#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_২২
রেস্টুরেন্টের ভেতরটা এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে আছে। মাঝে মাঝে কেবল দূর থেকে কাঁটা-চামচের ঠকঠক আর লোকেদের টুকটাক কথা ব্যতীত আর কোনো শব্দ নেই। এর মাঝে আরশানের নজর পাথরের ন্যায় স্থির হয়ে আছে ওর ঠিক উল্টোপাশের কোণায় বসে থাকা রিমির ওপর। রিমির সঙ্গে বসে থাকা ছেলেটি বারবার ওর দিকে ঝুঁকে আসছে যা দেখে আরশানের ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। রিমি নিজের সঙ্গে বসে থাকা ছেলেটিকে নিচু স্বরে বলল — “দেখুন, আমি এখন বিয়ের জন্য মানসিকভাবে একদমই প্রস্তুত নই। আপনি আমাকে মাকে এই বিয়ের জন্যে না করে দিন”
ছেলেটি খাওয়া থামিয়ে রিমির দিকে এক পলক তাকাল। সে গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি খেয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল — “বিয়ের জন্যে আগে থেকে কেউই প্রস্তুত থাকে না, পরিস্থিতি মানুষকে প্রস্তুত করে নেয়। তাই বলে কি মানুষ বিয়ে করা ছেড়ে দেয়?”
রিমি আরো নানানভাবে বললো কিন্তু ছেলেটা নাছোড়বান্দা! ও ভেবেছিল ভালোভাবে কথা বললে হয়তো ছেলেটা শুনবে কিন্তু লোকটা তো আরো ঘাড়ত্যাড়া! বিয়ের জন্যে এক পায়ে তৈরি! হঠাৎ ছেলেটা রিমির খুব কাছে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা রিমির আঙুলগুলো ধরার চেষ্টা করল। রিমি চমকে উঠে তড়িৎ বেগে হাত সরিয়ে নিল। এই জনসম্মুখে ও না পারছে কিছু করতে, না পারছে উঠে চলে যেতে। আরশান এসব দৃশ্য প্রতিটি সেকেন্ড খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ওই ছেলেটা রিমির হাত ছোঁয়ার সাহস দেখিয়েছে! আরশানের কাছে ওই ছেলেটা কে, রিমির সাথে তার কী সম্পর্ক তা জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ও শুধু জানে, রিমির ওপর কেবল একজনেরই অধিকার আছে, আর সে হলো ও নিজেই। রিমির পাশে অন্য কোনো পুরুষের ছায়াও ও সহ্য করবে না! সামনে রাখা পছন্দের খাবারগুলোও এখন আরশানের কাছে বিস্বাদ ঠেকছে। ও হুট করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই সবাই কিছুটা অবাক হয়ে তাকালো। আরশান খুব ধীর গলায় বলল — “আমার একটা জরুরি কাজ আছে, ফিরতে দেরি হবে”
আরশানের এই হুটহাট কোথাও চলে যাওয়ার স্বভাব সম্পর্কে পরিবারের কারোরই অজানা নয়। ওর কখন কী করার কথা মনে হয় তা শুধু ওই জানে। তাই সুরভী বেগম কেবল একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন — “ঠিক আছে, সাবধানে যাস।”
আরশান এক মুহূর্ত আর সেখানে দাঁড়াল না। বড় বড় কদমে রেস্টুরেন্টের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। বাইরের রাতের হিমেল বাতাস ওর ভেতরের আ’গুনকে নেভানোর বদলে আরও উসকে দিচ্ছে। রেস্টুরেন্টের সেই গুমোট পরিবেশ থেকে আরশান বেরিয়ে এল এক বুক আক্রোশ নিয়ে। ও গাড়ির সামনে এসেই নিজের ফার্মহাউসের কেয়ারটেকারকে ফোন করে ফার্ম হাউজটা গুছিয়ে রাখতে বললো। আরশান আর রিমিকে নিজের থেকে দূরে রাখতে চাইছে না তাই ইতিমধ্যেই মনে মনে চরম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে! ভেতরে রিমি তখন চরম বিরক্ত। ছেলেটি বারবার হাত ধরার চেষ্টা করায় রিমির মনে হচ্ছিল ও এখনই ওর গালে একটা থা’প্পড় বসিয়ে দিতে। ও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল — “আমার কালকে ক্লাস আছে, এতো দেরি করে বাসায় ফিরলে ঘুম হবেনা। আপনি খাওয়া শেষ করুন, আমি আসছি আর হ্যাঁ, আমি একাই যেতে পারবো আপনাকে আসতে হবেনা”
ছেলেটি কিছু বলার আগেই রিমি হনহন করে বের হতে গিয়েই পাশে তাকিয়েই থমকে গেল। ইনায়াদের পুরো পরিবার! রিমিকে দেখে ইনায়া এক গাল হেসে এগিয়ে এল — “আরে রিমি! ভালোই তো তলে তলে ট্যাম্পু চালাচ্ছিস! আমাকে তো একবারও বললি না যে তুই কাউকে পছন্দ করিস?”
রিমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসার চেষ্টা করল — “বাসা থেকে হঠাৎ ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে বলেছিলো তাই…”
আরাফাত সাহেব পাশ থেকে বলে উঠলেন — “বিয়ের বয়স যখন হয়েছে বিয়ের জন্যে পরিবারের লোকেরা তো চেষ্টা শুরু করবে এটাই স্বাভাবিক! ছেলে ভালো হলে আর তোমার পছন্দ হলে বিয়ে করে নেওয়া উত্তম”
আয়ান পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল — “ভাগ্যিস ভাইয়া চলে গেছে। নাহলে তো আজ এখানে কোনো একটা অঘটন হয়ে যেত!”
এ কথা আবার সুরভী বেগমের কানে গেছে কারণ আয়ান মায়ের পাশেই বসেছিলো। উনি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন — “এখানে আবার আরশানের প্রসঙ্গ কেন আসছে আয়ান?”
‘আরশান’ নামটা শুনতেই রিমির বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। ও উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞাসা করল — “উনি এখানে ছিলেন?”
ইনায়া মাথা নেড়ে বলল — “হ্যাঁ, একটু আগেই একটা ইমার্জেন্সি কল পেয়ে চলে গেল। কেন বলো তো? ও থাকলে কি ভয় পেতে?”
চলে গেছে শুনে রিমি মনে মনে এক বিশাল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, কিন্তু একই সাথে ওর ভেতরে এক অদৃশ্য ভয়ের মেঘ জমল। সেদিন ফোনে আবিদের গলার স্বর শুনেই আরশান যে তা’ণ্ডব চালিয়েছিল, আজ তো অন্য একটা পুরুষের সঙ্গে বসে খাচ্ছিল! আরশান যদি সরাসরি দেখে থাকে, তবে ওর কপালে যে দুর্গতি আছে তা ভেবেই ওর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। পরিবারটির সঙ্গে কুশল বিনিময় শেষ করে রিমি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এল। পেছনে ওই ছেলেটি ডাকার চেষ্টা করছিল — “রিমি, শোনো! আমি তোমাকে ড্রপ করে দিচ্ছি।”
রিমি পেছনে না তাকিয়েই বাইরে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই ও দেখল পার্কিংয়ে আরশান গাড়িতে হেলান দিয়ে ফোন হাতে কিছু করছে। ও রিমিকে দেখেছে, দেখে নিজেই এগিয়ে এলো। ওকে দেখে রিমি চমকে জিজ্ঞাসা করলো — “আপনি? ইনায়া তো বলল আপনি চলে গেছেন!”
আরশান খুবই শান্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো — “আমার উপস্থিতিতে তোমার খুব সমস্যা হচ্ছে?”
