মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_৩৬

0
87

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩৬

আরশানের মুখটা মুহূর্তের জন্য নমনীয় হলেও পরক্ষণেই সেখানে সেই পরিচিত সন্দেহ আর কাঠিন্য ফিরে এসেছে যা উপলব্ধি করে রিমির ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই এক চিলতে হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। ও যেন আকাশ থেকে পড়ল। ও অনেক শখ করে, সারাদিন পরিশ্রম করে আরশানের জন্য এই সারপ্রাইজটা তৈরি করেছিল। ভেবেছিল লোকটা অন্তত আজ একটু খুশি হবে, কিন্তু তার বদলে ও কি না রিমির এই ছোট্ট চেষ্টাটুকুকেও সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে! রিমি অস্ফুট স্বরে বলল — “আপনি কি সত্যিই সন্দেহ করছেন যে আমি কোনো গোপন উদ্দেশ্যে এগুলো করছি?”

আরশান সপাটে উত্তর দিল— “Isn’t it obvious? তুমি তো আমাকে অপছন্দ করো। আর অপছন্দের মানুষের জন্য কেউ কোনো গভীর উদ্দেশ্য ছাড়া কিছু করেনা। তোমার যদি কোনো আবদার থাকে বা কোনো ফায়দা লুটতে চাও, তবে সরাসরি বলো। এসব ইমোশনাল ড্রামার কোনো প্রয়োজন নেই!”

আরশানের কথাগুলো রিমির কানে বিঁধল। ও জানত আরশান বড্ড রুক্ষ, কিন্তু ও যে এতটাই অকৃতজ্ঞ হতে পারে সেটা রিমির ভাবনার বাইরে ছিল। কষ্টের চেয়েও রিমির এখন রাগ হচ্ছে বেশি। এই লোকটার জন্য কেন ও এত ভাবতে গেল? রিমি টেবিলের ওপর দুহাত রেখে একটু ঝুঁকে এসে আরশানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল — “আমি যদি এখন বলি যে আমার এসব করার পেছনে কোনো স্বার্থ নেই, কোনো উদ্দেশ্য নেই তবে কি আপনি সেটা বিশ্বাস করবেন?”

আরশান কোনো উত্তর দিল না। ও কেবল এক দৃষ্টে রিমির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন রিমির চোখের মণির ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো সত্যকে ও পড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। রিমি একটা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে আবারও বলল…

“আপনার মনে হতে পারে যে পৃথিবীর সবকিছুই লেনদেনের মাধ্যমে চলে। কিন্তু মাঝেমধ্যে মানুষ শুধু কৃতজ্ঞতা থেকেও কিছু করে। আপনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন এটা কি কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া করা সম্ভব ছিল না? তাহলে আমার এই সামান্য আয়োজন কেন আপনার কাছে নাটক মনে হচ্ছে?”

“আমি তোমাকে নিজের সঙ্গে রাখতে চাই রিমি, তাই তোমাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য কিন্তু তোমার তো আমার থেকে পালানোর ইচ্ছা। তাহলে কেনো তুমি আমাকে হ্যাপি করার জন্যে কিছু করবে?”

রিমি বুঝলো এই লোকটার সং কথা বলে লাভ হবেনা, উনি এই সাধাওন্ড বিষয়টাকে আরো জটিল করে একটা ঝামেলাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলবেন কিন্তু রিমি আরশানের সঙ্গে আর কোনো ঝামেলা করতে চায়না তাই ও নীরবে ওখান থেকে বেরিয়ে এলো। তবে রিমির সেই অভিমানী কণ্ঠস্বর আরশানের মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করল। ও চলে যাওয়ার পর স্টাডি রুমটা যেন আগের চেয়েও বেশি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আরশান এক দৃষ্টিতে ট্রে-তে পড়ে থাকা অবশিষ্ট কাপকেকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। রিমির উদ্দেশ্য কী হতে পারে সেটা ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়েও ও আজ সফল হতে পারল না। একসময় অগোচরেই ওর হাতটা এগিয়ে গেল ট্রে-র দিকে। একটা কাপকেক মুখে দিতেই আরশান বুঝল, স্বাদটা একদম আহামরি কিছু হয়নি, কিন্তু খাওয়ার পর আরশান এক গভীর তৃপ্তি পেয়েছে। ভাবতে ভাবতেই ও সবগুলো কেক সাবাড় করে দিল। মনে মনে এক ধরণের আনন্দ কাজ করলেও বাইরে নিজের সেই ভাবলেশহীন মুখটা ও বজায় রাখল। পরদিন ভোরবেলা। আরশান জগিং শেষ করে বাড়িতে ঢুকতেই দেখল ইনায়া আর আয়ান যেন ওত পেতে বসে ছিল। ওকে দেখেই দুজনে সমস্বরে বলে উঠল — “হ্যাপি বার্থডে ভাইয়া!”

