#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩২
আরশান ঝড়ের বেগে হোটেলের পেছনের বাগানের দিকে ছুটল। ওর পেছনে রিসোর্টের আরও কয়েকজন কর্মী আর ম্যানেজারও দৌড়াচ্ছেন। তাঁদের চোখেমুখে আতঙ্ক, ওনাদের রিসোর্টের বেশ সুনাম রয়েছে এ শহরে। এই মুহূর্তে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তবে রিসোর্টের নাম বদনাম হয়ে যাবে! নদীর পাড়ে পৌঁছাতেই আরশানের টর্চের আলো সেই উত্তাল কালো জলরাশির ওপর গিয়ে পড়ল। কিনারের খুব কাছেই পানির ভেতর হাত-পা ছোড়াছুড়ি করছে একটা শরীর, কিন্তু সেই নড়াচড়া ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছে। রিমির সাদা পোশাকটা পানির ঝাপটায় ভারী হয়ে ওকে যেন অতলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নদীর পাড়টা উঁচু আর কিনারে হলেও বেশ গভীর! ও অনেক পানি খেয়ে ফেলেছে, তবুও শেষবারের মতো নিজেকে বাঁচানোর এক আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই ওর হাত দুটো যেন হাল ছেড়ে দিয়ে নিচের দিকে তলিয়ে যেতে শুরু করল।
“রিমি!”— এক বুক ফাটা আর্তনাদ করে আরশান আরও জোরে ছুটল। কাদা বা ময়লার তোয়াক্কা না করে ও একদম পানির কিনারে গিয়ে উপুড় হয়ে ঝুলে পড়ল। ঠিক যখন রিমির শেষ হাতটা পানির গভীরে হারিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আরশান ক্ষিপ্র গতিতে রিমির হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে ও রিমিকে টেনে ওপরে তুলল। রিমির ভেজা নিথর শরীরটা যখন ডাঙ্গায় উঠে এল, আরশানের মনে হলো ওর নিজের প্রাণটা বুঝি ফিরে এল। রিমি তখনো আধো চেতনায় গোঙাচ্ছে, আরশান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না, ওর ঠোট দুটো নড়ছে ঠিকই কিন্তু কোনো কথা শোনা যাচ্ছেনা। আরশান রিমিকে ওখান থেকে একটু সরিয়ে এনে একটু দূরে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিল। রিসোর্টের লোকেরা এগিয়ে এলো, সাহায্য প্রয়োজন কিনা জানতে চাইলো কিন্তু কারো কোনো কথাই ওই মুহূর্তে আরশানের কানে যেনো পৌঁছাচছিলো না। ওর ওর হাত কাঁপছে, সারা শরীর রাগে আর আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। ও রিমির পেটে আর বুকে দুই হাত দিয়ে চাপ দিতে শুরু করল যেন ভেতরে ঢুকে যাওয়া পানি বেরিয়ে আসে। কয়েকবার চাপ দেওয়ার পর রিমি অনেকটা পানি উগরে দিয়ে সজোরে কাশতে শুরু করল। ওর শ্বাসপ্রশ্বাস ফিরে এলেও ও এতটাই দুর্বল যে চোখ মেলতে পারছে না। আরশান রিমিকে নিজের দুই বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরল। ওর নিজের চোখ তখন জলে টলমল করছে, অথচ গলার স্বরে ও সেই কঠোরতা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে যেন রিমি ওর শাসনের ভয়ে হলেও নিজেকে সজাগ রাখে। এর মধ্যে ইনায়াসহ রিমিদের আরো কয়েকজন ক্লাসমেট দৌড়ে এসেছে, আরশান এখানে? আর রিমির এই অবস্থা! এসব দেখে ও তো ভীষণ ঘাবড়ে যায়। ইনায়া ভয় পেয়ে বললো — “র..রিমির কি হয়েছে ভাইয়া? ও ঠিক আছে তো?”
