#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_০৮
শপিং মল থেকে ফেরার পর থেকেই রিমির জগতের কেন্দ্রবিন্দু যেন এক লহমায় বদলে গেল। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ও ল্যাপটপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে রইল। সার্চ ইঞ্জিনে বারবার টাইপ করল…”OCD & its types”. “Just Right OCD”, “Symmetry Obsession”। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা প্রতিটি শব্দ পড়ছে আর মেয়েটা অবাক হচ্ছে , এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষগুলো শুধু পরিচ্ছন্ন থাকতেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তাদের মস্তিষ্কের ভেতরে প্রতিটা মুহূর্ত এক অদৃশ্য দানব লড়াই করে। সামান্য একটা অগোছালো কলম বা টেবিলের ওপর রাখা বাঁকা একটা পানির গ্লাসও তাদের জন্য পাহাড় সমান মানসিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে। রিমির মনের কোণে আরশানের প্রতি যে ক্ষোভ জমা ছিল, তা যেনো ধীরে ধীরে এক গভীর মায়ায় রূপ নিতে লাগল। ও কিছুটা বুঝতে পারল, আরশান ইচ্ছে করে এমন করেনা। গত কয়েকদিন ও আরশানকে যমের মতো এড়িয়ে চলত ঠিকই, কিন্তু এখন ওর চোখ দুটো যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে। ও দূর থেকে ছায়ার মতো আরশানকে লক্ষ্য করতে লাগল। ডাইনিং টেবিলে আরশানের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন রিমির কাছে এক নতুন গবেষণার বিষয়। আরশান কীভাবে কাঁটাচামচ আর ছুরিটা প্লেটের একদম সমান্তরালে সাজিয়ে রাখছে, গ্লাসটা তুলে নেওয়ার পর আবার ঠিক আগের বৃত্তেই সেটা বসাচ্ছে কি না, রিমির তীক্ষ্ণ নজর সবকিছুই ধরছে। আরশানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বরাবরই প্রখর, কিন্তু ইদানীং রিমির এই নজরদারি ওকে তপ্ত শলাকার মতো বিঁধছে। আরশান যেকোনো বিষয়ে একটা গাণিতিক নিয়মের মধ্যে চলতে পছন্দ করে। ও যখন রিমিকে ইগনোর করছিল, ও সেই ‘উপেক্ষা’র নিয়মটা নিজের মাঝে ধ্রুব সত্য হিসেবে গেঁথে নিয়েছিল। রিমি ওকে এড়িয়ে চলছিলো, যা একটি নিয়ম হিসেবে আরশান মেনে নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে ও অনুভব করছে, ওর প্রতিটি ব্যক্তিগত পদক্ষেপের ওপর কেউ একজন অদৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছে। ডাইনিং টেবিলে বসে আরশান যখন খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের সাদা ন্যাপকিনটা ত্রিকোণাকৃতিতে ভাজ করছিল, ও টেবিলের নিচ দিয়ে অনুভব করল রিমির স্থির দৃষ্টি ওর হাতের আঙুলের ওপর। ও মাথা তুলে তাকাল না, কিন্তু ওর চোয়ালের পেশিগুলো রাগে আর অস্বস্তিতে শক্ত হয়ে এল। আরশানের মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন, “মেয়েটা হঠাৎ এমন বদলে গেল কেন?”
__________________________________
রাত তখন প্রায় এগারোটা। পুরো বাড়ি যেন এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। করিডোরের সোডিয়াম আলোয় হালকা হলদেটে আভা। ইনায়ার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই ও অনুভব করল কেউ ওর পেছন থেকে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক জোড়া শক্ত এবং শীতল হাত রিমির মুখ চেপে ধরল। হৃৎপিণ্ড গলার কাছে চলে আসার উপক্রম হলো রিমির। ধস্তাধস্তি করার সুযোগটুকু পাওয়ার আগেই লোকটা ওকে হিড়হিড় করে টেনে সিঁড়ি দিয়ে বাড়ির ছাদে নিয়ে গেল। ছাদের ঠাণ্ডা বাতাসে রিমির শরীরের কাঁটা দিয়ে উঠল। কোনো কথা না বলে লোকটা রিমিকে টেনে ছাদের এক কোণে ইটের দেয়ালের সাথে প্রচণ্ড জোরে ঠেসে ধরল। মাথার ওপর রুপোলি চাঁদ থাকলেও আরশানের দীর্ঘ আর বলিষ্ঠ ছায়ায় রিমির ছোট শরীরটা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেছে।আরশানের হাতের বাঁধন রিমির কবজিতে লোহার শিকলের মতো চেপে বসেছে। ওর চোখের মণি দুটো রাগে আর উত্তেজনায় চিকচিক করছে। আরশানের নাকের ডগা রিমির কপালে ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রায়, ওর উত্তপ্ত নিশ্বাস রিমির মুখে আছড়ে পড়ছে।
“What are you trying to do, Rimi?”
