মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_২৫

0
25

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_২৫

যাওয়ার পথে ইনায়া রিমিকে জানায় যে আয়ান ওকে সব বলেছে যে আরশানই রিমিকে পছন্দ করে শুরু থেকে। তাই রিমির প্রতি ওর কোনো অভিমান নেই। আরশানের বাসায় পা রাখার পর রিমির এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। এ বাড়িতে একসময় একপ্রকার আশ্রিতার ন্যায়ই পা রেখেছিল, সে বাড়িতেই যে শেষ অব্দি বউ হিসেবে আসবে তা কে জানতো? বাসায় পৌঁছানোর পর রিমিকে দেখে সুরভী বেগম সোফায় বসেই স্থির দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। আরশানের এই খামখেয়ালি বিয়ের সিদ্ধান্তে শুরুতে উনিও বিরক্ত হয়েছিলেন কিন্তু এখন তিনি নিজেকে সামলে নিয়েছেন। ছেলে যখন সবার সামনেই বিয়েটা করেই ফেলেছে, তখন ছেলের সাথে তিক্ততা বাড়িয়ে লাভ নেই এই বাস্তববাদী চিন্তা থেকেই তিনি রিমির সাথে স্বাভাবিক আচরণের চেষ্টা করলেন। সুরভী বেগম একটু এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললেন, “আরশান বলছিল বটে তুমি আজই আসবে। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে বা ইনায়াকে নির্দ্বিধায় জানিও আর হ্যাঁ, তোমার জিনিসপত্র আরশান ঘরে রাখিয়ে দিয়েছে”

সুরভী বেগমের এই অপ্রত্যাশিত স্বাভাবিক ব্যবহার রিমিকে কিছুটা অবাক করল। সে ভেবেছিল হয়তো কিছু কটু কথা শুনতে হবে, কিন্তু এই শীতল সৌজন্যতা তাকে আরও বেশি আড়ষ্ট করে দিল। রিমি শুধু নিচু স্বরে “জি” বলে মাথা নাড়াল। রিমি আরশানের ঘরের সামনে গেলো, ও যখন দরজা ঠেলে আরশানের ঘরের ভেতর ঢুকলো তখন ঘরের প্রতিটি কোণ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। টেবিলের ওপর রাখা কলমদানি থেকে শুরু করে বিছানার চাদর কোথাও এক চুল পরিমাণ অসামঞ্জস্য নেই। রিমির মনে হলো, এটা কোনো মানুষের শোবার ঘর নয়, বরং কোনো হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার; যেখানে সব কিছু প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পরিষ্কার! সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক সারিতে সাজানো। ও ঘরটার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। জানালার স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে বাইরের আকাশটা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ঘরের ভেতরের পরিবেশটা বড্ড দমবন্ধ। সে আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আলমারি খুলতেই দেখা গেল আরশানের জামাকাপড়গুলো রঙের গভীরতা অনুযায়ী সাজানো, গাঢ় থেকে হালকা। এমনকি টাইগুলোও নির্দিষ্ট মাপে ঝোলানো। ঘরের প্রতিটি জিনিসই যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে এখানে কোনো ভুল বা অগোছালো আচরণের জায়গা নেই। রিমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিলের ওপর আরশানের হেয়ার ব্রাশ আর একটা ঘড়িসহ আরো কিছু জিনিষ ঠিক এক ইঞ্চি দূরত্ব রেখে রাখা। রুমের প্রতিটা জিনিস ও বেশ পরখ করে দেখে নিয়ে রিমি আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালো, নিজের চোখের সেই বিষণ্ণতাকে একনজর দেখল। তারপর হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। রিমি নিজের ব্যাগটা বিছানার ওপর সজোরে রাখল। তাতে আরশানের সেই টানটান করে পাতা বিছানার চাদরটা এক মুহূর্তেই কুঁচকে গেল। রিমি সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করলো না। এরপর নিজের বই আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস বের করল। সাইড টেবিলের ওপর আরশানের ফাইলগুলো ছিলো, ওগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে নিজের বইগুলো সেখানে রাখল! আলমারির যে অংশে আরশানের শার্টগুলো রঙের মাপে ঝোলানো ছিল, সেখানে রিমি নিজের জামা ও শাড়িগুলো এমনভাবে রেখে দিল যে পুরো বিন্যাসটাই ওলটপালট হয়ে গেল। রিমি জানে আরশান অগোছালো পরিবেশ সহ্য করতে পারে না আর রিমি সেটারই সুযোগ নেবে। নিজের সবকিছু গোছানো শেষে। পুরো ঘরটার দিকে একনজর তাকালো। এখন আর এটাকে কোনো অপারেশন থিয়েটার বা সাজানো জাদুঘর মনে হচ্ছেনা বরং একটা সত্যিকারের মানুষের ঘর মনে হচ্ছে যেখানে খানিকটা বিশৃঙ্খলা আছে!

