মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #বোনাস_পর্ব

0
28

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#বোনাস_পর্ব

গত কয়েকটা দিন আরশানের জন্য ছিল এক ভয়াবহ মানসিক যুদ্ধের মতো। ডক্টর জুবায়েরের চেম্বার থেকে ফেরার পর ও নিজেকে এক অদৃশ্য হাজতে বন্দি করে ফেলেছে। আরশান নিজের নিখুঁত পৃথিবীতে রিমিকে একটি Error হিসেবে ধরে নিয়েছে আর সেই ত্রুটি সংশোধন করতেই ও স্থির করেছিল ও চেয়েছিল রিমিকে এমনভাবে আঘাত করতে যাতে মেয়েটা ভয়ে ওর ছায়া থেকেও দূরে থাকে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আরশান যতবারই রিমির মনে কষ্ট দেওয়ার নীল নকশা সাজাচ্ছিল, ততবারই ওর নিজের মন সেই পরিকল্পনায় সায় দিচ্ছিল না। কারো সাথে খারাপ আচরণ করার জন্য তো খুব বেশি সুযোগের প্রয়োজন হয় না। একটা তুচ্ছ অজুহাত বের করে অনায়াসেই কাউকে মানসিকভাবে পিষে ফেলা যায়। কিন্তু আরশান যখনই রিমির সেই মায়া জড়ানো, শান্ত মুখটা মনে করছিল ওর সমস্ত কঠোরতা মুহূর্তেই বালির বাঁধের মতো ধসে যাচ্ছিল। ও নিজের সাথেই নিজে এক কঠিন দ্বন্দ্বে মেতে উঠল।

এক গভীর রাতে স্টাডি রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে আরশান নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল। ও কি আসলেও রিমির ওপর রাগ করছে, নাকি নিজের ওপর? ঠাণ্ডা মাথায় তলিয়ে দেখল, এখানে রিমির আসলে দোষটা কোথায়? মেয়েটা তো নিজের মতো ছিল। আরশানই তাকে নিজের জীবনে জায়গা দিয়েছে, নিজের অবচেতন মনে তাকে ঠাঁই দিয়েছে। আরশানই নিজেকে ‘ডিস্ট্রাক্টেড’ হতে দিয়েছে। ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি। এটা ওর ব্যর্থতা, রিমির নয়। শেষমেশ কোনো কূলকিনারা না পেয়ে আরশান ‘উপেক্ষা’র পথ বেছে নিল। ও স্থির করল, রিমিকে আঘাত করবে না, কিন্তু ওকে আগলে ধরতেও পারবে না। রিমির অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এড়িয়ে চলাই এখন আরশানের নতুন আত্মরক্ষার বর্ম। ও এমনভাবে রিমির পাশ কাটিয়ে চলে যেতে শুরু করল যেন মেয়েটা হাওয়ার এক ঝাপটা মাত্র, আর কিছুই না। রিমি অবশ্য আরশানের এই আচরণকে এটাকে অস্বাভাবিক কিছু ভাবেনি। বরং ও যেনো স্বস্তি লেগেছে এটা ভেবে যে ও এটাই চাইছিল। আরশানের সঙ্গে দূরত্ব যত বজায় থাকবে, ততই ওর মনের অস্থিরতা কমবে। রিমির ধারণা, এই শীতলতা বজায় থাকলে হয়তো সময়ের সাথে সাথে সবকিছু আবার পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

_______________________________

শহরের নামী শপিং মলটার ভেতর এসির স্নিগ্ধ বাতাস থাকলেও আরশানের চেহারায় এক ধরণের চাপা অস্বস্তি কাজ করছে। ছুটির দিন ও ঘরে নিরিবিলিতে কাটাতেই পছন্দ করে কিন্তু আজ বোনকে শপিংয়ে নিয়ে আসতে হলো। রিমি লক্ষ্য করল, আরশান যেন এই ভিড় আর মানুষের আনাগোনা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে চাইছে। ইনায়া ঘুরতে ঘুরতে রিমিকে নিয়ে একটা শপে ঢুকল। আরশানও সঙ্গে গেলো। ইনায়া একটা গাঢ় ল্যাভেন্ডার রঙের ড্রেস বের করে নিজের গায়ের সাথে ধরল। রঙটা ওকে দারুণ মানিয়েছিল। ও বেশ উৎসাহ নিয়ে আরশানের দিকে ঘুরে বলল…

