#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_১৭
রিমি তো চিন্তায় পড়ে গেছে যে এ মুহূর্তে কি এমন করবে যা আরশানের মেজাজ ভালো করবে। ওর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আরশান চোখ না মেলেই বললো…
“Stop standing there like a statue. Hurry up!”
আরশানের তাড়া খেয়ে রিমির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ও ভাবল, মানুষ যখন খুব বেশি মানসিক চাপে থাকে, তখন তার স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে যায়। আরশানের এই প্রচণ্ড খিটখিটে মেজাজের পেছনে হয়তো একটা মাথাব্যথাও কাজ করছে। ও একটু সাহস সঞ্চয় করে ভাবল একটা হেড ম্যাসাজ দিলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। রিমি কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে টেবিলের এক কোণে রাখল। তারপর ফোনটা বের করে খুব দ্রুত ইউটিউবে গিয়ে সাউন্ড মিউট করে কিছু ‘রিলাক্সিং হেড ম্যাসাজ’ ভিডিও দেখে নিল। কয়েক সেকেন্ডেই টেকনিকটা বুঝে নিয়ে ও ফোনটা পকেটে পুরল। আরশান তখনো নিস্পন্দ হয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে আছে। রিমি ধীর পায়ে টেবিলটা ঘুরে আরশানের একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর নিজের হাত দুটো সামান্য কাঁপছে, কিন্তু ও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। ও খুব সাবধানে নিজের আঙুলগুলো আরশানের মাথার ঘন চুলের ভেতরে রাখল। হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে আরশান যেন চমকে উঠল। ও ঝটকা দিয়ে চোখ মেলে ভ্রু কুঁচকে ওপরের দিকে তাকাল। ওর সেই নীলচে চোখের দৃষ্টিতে একরাশ বিস্ময়। আরশান বেশ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল — “এটা কী করছ?”
রিমি থমকে গেল, কিন্তু আঙুল সরাল না। ও একটু সাহস নিয়ে উত্তর দিল….
“আপনার মেজাজ ঠান্ডা করার একটা উপায় বের করলাম। মানুষ যখন খুব বেশি চিন্তায় থাকে, তখন মেজাজ গরমের সাথে সাথে মাথাব্যথাও করে। তাই ভাবলাম ম্যাসাজ করলে হয়তো আপনার ভালো লাগবে”
আরশান এক মুহূর্ত রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এক ধরণের অবিশ্বাসের স্বরে বলল — “তুমি শেষ পর্যন্ত এই উপায়ই খুঁজে পেলে? সিরিয়াসলি?”
রিমি দমে না গিয়ে উল্টো আরশানের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল…
“কেন? আপনার কাছে কি এর থেকে সহজ বা কার্যকর কোনো উপায় জানা আছে? থাকলে বলুন, আমি সেটাই করছি।”
আরশান রিমির এই সাহসী জবাবে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ও রিমির মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন পরখ করল, তারপর এক ধরণের ক্লান্তিতে ফের চোখ বুজে ফেলল। ও চেয়ারে নিজেকে পুরোপুরি এলিয়ে দিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল…
“Fine. Just…do whatever you want ”
রিমি ম্যাসাজ শুরু করল, ম্যাসাজ করতে করতে আরশানের সেই শান্ত মুখটার দিকে একপলক তাকাল। চোখ বুজে থাকলে এই মানুষটাকে অতটা কঠোর মনে হয় না! মিনিট পাঁচেক ধরে রিমি খুব মনোযোগ দিয়ে ম্যাসাজটা চালিয়ে গেল। ইউটিউবে দেখা সেই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই ও আরশানের কপালে আর মাথার দুপাশে আঙুল বোলাচ্ছিল। আরশান একদম চুপচাপ আছে দেখে রিমির মনে হলো, হয়তো এতে একটু হলেও কাজ হচ্ছে! তাই এক ধরণের কৌতূহল নিয়ে রিমি নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল…
“কেমন লাগছে? আরাম পাচ্ছেন তো একটু?”