রাত তখন প্রায় দশটায় আরশান বাসায় এলো। ক্লান্তি থাকলেও তার মনের এক কোণে ছিল এক ধরণের প্রশান্তি। যে মেয়েটাকে সে চেয়েছিলো, ঘরে ঢুকলেই আজ তার দেখা পাবে। কিন্তু ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই সেই প্রশান্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার কপাল কুঁচকে গেল। সে যেন নিজের ঘরটা চিনতেই পারছে না। আরশান একটু চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো রিমি শান্তভাবে ওর সাধের রকিং চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে বই পড়ছে। আরশানের বুঝতে বাকি নেই এই কাজ কে করেছে। ও নিজের সবকিছু একবার ভালোভাবে চেক করলো এরপর রিমির দিকে এগিয়ে এসে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকালো কিন্তু রিমির এদিকে ভ্রুক্ষেপই নেই!

“আমি কি তোমাকে আমার ঘরটা ডাস্টবিন বানানোর অনুমতি দিয়েছি?”

রিমি বই থেকে চোখ না তুলেই খুব নিরুদ্বেগ গলায় বলল — “ঘরটা এখন আমারও আরশান। আর আমি এভাবেই থাকতে পছন্দ করি”

আরশান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের মণি কাঁপছে, চোয়াল শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে। এই বিশৃঙ্খলা তার মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো আঘাত করছে, কিন্তু সে আজ নিজের রাগ সংযত করার চেষ্টা করছে কারণ আজ রিমির এই বাড়িতে প্রথম রাত, আর আরশান চায় না প্রথমদিনই রিমি ও ক্রোধের শিকার হোক। সে ধীরপায়ে রিমির রকিং চেয়ারের হাতলে দুই হাত রেখে ওর ওপর ঝুঁকে এলো। আরশানের এই হুটহাট নিকটে আসাতে মেয়েটা এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি বিধায় ও কিছুটা কেঁপে উঠলো। রিমির ভয়ার্ত চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আরশান। রিমির অস্বস্তিটা ও বেশ উপভোগ করতে করতে বললো…

“you know what sweetheart? My patience has a very expensive price, and I don’t think you’re ready to pay it yet. আজকের রাতটা তোমাকে ছাড় দিলাম, কিন্তু কাল এই ঘরের প্রতিটি জিনিস আমি আগের জায়গায় দেখতে চাই”

আরশানের কণ্ঠস্বরে এক ধরণের অধিকারবোধ আর শীতলতা মিশে আছে, যা রিমিকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রিমি শক্ত হয়ে বসে রইল, আরশানের চোখের ওই তীব্র নেশা আর জেদ যেনো ওকে কোণঠাসা করে ফেলছে। আরশান রিমির ভয়ার্ত চাউনি দেখে একটু হাসল, তারপর খুব আলতো করে রিমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল বললো — “পড়ায় মনোযোগ দাও”

