মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_০৭

0
99

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_০৭

রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই করছে। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকলেও রিমির চোখের পাতা এক হচ্ছে না। ইদানীং রাতগুলো ওর জন্য খুব দীর্ঘ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতবার ও চোখ বন্ধ করছে, আরশানের সেই গম্ভীর মুখ বা সেই তীক্ষ্ণ চাউনি ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। রিমি উঠে বসে বিছানায় হেলান দিল। সঠিক কারণটা না বুঝলেও এ কদিন আরশানকে দেখে রিমি এইটুকু বুঝেছে যে আরশান মানুষটা একটু অন্যরকম। তার মধ্যে যেকোনো জিনিস নিয়ন্ত্রণের নেশা ও এক অদ্ভুত খুঁতখুঁতে স্বভাব আছে। আরশানকে ও ভয় পায় ঠিকই, কিন্তু যখন থেকে লোকটা ওর আশেপাশে আসতে শুরু করেছে, তখন থেকেই রিমির মনে অন্যরকম এক অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে। এ কেমন অনুভূতি সেটা রিমির জানা নেই, কিন্তু ওর মস্তিষ্ক বারবার যেন জানান দিচ্ছে এটা অন্যায়! রিমি নিজেই নিজেকে ধমক দেওয়ার ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে উঠল…

“ছিঃ রিমি! তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এই বাড়িতে তুই আশ্রিত। ইনায়া তোকে নিজের বোনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। ওর মা বাবাও তোর অযত্ন করছেনা আর তুই… তুই কি শেষ পর্যন্ত ইনায়ার ভাইয়ের সম্পর্কেই এসব উল্টোপাল্টা ভাবছিস? ইনায়ার ভাই মানে তো সে আমারও ভাইয়ের মতো, আর আমি কিনা এসব ভাবছি! এটা তো মারাত্মক অন্যায়!”

রিমির নিজের ওপর এক ধরণের অপরাধবোধ দলা পাকিয়ে আসছে। আরশান ইনায়ার বড় ভাই এই ধ্রুব সত্যটা ও কেন বার বার ভুলে যাচ্ছে? তার ওপর এই পরিবারের আভিজাত্য আর স্ট্যাটাস! আরশানদের জীবনযাপনের যে ধরনের জীবনযাপন করে তার সাথে রিমির মতো একটা সাধারণ মেয়ের কোনো তুলনাই চলে না। এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করার সাধ্য ওর নেই। সব জেনেও এমন এক পুরুষ সম্পর্কে তৈরি হওয়া অনুভূতিকে প্রশয় দেওয়াও অন্যায়! রিমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, আরশানের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণ আসলে কিছুই না। সে হয়তো মজা নিচ্ছে বা টি’জ করার জন্য এসব করছে। ওর মতো একজন ‘পারফেক্ট’ মানুষ ওর মতো একটা মেয়ের প্রতি সিরিয়াস হবে, এটা ভাবাটাই বোকামি। রিমি ভাবলো হয়তো ওকে একটু নাস্তানাবুদ করে লোকটা আনন্দ পাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতেই রিমি জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও মনে মনে শক্ত হওয়ার চেষ্টা করল। আরশানকে ও শুধু ইনায়ার ভাই হিসেবেই দেখবে, এর বেশি কিছু না। ওর অবাধ্য মনটাকে এখন থেকেই শেকল পরাতে হবে। রিমি চায় না ওর কোনো ভুল অনুভূতির জন্য এই পরিবারের সাথে ওর তৈরি হওয়া সম্পর্কটা নষ্ট হোক। বিশেষ করে ইনায়ার বিশ্বাস আর আরাফাত সাহেবের দয়ার অমর্যাদা ও কিছুতেই হতে দেবে না! সকাল আটটা…ডাইনিং টেবিলে নাস্তার আয়োজন শেষ। আরশানের বাড়িতে নিয়মকানুন খুব কড়া, বিশেষ করে সকালের নাস্তাটা সবাই একসাথেই করে। আরাফাত সাহেব ধীরেসুস্থে খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন। আরশান বরাবরের মতোই ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট পরে বসে আছে। ওর বসার ভঙ্গি বা কফির কাপ ধরা সবকিছুর মধ্যেই একটা পরিপাটি ভাব। রিমি আজ পুরোটা সময় মাথা নিচু করে নাস্তা শেষ করল। গত রাতের সিদ্ধান্তে সে অটল থাকবে, আরশানকে শুধু ইনায়ার ভাই হিসেবেই দেখতে হবে, এর বাইরে অন্য কোনো চিন্তা আনা যাবে না। নাস্তা শেষ করে আরাফাত সাহেব টেবিল ছেড়ে উঠে গেলেন। রিমিও নিজের প্লেটটা সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। ও যখন যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে, তখনই খেয়াল করল আরশান এখনো বসে আছে। ও পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে সরাসরি রিমির দিকে তাকিয়ে আছে। সেই তীক্ষ্ণ চাউনি দেখে রিমির অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল। রিমি জানে এড়িয়ে গেলেও সমস্যা কিন্তু একটা সীমারেখা টেনে দেওয়া দরকার। ও দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়েও হঠাৎ থামল। আরশানের চোখের দিকে না তাকিয়েই খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলে উঠল…

“Have a nice day…ভাইয়া!”