রিমি কিছু বলতে পারলো না! কিন্তু আরশানের মুখ দেখে এটুকু নিশ্চিত যে আরশান অবশ্যই দেখেছে ছেলেটার সঙ্গে ওকে! এ মুহূর্তে মেয়েটার মাথায় হাজার চিন্তা ঘুরছে। কিভাবে এই ছেলের থেকে পিছু ছাড়াবে, কে ভার্সিটিতে ওর হাসবেন্ড পরিচয় দিয়ে ঘুরছে আবার আরশান এখন যদি কিছু করে? এতো চিন্তা একসঙ্গে মাথায় ঝেঁকে বসায় মেয়েটা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ওই ছেলেটি যেকোনো সময় চলে আসবে, আরশান যদি আবার ছেলেটাকে এই পাবলিক প্লেসে মা’রতে যায় তখন কি হবে? পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে ভেবে রিমি আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। এছাড়া ওই ছেলেটার সাথে যাওয়ার চেয়ে আরশানের সাথে যাওয়াকেই বেশি নিরাপদ মনে করল। রিমি দ্রুত আরশানের শক্ত হাতটা নিজের নরম হাতের মুঠোয় চেপে ধরে আকুল স্বরে বলল — “আরশান, আমাকে একটু বাসায় ড্রপ করে দিন”
বলেই আরশানের উত্তরের অপেক্ষা না করে বা ওকে উত্তর দেওয়ার সময় না দিয়ে টেনে গাড়ির কাছে নিয়ে গেলো। রিমি নিজেই গাড়ির সামনের সিটে গিয়ে বসে পড়ল। যাওয়ার আগে ফোন করে ওর বাবাকে বলে দিলো যে ও গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। ফেরার আগে একটা ট্যাক্সি ডেকে নিতে। এতক্ষণ রাগে আরশানের মাথা টনটন করলেও রিমি যখন নিজেই গাড়িতে গিয়ে বসলো তখন ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে উঠলো। ও এতক্ষণ ভাবছিল কীভাবে রিমিকে এখান থেকে তুলে নিয়ে যাবে, সেখানে কিনা রিমি নিজেই এসে ওর জালে ধরা দিল? আরশান ধীরে ধীরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। রিমির দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখল। পাখি নিজেই নিজের খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছে, এবার আর ওর হাত থেকে নিস্তার নেই! আরশান ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো। গাড়ি যখন চলছিলো তখন আরশান বললো — “Do you like that guy?”
রিমি শান্তভাবেই উত্তর দিলো — “না”
হঠাৎ রিমি লক্ষ্য করলো আরশান গাড়ি অন্য রাস্তায় ঘুরিয়েছে। ও অবাক হয়ে বলল — “বাসার রাস্তা তো এদিকে না! আপনি কোন দিকে যাচ্ছেন?”
আরশান কোনো উত্তর দিল না। ও শুধু আড়চোখে একবার রিমির মুখটার দিকে তাকাল। রিমির চোখের সেই আতঙ্ক আরশানের ভেতরের প্রতিহিংসাকে এক অদ্ভুত তৃপ্তি দিচ্ছে। ও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললো — “You just walked into your own cage, Rimi”
ড্রাইভ করতে করতেই রিমির দিকে একনজর তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে বললো — “There is no going back anymore”
এ কথা শুনে রিমির মুখটা ফ্যাকাশে বর্ন ধারণ করলো, ও বুঝতে পারল যে এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক ভয়ংকর অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। গাড়িটা ঝড়ের গতিতে শহরের আলো ছাপিয়ে অন্ধকারের দিকে ছুটে চলল! শহরের কৃত্রিম আলো পেছনে ফেলে গাড়িটা এক গভীর অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে এল। চারপাশটা বড্ড নিঝুম, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আরশান এক ঝটকায় ব্র্রেক কষল। গাড়ির টায়ার পিচঢালা রাস্তায় ঘষা খেয়ে এক কর্কশ আওয়াজ তুলল, যা রিমির বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। গাড়ি থামার সাথে সাথেই আরশানের সেই ব্যক্তিগত ফার্মহাউসের বিশালাকার লোহার গেটটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। রিমি আসার পথে গাড়ির ভেতর পা’গলের মতো হাত-পা ছুড়েছে। আরশানের স্টিয়ারিং ঘোরানোর পথে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, ওর হাত টেনে ধরার চেষ্টা করেছে যাতে গাড়িটা অন্তত থামে। কিন্তু রিমির সব প্রচেষ্টাই ছিল যেনো সমুদ্রের ঢেউয়ের সামনে বালির বাঁধের মতো। আরশান এক মুহূর্তের জন্য রিমির দিকে তাকায়নি, শুধু ওর দৃঢ় হাতের মুঠোয় গাড়িটা নিজের গন্তব্যে নিয়ে এসেছে। আরশান ইঞ্জিন বন্ধ করে নেমে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল — “নেমে এসো।”
রিমির সারা শরীর তখন আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। ও সিটটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফ্যাকাশে মুখে বলল — “আমি নামব না! আপনি আমাকে এমন নির্জন জায়গায় কেন নিয়ে এসেছেন?”