আরশান হুট চোখ মেলল না ঠিকই বরং ওর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিদ্রূপের হাসিটা আবার ফুটে উঠল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উপহাসের সুরে উত্তর দিলো…
“It feels like a tiny cat is trying to massage me. I’m feeling nothing but tickles”
আরশানের এই খোঁচাটা রিমির কানে তীরের মতো বিঁধল। ও এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল। ওর নাকটা রাগে ফুলে উঠেছে। ও নিজের হাতের দিকে একবার তাকিয়ে আরশানের দিকে রাগী চোখে চাইল! রিমি থেমে গেছে দেখে আরশান চোখ বুজেই প্রশ্ন করল— “Why did you stop?”
রিমির তখন গলার স্বর যতটা সম্ভব শক্ত রেখে বলল…
“আপনার মেজাজ ঠান্ডা করার উপায় খুঁজতে বলেছিলেন, আমি সেটা করেছি কিন্তু আপনার পছন্দ হয়নি সেটা আপনার ব্যাপার। আমার কাজ শেষ, এবার আমি যাবো।”
কথাটা বলেই রিমি ঝটকা দিয়ে টেবিলের ওপর থেকে নিজের ব্যাগটা তুলে নিল। ও আর এক মুহূর্ত এখানে দাঁড়াতে চায় না কিন্তু রিমি এগোতে আর পারলো কই? ওখান থেকে সরার আগেই এক জোড়া শক্ত হাত বিদ্যুৎগতিতে এসে ওর কবজিটা জাপ্টে ধরল। রিমির সারা শরীর যেন নিমিষেই অবশ হয়ে গেল। আরশান ওর হাতটা এতই শক্ত করে ধরেছে যে নড়ার কোনো উপায় নেই। পরক্ষণেই আরশান নিজের বিশাল রিভলভিং চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর দীর্ঘকায় শরীরের ছায়া এখন রিমির ওপর আছড়ে পড়ছে। ও এক ঝটকায় রিমিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। দুজনের মাঝে এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির ব্যবধান। আরশানের চোখের সেই রাগী লালচে ভাবটা এখন নেই, সেখানে থিতু হয়েছে এক ধরণের গভীর এবং পজেসিভ অন্ধকার।
আরশান রিমির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল—
“I didn’t give you permission to leave”
“সবসময় সবকিছু আপনার মর্জিতে তো চলতে পারেনা, আপনার ভালো লাগছেনা। অথচ মন চাইলো তো আমাকে ডেকে নিলেন, আমি না এলে আপনি নিশ্চয়ই আমার কাছে চলে যেতেন! টায়ার্ড আমারও লাগে, জানেন কতো খাটুনি যাচ্ছে আমার?”
রিমির চেহারায় আজ প্রথম আরশান এতটা ক্লান্তি ও বিরক্তি একসঙ্গে দেখছে। হঠাৎ আরশান ওর অন্য হাতটা বাড়িয়ে খুব আলতো কিন্তু দৃঢ়ভাবে রিমির থুতনিটা ধরল। এক ঝটকায় রিমির মুখটা নিজের দিকে তুলে ধরে বললো….
“I see you’ve learned how to raise your voice at me, Rimi. এতো সাহস বেড়ে গেছে?”