আরশান তখন কোনো উত্তর দিলো না, এ মুহূর্তে অন্যদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে ওর নেই। ও রিমির ভেজা মুখটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু ঝাঁকিয়ে ধরা গলায় বলল — “রিমি! রিমি আমার দিকে তাকাও! মানা করেছিলাম না তোমাকে? একটা কথা তো কানে নাও না? এই জন্যই কি আমি তোমাকে পিকনিকে আসতে দিয়েছিলাম যে তুমি এখানে এসে এমন স্বাধীনতা উপভোগ করবে?”
কথা বলতে গিয়ে আরশানের গলাটা শেষ দিকে ভেঙে এল। ও যতোই রাগ দেখাতে চাইছে কিন্তু পারছে না। ওর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল ও ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে পড়েছে। রিমি খুব কষ্ট করে একবার চোখ মেলে তাকালো। আরশানের ভেজা আর বিধ্বস্ত মুখটা ওর ঝাপসা নজরে আসতেই ও অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। ওর চোখের পাতা আবার ভারী হয়ে নেমে আসছে। আরশান রিমিকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় ওকে পাজা কোলা করে তুলে নিল। ওর পরনে তখন ভেজা কাপড়, শরীর থেকে পানি ঝরছে, কিন্তু সেদিকে ওর বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। ও রিসোর্ট কর্মীদের দিকে তাকিয়ে সিংহের মতো গর্জন করে উঠল — “is there any hospital nearby?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কর্মী কাঁপাকাঁপা গলায় বলল — “জি স্যার, একদম পাশেই একটা লোকাল ক্লিনিক আর একটু দূরে সদর হাসপাতাল আছে।”
“গাড়ির দরকার নেই, আমি নিজেই নিয়ে যাবো!”— আরশান আর কারোর জন্য অপেক্ষা করল না। ও রিমিকে নিজের বুকে জাপটে ধরে পাগলের মতো পার্কিং লটের দিকে ছুটল। রিমির মাথাটা আরশানের কাঁধে নুয়ে পড়েছে। আরশান গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করল — “Don’t you dare close your eyes, Rimi. I will never let you go.”
অন্ধকার রাত চিরে আরশানের গাড়িটা তীরের বেগে হাসপাতালের দিকে ধেয়ে চলল। হাসপাতালের করিডোরে তখন মোটামুটি লোকজনের আনাগোনা চলছিলো। ওর নিজের পরনের শার্টটা ভিজে শরীরের সাথে সেঁটে আছে, কপালে চুলে লেপ্টে আছে নদীর পানি আর কাদা। আশেপাশে যারা যাওয়া আসা করছে তারা ওর দিকে আরচোখে তাকিয়ে আছে কিন্তু কিন্তু সেদিকে ওর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। স্ট্রেচারে করে রিমিকে যখন এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হলো, আরশানকে বাইরে আটকে দিলেন নার্সরা। সেই কয়েকটা মিনিট আরশানের কাছে কয়েকটা যুগের মতো মনে হতে লাগল।কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। আরশান প্রায় তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো করে জিজ্ঞেস করল — “how’s she?”
ডাক্তার শান্ত স্বরে বললেন — “ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ওনার ফুসফুসে কিছু পানি ঢুকে গিয়েছিল, যেটা অলরেডি বের করা হয়েছে। আমরা ওনাকে নেবুলাইজ করেছি এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন একটা স্যালাইন চলছে। She is alright”
আরশানের অস্থির মন এই গদবাঁধা আশ্বাসে শান্ত হলো না। ও একনজর ভেতরে তাকিয়ে রিমির চোখ এখনও বন্ধ দেখেই রূঢ় স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করল — “যদি ঠিকই থাকে, তবে ও চোখ খুলছে না কেন? ওর জ্ঞান ফিরছে না কেন ডক্টর?”
