#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_১৪
অন্যদিনের ন্যায় আজ রিমির ভার্সিটি যাওয়ার তাড়া না থাকলেও এখান থেকে সময়মত বেরোনোর একটু তাড়া আছে নইলে যাওয়ার পর্ব জ্যামে পড়বে। ব্যাগপত্র গুছিয়ে ও যখন ইনায়াদের বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়াল, তখন যেনো অদ্ভুত এক শূন্যতা ওকে গ্রাস করতে চাইল। আরাফাত সাহেব চেয়েছিলেন নিজের গাড়ি আর ড্রাইভার দিয়ে ওকে পৌঁছে দিতে, কিন্তু রিমি বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ও চেয়েছিল এই পথটুকু একা পাড়ি দিতে। যাওয়ার সময় বাসার সবার থেকে বিদায় নিয়ে ও বেরিয়ে পড়লো, আরশান বাসায় ছিলো না তাই ওর সঙ্গে আর দেখা হলো না। অবশ্য গত রাতে আরশানের ওই আচরণের পর আজ ওর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছেও রিমির ছিলো না! বাসের জানালার পাশে বসে রিমি বাইরের দ্রুতবেগে ধাবমান গাছপালা আর দালানগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখছিল। প্রথমবার এভাবে একা দীর্ঘ পথে বেরোনোয় শুরুতে বুকটা দুরুদুরু কাঁপছিল কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয়টা কাটতে শুরু করল। শহরের ব্যস্ততা পেরিয়েই বাস যখন লোকাল স্ট্যান্ডে গিয়ে থামল, গাড়ি থেকে নামতেই ওর চোখ গেল রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মাঝবয়সী মহিলার দিকে। তেরো বছর বয়সে যে মা ওকে ছেড়ে গিয়েছিল, সেই ইলোরা বেগম আজ বাস স্ট্যান্ডে মেয়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। বয়সের কিছুটা ছাপ তাঁর মুখে পড়লেও মায়াভরা সেই চোখ দুটো আজও বদলায়নি। এই ৬/৭ বছরে মা-মেয়ের দেখা হয়েছে মাত্র ৩/৪ বার, তাও খুব অল্প সময়ের জন্য। যেটুকু যোগাযোগ ছিলো তা শুধু ফোনে কথা বলা অব্দিই সীমাবদ্ধ ছিলো । ইলোরা বেগম মেয়েকে দেখামাত্রই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। রিমি কাছে যেতেই তিনি পরম মমতায় ওকে জড়িয়ে ধরলেন। এই সেই বুক, যেখানে রিমি ছোটবেলার সব দুঃখ ভুলে যেত। ইলোরা বেগমের দুচোখ বেয়ে তখন আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। রিমিও আর নিজের বাঁধ ভাঙা আবেগ ধরে রাখতে পারল না। মায়ের গায়ের সেই পরিচিত ঘ্রাণে ওর সবটুকু ক্লান্তি যেন এক নিমেষে ধুয়ে মুছে গেল। ও মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে উঠল!