“ভাইয়া, দেখো তো! এটা নিই? আমার কিন্তু খুব পছন্দ হয়েছে।”

আরশান একপলক ড্রেসটার দিকে তাকাল। ওর ভ্রু কুঁচকে এল। ড্রেসটার নকশাটা ছিল কিছুটা অসমান, নিচের দিকটা একপাশে একটু বেশি ঝোলানো। আরশানের চোখে এই ‘অসামঞ্জস্যতা’ যেন বিঁধছে। ও খুব শান্ত কিন্তু কাটা কাটা গলায় বলল….

“না ইনায়া, এটা কেমন যেনো অগোছালো ধরনের। তোকে মানাচ্ছে না। পাশের ওই স্কাই – ব্লু রঙের ড্রেসটা দেখ, ওটার কাটিং অনেক বেশি ব্যালেন্সড। I think that’s perfect for you”

রিমি অবাক হলো, পোশাকের ডিজাইনেও এই লোকটা ব্যালেন্স খোঁজে? এ তো অস্বাভাবিক ব্যাপার। রিমি আরো অবাক হলো যখন দেখলো ইনায়া কোনো তর্ক করল না। এমনকি একটুখানি মন খারাপও করল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই ও নিজের প্রিয় ল্যাভেন্ডার ড্রেসটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখে আরশানের পছন্দ করা ড্রেসটা হাতে নিল। ঠিক সেই সময় আরশানের ফোনে একটা কল এল। ও উঠে দাঁড়িয়ে ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল….

“আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট জুম মিটিং আছে। আমি ক্যাশ কাউন্টারের পাশের লাউঞ্জে বসছি। তোরা দ্রুত শেষ করে ওখানে আসিস।”

আরশান আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে লম্বা পা ফেলে কাউন্টারের চলে গেল। আরশান চোখের আড়াল হতেই রিমি ইনায়ার হাতটা একটু চেপে ধরল। ও কৌতূহল সামলাতে না পেরে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল…

“ইনায়া, ল্যাভেন্ডার কালারটা তো তোকে খুব সুন্দর লাগছিল আর ওটা তোর পছন্দের রংও। তুই ওটা নিতে একটু জেদও করলি না? শুধু তোর ভাই পছন্দ করেননি বলে ড্রেসটা নিলি না?”

ইনায়া একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও রিমির দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল…

“জেদ করে কী হবে রে রিমি? ভাইয়া যেটা একবার বলে ওর পছন্দ না, সেটা ও আর দ্বিতীয়বার ওর চোখের সামনে সহ্য করতে পারে না। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি”

রিমি ভ্রু কুঁচকে তাকাল… “একটা ড্রেস পছন্দ না হওয়া তো খুব সাধারণ ব্যাপার। তাই বলে ওটা তুই পরলেও উনার সমস্যা? তাছাড়া এই জামার মধ্যেও উনি কিসের ব্যালেন্সের কথা বললেন?”

ইনায়া ড্রেসগুলো সরাতে সরাতে খুব নিচু স্বরে বলতে শুরু করল…

“আসলে ভাইয়ার ভেতরে না সবকিছু একদম সোজা আর পারফেক্ট দেখার একটা অদ্ভুত রোগ আছে। ডাক্তাররা এটাকে OCD বলেন। আমার ভাইয়ের আবার extreme level OCD আছে!”

রিমি চমকে গেলো — “OCD? এ সমস্যায় তো শুধু মানুষ বেশি পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে তাইনা?”

