#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩৫
ভার্সিটির মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আরশানের গাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল ইনায়া, সময় হয়ে যাচ্ছে। রিমি আসছে না দেখে হয়ে দূর থেকেই ও ডাক দিল — “রিমি! জলদি আয়, লেকচার শুরু হয়ে যাবে তো!”
রিমি হাত উঁচিয়ে ইনায়াকে ইশারায় জানালো যে ও আসছে। এরপর আরশানের দিকে তাকিয়ে বললো — “আমি তাহলে গেলাম। আর শুনুন… রাতে যদি ফিরতে দেরি হয়, তবে একটা ফোন করে দেবেন।”
আরশান অবাক হয়ে রিমির দিকে তাকালো। ওর চোখেমুখে বিস্ময় স্পষ্ট। রিমি থামল না, ও আরো যোগ করল — “ফোনে কথা বলার সময় না থাকলে অন্তত একটা মিসড কল দিলেও হবে। আমি বুঝে নেবো আপনি ব্যস্ত আছেন”
কথাটা বলেই রিমি দ্রুত পায়ে গাড়ি থেকে নেমে ইনায়ার দিকে চলে গেল। আরশান পাথরের ন্যায় কয়েক মুহূর্ত স্টিয়ারিং ধরে বসে রইল। এই তো কয়েকদিন আগেও ও বাড়ি ফিরল কি ফিরল না, খেল কি খেল না—এসব নিয়ে রিমির কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। বরং আরশান বাইরে থাকলে ও তো হাফ ছেড়ে বাঁচত। কিন্তু আজ হঠাৎ এই আগ বাড়িয়ে খোঁজ নেওয়ার মানে কী? আরশানের মনে এক ধরণের খটকা লাগল। ও নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল…
“Is she planning something?”
রিমির এই হঠাৎ নরম হওয়াটা কি স্বাভাবিক, মেয়েটার মনে সত্যিই কোনো পরিবর্তন আসছে? এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ও গাড়ির গিয়ার পাল্টে অফিসের দিকে রওনা দিল। এদিকে রিমি ক্লাসে ঢোকার সাথে সাথেই এক ছোটখাটো শোরগোল পড়ে গেল। সেদিন পিকনিকে যারা যারা ওর সঙ্গে গেছিলো তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ওর খোঁজ নিতে এগিয়ে এল। বন্ধুদের ভিড়ে রিমি হাসিমুখে সবাইকে সামলাচ্ছিল। ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে সবার শেষে এগিয়ে এল আবিদ। আবিদ এসে রিমির একদম সামনে দাঁড়ালো। কিন্তু কোনো এক অজানা জড়তায় ওর মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। ও শুধু এক দৃষ্টিতে রিমির মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ও জিজ্ঞাসা করল — “ভালো আছো তো, রিমি?”
রিমি স্নিগ্ধ এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল — “একদম ফিট আছি!”
অফিসের বিশাল কেবিনে পিনপতন নীরবতা। বাইরে তপ্ত দুপুরের রোদ আছড়ে পড়ছে কাঁচের দেয়ালে, কিন্তু ভেতরের এসি সেই আঁচকে অবলীলায় আটকে দিয়েছে। আরশান তার ডেস্কে ঝুঁকে ফাইলের স্তূপে নিমগ্ন। কাজের চাপে সে ভুলেই গেছে যে দুপুরের লাঞ্চের সময় কখন পার হয়ে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে সামনের চেয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিরের ফোনের ভাইব্রেশন আরশানের মনোযোগ নষ্ট করছে। একবার, দুবার, তিনবার। বিরক্তিটা এবার আরশানের চোয়াল শক্ত করে দিল। ফাইল থেকে চোখ না তুলেই গম্ভীর গলায় সে বলল — “ফোনটা কি সাইলেন্ট মুডে রাখা যায় না, ইয়াসির? আমি কনসেন্ট্রেট করতে পারছি না।”
ইয়াসির কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে ফোনটা পকেটে ঢোকাল।
“সরি স্যার। আসলে ও বারবার কল করছিল তো, লাঞ্চ করেছি কি না সেটা জানার জন্য…”
আরশান এবার কলমটা টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল — “কে? আপনার ফিয়ন্সে?”