আরশানের কথা শুনে রিমি একটু ভয় পেলেও চুপ রইলো, আজ কিছুতেই নিজের ভয় প্রকাশ করা যাবেনা! আরশানের আচরণে রিমি লক্ষ্য করেছে যে ওকে ভয় পেতে দেখে লোকটা আনন্দ পায় তাই ঠিক করেছে এখন থেকে আরশানের সামনে যথাসম্ভব সাহস দেখাবে! তারপর সে কি করবে দেখা যাবে। রিমি ভেবেছিল বরাবরের ন্যায় বুঝি এবারও কোনো একটা শাস্তি দেবে কিন্তু ও অবাক হলো যখন আরশান ওকে ছেড়ে দিলো! ওকে ছেড়ে ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে আরশান আবার গিয়ে নিজের চেয়ারে বসে কিছু কাগজ দেখতে শুরু করলো। লোকটাকে আজ অন্যদিনের তুলনায় দুর্বল লাগছে! কিছু হাসিল করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করার পর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়া গেলে কঠিন মেজাজারের মানুষও দুর্বল হয়ে যায় তার প্রমাণ আর রিমি আরশানকে দেখে পেলো। ও আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো!
____________________________________
রাত তখন প্রায় বারোটা, রিমি বিছানায় আধশোয়া হয়ে ইনায়ার সাথে ভিডিও কলে কথা বলছে। রিমির বোনটা ঘুমিয়ে গেছে অনেকক্ষণ হলো। ওর ঘুমের যাতে ব্যাঘাত না ঘটে তাই পড়ার টেবিলের লাইট কমিয়ে জ্বালিয়ে রেখেছে। ফোনের ওপাশে ইনায়া যেন এক অন্য জগতে বাস করছে। ওর দুচোখে রাজ্যের স্বপ্ন আর মুখে কেবলই শাফিনের গুণগান। শাফিন আজ ওকে কী বলেছে, কীভাবে তাকিয়ে হেসেছে সেসবের এক লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে যাচ্ছে ও। কিন্তু রিমির মন আজ কিছুতেই ইনায়ার কথায় স্থির হতে পারছে না। ওর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে আরশানের মুখটা। লোকটার জন্য গত কয়েক দিন ধরে ওর ওপর দিয়ে যেন একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একে তো নিজের পড়াশোনা আর টিউশনির চাপ, তার ওপর হয় আরশানের অসময়ে হুটহাট আগমন নয়তো ওকে ডেকে পাঠানো! ওকে অন্যমনস্ক দেখে ইনায়া হঠাৎ ফোনের ওপাশ থেকে বলে উঠল— “কিরে রিমি? তুই কি শুনছিস কি বলছি?”
রিমির সম্বিৎ ফিরল। ও একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলে নিল। আরশানের চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে ও একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শাফিনকে নিয়ে ইনায়ার এই পাগলামি এখন ওর কাছে শুধু সময়ের অপচয় আর বিপদের সংকেত ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। রিমি সরাসরি ফোনের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল…
“ইনায়া, শোন। তোকে একটা কথা বলি। শাফিনকে আমার মোটেও ভালো লাগে না। কেন জানি মনে হচ্ছে, ও বিশেষ সুবিধার কোনো মানুষ নয়।”
ইনায়ার হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তেই একটু ম্লান হয়ে গেল। ও অবাক হয়ে বলল — “কেন? শাফিন তো সবার সাথে কত অমায়িক ব্যবহার করে! তুই কেন এমন বলছিস?”
রিমি বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো — “অতিরিক্ত অমায়িক হওয়াটাই আমার কাছে সন্দেহজনক লাগে রে। তুই জানিস না, কমনরুমের বাইরে আমি ওকে যেভাবে অন্য মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করতে দেখেছি, তাতে ওকে বিশ্বাস করা কঠিন। তুই ওর সাথে এগোনোর আগে অন্তত দশবার ভাবিস ইনায়া। আবেগ দিয়ে সব বিচার করিস না।”
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রিমির এই সোজাসাপ্টা কথায় ও হয়তো কিছুটা কষ্ট পাবে, কিন্তু রিমি জানে বন্ধুর ভালোর জন্য এই তেতো সত্যিটা বলা জরুরি ছিল। ইনায়া তখন আর কোনো কথা বললো না, আবার রিমির কথাটা হেলায় ফেলেও দিতে পারছেনা কিন্তু এই মুহূর্তে ওর মাথায় শাফিনের যে ভুত চেপে আছে তাতে রিমির আশঙ্কাকে ও বিশেষ গুরুত্ব দিলো না!