ইনায়া খুব আহ্লাদ করে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল — “ভাইয়া, এই ঘড়িটা তোমার জন্য। কালারটা এত জোস! তোমাকে না হেভি মানাবে।”

ইনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই আয়ান মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল — “তুই ঘড়ি কেন দিলি? আমিও তো ঘড়ি এনেছি!”

ইনায়া আকাশ থেকে পড়ল — “তো আমি কী করব? আমার দোষ কোথায়?”

আয়ান বেশ চটে গেল!

“দোষ কোথায় মানে? তুই গতবারও একই কাজ করেছিস। আমি ভাইয়াকে যা গিফট করি, তুইও ঠিক সেটাই দিস। তুই নির্ঘাত আমাকে কপি করছিস।”

“বয়েই গেছে আমার তোকে কপি করতে! তুই নিশ্চয়ই কোনোভাবে শুনেছিস আমি কী দেব, তাই এখন উল্টো আমাকেই দোষ দিচ্ছিস।”

দুজনের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ লেগে যাওয়ার জোগাড়। আরশানের এই সাত সকালে এসব চেঁচামেচি সহ্য করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। ও শান্তভাবে দুজনের হাত থেকেই উপহার দুটো নিয়ে নিল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল — “আমি দুটোই পরব। এবার তোরা এই ঝগড়াটা বন্ধ করবি?”

ইনায়া আবদার করে বলল — “ভাইয়া, আমারটা কিন্তু আগে পরবে!”

আয়ান সাথে সাথে মুখ গোমড়া করে ফেলল!

“ভাইয়া! তুমি সবসময় ওকে বেশি গুরুত্ব দাও। আমারটা এবার আগে পরো প্লিজ!”

সিঁড়ি দিয়ে ওপর থেকে নিচে নামার সময় দৃশ্যটা রিমির চোখে পড়ল। ও একটা হাত দিয়ে অগোছালো চুলগুলো খোঁপা করতে করতে নিচে নামছিল। দেখল, আরশান কতটা শান্তভাবে দুই ভাইবোনের এই পাগলামি সামলাচ্ছে। মানুষটা ঝামেলা একদম সহ্য করতে পারে না, অথচ নিজের ভাইবোনের বেলায় ও কী অদ্ভুত ধৈর্যশীল! দৃশ্যটা দেখে রিমি মাঝপথেই দাঁড়িয়ে পড়ল। আরশান এবার একটু কড়া গলায় বলে উঠল…

“Stop it guys! উপহার দেওয়াটা তোদের কাজ ছিল, তোরা দিয়েছিস। কিন্তু আমি ওগুলো কীভাবে ব্যবহার করব বা কোনটা আগে পরব, সেটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। অযথা এই সাত সকালে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করিস না।”

ভাইয়ের সেই ধমকমিশ্রিত কথায় দুজনেই চুপ মেরে গেল এবং সুড়সুড় করে নিজেদের ঘরে চলে গেল। রিমি এবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। আরশানের মুখোমুখি হয়ে ম্লান হেসে বলল….

“ওরা দুজনেই দেখছি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে। আপনার একটু মনোযোগ পাওয়ার জন্য ওরা কতটা মুখিয়ে থাকে, দেখলেন?”

আরশান রিমির দিকে তাকালো — “তুমি এত সকালে কেন উঠেছ?”

রিমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরশানের চোখের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ও সাবলীল গলায় উত্তর দিল….