ইয়াসির বেশ অবাক হলো। কিছুটা লাজুক হেসে মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করল — “জি স্যার… কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?”
“সেদিন আপনি আমার কেবিনের দরজা খুলে রেখেই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কারো সাথে প্রেমালাপ করছিলেন!”
আরশানের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি থাকলেও সেখানে এক অদ্ভুত কৌতূহল মিশে ছিল।ইয়াসির কাঁচুমাচু হয়ে বলল — “সরি স্যার। আসলে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই মেয়েটা উঠতে বসতে আমার খোঁজ নেয়। সময়মতো কল রিসিভ না করলে একদম মাথা খারাপ করে ফেলে, প্রচণ্ড রেগে যায়”
ইয়াসিরের কথাগুলো শুনে আরশান হুট করেই নড়েচড়ে বসল। ওর মনের গহীনে হঠাৎ রিমির মুখটা ভেসে উঠল। রিমি তো কখনো ওকে এভাবে ফোন করে জ্বালাতন করে না! আরশান নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল — “Do all girls act like this? I mean, checking up on their partners every second?”
ইয়াসির আকাশ থেকে পড়ল। আরশানের মতো একজন রাশভারী মানুষ এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করবে, সেটা তার কল্পনার অতীত। সে আমতা আমতা করে বলল — “স…স্যার, এটা তো আপনি আমার চেয়ে ভালো জানবেন। আমার তো সবে বিয়ে ঠিক হয়েছে, আর আপনি তো অলরেডি বিবাহিত।”
“বিবাহিত” শব্দটা আরশানের কানে গিয়ে যেন সজোরে ধাক্কা খেল। সে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ও কি সত্যিই বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছে? বিবাহিত জীবন কি আসলে এমনই হয়? আরশানের নিজের এই সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা কোনোদিনই ছিল না। ওর কাছে বিয়ে মানে ছিল একটা অধিকার অর্জন। কিন্তু তার পরের জীবনটা যে দুজন মানুষ মিলে সাজাতে হয়, একে অপরের প্রতি দায়িত্ব আর মায়ার বাঁধনে জড়াতে হয় সেই ভাবনাটা আরশানের জটিল মস্তিষ্ক কখনোই উপলব্ধি করতে পারেনি। বিশেষ করে রিমির সাথে তার সম্পর্কের যে টানাপোড়েন গেছে, তাতে সম্পর্কের এই সহজ সমীকরণগুলো তার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকছে। তার ওপর আজ মেয়েটার এই আকস্মিক পরিবর্তন আরশান ঠিক হজম করতে পারছে না। যে মেয়ে ওকে ঘৃণা করত, ও বাড়িতে না ফিরলে খুশি হতো, সে আজ কেন ওর ফেরার সময় জানতে চাইছে? আরশানের খটকা লাগছে সবই কি রিমির কোনো নতুন চাল? নাকি ওর জটিল মস্তিষ্ক সহজ বিষয়কে অহেতুক পেঁচিয়ে ভাবছে? ওর নিরবতা দেখে ইয়াসির সাহায্য করতে চেয়ে বলল — “স্যার, আপনার যদি কোনো পরামর্শ বা হেল্প লাগে, আমি…”
আরশান ঝট করে মাথা তুলল। ওর মেজাজ মুহূর্তেই সপ্তমে চড়ে গেছে। ও কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল — “আপনার কাজ শেষ তো? এখন যেতে পারেন”
ইয়াসির আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। ও জানে আরশানের মুড ঠিক করা আর আকাশের আবহাওয়া বোঝার বৃথা চেষ্টা একই কথা! কখন রোদ উঠবে আর কখন বজ্রপাত হবে, তা কেউ জানে না। অন্যদিকে… ক্লাস শেষে বের হতেই রিমি অভ্যাসবশত ফোনের স্ক্রিনে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। কোনো মিসড কল নেই, কোনো মেসেজ নেই। লোকটা এমনিতে ফোন করে না ঠিকই, কিন্তু আজ রিমির অবচেতন মন কেন যেন আশা করেছিল হয়তো একটা ফোন আসবে আজ। রিমি হাঁটতে হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরশানের মতো একজনের হাত থেকে পালানো অসম্ভব। আর পালিয়েই বা এই বিশাল দুনিয়ায় ও কোথায় যাবে? ওর তো কেউ নেই। মানুষটা যেমনই হোক, অন্তত ওর বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে জানে। যে মানুষটা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওকে আগলে রাখতে জানে, তাকে অন্তত একটা সুযোগ তো দেওয়াই যায়। রিমি ঠিক করে নিয়েছে, অতীতকে পেছনে ফেলে এবার থেকে আরশানের সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে। ওর পাশেই হাঁটছিল ইনায়া। সে হঠাৎ রিমির কাঁধে হাত দিয়ে বলল — “রিমি! কাল কিন্তু ভাইয়ার জন্মদিন!”