ও ফ্রেশ হতে চলে যেতেই রিমি বড় একটা শ্বাস নিল। বুকটা ওর তখনও ধড়ফড় করছে।রাত বাড়ার সাথে সাথে রিমির অস্থিরতাও বাড়তে লাগল। ও বিছানার এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পার হয়ে গেছে, কিন্তু ওর চোখের পাতা এক করার সাহস হচ্ছে না। আরশান যদি কাছে আসার চেষ্টা করে? কিন্তু অনেকটা সময় পার হয়ে গেলেও আরশান ঘরে ফিরল না। রিমি অবাক হয়ে দেখল, ঘর থেকে লাগোয়া স্টাডিরুমের দরজাটা হালকা খোলা আর সেখান থেকে আলোর রেখা আসছে। আরশান বোধহয় কোনো ভীষণ জরুরি কাজে ডুবে আছে যার জন্যে রিমিকেও সময় দিতে পারছেনা। অবশেষে রাত একটার দিকে দিকে রিমির শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে লাগল। কখন যে ওর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল আর ও ঘুমের গভীর তলিয়ে গেল, তা রিমি নিজেও টের পেল না।
__________________________________

সকালের রোদে ডাইনিং টেবিলটা ঝকঝক করছে ঠিকই, কিন্তু পরিবেশটা বড্ড থমথমে।এর মধ্যে নীরবতা ভাঙলেন আরাফাত সাহেব। তিনি খাওয়ার চেয়ে ছেলের দিকেই বেশি তাকাচ্ছিলেন। গম্ভীর গলায় তিনি বললেন — “খেলার ছলে বিয়েটা তো সেরে ফেললে, যা খুশি তাই করছো। আমার মতামতের তো কোনো গুরুত্বই নেই তোমার কাছে। কিন্তু আমাদের আত্মীয়-স্বজন আছে, সমাজে একটা অবস্থান আছে। লোকে যখন হুট করে শুনবে আমার ছেলে এভাবে বিয়ে করে নিয়েছে, তখন মান-সম্মান কিছু থাকবে?”

আরশান খুব নির্বিকারভাবে খাবার খাচ্ছিলো। বাবার কথার পিঠে সে চোখ না তুলেই কিছুটা মজার ছলে জবাব দিল…

“আব্বু, বিয়েটা আমার দরকার ছিল, তাই করেছি। বাকি বিষয়গুলো কি তোমার সামলানোর কথা না? মান-সম্মান বাঁচাতে চাইলে বড় করে একটা রিসিপশনের ব্যবস্থা করো! কে বারণ করেছে তোমাকে?”

ছেলের এমন উত্তরে আরাফাত সাহেব যেন আরও চটে গেলেন!

“এত সহজ মনে হয় তোর কাছে? লোকে তো জানতে চাইবে হুট করে বিয়ে কেন করলো। তাদের কী জবাব দেব?”

আরশান এবার খাওয়ার মাঝখানে থামল। মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল…

“তুমি যখন আম্মুকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলে, তখন তো কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি আব্বু। আর আমি তো তোমাদের সাক্ষী রেখেই বিয়ে করেছি। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে কি একটা উত্তর বানিয়ে দিতে পারবে না?”

আরশান এ কথা বলার পরেই পুরো টেবিলে যেন পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সুরভী বেগম চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে গেলেন, তাঁর মুখটা মুহূর্তেই অপ্রস্তুতে লাল হয়ে উঠল। ছোট ভাইবোন আর নতুন বউয়ের সামনে আরশান যে এমনভাবে বাবা মায়ের পুরনো কাহিনী টেনে আনবে, সেটা কেউ ভাবেনি। আয়ান ও ইনায়া নিজেদের হাসি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছিল আর রিমি তো চমকে গেছে। এভাবে মা বাবার সামনে কেউ কথা বলে? আরাফাত সাহেব এবার ছেলেকে ধমক দিয়ে বললেন — “আরশান! কখন কি বলতে হয় সেই বোধও লোপ পেয়েছে নাকি তোমার!”

আরশান সেটা একটুও পাত্তা দিল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে খেতে খেতে একনজর রিমির দিকে তাকাল। রিসিপশনের কথা শুনে রিমির বুকের ভেতরটা দমে যাচ্ছে। এই মিথ্যে সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিকতা সে চায় না। বিষণ্ণ মনে ও যখন এসব ভাবছিল, তখনই ইনায়া কথা বলে উঠল — “রিমি, তুই আজকে ক্লাসে যাবি?”

ইনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই আরশান শাসনের স্বরে বলে উঠল — “She is your sister-in-law now, call her respectively.”

ইনায়ার মুখটা মুহূর্তেই গোমড়া হয়ে গেল। সে কাঁচুমাচু করে বলল — “কিন্তু ভাইয়া, ও আমার ছোটবেলার বান্ধবী! আমরা তো সবসময় এভাবেই কথা বলি।”

“So what? সম্পর্ক বদলেছে, ডাকার ধরণও বদলাবে”

রিমি আর চুপ থাকতে পারল না। আরশানের এই অকারণে খবরদারি করাটা ওর একদম সহ্য হচ্ছে না। ও ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল — “ইনায়া, এসব ফর্মালিটির দরকার নেই। আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে।”

“সম্পর্ক অনুযায়ী যেভাবে ডাকা দরকার, ইনায়া তোমাকে সেভাবেই ডাকবে।”

কথাটা বলেই আরশান সরাসরি রিমির দিকে চোখ গরম করে তাকালো, রিমিও দমে না গিয়ে ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রইল। দুজনের এই নীরব চাউনি খাওয়ার টেবিলের বাকিদের কাছে এক অশান্ত তর্কের আভাস দিচ্ছিল! নাস্তা শেষে আরশান দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে এসেছিলো কিছু নিতে, রিমিও দেরি না করে আরশানের পিছু পিছু ঘরে ঢুকল।আরশান নিজের ফোনটা নিতে ঘরে এসেছিলো। রিমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বেশ শক্ত গলায় বলল — “আমি কোনো রিসিপশন বা বড় অনুষ্ঠান চাই না”

আরশান আয়না থেকেই রিমির প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। ওর চেহারায় কোনো রাগ নেই, বরং এক ধরণের শান্ত স্থিরতা। সে ধীরপায়ে রিমির দিকে এগিয়ে এল। রিমির একদম সামনে দাঁড়িয়ে ওর চোখের গভীরে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল — “Don’t worry, nobody’s going to tell you anything. You have no reason to be afraid.”

রিমি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আরশানের এই শান্ত অভয়বাণী ওকে স্বস্তি দেওয়ার বদলে আরও বিভ্রান্ত করছে। রিমি তখন কিছুটা উপহাসের সুরে বলল — “মানুষ যখন প্রশ্ন করবে হুট করে কেন বিয়ে হলো, তখন কী জবাব দেবেন? সবাইকে কি সত্যিটা বলবেন? যে আপনি আমায় ব্ল্যাকমেইল করে জোর করে তুলে এনে বিয়ে করেছেন? নাকি অন্য কোনো সাজানো গল্প শোনাবেন?”

আরশান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই ওর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে ধীরপদে রিমির সামনে এসে দাঁড়াল। রিমির খুব কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল — “Truth is bitter & boring, রিমি। লোকে সেটাই বিশ্বাস করবে যেটা আমি তাদের বিশ্বাস করাবো। আমি তাদের বলবো তুমি আমার প্রেমে এতটাই পা’গল ছিলে যে আমাকে ছাড়া আর এক মুহূর্ত থাকতে পারছিলে না, তাই এই হুট করে বিয়ে।”

রিমির চোখ দুটো রাগে বড় বড় হয়ে গেল। আরশান থামল না, রিমির চিবুকটা আঙুল দিয়ে আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বললো — “And the funny thing is, যখন আমি এটা সবার সামনে বলবো তখন তুমিও পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে, হাসিমুখে”