“আপনার বউ হিসেবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে তো গত রাতেই চরমভাবে ব্যর্থ হলাম! এবার ভাবলাম এবার বাড়ির বড় বউমা হিসেবে দায়িত্বটা অন্তত ঠিকঠাক পালন করি। তাই রান্নাঘরে যাচ্ছি”

রিমির এমন খোঁচা দেওয়া কথা শুনে আরশানের কয়েক কদম এগিয়ে এসে রিমির পথ আগলে দাঁড়ালো। ওর কপালে ভাঁজ পড়লো, কণ্ঠস্বরে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন অস্থিরতা। ও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো — “Are you trying to p!ss me off?”

রিমি থমকে দাঁড়াল। তবে এবার ওর চোখে কোনো ভীতি নেই, বরং এক অদ্ভুত স্থৈর্য। ও আরশানের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল — “আপনাকে রাগিয়ে আমার কোনো লাভ নেই আরশান”

কথাটা শেষ করেই রিমি পাশ কাটিয়ে ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আরশান ওভাবেই ড্রয়িংরুমের মাঝখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ওর কুটিল মস্তিষ্ক এবার চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছে। রিমিকে ও চেনে এক জেদি, অবাধ্য মেয়ে হিসেবে যে সবসময় আরশানকে দূরে ঠেলে দিতে চায়। কিন্তু গতরাত থেকে রিমির এই অত্যধিক স্বাভাবিক আচরণ আরশানের চেনা সমীকরণগুলোকে তছনছ করে দিচ্ছে। যেকোনো বিষয় দীর্ঘদিন একভাবে দেখে অভ্যস্ত হওয়ার পর তাতে হঠাৎ পরিবর্তন এলে আরশান সেটা সহজে মেনে নিতে পারে না। রিমি ওর সাথে ঝগড়া করবে, ঘৃণা করবে এটাই ছিল আরশানের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু রিমির এই নমনীয়তা ওর কাছে এক ধরণের রহস্যময় ধাঁধা মনে হচ্ছে! যার জন্যে ওর বারবার মনে হচ্ছে এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো গভীর চাল লুকিয়ে নেই তো? ও নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল, একটা মেয়ে কি এত দ্রুত বদলে যেতে পারে? নাকি ও আরশানের নিষ্ঠুরতাকে আপন করে নেওয়ার কোনো নতুন পথ খুঁজছে? রান্নাঘর থেকে খুন্তি নাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। আরশান সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েও একবার পেছন ফিরে রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকাল। রিমির এই পরিবর্তন আরশানকে এক অদ্ভুত দোটানায় ফেলে দিয়েছে একদিকে ও এই স্বাভাবিকতাই চাচ্ছিল, অথচ অন্যদিকে এই নতুন রিমিকে ও ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না!
___________________________________

রান্নাঘর থেকে সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আরশানের পছন্দের কিছু বিশেষ পদ আজ নিজ হাতে তৈরি করেছে রিমি। সুরভী বেগম রান্নাঘরের কাউন্টারে হরেক রকমের আয়োজন দেখে তিনি অবাক হয়ে রিমিকে জিজ্ঞাসা করলেন — “আজ সকালেই এত আয়োজন?”

রিমি কড়াইয়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তে লাজুক হেসে বলল — “আজ আরশানের জন্মদিন তো, তাই ভাবলাম সকালের নাস্তাটা একটু স্পেশাল করি।”

সুরভী বেগমের মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি এগিয়ে এসে রিমির মাথায় হাত রেখে বললেন — “যাক, খুব ভালো করেছ”

পরক্ষণেই সুরভী বেগমের চোখেমুখে এক ধরণের ম্লান ছায়া নেমে এল। তিনি একটু নিচু স্বরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন…

“রিমি, আমার ছেলেটাকে আমি ছোটবেলায় একদম সময় দিতে পারিনি। আর ও বড় হওয়ার পর পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ওর এখন আর কারো সময়ের প্রয়োজন পড়ে না। ও একাই নিজেকে সামলে নিতে শিখেছে, নিজের চারপাশে একটা দেয়াল তুলে নিয়েছে। কিন্তু মা হিসেবে আজ তোমার কাছে একটা অনুরোধ করি ওকে একটু সময় দিও মা। একটু বেশি মনোযোগ দিও ওর প্রতি। আমার বিশ্বাস, তোমার একটুখানি ভালোবাসা পেলে ও হয়তো ধীরে ধীরে আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।”