রিমি থমকে দাঁড়াল। বিস্ময় নিয়ে বলল — “কালকে? তুই আগে বলবি না? আমি তো কিচ্ছু জানি না!”
ইনায়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল — “আমি ভেবেছিলাম ভাইয়া হয়তো তোকে বলেছে। যদিও ভাইয়া এসব বার্থডে সেলিব্রেশন একদম পছন্দ করে না। তবে তুই চাইলে একটা গিফট দিতে পারিস।”
আরশানের জন্মদিনের কথা শুনে রিমির মনে এক ধরণের উত্তেজনা আর দ্বিধা কাজ করতে লাগল। মনে মনে ভাবল আরশানের সাথে এটা ওর প্রথম কাটানো জন্মদিন। শুধু একটা সাধারণ উপহার দিলেই কি হবে? নাকি ওনার জন্য স্পেশাল কিছু প্ল্যান করা উচিত?
_____________________________________
অফিসের কাজগুলো আজ কেন যেন আরশানের মাথায় ঢুকছিল না। রিমির সেই সকালের ফোন করার অনুরোধটা বারবার ওর কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তাই সব কাজ ফেলে ও আজ একটু আগেই বাড়ির পথে রওনা দিল। কিন্তু বাসায় পা রাখতেই আরশানের কপাল কুঁচকে গেল কারণ রিমির বাসায় নেই। এই সময়ে তো মেয়েটার বাড়িতে থাকার কথা। সিঁড়ির গোড়ায় মায়ের সাথে দেখা হতেই আরশান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল — “রিমি কোথায়?”
সুরভী বেগম একটু হেসে বললেন — “ও তো আমাকে ফোন করেছিল বাবা। বলল খুব জরুরি একটা কাজে একটু আটকে গেছে, ফিরতে সামান্য দেরি হবে।”
আরশান হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করল — “রাত আটটা বাজে, এখন আবার কিসের জরুরি কাজ ওর!”
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় ও দেখল ইনায়ার ঘরের দরজা খোলা। ইনায়া ঘরে বসে ল্যাপটপে কিছু করছে। তার মানে রিমি একা বাইরে গেছে? আরশানের ভেতরে একটা চাপা সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। ও নিজের ঘরে ঢুকে সরাসরি রিমিকে কল করল। রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ ধরছে না। পুরোটা সময় ফোন বাজার পর কলটা কেটে গেল। আরশান দাঁতে দাঁত চেপে আবার ট্রাই করল। কিন্তু এবার যা হলো, তাতে ওর মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। কলটা হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মাথায় রিমি ওপাশ থেকে কলটা কেটে দিল!
“What the hell!”— আরশান ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল।
ওর মাথায় র’ক্ত চড়ে যাচ্ছে। কি এমন রাজকার্য করছে ও যে কল কাটার সাহস দেখাচ্ছে? সকালে অত দরদ দেখিয়ে এখন কি তবে ইগনোর করার নতুন কোনো খেলা শুরু করল? আরশানের মনে হলো রিমি হয়তো ওর ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। রাত ঠিক নয়টা। রিমি ক্লান্ত পায়ে ঘরে ঢুকল। তবে ওর চোখেমুখে একটা তৃপ্তির ছাপ আছে। আরশানের জন্মদিনের সারপ্রাইজটা গুছিয়ে ফেলেছে, এবার শুধু কালকের দিনের অপেক্ষা। কিন্তু ঘরে পা রাখতেই রিমির ভ্রু কুঁচকে এল। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। এমনকি প্রতিদিন যে ড্রিম লাইটটা জ্বলে, আজ সেটাও নেভানো। ও অন্ধকার একদম সইতে পারে না। ঠিক তখনই জানালার পর্দা ভেদ করে আসা চাঁদের আলোয় ও বারান্দার রেলিং ঘেঁষে একটা দীর্ঘ অবয়ব দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। রিমি চমকে উঠে অস্ফুট স্বরে বলল — “কে ওখানে!”