আরশান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল, ওপাশের দরজাটা খুলে দাঁড়াল। রিমির করুণ মুখটার দিকে তাকিয়ে ও এক রহস্যময় এবং তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল যে হাসিতে মায়ার লেশমাত্র নেই! রিমির চোখে পানি এসে গেছে ততক্ষনে, ও কাঁপা গলায় বললো — “আমাকে যেতে দিন! আপনি আমার সাথে এমন করতে পারেন না!”
আরশান কোনো উত্তর দিল না। ও রিমির কথা উপেক্ষা করেই ওর একটা হাত ধরে এক হেঁচকা টানে ওকে সিট থেকে বাইরে বের করে আনল। রিমির শরীরটা ধপ করে বাইরে পড়ল। ও নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। আরশানের কব্জিতে নিজের নখ দিয়ে আঁচড় কাটল, কিন্তু আরশান যেন ব্যথাবোধহীন এক রোবট। এক ফাঁকে রিমি আরশানের হাতটা থেকে নিজের কব্জি ছাড়িয়ে নিয়ে অন্ধকারের দিকে দৌড় দিল। ও ভাবল এই নির্জন বাগানের মাঝ দিয়ে দৌড়ে হয়তো ও কোনোভাবে গেটের বাইরে চলে যেতে পারবে। কিন্তু আরশান কয়েকটা দীর্ঘ কদমে রিমির সামনে এসে ওর পথ আটকে দাঁড়াল — “আমি না চাইলে তুমি এখান থেকে কোথাও যেতে পারবে না, বৃথা চেষ্টা করো না”
আরশান রিমিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এক ঝটকায় ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। রিমির পা দুটো বাতাসে শূন্যে ভাসছে। ও আরশানের বুকে কিল-ঘুষি মে’রে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, ওর শার্টের কলার টেনে ধরছে। রিমির চোখে এখন টলমল করছে নোনা জল। ও ফুঁপিয়ে উঠে বলল — “নামিয়ে দিন আমাকে! আপনি এমন কেন করছেন? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি?”
আরশান রিমির উত্তপ্ত নিশ্বাস নিজের মুখে অনুভব করল। ওর বুকের ভেতর রিমির হৃদপিণ্ডের সেই দ্রুত ধুকপুকানি স্পষ্ট টের পাচ্ছে ও। আরশান রিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল — “তুমি ক্ষতি করোনি বরং অবাধ্য হয়েছো & I don’t allow what’s mine to defy me”
আরশান রিমিকে নিয়ে ধীর পায়ে ফার্মহাউসের বিশাল কাঠের দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। রিমি হতবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে আছে, ও জানেনা আরশানের মনে কি চলছে বা ভেতরে যাওয়ার পর ওর সঙ্গে কি হতে চলেছে কিন্তু রিমির মনে এক অজানা আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে যে হয়তো আরশান আজ ওর সব স্বাধীনতা কেড়ে নেবে!