শাশুড়ির কথাগুলো রিমি খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সুরভী বেগমের কণ্ঠস্বরে এক ধরণের অপরাধবোধ আর অসহায়ত্ব মিশে আছে, যা রিমিকে স্পর্শ করল। রিমি বুঝতে পারল, আরশানের এই রুক্ষ আর একাকী স্বভাবের জন্য সুরভী বেগম আজও নিজেকেই দায়ী ভাবেন। রিমি ওনার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আশ্বস্ত করে বলল — “আপনি একদম চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

সকালের নাস্তা শেষ করার পর থেকেই আরশানের তোড়জোড় শুরু হলো অফিসের জন্য। ওর কাছে জন্মদিন মানে অন্য দশটা সাধারণ দিনের মতোই একটা কর্মব্যস্ত দিন। ও যখন আলমারি খুলে টাই ঠিক করছিল, ঠিক তখনই রিমি ঘরে ঢুকে সটান ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো — “আজ আপনি অফিসে যাবেন না।”

আরশান ভ্রু কুঁচকে টাই বাঁধা থামিয়ে দিল — “কেন?”

“ধরে নিন আজকে আপনার সারাদিনের সময়টা আমি কিনে নিয়েছি। আজকের এই পুরো দিনটার জন্য আপনাকে আমি নিজের নামে বুকিং করে ফেলেছি।”

আরশান আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল — “But I don’t want to book myself, আমার অনেক কাজ আছে।”

“আপনি চাইলেই তো আর হবে না! আমি অলরেডি বুকিং কনফার্ম করে ফেলেছি।”

বলতে বলতে রিমি আরশানের আলমারি থেকে একটা ডার্ক নেভি ব্লু শার্ট বের করল। তারপর নিজের জন্য বেছে রাখা একটা নীল রঙের ড্রেস শার্টটার পাশে ধরে আয়নায় দেখল। দুজনের পোশাকের রঙে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য ফুটে উঠেছে। রিমি খুশিতে ডগমগ হয়ে আরশানকে দেখিয়ে বলল — “দেখুন তো, এই দুটো একদম পারফেক্ট ম্যাচিং হয়েছে না? আজ আমরা টুইনিং করব। আপনি চটপট এই শার্টটা পরে নিন তো!”

আরশান স্তব্ধ হয়ে রিমির পাগলামি দেখছিল। ও শার্টটা হাতে নিয়ে রিমির দিকে তাকালো কিন্তু কিছু ভাবতে পারছেনা। পরে ভাবনা বাদ দিয়ে রিমির দেওয়া শার্টটা পড়ে নিলো। আরশান আর রিমি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এল, তখন ইনায়া মাত্র ক্লাসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। ওদের দুজনকে নীল রঙের পোশাকে টুইনিং করতে দেখে ইনায়ার পা যেন থমকে গেল। এক পলক আরশানকে দেখে আর এক পলক রিমির দিকে তাকিয়ে ও দুষ্টুমি ভরা একটা হাসি দিল।

“ম্যাচিং ড্রেস? হুমম! ডেটে যাওয়া হচ্ছে নাকি?”

রিমি মাথা নেড়ে সায় দিল। ইনায়া একটা মুচকি হাসি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, যেন ও মনে মনে অনেক আগে থেকেই এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল। আরশান অবশ্য কোনো উত্তর দিল না, ওর গম্ভীর মুখটা বরাবরের মতোই ভাবলেশহীন রইল। ওরা যখন গ্যারেজের দিকে এগোচ্ছিল, আরশান পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করতে নিলেই রিমি বাধা দিয়ে বলল — “গাড়ি নয়, আজ আপনার বাইকটা বের করুন।”

আরশান আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে মেঘের ঘনঘটা দেখে নিয়ে সটান উত্তর দিল…

“It wouldn’t be wise to take the bike in this weather, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।”

রিমি নিচু স্বরে বিড়বিড়িয়ে নিজের মনেই বলে উঠল — “বৃষ্টির ঠান্ডা পানি মাথায় পড়লে যদি আপনার মাথার ভেতরের প্যাঁচগুলো খোলে, তবে তো ভালোই হয়।”

আরশান রিমির সেই বিড়বিড় করা শুনে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো। আরশানের সেই চাউনি দেখে রিমি একটুও ভয় পেল না, বরং আরশানের হাতটা দুই হাতে ধরে জোরে ঝাঁকাতে শুরু করল।

“প্লিজ আরশান, আজ বাইকই নিন না! দামী একটা বাইক কিনেছেন কি শুধু গ্যারেজে সাজিয়ে রাখার জন্য?”