ডাক্তার আরশানের ব্যাকুলতা দেখে একটু নরম হলেন। তিনি বুঝিয়ে বললেন — “দেখুন, উনি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলেন। এটাকে আমরা ট্রমাটিক শক বলি। পানিতে ডুবে যাওয়ার সেই মুহূর্তের আতঙ্কটা কাটিয়ে উঠতে ওনার মস্তিষ্ক একটু সময় নিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই জ্ঞান ফিরবে, চিন্তা করবেন না।”
আরশান ডাক্তারের কথা শুনেও স্থির হতে পারল না। ও ধীর পায়ে কেবিনের ভেতরে গিয়ে ঢুকল। বিছানায় শুয়ে থাকা ছোটখাটো মেয়েটার দিকে তাকাতেই ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। রিমির হাতটাতে স্যালাইনের সুঁই বিঁধিয়ে রাখা হয়েছে। মুখটা একটু ফ্যাকাশে বর্ন ধারণ করেছে। আরশান ওর শিয়রে বসে রিমির সেই ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওর মনে হলো, আজ যদি ও ঠিক সময়ে না পৌঁছাত, তবে এই হাতটা হয়তো চিরতরে শীতল হয়ে যেত। আরশানের চোখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর মমতার মিশ্রণ খেলা করতে লাগল। ও রিমির কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল— “Just open your eyes Rimi, then you can fight with me all you want, আমি বাঁধা দেবো না”
প্রায় এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল। আরশান এক মুহূর্তের জন্য ওর হাত ছাড়েনি। হঠাৎ রিমির আঙুলগুলো একটু কেঁপে উঠল। অবচেতন মনে ও তখনও সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তটার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ঘুমের ঘোরে ও দেখছিল কালো জলরাশি ওকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে, কেউ একজন ওকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর ও নিশ্বাস নিতে পারছে না।
“না… বাঁচান! আমি ডুবে যাচ্ছি!”— হঠাৎ করেই এক তীব্র চিৎকারে রিমি জেগে উঠল। ওর পুরো শরীরটা একটা ঝটকা দিয়ে কেঁপে উঠল। আরশান একটু কেবিন ছেড়ে বেরিয়েছিলো, ফিরে আসতেই দেখলো রিমি উঠে বসেছে! মেয়েটা চোখ দুটো বড় বড় করে ও চারদিকে তাকাচ্ছিল, কিন্তু ওর দৃষ্টিতে তখনও গভীর এক আতঙ্কের চাপ। আরশান তৎক্ষণাৎ এসে মেয়েটার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। ও রিমির চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলতে লাগল — “রিমি, শান্ত হও! Everything is alright। এই তো আমি আছি। তুমি সেফ আছো। রিমি, আমার দিকে তাকাও!”
রিমি জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছিল। আরশানের গলার স্বর শুনে ও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। ও আরশানের ভেজা শার্টের কলারটা খামচে ধরল, যেন এই একটা আশ্রয় ছেড়ে দিলেই ও আবার সেই অতল পানিতে হারিয়ে যাবে। আরশানের তপ্ত নিশ্বাস রিমির কপালে লাগতেই ওর চেতনার ঘোর কাটল। ও অস্ফুট স্বরে কাঁপা গলায় ডাকল — “আরশান…?”
আরশান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর চোখে তখন পানি আর রাগের এক অদ্ভুত সংঘাতের দেখা মিলল। ও রিমির চিবুক ধরে একটু উঁচু করে গম্ভীর অথচ ধরা গলায় বলল — “হ্যাঁ, আমি”
রিমি কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু আরশানের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। আরশান ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর রাগগুলো যেনো এই মুহূর্তের এখন রিমির চোখের পানির সাথে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে!