রিমি যখন ইলোরা বেগমের সংসারে পা রাখল, তখন বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় দুরুদুরু করছিল। এ বাসাটা রিমির জন্য একদমই নতুন। ইলোরা বেগমের বর্তমান সংসারে রয়েছেন ওনার স্বামী, শাশুড়ি, ছোট একটি মেয়ে, দেবর আর দেবরের বউ আছে। রিমির পা ঘরে পড়ার সাথে সাথেই বছর পাঁচেকের সেই ছোট মেয়েটি কোনো এক ঘর থেকে এক দৌড়ে রিমির কাছে চলে এল। ওর ডাগর ডাগর চোখ দুটোয় অপার বিস্ময় আর আনন্দ। মেয়েটি রিমির জামার এক কোণ টেনে ধরে বলল — “তুমিই কি রিমি আপু? আম্মু বলেছিলো তুমি আজ আসবে।”
রিমি থমকে দাঁড়াল। এই ফুটফুটে শিশুটি সম্পর্কে ওর ছোট বোন। ও বুঝতে পারল, ইলোরা বেগম হয়তো আগে থেকেই এই ছোট মেয়েটিকে রিমির ছবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে রেখেছিল বা ওকে রিমির সম্পর্কে বলেছে। রিমি নিচু হয়ে মেয়েটার গাল টিপে দিয়ে এক চিলতে হাসল। তবে সেই আনন্দের রেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ইলোরা বেগমের শাশুড়ি, অর্থাৎ রিমির মায়ের বর্তমান শাশুড়ি সোফায় বসে পান সাজছিলেন। বয়সের ভারে মুখটা বেশ গম্ভীর। রিমি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ওনাকে নিচু হয়ে সালাম দিল। ভদ্রমহিলা মুখ না তুলেই শুধু একটা শুকনো ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে সালামটুকু গ্রহণ করলেন। রিমির দিকে একবার ফিরেও তাকালেন না, যেন এই বাড়িতে ওর আগমনে ওনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। পানের বাটা থেকে চুন নিয়ে পানে ঘষতে ঘষতে ওনার নিরুত্তাপ ভঙ্গিটা বলে দিচ্ছিল যে, এই বাড়িতে রিমির অস্তিত্ব ওনার কাছে স্রেফ একটা বাড়তি দায় ছাড়া আর কিছুই নয়।ইলোরা বেগম পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরে একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। তিনি রিমির ব্যাগটা হাতে নিয়ে ওকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় ইলোরা বেগমের ছোটো জা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। রিমিকে দেখলেন ঠিকই কিন্তু ওর দিকে খুব একটা উৎসাহ দেখাল না। পুরো বাড়ির থমথমে পরিবেশটা রিমিকে বুঝিয়ে দিল যে, মায়ের কোলটা নিরাপদ হলেও এই বাড়ির লোকগুলোর মন জয় করা মোটেও সহজ হবে না। মায়ের বাসায় প্রথম রাতটা রিমির জানালার পাশে শুয়ে নির্ঘুমই কেটেছিল, তবুও নিজের জীবনের প্রতি শুকরিয়া করে যে অন্তত মায়ের কাছে এসে থাকতে তো পারছে!
_______________________________
রাত তখন গভীর, আরশান ওর বিশাল ঘরের স্টাডি টেবিলে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কিছু জরুরি ফাইল চেক করছিল। চারপাশ একদম নিঝুম, শুধু কিবোর্ডের খটখট শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। কাজ করতে করতে লাগবে কিছু লিখতে গিয়ে আরশান দেখলো কলমটার কালি ফুরিয়ে গেছে। ও কিছুটা বিরক্ত হয়েই ড্রয়ারটা টান দিয়ে খুলল নতুন কলমের প্যাকেট বের করার জন্য। ঠিক তখনই ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে থাকা একটা গিফট প্যাকেটের ওপর ওর নজর আটকে গেল। নীলরঙা র্যাপিং পেপারে মোড়ানো সেই প্যাকেট যা রিমি যাওয়ার আগে রাতে ওর হাতে তুলে দিয়েছিল। ছাদ থেকে নামার পর আরশান ওটা টেবিলের একপাশে রেখে দিয়েছিল, তারপর আর খুলে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। আরশান প্যাকেটটা হাতে নিয়ে টেবিল ক্যালেন্ডারের দিকে একপলক তাকাল। আজ অনেকগুলো দিন হয়ে গেছে মেয়েটা এই বাড়ি থেকে গেছে। এই সময়ে আরশান একবারও ওকে বিরক্ত করেনি, কোনো খোঁজ নেয়নি। ও চেয়েছিল রিমিকে ওর সেই তথাকথিত ‘মুক্ত’ জীবনটা একটু পরখ করতে দিতে। আরশান কিছুটা কৌতূহল আর একরাশ তাচ্ছিল্য নিয়ে র্যাপিং পেপারটা ছিঁড়ে ফেলল। ভেতরে একটা কালো ভেলভেটের বক্স। বক্সটা খুলতেই ওর চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। ভেতরে খুব সুন্দরভাবে সাজানো দামী একটা ফাউন্টেন পেন সেট। তিনটে চকচকে কলম আছে। আরশান একটা কলম তুলে নিল। কলমটা ছুঁতেই ওর চোখের সামনে রিমির সেই ভয়ার্ত, মায়াভরা মুখটা ভেসে উঠল। উপহারটা ওর মনে ধরেছে বটে! আরশানের ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা আবার চওড়া হলো। ও কলমটা দিয়েই নিজের লিখার কাজ সম্পন্ন করলো, তারপর অদ্ভুত এক ঘোর নিয়ে বিড়বিড় করে উঠল — “It’s time to meet again, Rimi!”