আরশানের ওই নির্লজ্জ মিথ্যা আর আত্মবিশ্বাস দেখে রিমির শরীর রাগে জ্বলে উঠলো। ওর এখানে দাঁড়ানোরই ইচ্ছে নেই, ও যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতেই আরশান এক ঝটকায় ওকে নিজের দিকে টেনে নিল।আরশানের এক হাত রিমির কোমরে শক্ত হয়ে চেপে বসল, অন্য হাতটা রিমির ঘাড়ের পেছন দিক দিয়ে ওর মাথাটা একটু উঁচিয়ে ধরল। রিমির কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরশান ওর ঠোঁটে নিজের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এক মুহূর্তের জন্য রিমির পৃথিবীটা থমকে গেল। আরশানের এই আচমকা আর তীব্র আক্রমণে রিমির প্রতিটি স্নায়ুকে যেনো মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেছিলো। ঠিক যখন রিমির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, তখনই ও নিজের ভেতর থেকে সর্বশক্তি সঞ্চয় করে আরশানকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। আরশান কয়েক কদম পিছিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু ওর চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই।আরশানের চাউনি মুহূর্তেই বদলে গেল। ও ধীরপায়ে আবার রিমির দিকে এগিয়ে এল, কিন্তু এবার ওর চোখে কোনো প্রণয় নেই, আছে এক ধরণের ভয়ংকর সতর্কতা। আরশান রিমির খুব কাছে এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বললো…

“ফার্স্ট নাইটের পরে তুমি আমায় ফেলে চলে এসেছিলে রিমি, সেই অসম্পূর্ণ পাওনাটা এখনও তোলা আছে ভুলে যেও না আর হ্যাঁ আমি অফিস থেকে ফেরার আগে এই ঘরের প্রতিটি কণা যেন আগের মতো থাকে।”

বলেই আরশান আর এক সেকেন্ড দাঁড়াল না। একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। রিমি ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। আরশান ওর অধিকারের কথা পুনরায় মনে করিয়ে দিয়ে গেলো বুঝে রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এই লোকটাকে শায়েস্তা করা কি আদৌ সহজ হবে? হঠাৎ রিমির মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আরশানকে ভাঙতে হলে আগে ওর দুর্বলতা জানতে হবে। আর আরশানের পছন্দ-অপছন্দ, ওর সহ্য করার সীমা এসব এই বাড়িতে সুরভী বেগমের চেয়ে ভালো আর কে জানে? রিমি নিজেকে শান্ত করে রুম থেকে বেরিয়ে এল। আরশান বাসায় নেই তাই এটাই উপযুক্ত সময়। ও ধীরপায়ে নিচে নেমে দেখলেন, সুরভী বেগম নেই। তো ও সুরভী বেগমের ঘরে এলেন। সুরভী বেগম তখন কুশিকাঁটায় কিছু তৈরি করছিলেন। দরজার কাছে রিমিকে দেখে চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন — “কিছু বলবে? এসে বসো এখানে।”

রিমি এসে বসলো, প্রথমে ও কিছুটা ইতস্ততবোধ করছিলো পরে সাহস করে আরশানের OCD আর এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইতেই সুরভী বেগম বিশেষ অবাক হলেন না। উনি ভেবেছেন আরশান নিজেই হয়তো ওকে বলেছে। তো কথায় কথায় শাশুড়ির কাছে থেকে রিমি কৌশলে আরশানের অপছন্দের বিষয়েও মোটামুটি সব ধারণা নিয়ে নিলো! এবার এগুলোকেই নিজের অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাবে। হতে পারে একসময় বিরক্ত হয়ে আরশান নিজেই ওকে মুক্তি দিয়ে দেবে!

চলবে….

[আমার পাঠকদের সুবিধার জন্যে আবারো বলে দিচ্ছি, রেগুলার বেসিসে আমি গল্প সাধারণত রাত দশটার পরে দেই। রাত ১০-১১ এর মধ্যে একবার পেজে ঢু দিয়ে যাবেন, যদি না পান ভাববেন আরো দেরি হবে দিতে বা ওইদিন দেবো না। সেক্ষেত্রে আর অপেক্ষার প্রয়োজন নেই, যদি গভীর রাতে পোস্ট করেও দেই পরের দিন পড়ে নেবেন ❤️]

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1GH2DcTAjC/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here