রিমি ব্যথায় মুখ কুঁচকে ফেলল, কিন্তু এবার আর ও কুঁকড়ে গেল না। আরশানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল…
“আপনি কি করছেন এটা? হাত ছাড়ুন তো, আপনার হাত এমন বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আছে কেনো!”
আরশান হাত ছাড়ল না, বরং আরও একটু ঝুঁকে এল। ওর গলার স্বরটা একটা ধারালো চাবুকের ন্যায় শোনাল…
“আগে বলো, তুমি এমন কেনো করছো? গত কয়েকদিন তো তুমি আমাকে এড়িয়ে চলেছ আর এখন কি করছো? খাওয়ার টেবিল থেকে করিডোর কোনো জায়গায় তোমার জন্যে শান্তি পাচ্ছিনা। তোমার ওই চোখজোড়া কেন সারাক্ষণ আমার পিছু নিচ্ছে? What are you trying to prove?”
আরশানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ও যে নিজের সাজানো জীবনে কোনো বিশৃঙ্খলা সহ্য করতে পারে না। ও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ গলায় আবার বলল…
“শোনো রিমি, আমি ডিসিপ্লিন পছন্দ করি। তুমি আমাকে ইগনোর করছিলে, আমি সেই নিয়মটা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু একেক দিন একেক নিয়ম অনুসরণ করা আমার ডিকশনারিতে নেই। তুমি কেন আমার প্রতিটা স্টেপ কাউন্ট করছ?”
নিজেকে সবসময় শান্ত রাখা আরশান আজ রেগে যাচ্ছে। ওর রাগের গভীরতা ঠিক কতটা হবে রিমির ধারণা নেই তাই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই রিমি চট করে ওর স্বভাবজাত গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলল। ও খুব সাবধানে নিজের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। আরশানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রিমি খুব হালকাভাবে বলল…
“আপনি ভুল ভাবছেন, আমার কোনো উদ্দেশ্য নেই। আমার হঠাৎ একটু নতুন কিছু ট্রাই করতে ইচ্ছে হয়েছিল তাই করছিলাম”
আরশান ভ্রু কুঁচকালো — “নতুন কিছু মানে?”
“আমি চেক করছিলাম আপনার ওই পারফেকশনে কোথাও কোনো খুঁত খুঁজে পাওয়া যায় কি না”
রিমির এই হঠাৎ করে বদলে যাওয়া সুর আর অদ্ভুত উত্তর শুনে আরশান এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। ও রিমির কবজিতে ওর হাতের বাঁধনটা আলগা করে দিল। আরশানের অভ্যস্ত মস্তিষ্কে এই নতুন যুক্তিটা ঠিক মিলছিল না। ও ভেবেছিল রিমি হয়তো কোনো সিরিয়াস উত্তর দেবে বা কান্নাকাটি করবে, কিন্তু রিমির এই মজার ছলে বলা কথাগুলো ওকে পুরোপুরি কনফিউজড করে দিল। রিমি নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। ওড়নাটা কাঁধে ঠিক করতে করতে হাসি মুখে বলল…
“আর আপনি যে বললেন একেক দিন একেক নিয়মে চলা ঠিক না আসলে জীবনটা তো আর আপনার ওই জ্যামিতিক নকশা করা ডায়েরি নয় যে প্রতিদিন একই মাপে চলবে! একটু এদিক-ওদিক না হলে কি আর জীবন চলে?”
“তুমি আমাকে জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করছো?”
রিমি একটু মজার ছলে বললো — “আপনি আমার থেকে বয়সে এতো বড়, এমনিতেই তো আপনি আমার থেকে বেশি জ্ঞানী তাইনা?”
আরশান ভ্রু কুচকে নিলো, রিমির এই নয়া রূপ ওর ভীষণ অচেনা! এতে এখনই ও অভ্যস্ত হতে পারছেনা, কেমন যেনো কনফিউজ হয়ে যাচ্ছে। আরশান শান্ত আছে দেখে রিমি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, ও সবে ছাদের দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই ছাদের অন্য কোণ থেকে এক অদ্ভুত খটখট আওয়াজ ভেসে এল। গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় সেই শব্দটা রিমির কানে কোনো ভয়ংকর সংকেতের মতো শোনাল। ও এক নিমেষে জমে গেল। রিমির চটপটে হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল, আর তার জায়গায় ভর করল এক অচেনা আতঙ্ক। ও কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজাসুজি আরশানের দিকে দৌড়ে এল। আরশানের হাতটা খপ করে চেপে ধরে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল…
“এতো রাতে এখানে আওয়াজ কোত্থেকে আসছে? নিশ্চিত ভূত!”