______________________________________
হাসপাতালের কেবিনের আবছা আলোয় রিমি তখনো আরশানের শার্টের হাতা খামচে ধরে আছে। ওর দুচোখে জমাট বাঁধা আতঙ্ক যেন সরতেই চাইছে না। আরশানকে এক মুহূর্তের জন্য আড়াল হতে দিলেই ও আবার সেই অতল জলের দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করছে। স্যালাইনের ব্যাগটা যখন প্রায় শেষ হয়ে এল, আরশান নিজ হাতে কিছু খাবার ওর মুখে তুলে দিতে চাইল। কিন্তু রিমি শুধু মাথা নাড়ল, ওর শরীর আর মন এখন কোনো কিছুই গ্রহণ করার অবস্থায় নেই। আরশান চাইলে ধমক দিয়ে বা জোর করে খাইয়ে দিতে পারত, কিন্তু আজ ওর সমস্ত কঠোরতা রিমির ওই ফ্যাকাশে মুখটার কাছে হেরে গেছে। আরশান ঠিক করল, আজই ওকে নিয়ে সরাসরি বাসায় ফিরবে। কিন্তু তার আগে, একটা পাওনা চুকানো বাকি। যে হাত আজ রিমির জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল, সেই হাতগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আরশানের ভেতরের রাগ শান্ত হবে না। রাত তখন প্রায় দেড়টা। রিমির দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে আসার পর ও যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো, আরশান আলতো করে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। এরপর ওখান থেকে বেরিয়ে ও আবার রিসোর্টের দিকে রওনা দিল। আরশানের ভেজা কাপড় তখন শুকিয়ে শরীর কামড়ে ধরেছে, কিন্তু ওর মস্তিষ্ক তখনও গরম হয়ে আছে। রিসোর্টে পা রাখতেই ম্যানেজার এগিয়ে এলেন।
“স্যার, মেয়েটা শুনলাম আপনার ওয়াইফ ছিলো। এখন কেমন আছেন উনি?”
আরশান কোনো উত্তর দিল না। ওর নীরবতা যেন যেকোনো চিৎকারের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। ম্যানেজার আর কথা বাড়াতে সাহস পেলেন না। লবিতে ঢুকতেই ইনায়ার সাথে দেখা। ইনায়া ভাইকে দেখেই ছুটে এল — “ভাইয়া! কতবার ফোন করলাম তোমাকে, ধরলে না কেন? রিমি কেমন আছে এখন? আর তুমি হঠাৎ এখানে কীভাবে…”
আরশান ওকে কথা শেষ করতে দিল না। ও ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে স্থির গলায় বলল — “তোর সাথে যারা পিকনিকে এসেছে, তাদের সবাইকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে একসঙ্গে চাই।”
ইনায়া হকচকিয়ে গেল।
“এত রাতে? কিন্তু কেন ভাইয়া? ওরা তো সবাই মনে হয় ঘুমিয়েও গেছে এতক্ষণে”
আরশান এবার দাঁতে দাঁত চেপে শুধু এটুকুই বলল — “Just do what I said. I want everyone here. Right now.”
আরশানের সেই বিধ্বস্ত অথচ র’ক্তবর্ণ চোখের চাহনি দেখে ইনায়ার শিরদাঁড়া দিয়ে যেনো ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ও আর একটা প্রশ্নও করল না। দ্রুত গিয়ে ইনায়া সবাইকে ডাকতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব স্টুডেন্ট আর দুইজন প্রফেসর এসে হাজির হলেন। ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে যে রিমির হাসবেন্ড আরশান। সবার চোখেমুখে এক ধরণের অস্বস্তি, এতো রাতে ঘুম ভাঙিয়ে ডাকার কোনো মানে হয়? প্রফেসরদের একজন এগিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন…
“রিমির সঙ্গে আজ যেটা হয়েছে তার জন্যে আমরা লজ্জিত, হুট করে এমন একটা ঘটনা ঘটবে আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি”
আরশান তখন প্রশ্ন করলো — “আজকে রিমির সাথে এখানে যেটা হয়েছে, সেটা কি ছিল বলে মনে হয় আপনাদের?”
এর মধ্যে এক ক্লাসমেট বলে উঠলো — “wasn’t that an accident? আমার তো মনে হয় ও পা পিছলে পড়েছে”
আরশান মেয়েটার কথা শুনে বুঝলো এখানে সবাই ধরেই নিয়েছে যে রিমি পা পিছলে পড়ে গেছিলো, তাই এই বিষয় নিয়ে কেউ কোনো মাথায়ই ঘামাচ্ছে না কিন্তু আসলে তো তেমন কিছুই হয়নি! আরশান ধীর পায়ে এগোতে এগোতে সব স্টুডেন্টদের মুখের দিকে তাকালো। ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রতিটি কোণায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন ও কাউকে খুঁজছে। পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে আরশানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো। ও প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে বললো….