আরশান গ্লাসটা ঠোঁটের কাছে গিয়েও থেমে গেল। রিমি প্রথমবার ওকে ‘ভাইয়া’ বলে ডেকেছে! এই শব্দটা আরশানের কানে কেমন যেন অপরিচিত কোনো সুরের ন্যায় শোনাল। ও এক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইল রিমির দিকে, কিছু বলল না। কিন্তু ওর ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম, রহস্যময় একটা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে না ছিল কোনো সরাসরি রাগ, না ছিল কোনো সহজ সম্মতি। ও শুধু একপলক দেখে নিয়ে পানি খেয়ে উঠে গেলো। আরশানের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে রিমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো, হয়তো এতেই কাজ হয়েছে!

ভার্সিটির ক্লাসের মাঝখানে লম্বা একটা ব্রেক। ক্যাম্পাসের বটগাছের নিচে এক কোণে গিটার হাতে বসে মনের সুখে গান গাইছে শাফিন। ওর উদাসীন ভঙ্গি আর দরাজ গলার গান মুহূর্তেই একঝাঁক মেয়েকে টেনে এনেছে সেখানে। কেউ ফোনের ক্যামেরা তাক করে ভিডিও করছে, কেউ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। গান শেষ হতেই হাসাহাসি আর করতালিতে মুখর হয়ে উঠল চারপাশ। একটা মেয়ে মজা করে খাতা এগিয়ে দিয়ে বলল…

“শাফিন, অটোগ্রাফ প্লিজ! তুমি তো ফিউচার স্টার।”

শাফিন হোহো করে হেসে উঠল। ও বেশ খোশমেজাজে মেয়েদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, হাসাহাসি করছে। দূর থেকে এই দৃশ্যটা দাঁড়িয়ে দেখছিল ইনায়া আর রিমি। ইনায়ার হাতে একটা পানির বোতল, কিন্তু ওর চোখ জোড়া শাফিনের দিকে স্থির। শাফিনকে অন্য মেয়েদের সাথে এভাবে হাসাহাসি করতে দেখে ইনায়ার ভেতরে কেমন জানি একটা খচখচ করছে। ওর মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেল।রিমি লক্ষ্য করছিল ইনায়াকে। ও মৃদু হেসে ইনায়ার কাঁধে একটা ধাক্কা দিল…

“কিরে? ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? কারো প্রতি কি মায়া পড়ে গেল নাকি?” রিমি একটু টিপ্পনী কেটে বলল।

ইনায়া একদম থমকে গেল। থতমত খেয়ে চট করে নজর সরিয়ে নিয়ে বলল, “ধুর! কী যা তা বলছিস? আমি জাস্ট দেখছিলাম গানটা শেষ হলো কি না।”

রিমি হাসল — “ওর গান তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে কিন্তু তোর মুখটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ তোর ভীষণ প্রিয় চকলেট কেড়ে নিচ্ছে”

ইনায়া আবার অস্বীকার করার চেষ্টা করল…

“কি বলছিস এগুলো উল্টোপাল্টা?”

রিমি এবার একটু সিরিয়াস হয়ে ইনায়ার দিকে তাকাল…

“শোন, অস্বীকার করে লাভ নেই। আমি কদিন ধরে দেখছি তুই ক্লাস টাইমে কিভাবে শাফিনের দিকে তাকিয়ে থাকিস। তাছাড়া এখন, তোর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ওই মেয়েগুলোর সঙ্গে ওকে দেখে তোর মোটেই ভালো লাগছে না। পছন্দ করিস ওকে, তাই না?”