তড়িঘড়ি করে ও সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে মেইন লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিল। আলো জ্বলে উঠতেই আরশান ধীর পায়ে বারান্দা থেকে ঘরের ভেতর এল। ওর চোখেমুখে এক ধরণের হিমশীতল আক্রোশ। আরশান রিমির খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল…
“It seems your words mean nothing to you, Rimi! একদিকে সকালে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিলে যে ফিরতে দেরি হলে যাতে ফোন করি, আর এখন তুমি নিজে কী করলে? তার ওপর আমার কল কেটে দেওয়ার সাহস তোমার হলো কীভাবে?”
রিমি থতমত খেয়ে গিয়ে নিচু গলায় বলল — “আমি একটা খুব জরুরি কাজ করছিলাম আরশান। ওভাবে ফোনের পর ফোন দিলে কথা বলা সম্ভব ছিল না, তাই…”
“Oh really? তুমি আবার কয়টা অফিস সামলাচ্ছিলে যে একটা কল রিসিভ করার সময় হয়নি?”
আরশানের এই রাগ দেখে রিমি মুখ গোমড়া করে একটু অভিমানের সুরেই বলে উঠল…
“আপনি শুধু শুধু রাগ করছেন। আমার তো আজ একদিন একটু দেরি হয়েছে। কিন্তু আপনি তো মাসের মধ্যে বিশ দিনই দেরি করে ফেরেন! তাহলে ওই ফোনের নিয়মটা কি আপনার ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়? আপনি ফিরলে সব ঠিক, আর আমার একটু দেরি হলেই আমি অপরাধী?”
রিমির এই পাল্টাপাল্টি যুক্তিতে আরশান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মেয়েটা এখন আর আগের মতো ভয়ে সিঁটিয়ে থাকছে না, বরং চোখে চোখ রেখে জবাব দিচ্ছে। আরশানের মাথায় তখনো জেদ চেপে আছে, কিন্তু রিমির ওই ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ও যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল!
____________________________________
স্টাডি রুমের পিনপতন নিস্তব্ধতায় কেবল আরশানের ল্যাপটপের কি-বোর্ডের খটখট শব্দ আর দেয়াল ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। আরশান খুব মন দিয়ে একটা প্রজেক্টের ফাইল দেখছিল। হঠাৎ ও দরজার কাছে কারো পায়ের শব্দ পেল। ও বুঝতে পারল রিমি এসেছে। দরজা খোলার মৃদু শব্দ ও শোবার ঘরে থাকতেই পেয়েছিল, কিন্তু রিমি এই মাঝরাতে কেন বের হলো সেটা ও তখন মাথা ঘামায়নি। রিমি হাতে একটা ছোট ট্রে নিয়ে ধীর পায়ে আরশানের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। আরশান ফাইল থেকে চোখ তুলে একবার রিমির দিকে, আর একবার ট্রের দিকে তাকাল। রিমির দৃষ্টি তখন দেয়াল ঘড়ির বড় কাঁটাটার ওপর নিবদ্ধ। আরশান প্রশ্ন করলো — “কিছু বলবে?”
রিমি কোনো উত্তর দিল না। ও যেন মনে মনে কোনো একটা ক্ষণ গুণছে। আরশান বিরক্তি নিয়ে ল্যাপটপটা আধা-বন্ধ করে বলল…
“কিছু বলার থাকলে চটপট বলো। নাহলে গিয়ে শুয়ে পড়ো”
ঠিক তখনই ঘড়ির কাঁটা দুটো একসাথে বারোটার ঘরে গিয়ে স্থির হলো। রিমির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ও আরশানের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নরম কিন্তু মিষ্টি এক চিলতে হাসি দিয়ে বলে উঠল — “হ্যাপি বার্থডে, আরশান!”