দেখতে দেখতে মায়ের বাসায় রিমির দুই সপ্তাহ কেটে গেল। নতুন পরিবেশ, অচেনা মানুষ আর গুমোট এক পারিবারিক আবহ সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়াটা রিমির জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। বিশেষ করে ভার্সিটি থেকে এই বাসার দূরত্বটা এখন বড় একটা অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন বাসের ধকল আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রিমি একদম ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই দশ দিনে আরশান একবারও ওকে ফোন করেনি, কোনো মেসেজও দেয়নি। এমনকি ইনায়ার সাথে যখন রিমির কথা হয়েছে, তখনো ইনায়া ভাইয়ার কোনো প্রসঙ্গ তোলেনি। রিমি নিজেও খুব সন্তর্পণে আরশানের নামটা এড়িয়ে গেছে। রিমির মনের এক কোণে এই নীরবতা এক বিশাল স্বস্তি নিয়ে এসেছে। আরশানের সেদিনের আচরণে রিমি ভেবেই বসেছিলো যে হয়তো লোকটা কোনোভাবে ওর পিছু ছাড়বেনা! আরাফাত সাহেব বাইরে গেছিলেন, তো রাতে ফেরার পর ড্রাইভার যখন বাসার গ্যারেজে গাড়িটা পার্ক করছিলো তখন ওনার নজর আটকে গেল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা চকচকে কালো রঙের এক স্পোর্টস বাইকের ওপর। আরাফাত সাহেব ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকালেন। হঠাৎ ওনার মনে পড়ল, কিছুদিন আগে আয়ান একটা বাইকের জন্য বেশ বায়না ধরছিল। তিনি ভেবেছিলেন এটা হয়তো আয়ানের কাজ! তিনি গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে সোজা লিভিং রুমে ঢুকলেন। আয়ান তখন সোফায় বসে ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে আছে। আরাফাত সাহেব গম্ভীর গলায় ডাকলেন — “আয়ান!”
আয়ান চমকে মুখ তুলল — “জি আব্বু?”
“গ্যারেজে ওটা কার বাইক? আমি কি তোমায় অনুমতি দিয়েছি ওসব কেনার? এখনো উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হওনি, এর মধ্যেই এসব বিলাসিতা শুরু করে দিয়েছ?”
আয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ওর বাইক কেনার ইচ্ছা আছে ঠিকই, কিন্তু টাকা কে দেবে? ও আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে আরশানের ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল — “ওটা ওর বাইক নয়”
অফিস থেকে ফেরার পরই আরশানের বেশ ঝাল কিছু খেতে ইচ্ছে হচ্ছিল, চাইলে কিনে আনতে পারতো কিন্তু নিজের হাতে বানানো খাবারের তো ব্যাপারটাই আলাদা! ছেলের কথা শুনে আরাফাত সাহেব রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে এসে বললেন — “তোমার বাইক? তোমার নিজের গাড়ি আছে, মাঝখান থেকে এই বাইক দিয়ে কী করবে?”