“I feel sorry for you, Professor. It’s pathetic to see how hard you try to educate some criminals. Your efforts are nothing but a waste of time”
কথাটা শোনার সাথে সাথে পুরো হলরুমে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। এক প্রফেসর রীতিমতো আঁতকে উঠে বললেন — “ক্রি’মিনাল! আপনি কার কথা বলছেন? এখানে সবাই আমাদের স্টুডেন্ট!”
আরশান এক বাঁকা হাসি হাসল। ও ভিড়ের মধ্যে আড়চোখে একবার পেছনের দিকে তাকালো, যেখানে শাফিন মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আরশান এক পা এক পা করে এগোতে এগোতে বলল — “criminals are everywhere, শুধু অসময়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে আর সময় পেলেই নিজের আসল রূপ দেখায়। Am I right?”
আরশানের চোখ দেখেই শাফিনের কপাল তখন ঘামে ভিজে একাকার হতে শুরু করেছে। ও বুঝতে পারছে না আরশান কি সব জেনে ফেলেছে? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? ওখানে তো সেই সময় কেউ ছিলো না তাহলে আরশান কিভাবে জানবে? শাফিন যখন এসব ভাবনায় ব্যস্ত তখন আরশানের সেই বরফশীতল চাহনি সরাসরি ওর চোখের ওপর নিবদ্ধ! ও শাফিনের চোখের দিকে স্থিরভাবে চেয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। সেই চাউনিতে ছিল এক কঠোর হুঁশিয়ারি। শাফিন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল, ওর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে ঠিক তখনই হঠাৎ আরশান চাউনি সরিয়ে নিল। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বলল — “রিমির আর তোর নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নে ইনায়া। তুই এখনই আমার সাথে বাসায় ফিরবি।”
আরশান এবার প্রফেসরদের দিকে ফিরল। ওর চেহারায় এখন সেই আগের শান্ত রূপটা ফিরে এসেছে, কিন্তু চোখের কোণে লাল আভাটা তখনও মেজাজের জানান দিচ্ছে। ও মৃদু মাথা ঝুঁকিয়ে বলল — “আপনাদের কোনো আপত্তি নেই তো?”
প্রফেসররা নিজেদের মধ্যে একবার চোখাচোখি করে নিলেন। বড় প্রফেসরটি মাথা নেড়ে বললেন — “অবশ্যই না। আপনি ওর বড় ভাই, আমরা বরং লজ্জিত যে আমাদের নজরে থাকা সত্ত্বেও এমন একটা অঘটন ঘটে গেল রিমির সঙ্গে”
আরশান একটা ম্লান হাসি দিয়ে উপস্থিত বাকি স্টুডেন্টদের দিকে তাকালো। বিশেষ করে শাফিনকে আরও একবার চোখের কোণ দিয়ে মেপে নিল। তারপর কর্কশ গলায় বলল — “You guys enjoy your picnic. Good night.”
ওর বলা ‘এনজয়’ শব্দটা সবার কানে বিদ্রূপের মতো শোনাল। ইনায়া জিনিসপত্র নিয়ে আসতেই আরশান ওকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। এরপর হাসপাতাল থেকে রিমিকে নার্স দিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করিয়ে ডিসচার্জ করিয়ে যখন গাড়িতে তোলা হলো, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।ইনায়া পেছনের সিটে গম্ভীর মুখে বসে রইল, পুরো ঘটনাটা ওর মাথায় ঠিক খেলছে না। আরশান ড্রাইভ করছে। গাড়িটা যখন হাইওয়েতে পড়ল, রিমি নিজের অজান্তেই পাশে বসা আরশানের কাঁধে মাথা রাখল। ওর ভেতরে যে ভয়টা কাজ করছিল, আরশানের গায়ের চেনা ঘ্রাণে তা যেন ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসছে। আরশান এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতটা আলতো করে রিমির মাথায় রাখল। পেছন থেকে ইনায়া দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকার পর খুব নিচু স্বরে ডাকল — “ভাইয়া?”