কথাটা বলেই ও ট্রে-টা আরশানের ল্যাপটপের ওপর দিয়ে টেবিলের ফাঁকা জায়গাটায় রাখল। ট্রে-তে সুন্দর করে সাজানো পাঁচ-ছয়টা কাপকেক। ওগুলোর ওপর সাদা ফ্রস্টিং আর ছোট ছোট রঙিন সুগার বল ছিটানো। আরশান কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই রিমি বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল — “এগুলো আমি আপনার জন্য নিজের হাতে বানিয়েছি! আজ বিকেলে এইটা শিখতেই আমার এক ক্লাসমেটের বাসায় গেছিলাম। এটা বানানো শিখতেই দেরি হয়ে গিয়েছিল। দেখুন তো, কেমন হয়েছে দেখতে?”
আরশান যেন মুহূর্তের জন্য কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। ও স্তম্ভিত হয়ে সেই কাপকেকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। আজকের তারিখটা ওর মনে ছিল না তা নয়, কিন্তু ওকে রাত বারোটায় কেউ এভাবে উইশ করতে পারে এটা ওর কল্পনারও বাইরে ছিল। ও কাউকে সেই সুযোগ কোনোদিন দেয়নি। এমনকি ওর বাবা আরাফাত সাহেবও কড়া শাসনের মানুষ ছিলেন বলে এই বাড়িতে জন্মদিন পালন করার কোনো রেওয়াজ ছিল না। ওর ছোটো ভাইবোনেরা একটু বড় হওয়ার পর কখনো উইশ করেছে বা গিফট দিয়েছে, কিন্তু এমন নিভৃতে, ঠিক রাত বারোটায় কেউ নিজের হাতে কেক বানিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে এমন স্নিগ্ধ অনুভূতির মুখোমুখি আরশান এর আগে কখনো হয়নি। আরশান টেবিলের ওপর রাখা সেই সাধারণ দেখতে কাপকেকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, এরপর ধীরে ধীরে রিমির দিকে তাকাল। রিমির চোখে এখন কোনো ভয় নেই, বরং একটা অদ্ভুত আনন্দ চিকচিক করছে। আরশান অস্ফুট স্বরে শুধু বলল — “You made these… for me?”
রিমির হাসিটা এবার আরও চওড়া হলো। ও মাথা নাড়ল! স্টাডি রুমের সেই মৃদু আলোয় আরশানের সেই কঠিন মুখটা আজ যেন একটু বেশিই নমনীয় দেখাল। আরশান কি একটা ভেবে একটা কেক হাতে নিলো, কেকটা একটু হার্ড লাগছে! ও কোনো মন্তব্য করার আগেই রিমি বললো — “দেখুন, আমি আগে কোনদিন এগুলো বানাইনি। আজকের কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় কোনোরকম বানিয়ে এনেছি। একটু হলেও আপনাকে খেতে হবে। একটু খেলেই চলবে”
রিমিকে বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছে, আরশান কিছু না বলেই একটা কেক পুরো খেয়ে নিলো। রিমি উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলো — “কেমন হয়েছে? সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে তো? আমার মনে হয় চিনিটা একটু বেশিই দিয়ে ফেলেছিলাম। বেশি মিষ্টি হয়ে গেছে?”
রিমি একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছিলো, তখন আরশান উত্তর দিলো — “below average”
আরশানের উত্তর শুনে রিমির রাগ হলো না বরং ও যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো, একদিনের চেষ্টায় আর কত ভালো হবে? তবে খাওয়ার উপযোগী হয়েছে এটাই অনেক! রিমি নিজেও ট্রে থেকে একটা কেক নিয়ে খেতে শুরু করলো, যেমনটা আরশান বলেছে মন্দ হয়নি! রিমি বললো — বাকিগুলো রেখে যাচ্ছি, আপনি তো অনেকক্ষণ জেগে কাজ করবেন। কাজের ফাঁকে খেয়ে নেবেন সবগুলো কেমন?”
আরশান নিজের কাজের মধ্যে কারো বিরক্তি পছন্দ করেনা তো রিমি আর ওকে বিরক্ত না করে বেরিয়ে আসছিলো তখনই হুট করে আরশান প্রশ্ন করলো — “কেনো করছো তুমি এসব?”
রিমি ভ্রু কুঁচকে ফিরে তাকালো — “কি?”
আরশান চেয়ারে হেলান দিয়ে রিমির দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকালো — “হঠাৎ আমাকে খুশি করার এতো চেষ্টা কেনো? কি করতে চাইছো তুমি?”
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/14aSBkyY1qd/?mibextid=oFDknk