ইনায়া এবার একদম চুপ হয়ে গেল। ও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কথাগুলো যেন গলায় আটকে গেল। ও আবার শাফিনের দিকে তাকাল। শাফিন তখন একটা মেয়ের ফোনের দিকে তাকিয়ে পোজ দিচ্ছে। ইনায়া এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে উল্টো দিকে হাঁটা দিল।

“চল রিমি, ক্লাসে গিয়ে বসি। এখানে বড্ড বেশি মানুষের ভিড়।”

রিমি পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে হাসল কারণ ইনায়ার এই অভিমানের কারণটা ও ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছে!
_________________________________

শহরের নামী সাইকিয়াট্রিস্ট ডক্টর জুবায়েরের চেম্বারে বসে আছে আরশান। বিগত আট বছর ধরে এই চেম্বারে আরশানের যাওয়া আসা হচ্ছে। শুরুতে তিনমাস পরপর এলেও, এখন যাতায়াতের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। ডক্টর জুবায়ের ওর পুরনো ফাইলটা দেখছিলেন, মাঝেমধ্যে চশমার ওপর দিয়ে আরশানের দিকে তাকাচ্ছেন। এ মুহূর্তে চেম্বারে এসির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আরশান ধীরস্থিরভাবে সামনের চেয়ারে বসে আছে। বিশ বছর বয়স থেকে সে এখানে আসছে, নিজের মস্তিষ্ক ও মনের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াইয়ের পর গত তিন বছর আরশান এতটাই স্থিতিশীল ছিল যে, সে শুধু ছয় মাস পর পর রুটিন চেকআপে আসছে। আজও সে নিজেকে খুব স্বাভাবিকভাবেই উপস্থাপন করল। ওর শার্টের কলার থেকে শুরু করে কথা বলার ধরণ সবকিছুতেই সেই চিরচেনা পরিপাটি ভাব। ডাক্তার হাসিমুখে প্রশ্ন করলেন…

“কেমন আছো আরশান? অফিস আর রুটিন সব ঠিকঠাক চলছে?”

ডক্টর জুবায়ের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আরশানের ফাইলটা দেখছিলেন। আরশান খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল — “I’m fine doctor, সবকিছু একদম শিডিউল মতোই চলছে। কোনো বড় সমস্যা নেই।”

ডক্টর জুবায়ের কলমটা হাতে নিয়ে কিছু একটা নোট করলেন — “ঘুমের কী অবস্থা এখন?”

“কিছুটা আগের মতোই। কোনো কোনো রাতে বেশ ভালো ঘুম হচ্ছে, আবার কোনো রাতে দেখা যায় সারা রাত জেগে থাকি”

ডক্টর জুবায়ের কলমদানিটা ইচ্ছে করে অগোছালো করে রেখেছিলেন, আরশানের ওটা নজরে পড়তেই ও গোছাতে শুরু করলো। ডক্টর সেটা নোট করে আরো কিছু প্রশ্ন করলেন, আরশান ঠিকঠাক উত্তর দিলো। এরপর ডক্টর জিজ্ঞাসা করলেন…

“আরশান, তোমার আশেপাশে ইদানীং এমন কোনো নতুন পরিবর্তন কি এসেছে যা তোমার অভ্যস্ত চোখের জন্য কিছুটা ‘অগোছালো’ বা ‘অন্যরকম’ লাগছে? ধরো কোনো বস্তু, নতুন মানুষ, বা কোনো নতুন ধরণের অভ্যাস যা তুমি আগে কখনো লক্ষ্য করোনি?”

ডক্টরের এই সাধারণ প্রশ্নটাই যেন আরশানের মাথায় বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। ওর চোখের সামনে হুট করে রিমির সেই ভেজা চুল, ওর অবাধ্য চাউনি আর সকালে অস্ফুট স্বরে বলা ওই ‘ভাইয়া’ ডাকটা ভেসে উঠল। সচরাচর এমন হয় না, আরশান নিজের চিন্তাকে লোহার দেয়াল দিয়ে আটকে রাখতে জানে। কিন্তু আজ যেন সেই দেয়ালটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। চোখের সামনে ডাক্তারের বদলে রিমির ওই অপরাধবোধে জড়ানো মুখটা জেঁকে বসল। ডক্টর জুবায়ের লক্ষ্য করলেন আরশান হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে। ও এক দৃষ্টিতে মেঝের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর জুবায়ের আবারও জিজ্ঞেস করলেন — “আরশান? আমার প্রশ্নটা কি শুনতে পেয়েছ?”

আরশান চমকে উঠে সম্বিৎ ফিরে পেতেই ও একটু আমতা আমতা করে বলল, “I’m sorry doctor, কী যেন বলছিলেন? ঘুম… হ্যাঁ, ঘুমের প্যাটার্নটা এখনও ঠিক হয়নি। ওই যে বললাম, কখনো হচ্ছে, কখনো হচ্ছে না”

ডক্টর জুবায়ের এবার আরও তীক্ষ্ণভাবে আরশানের দিকে তাকালেন। গত তিন বছরে আরশানকে এতটা আনমনা তিনি দেখেননি — “আরশান, আমি কিন্তু ঘুমের কথা বলিনি। আমি জিজ্ঞেস করেছি নতুন কোনো পরিস্থিতির কথা। তুমি কি আজ মানসিকভাবে এখানে আছ?”