আরশান রিয়ার-ভিউ মিররে ইনায়ার দিকে একবার তাকালো, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। ইনায়া দ্বিধা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল…
“ভাইয়া, তুমি হলরুমে শাফিনকে ওভাবে ওসব কথা বললে কেন? শাফিন কিছু করেছে নাকি? আমি ওকে দেখেছি ও একা একা এক কোণায় দাঁড়িয়ে কাঁপছিল।”
আরশান বিশেষ কিছু বললো না, শুধু এইটুকুই বললো যে — “just Stay away from that guy”
ভাইয়ের কথা শুনে ইনায়াই একটু চুপ করে গেলো, ছেলেটা যে ভালো না সেটা তো আগেই জেনে গেছিলো কিন্তু আজ রিমির সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তার পেছনেও যে শাফিনের হাত আছে সেটা ভাইয়ের কথা শুনে আর বুঝতে বাকি রইলো না ওর। ইনায়ার আবার নিজের ওপর আফসোস হতে শুরু করলো। একটা ভুল মানুষকে কিভাবে পছন্দ করেছিলো ও?
________________________________________
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি, আকাশের এক কোণে ফিকে নীল আর ধূসর রঙের মাখামাখি। শহরের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই আরশানের গাড়িটা এসে থামল মির্জা ভিলার বিশাল গেটের সামনে। রাতভর জাগরণ আর দুশ্চিন্তায় আরশানের চোখ দুটো র’ক্তবর্ণ হয়ে আছে, কিন্তু ওর বাহুবন্দি রিমির ভার যেন ওর সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে। কলিংয়ের শব্দ পেয়ে সুরভী বেগম আর আরাফাত সাহেব দুজনেরই ঘুম ভেংগে গেছে। এই অসময়ে আরশান রিমি ও ইনায়কে নিয়ে ফিরে এসেছে দেখে ওনারা অবাক হলেন। বিশেষ করে যখন আরশান রিমিকে কোলে নিয়ে আছে দেখে সুরভী বেগম অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন — “আরশান! একি কাণ্ড! রিমি এভাবে কেন? ওর কী হয়েছে?”
আরাফাত সাহেবও গম্ভীর মুখে ধীর পায়ে সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন — “আরশান, ঘটনা কী? আর ইনায়া, তুই এভাবে মুখ শুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
আরশান ওনাদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে গেল না। ওর ভেজা শার্টটা এখন রিমির শরীরের তাপে কিছুটা গরম হয়ে এসেছে। ও একবার নিচের দিকে রিমির মুখটার দিকে তাকালো, ঘুমের ঘোরেও রিমির কপালে একটা ভয়ের ভাঁজ পড়ে আছে। আরশান বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল — “She is sleeping now. তোমাদের যত প্রশ্ন আছে, সবকিছুর উত্তর পরে পাবে। এখন কেউ কোনো কথা বলে ওকে বিরক্ত করো না। ও খুব ক্লান্ত।”
সুরভী বেগম কিছু একটা বলতে গিয়েও আরশানের পাথরের মতো শক্ত মুখটা দেখে থেমে গেলেন। আরশান ইশারায় ইনায়াকে বলল — “ইনায়া, রিমির ব্যাগটা আমার ঘরে রেখে আয়।”
ইনায়া ব্যাগ নিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো। আরশান অত্যন্ত সন্তর্পণে রিমিকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। ওর প্রতিটা পদক্ষেপে ছিল এক অদ্ভুত সতর্কতা, যেন সামান্য একটু নড়াচড়ায় রিমির এই শান্তির ঘুমটা ভেঙে না যায়। রুমের দরজাটা পায়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকে আরশান রিমিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আরশান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিমির ফ্যাকাশে চেহারায় ভোরের আবছা আলো এসে পড়েছে। আরশান আলতো করে রিমির কপালে হাত রাখল। ওর নিজের হাত তখনো সামান্য কাঁপছে। মেয়েটার আজ যদি কিছু হয়ে যেত তাহলে? এই ভাবনাটা আরশানের রুহ যেনো কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ও কোনরকম একটু ড্রেস বদলে এসে রিমির পাশে শুয়ে ওকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিলো।
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1YZUdKCdSt/?mibextid=oFDknk

