেকে আসা সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বরে রিমি শিউরে উঠল। ভয়ে ওর আত্মা যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ও দ্রুত ঘুরে দেখল আরশান সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। ওর হাতে একটা কফির মগ। রিমি হকচকিয়ে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে পালাতে চাইল, কিন্তু আরশানের এক তর্জনী উঁচানো আদেশ ওকে থামিয়ে দিল— “দাঁড়াও!”
রিমির পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেল। আরশান ধীরপায়ে হেঁটে ওর একদম কাছে এসে দাঁড়াল। লোকটার উপস্থিতি এতটাই দাপুটে যে রিমি নিশ্বাস নিতেও ভয় পাচ্ছে। আরশান কফির মগটা হাতে ধরেই রিমির খুব কাছাকাছি এসে মুখ নামাল। ওর তপ্ত নিশ্বাস রিমির কপালে আছড়ে পড়ছে…
“এত কৌতূহল নিয়ে কী দেখতে এসেছিলে?”
রিমি মাথা নিচু করে তোতলাতে শুরু করল…
“কি..কিছু তো না, আপনার ঘরের দরজা সাধারণত খোলা থাকে না তাই আমি..আমি দরজা আটকে দিতে এসেছিলাম। হ্যাঁ”
আরশান এক চিলতে বাঁকা হাসি দিল। ও নিজের খালি হাতটা দিয়ে রিমির থুতনিটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। আরশানের আঙুলের সেই শীতল স্পর্শে রিমির সারা শরীরে এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। ও অনুভব করল, আরশানের চোখের সেই নিষিদ্ধ আকর্ষণ ওকে যেন একটু একটু করে গ্রাস করছে…
“I hate lies, Rimi. তোমার চোখের এই অস্বস্তিই বলে দিচ্ছে তুমি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিলে।”
আরশান ওর থুতনি ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওর চশমার আড়ালে থাকা চোখদুটো যেন রিমির আত্মার একদম গভীরে গিয়ে বিঁধছে। রিমি উত্তর দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। ওর হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় যেন আছাড় খাচ্ছে। ও মাথা নিচু করে নিজের আঙুল মটকাচ্ছিল, কিন্তু আরশানের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য ও এক বিন্দুও প্রস্তুত ছিল না। হুট করেই আরশান রিমির কব্জিটা শক্ত করে ধরল। রিমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরশান ওর হাতটা টেনে এনে নিজের সুঠাম পেটের ওপর, অর্থাৎ ওর পাতলা টি-শার্টের ওপর শক্ত করে চেপে ধরল। রিমির সারা শরীর দিয়ে যেন এক শক্তিশালী বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। ওর হাতের তালুর নিচে আরশানের টি-শার্টের ওপারে পাথরের মতো শক্ত পেশি (অ্যাবস) গুলোর অস্তিত্ব স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে। রিমি এতটাই চমকে উঠল যে ওর নিশ্বাস আটকে এল, শুধু বড় বড় চোখে ও আরশানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরশান এক ইঞ্চিও নড়ল না। ও রিমির হাতটা ওভাবেই নিজের ওপর চেপে ধরে রেখে ওর চোখের দিকে চাইল। আরশানের চোখে এখন এক ধরণের শীতল দাপট। ও নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে রিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ধূর্ত হাসি। ও খুব ধীরলয়ে বলল…
“Does the reality feel better than your curiosity?”
রিমির গা শিউরে উঠল। ও হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু আরশান ওকে হাতটা একটুও নড়াতে দিলো না! সে রিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। ওর তপ্ত নিশ্বাস রিমির ঘাড়ের কাছে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করছে। ও খুব শান্ত অথচ প্রগাঢ় গলায় বললো…
“Your pulse is racing. Are you okay?”
রিমি উত্তর দিতে পারল না। আরশানের সেই প্রখর চাউনি রিমির গাল, কম্পিত ওষ্ঠাধর আর লজ্জায় নুইয়ে পড়া চোখের ওপর দিয়ে ধীরলয়ে বুলিয়ে গেল। রিমির এই অসহায় আত্মসমর্পণ, ওর চোখের সেই বিচিত্র কৌতূহল আর ভয়ের মিশ্রণ আরশানের ভেতরে এক তৃপ্তি আর তীব্র আকর্ষণের জন্ম দিচ্ছে। ও বুঝতে পারছে, মেয়েটা স্রেফ ভয় পাচ্ছে না, বরং এক নিষিদ্ধ আকর্ষণের গভীর চোরাবালিতে ও নিজের অজান্তেই ডুবে যাচ্ছে। অবাক করা বিষয় হলো প্রথমে ছাড়ানোর জন্যে ছটফট করলেও পরে রিমি শান্ত হয়েই দাঁড়িয়ে ছিলো। রিমিকে শান্ত দেখেই আরশান হঠাৎ ওর কব্জিটা আলগা করে ছেড়ে দিল। তখনই যেনো রিমির হুশ ফিরলো! আচমকা মুক্তি পেয়ে রিমি টাল সামলাতে না পেরে পেছনের দেওয়ালের সাথে সেঁটে গেল। ওর পুরো হাতটা এখনও আরশানের পেটের ওপর। ১৯ বছরের রিমি আজ প্রথমবার অনুভব করল, কোনো পুরুষের বলিষ্ঠ উপস্থিতিতে এভাবেও শব্দহীনভাবে দিশেহারা হয়ে যাওয়া যায়। একটু পর আরশান খুব ধীরস্থিরভাবে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। দরজায় পৌঁছে ও একবার থামল। কাঁধের ওপর দিয়ে ফিরে তাকিয়ে নিস্পৃহ অথচ হুকুমের সুরে বলল….
“Don’t tempt me, Rimi. I might not be this patient next time.”
আরশান ঘরে ঢুকে দরজাটা টেনে দিলেও রিমি তখনও থ হয়ে করিডোরে একা দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতের তালুটা ও নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। হৃদকম্পন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কি হচ্ছে এগুলো? আরশান কেনো এসব করছে? আর রিমি কেনোই বা ওই মুহূর্তে ছুটে পালিয়ে যেতে পারলো না? কেনো কড়া স্বরে আরশানকে কিছু বলতে পারলো না তা ভেবে পাচ্ছেনা। রিমির মনে ভয় জমতে শুরু করেছে, না চাইতেও কি সে কোনো এক ভয়ঙ্কর আকর্ষণের জালে জড়িয়ে পড়ছে?
চলবে…
[প্রিয় readers, পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন ❤️]
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1CR4wczmee/?mibextid=oFDknk