আরশান অস্বস্তিতে পড়ে গেল। ও সরাসরি উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল…

“আসলে ইদানীং কনসেন্ট্রেশনে একটু সমস্যা হচ্ছে। মনে হচ্ছে অপ্রত্যাশিত কিছু আমার সিস্টেমে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। আমি সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।”

ডক্টর জুবায়ের ফাইলে কিছু একটা লিখলেন…

“আমি ওষুধের ডোজ কিছুটা অ্যাডজাস্ট করে দিচ্ছি। তবে আমি চাই তুমি দুই সপ্তাহ পর একবার এসো।”

আরশান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল — “গত তিন বছর তো আমি ছয় মাস পর পর আসছি। হঠাৎ এত শর্ট গ্যাপে কেন আসতে বলছেন?”

ডক্টর জুবায়ের পেশাদার ভঙ্গিতে হাসলেন…

— “তেমন সিরিয়াস কিছুনা। তোমার মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সেটা নিয়েই ছোটো একটা রুটিন ফলো আপ হবে। আমরা বিস্তর আলোচনা করবো”

ডক্টর জুবায়েরের চেম্বার থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় আরশানের পায়ের শব্দ আজ পাথরের মতো ভারী শোনাল। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে ও হঠাৎ মত বদলে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল। প্রতিটি ধাপে ও যেন নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে পা ফেলছে। ডাক্তার সরাসরি না বললেও আরশানের বুঝতে বাকি নেই আসলে “পরিবর্তন” এর কথা ডাক্তার কেনো ওকে বলেছে কারণ ও নিজেও কিছুদিন যাবত নিজের মধ্যে এক অনেকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। পার্কিং লটে এসে নিজের গাড়িতে বসেই আরশান দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল….

“How dare you Arshan Mirza! একটা সাধারণ মেয়ে যে এই বাড়িতে আশ্রিত, যার কোনো অস্তিত্ব তোর কাছে থাকার কথা ছিল না সে আজ তোর এতো বছরের সাজানো Mental Discipline ভেঙে দিচ্ছে? This is pathetic!”

গাড়িতে উঠে ও স্টিয়ারিং হুইলে সজোরে একটা ঘুষি বসাল। ওর হাতের গাঁটগুলো সাদা হয়ে এল যন্ত্রণায়। ডক্টর জুবায়েরের ওই ‘পরিবর্তন’ শব্দটা ওর কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে।

“পরিবর্তন? আমি বদলাচ্ছি? No, it’s not a change. It’s a failure!”

ওর মনে পড়ল সকালে রিমির বলা ওই ‘ভাইয়া’ ডাকটা। শব্দটা শুনলে মনে হয় দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কিন্তু আরশানের অবচেতন মন জানে ওই ডাকটা ওর সিস্টেমের ভেতরে কেমন এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর টান তৈরি করেছে। ও রিমিকে ঘৃণা করে না, কিন্তু এই মুহূর্তে ওর মনে হচ্ছে রিমি একটা ভাইরাস যা ওর সুস্থ, সুশৃঙ্খল মস্তিষ্কে সংক্রমনের ন্যায় ছড়াচ্ছে।

“আমি তোমাকে আমার সিস্টেমে জায়গা দেব না রিমি। You’re nothing but a distraction, and I know exactly how to delete a distraction from its root”

আরশানের চোখের দৃষ্টি এবার পাথরের মতো কঠিন হয়ে এল। ও মনে মনে ঠিক করল, এই যে দুর্বলতা ওর ভেতর জন্ম নিয়েছে, এর জন্য ও নিজেকে শাস্তি দেবে আর সেই শাস্তির ভাগীদার হবে রিমি নিজেও। ও রিমিকে এমনভাবে অবজ্ঞা করবে, এমন রুক্ষ কথা বলবে যাতে ওই মেয়েটা আরশানের ছায়া মাড়াতেও ভয় পায়। রিমির চোখের জল ওকে অস্থির করে তুলছে? ভালো! ও আরও কাঁদাবে রিমিকে। যতক্ষণ না আরশানের নিজের ভেতরের এই অবাধ্য টানটা পুরোপুরি মরে যাচ্ছে, ততক্ষণ ও থামবে না।

সাইকোলজিতে যখন কেউ কারো প্রতি অবাধ্য আকর্ষণ অনুভব করে কিন্তু সেটাকে ‘অন্যায়’ বা ‘অসুস্থতা’ মনে করে, কারো প্রতি আকস্মিক টানকে নিজের ‘ব্যর্থতা’ মনে করে তখন সে উল্টো আচরণ করে। একে “Reaction Formation” বলা হয়। আর এই মুহূর্তে আরশানের এই হঠাৎ মুড পরিবর্তন হওয়া সেই reaction formation এরই ফল!

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/18NQrJjBev/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here