“আরে নাহ! অনেক ধরনের আছে। আর আমার ভাইয়ার বলতে পারিস সব ধরন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যেমন এই সামান্য বিষয়টাই দেখ। আমাদের কাছে যেটা সাধারণ ব্যাপার ভাইয়ার কাছে সেটা পাহাড় সমান অস্বস্তির ব্যাপারও হতে পারে। ওই যে ড্রেসটা দেখলি ওটার একদিকের ঝুল বেশি ছিল না? আমি যদি ওটা বাসায় নিয়ে পড়ি তবে ভাইয়া রাগ করবেনা ঠিকই কিন্তু ওর চোখের সামনে ওর পছন্দ হয়নি এমনকিছু পরে আমি ঘুরলে ওর অস্বস্তি হবে আর আমি চাই না আমার সামান্য একটা ড্রেসের জন্য ভাইয়ার সমস্যা হোক”

OCD সম্পর্কে এতদিন রিমির ধারণা ছিলো যে এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ শুধু পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখে কিন্তু বিষয়টা যে এতটা গুরুতর সেটা ওর ধারণার বাইরে ছিলো। আরশানের স্বভাব, তার তুচ্ছ কারণে অদ্ভুত আচরণের পেছনে যে এরকম একটা মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে, সেটা ও কল্পনাও করেনি। ও বুঝতে পারল, আরশান রিমিকে ঘৃণা করে না, বরং রিমির স্বতঃস্ফূর্ত আর কিছুটা অগোছালো স্বভাবটা আরশানের সাজানো মস্তিষ্কে একটা ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ে। আর সেই অস্বস্তি থেকেই ও রিমিকে দূরে ঠেলে দেয়। শপিংয়ের চেয়ে বেশি আজ রিমি আরশানের বিষয়ে আগ্রহী ছিলো। ইনায়াকে নানারকম প্রশ্ন করে সবগুলোর উত্তর না পেলেও খানিকটা নিশ্চিত হতে পেরেছে যে আরশানের আচরণের পেছনের কারণ কি। শপিং শেষে ওরা নিচে এলো, তখনই রিমির নজরে পড়লো কয়েক হাত দূরে লাউঞ্জে বসা আরশানের দিকে। লোকটা ফোনে কিছু দেখছিলো। ওদের দেখে আরশান এগিয়ে আসে, ক্যাশ কাউন্টারে যখন আরশান পেমেন্ট করার জন্য কার্ড বের করছিল, রিমি একটু দূর থেকে স্থির দৃষ্টিতে ওকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। সে মুহূর্তে আরশানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তখন ওকে জানান দিচ্ছিলো যে ও কেউ ওকে খুব নিখুঁতভাবে পরখ করছে। ও আড়চোখে দেখল রিমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে, কিন্তু ওর চোখে সেই চেনা সংকোচ নেই। বরং সেখানে এক ধরণের কৌতূহল! আরশান বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি যখন জ্যামে পড়েছিল তখন আরশান ড্রাইভিং সিটের ওপর থাকা ভিউ মিররে লক্ষ্য করল যে রিমি পেছনের সিটে জানালার বাইরে না তাকিয়ে আয়নার ভেতর দিয়ে আরশানের চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। আরশান আয়নায় চোখ রাখতেই রিমি তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে, ঠিক যেন কোনো নিষিদ্ধ কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার অবাধ্য চোখ দুটো ফিরে আসছে আরশানের ওপর। আরশান মনে মনে ভীষণ অবাক হলো। গত কয়েকটা দিন তো ওরা একে অপরকে এড়িয়ে চলছে। রিমি ভুলেও ওর কক্ষপথে আসতে চায়নি, আরশানও তা মেনে নিয়েছিল। তবে আজ মেয়েটার হঠাৎ কী হলো? আরশানের মস্তিষ্কে এই নতুন সমীকরণটা মিলছিল না। রিমির এই চাউনিতে কোনো রাগ নেই, বরং আছে এক অজানা কৌতূহলের ছাপ আছে যা আরশানের মতো মানুষের কাছে একদম অপরিচিত লাগছে!

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/1GfC9wjewX/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here