আরশান এক মুহূর্তের জন্য রিমির এই হঠাৎ ভয় পেয়ে দৌড়ে আসা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। ওর কবজিতে রিমির হাতের মুঠো তখন বেশ শক্ত। ও নিজের স্বাভাবিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আরশানের যুক্তিমাখা মস্তিষ্ক এই অবৈজ্ঞানিক ভয়কে কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। ও অত্যন্ত শান্ত কিন্তু কাটা কাটা গলায় বলল—
“ভূত বলতে কিছু হয় না”
“ভুত না হলেও জ্বীন তো আছে! আওয়াজটা শুনেছেন আপনি? ঠিক ওই পানির ট্যাংকের পাশ থেকে এসেছে! চলুন এখান থেকে, আমার খুব ভয় লাগছে”
রিমি প্রায় আরশানের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছিল। ওর চোখের মণি দুটো আতঙ্কে প্রশস্ত হয়ে গেছে। আরশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটার কখন কী হয়, তা বোঝা দায়। ও নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা না করে বরং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল…
“তুমি যাও নিচে। আমি দেখে আসছি আওয়াজটা কীসের”
“সবসময় এতো সাহস দেখাতে হয় না, হিতের বিপরীত কিছু হয়ে গেলে কি করবেন?”
রিমি আরশানের উত্তরের অপেক্ষা না করেই ওকে প্রায় টেনে ছাদের দরজার দিকে নিয়ে চলল। আরশানের মতো গম্ভীর মানুষ, যে কিনা নিজের ইচ্ছার বাইরে এক পা ও নড়তে চায় না। সে আজ রিমির এই অমূলক ভয়ের কাছে কেমন যেন নতি স্বীকার করল। ও কিছু না বলে রিমির পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল!
_________________________________
পরদিন সকালে…আরশান সোফায় বসে খুব মনোযোগ দিয়ে আজকের বিজনেস নিউজপেপারটা পড়ছে ঠিক সেই সময় আয়ান ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকল। ও কিছুক্ষণ ইতস্তত করে আরশানের পাশের সোফাটায় বসল। আয়ান সাধারণত আরশানের সঙ্গে কম কথা বলে যেহেতু আরশান অপ্রয়োজনীয় কথা পছন্দ করেনা কিন্তু আয়ান আজ নিজেই এগিয়ে এসেছে। ও কয়েকবার গলা পরিষ্কার করল, যেন বড় কোনো কথা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরশান অবশ্য পত্রিকার পাতা থেকে চোখ সরাল না, তবে ও বুঝতে পারছিল আয়ান কিছু একটা বলতে চাইছে।
“ভাইয়া, একটা কথা ছিল। মানে আমার মনে হয় বলাটা জরুরি”
আরশান পত্রিকার পাতাটা উল্টে এক পলক আয়ানের দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে কোনো বিশেষ আবেগ নেই, বরং এক ধরণের নির্লিপ্ততা। ও শান্ত গলায় বলল — “বল”
আয়ান এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি আরশানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে দিল…
“ভাইয়া, আমি আজ অব্দি তোমার কোনো সিদ্ধান্তে দ্বিমত করিনি কিন্তু আজ বাধ্য হচ্ছি। আমার চেয়ে মাত্র দেড় বছরের বড় কাউকে ‘ভাবী’ বলে ডাকতে পারব না। অসম্ভব!”
কথাটা শুনে আরশান বিশেষ অবাক হলো না, এমনকি ওর চেহারায় কোনো আকস্মিক চমকও ফুটে উঠল না। ও শুধু ধীরস্থিরভাবে পত্রিকাটা ভাজ করে কোলের ওপর রাখল। ওর ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে এল — “তাহলে কালকে রাতে তুই ছাদে ছিলিস?”
চলবে…
[ঈদের জন্যে গল্প দিতে বিলম্ব হতে পারে, তবে দেওয়ার চেষ্টা করবো অবশ্যই। সবাইকে চাঁদরাত শুভেচ্ছা ❤️]
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1Qm67W1JzX/?mibextid=oFDknk