___________________________________
ফার্মহাউসের বিশালাকার কাঠের দরজাটা এক কর্কশ শব্দে খুলে গেল। আরশান পাঁজাকোলা করে রিমিকে ভেতরে নিয়ে এল। ভেতরের পরিবেশটা মায়াবী আলোয় আচ্ছন্ন থাকলেও রিমির কাছে তা এক শ্বাসরুদ্ধকর কফিনের মতো মনে হচ্ছে। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাখা মখমলের সোফাটায় আরশান রিমিকে বসিয়ে দিল। রিমির সারা শরীর তখনো থরথর করে কাঁপছে, এলোমেলো চুলগুলো ওর ফ্যাকাশে মুখে এসে পড়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে কেয়ারটেকার কাচুমাচু মুখে সামনে এসে নিচু স্বরে শুধু বলল — “স্যার, আপনার কথামতো সব গোছানো আছে। রাতের খাবার টেবিলে রাখা। কোনো দরকার হলে আমাকে ফোন করবেন”
আরশান শুধু ঘাড় নেড়ে সায় দিল। কেয়ারটেকার প্রস্থান করতেই আরশান ধীর পায়ে গিয়ে সদর দরজাটা আটকে দিল। তালা পড়ার সেই ধাতব শব্দটা রিমির কানে এক চূড়ান্ত বন্দিত্বের বারতা নিয়ে এল। রিমি নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ও শুধু বোঝার চেষ্টা করছে, এই মানুষটা আসলে কী চায়? আরশান ধীরপদে রিমির সামনে এসে দাঁড়াল। রিমির গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে দেখে আরশান ঝুঁকে এল। ও খুব যত্ন করে, প্রায় আলতো ছোঁয়ায় রিমির চোখের জলটুকু মুছে দিয়ে ফিসফিস করে বলল — “তোমার চোখের পানিকে এতো কারো জন্যে সস্তাভাবে অপচয় করবে না। এই চোখের পানি আজ থেকে শুধু আমার জন্য বরাদ্দ রাখবে। Got it?”
রিমি মুখটা সরিয়ে নিল। ওর গলার স্বর রাগে কাঁপছে। লোকটার উম্মাদনা যে এতো দূর এসে গড়াবে সেটা ওর ভাবনার বাইরে ছিলো। ও সোজা আরশানের চোখের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞাসা করল — “কেন এনেছেন আমাকে এখানে? আমাকে এভাবে আটকে রেখে আপনার কি লাভ হবে?”
আরশান কোনো রাগ দেখাল না। বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে ও রিমির ঠিক পাশেই সোফাটায় হেলান দিয়ে বসল। ওর বসার ভঙ্গিটা এতটাই আয়েশি যে মনে হচ্ছে ও কোনো যুদ্ধের ময়দান জয় করে ফিরেছে। ও রিমির দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল — “তুমি এখনো ছোট রিমি, বড্ড অবুঝ। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে নিজের মতো করে কাটানোর জন্য আরও কিছুটা সময় দেব। আরেকটু স্বাধীনতা দেবো কিন্তু তুমি দিনে দিনে বড্ড অবাধ্য হয়ে যাচ্ছ আর আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছো! তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার নামের সাথে আমার নামটা চিরস্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়ার জন্যে আরো বেশি দেরি করা উচিত হবেনা”
রিমির হদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ও আঁতকে উঠে বলল — “কী আজেবাজে কথা বলছেন? আপনার নামের সাথে আমার নাম কেন জুড়বে?”
আরশান এক চিলতে বাঁকা হাসল। ও হাত বাড়িয়ে রিমির কানের ওপর অবাধ্যভাবে পড়ে থাকা চুলগুলো খুব আলতো করে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল — “Very soon, the world will only know you as Mrs. Arshan Mirza”
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/17AsLRXqW4/?mibextid=oFDknk