___________________________________
যাবে যাবে করেও আরশানের ফুপু এই বাড়িতে প্রায় সাতদিন ধরে জেঁকে বসে আছেন। যাওয়ার নামগন্ধও নেই ওনার মুখে। আসলে ফুপু একা নন, ওনার এই দীর্ঘ অবস্থানের মূল কারণ হলো ওনার মেয়ে নীরা। আরশান সারাদিন অফিসের কাজে এতই ব্যস্ত থাকে যে বাসায় ফেরার পর ওর সাথে কথা বলার সুযোগটুকুও পায় না নীরা। তাই এক সপ্তাহ ধরে মাকে পুঁজি করে এই বাড়িতে পড়ে আছে ও শুধুএকটা ছুটির দিনের আশায়, যদি আরশানের একটু সান্নিধ্য পাওয়া যায়! আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত ছুটির দিন। ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে একসঙ্গে। নীরা সরাসরি নিচে আসেনি, ও সিঁড়ির মোড়ে একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে এক মনে ড্রয়িংরুমের কথাবার্তা শুনছে। ফুপু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রসঙ্গটা তুললেন। আরশানের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললেন — “তা আরশান, এভাবে আর কতদিন একা থাকবি? তোর তো বিয়ের বয়স পার হতে চলল, করবিটা কবে শুনি?”
আরশান নির্লিপ্ত গলায় বলল — “আমার বিয়ে নিয়ে এত তাড়াহুড়োর তো কিছু দেখছি না। যখন সময় হবে, হয়ে যাবে।”
ফুপু এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। ওনার গলায় এক ধরণের কৃত্রিম উদ্বেগ ফুটে উঠল!
“আরে তুই বুঝিস না কেন? দিনকাল এখন খুব একটা ভালো যাচ্ছে না বাবা। হুট করে কোত্থেকে এক অজানা অচেনা মেয়ে তোর গলার হার হয়ে ঝুলবে তার বংশ-মর্যাদা কেমন হবে মেয়ে কেমন হবে কে জানে! এর চেয়ে পরিচিতের মধ্যে বিয়েটা করলে ভালো হয় না?”
আরাফাত সাহেব এতক্ষণ পত্রিকা পড়ছিলেন, বোনের কথার ধরনে উনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তাকালেন। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন — “কী বলতে চাইছিস তুই স্পষ্ট করে বল তো?”
ফুপু এবার সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না। ভাইজানের দিকে ফিরে বেশ মোলায়েম গলায় বললেন — “ভাইজান, কথাটা অনেকদিন ধরেই বলব ভাবছিলাম। আসলে আমার নীরা তো মাশাআল্লাহ গুনে-মানে কোনো অংশেই কম না। ও আরশানকে মনে মনে কতটা পছন্দ করে, সেটা তো আর কারো অজানা নয়। ওদের দুই হাত এক করে দিলে আমাদের আত্মীয়তাটাও আরও গাঢ় হতো, আর আরশানও ঘরে একটা বাধ্য মেয়ে পেত। ওদের বিয়েটা হলে কিন্তু আমার মনে হয় সবার জন্যই ভালো হতো।”
সিঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে নীরার গাল দুটো মুহূর্তেই রাঙা হয়ে উঠল। ও উত্তেজনায় ওড়নাটা আঙুলে পেঁচাতে লাগল। সুরভী বেগম আর আরাফাত সাহেব একে অপরের দিকে একবার তাকালেন। আরাফাত সাহেব কিছু বলবে তার আগেই আরশান বলে উঠলো — “আমি তোমাকে আমার শাশুড়ি বানাতে চাইনা আর না তো নীরাকে আমি নিজের স্ত্রী বানাতে চাই তাই আমার বিয়ের বিষয়ে তোমার ভাবতে হবেনা ফুফু!”