আরশান ম্যারিনেট করা তেলে চিকেনগুলো কড়া তেলে ভাজতে ভাজতে নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো — “গাড়ি নিয়ে সবসময় গন্তব্যে সময়মত পৌঁছানো যায় না আব্বু। ট্র্যাফিক এড়িয়ে শর্টকাটে যাওয়ার জন্য বাইকের দরকার হয়। তাছাড়া ওটা আমি নিজের টাকায় কিনেছি”
আরাফাত সাহেব আরশানের কথার গুঢ় অর্থ ঠিক বুঝতে পারলেন না। তিনি মাথা নেড়ে বললেন — “তোমাকে আমি টাকার কথা কিছু বলেছি আমি? আমি শুধু জানতে চাইছি তোমার কোথায় যাওয়ার এত তাড়া আছে যে হুট করে বাইক কিনতে হলো?”
আরশান কোনো উত্তর দিল না, ওকে নিরুত্তর দেখে আরাফাত সাহেব আর দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করলেন না কারণ উনি জানেন আরশানের প্রথমবার করা প্রশ্নে উত্তর না দেওয়া মানে ও এ মুহূর্তে উত্তর দিতে আগ্রহী নয়! প্রথমে রিমি নিজের ঘরে খাবার নিয়ে খেতো কিন্তু মায়ের শাশুড়ির কড়া আদেশ যে এ বাসায় উপস্থিত সবাইকে নির্দিষ্ট সময়ে ডাইনিং টেবিলে বসতে হবে। এরপর থেকে রিমি সবার সঙ্গে বসেই খায়। আজ রাতেও সবার সাথে ডিনার শেষ করে রিমি নিজের ঘরে এল। ছোট বোন আয়েশার সাথে ওকে রুম শেয়ার করতে হয়। আয়েশা আগেই খেয়ে ঘুমিয়ে যায়, আজও ঘুমিয়ে পড়েছে, রিমি আস্তে আস্তে গিয়ে ড্রিম লাইট জ্বেলে দিয়ে বিছানায় বসলো। দিনটা ভালোই কেটেছিল ভাবতে ভাবতে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিতেই ওর হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। স্ক্রিনজুড়ে লাল অক্ষরে ভেসে আছে ১০টি মিসড কল! আর সব কটি কল এসেছে সেই মানুষটার কাছ থেকে, যার নামটা দেখলেই রিমির শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বয়ে যায়! “আরশান…!” রিমির কণ্ঠস্বর গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। ফোন সাইলেন্ট থাকায় ও টেরই পায়নি যে গত আধা ঘণ্টা ধরে ওপাশ থেকে কেউ একজন ওকে এতবার কল করেছে। দশ দিন! দীর্ঘ দশটা দিন রীতিমত গায়েবের মতো হয়ে যাওয়া মানুষটা হুট করে দশবার ফোন করল কেন? তবে কি আরশান ‘কাউন্টডাউন’ করছে? রিমি কাঁপতে থাকা আঙুলে কল লগটা স্ক্রল করছিল, ঠিক তখনই সারা বাড়ি নিস্তব্ধ করে দিয়ে বাইরের সদর দরজায় কলিং বেলটা বেজে উঠল! এই নিঝুম রাতে কলিং বেলের তীক্ষ্ণ শব্দটা রিমির কানে চাবুকের মতো লাগল। রিমির হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ও পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর মস্তিষ্কে তখন ছাদের সেই অন্ধকার রাতটা সিনেমার মতো খেলে যাচ্ছে। আরশানের সেই বিকৃত হাসি, রেলিংয়ের ওপর ঝুলে থাকা ওর শরীর আর সেই শীতল কণ্ঠস্বর— “you’ll have to come willingly.” তবে কি আরশান চলে এসেছে? ও কি ঠিকানা খুঁজে বের করে ফেলেছে? রিমির মনে হলো ওর পায়ের তলার মাটি দুলছে। ও তো কথা দিয়েছিল আরশান ডাকলে ও দেখা করবে, কিন্তু আরশান যে এত দ্রুত ওর জীবনে আবার হানা দেবে, সেটা ও স্বপ্নেও ভাবেনি।
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1GsZakCxPy/?mibextid=oFDknk