সরাসরি আরশানের এমন কথা শুনে ফুফুর মুখটা একটুখানি হয়ে গেলো! ওপাশ থেকে নীরারও মুখ ভার হলো, কোথায় মেয়ে আরশানের সঙ্গে সংসার করার স্বপ্ন দেখছিল কিন্তু আরশান সেই আশায় পানি ফেলে দিলো! পড়ন্ত বিকেলের আকাশটা কেমন যেন মেঘলা হয়ে আছে, ঠিক রিমির মনের ভেতরের অস্থিরতাটার মতো। সারা সপ্তাহের ধকল শেষে রিমি ভাবল ওর ছোট বোনটাকে নিয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসবে। মেজাজটা বড্ড খিটখিটে হয়ে আছে, একটু খোলা বাতাস গায়ে লাগলে হয়তো ভালো লাগবে। রিমি যখন ছোট বোনের হাত ধরে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে মেইন দরজার দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পাশের ছোট ঘরটা থেকে নিচু স্বরে কথা বলার শব্দ ভেসে এল। গলার স্বরটা ইলোরা বেগম ও তার শ্বাশুড়ির! রিমি কৌতূহলবশত পা থামাল। ভদ্রমহিলা চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে রিমির মায়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। বেশ চতুর আর মোলায়েম গলায় উনি বলছেন— “দেখো ইলোরা, তোমার মেয়েকে রিমিকে যদি বিয়েতে রাজি করানো যায় তবে তোমার মেয়ের অনেক ভালো হবে। ওর ভবিষ্যৎটা একদম পাকা হয়ে যাবে।”
রিমির মা কিছুটা দোটানায় পড়া গলায় বললেন — “কিন্তু রিমি তো এখনো পড়াশোনা করছে, ওর নিজেরও তো কিছু স্বপ্ন আছে…”
ভদ্রমহিলা এবার একটু জোর দিয়ে বললেন — “আরে একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ের জন্য ভালো ঘরে বিয়ের চেয়ে বড় কোনো সুযোগ আর কী হতে পারে? তুমি বরং তোমার মেয়েকে রাজি করাও”
রিমি ঠিক বুঝলো না এ বাসার মানুষ হঠাৎ ওর বিয়ের বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু কেনো করলো! রিমি আরো ভালোভাবে পুরো কথা শুনতে চাইছিলো কিন্তু আয়েশা ওর হাত ধরে টান দিচ্ছিল বাইরে যাওয়ার জন্য, বিধায় রিমি আর ওখানে না দাড়িয়ে চলে এলো কিন্তু মাথায় ঘুরছে এই বিষয়টাই যে ওর বিয়ে নিয়ে হঠাৎ এতো গভীর আলোচনা হচ্ছে? সরু গলিটা পেরিয়ে বড় রাস্তায় আসার পর রিমি আয়েশার হাতটা আরো শক্ত করে ধরলো, ব্যস্ত রাস্তায় যেমন ভয় আছে তেমনি ছুটির দিনের ফাঁকা রাস্তাও সুবিধার নয়। তো হাঁটতে হাঁটতে আয়েশার জুতোর বেল খুলে গেলে ও নিজেই লাগাতে যাচ্ছিলো, তখন রিমি হেসে বললো — “আমি লাগিয়ে দিচ্ছি, তোমাকে করতে হবেনা”
রিমি নিচু হয়ে বসে আয়েশার জুতোর বেল লাফিয়ে দিয়ে আবার ওকে নিয়ে যেই হাঁটা শুরু করবে ওমনি একটু সামনে এগোতেই দেখলো আরশানকে! রিমি বিশেষ অবাক হয়নি, কারণ আচমকা উদয় হওয়াই তো আরশানের বৈশিষ্ট্য!
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/18Km8Y4FFF/?mibextid=oFDknk