রিমির এই রূপ দেখে আরশান বড্ড বিস্মিত। ও রিমির দিকে তাকিয়ে বিরক্তি আর বিস্ময়ের সংমিশ্রণে বলে উঠল….

“What’s wrong with you! এই ধরণের আচরণ তোমাকে একদম মানায় না।”

রিমি এবার আরশানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল — “তো আপনি ঠিক কী চান? আমি আপনার সঙ্গে সারাজীবন ঝগড়া করি? মানে, আমাদের জীবনে ঝগড়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই, তাই তো?”

আরশান যেন আজ তর্কে পেরে উঠছে না। ও একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বিরক্তিভরা চোখে চোখ উল্টে গ্যারেজের দিকে পা বাড়াল বাইকটা বের করতে। ও মনে মনে ভাবল, মেয়েটার সাথে আজকাল কথা বলতে গেলে ও নিজেই যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে!
______________________________________

ক্লাস শেষে করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় ইনায়ার মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা বড্ড একঘেয়ে। রিমি নেই বলে আড্ডার কোনো সুযোগ নেই, একাই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ও চত্বরে এসে দাঁড়াল। আজ সকালেই বাবা ফোন করে একজনের সাথে দেখা করতে বলেছেন। ছেলেটি ওনার কোনো এক পার্টনারের ছেলে। শাফিনের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা ইনায়া অনেক আগেই মনের কোনো গহীন কোণে কবর দিয়ে দিয়েছে। ও নিজেকে নতুনভাবে সুযোগ দিতে চায়, তাই বাবার প্রস্তাবে খুব একটা অমত করেনি। ইনায়ার কাছে ছেলেটির নম্বর ছিল। ও নিজেই একটা টেক্সট পাঠিয়ে লোকেশন জানিয়ে দিল। বিকেলের ক্লাস শেষ করে ও ছোটখাটো একটা বেকারিতে গিয়ে ঢুকল। ওখানকার পেস্ট্রিগুলো ওর খুব প্রিয়, আর আজ কেন যেন মিষ্টি কিছু খাওয়ার তীব্র তৃষ্ণা পাচ্ছিল ওর। জানালার ধারের একটা উঁচুমতো টুলে ও বসল। ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ার শব্দ ইনায়ার মনকে একটু উদাস করে দিল। ও যখন নিজের প্লেটের স্লাইসটা নিয়ে মগ্ন, তখনই দেখল বাইরে বৃষ্টির তোড় উপেক্ষা করে একটা ছেলে দ্রুত পায়ে বেকারির ভেতরে ঢুকে এল। ছেলেটির পরনে হালকা ধূসর রঙের শার্ট, বৃষ্টির ছাঁটে কাঁধের দিকটা ভিজে কালচে হয়ে গেছে। কোনো দ্বিধা না করেই সে সরাসরি ইনায়ার সামনের খালি টুলটাতে এসে বসল।ইনায়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে চিবুক মুছে নিয়ে প্রশ্ন করল — “আপনিই কি…?”

ছেলেটি এক চিলতে হাসি দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল — “মনে হচ্ছে আমার ছবি দেখেননি”

ইনায়া কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ছেলেটি পকেট থেকে একটা সাদা ধবধবে রুমাল বের করল। সে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল এবং মুখ মুছতে শুরু করল। ইনায়ার নজর হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা চশমাটার দিকে গেল। ওটা দেখে ইনায়া এতটাই অবাক হলো যে বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না — “আরে! আমার ভাইয়াও ঠিক এমন চশমা পরে। একদম একই ফ্রেম!”

ছেলেটি মুখ মোছা থামিয়ে প্রথমে একটু অবাক হয়ে ইনায়ার দিকে তাকাল। পরক্ষণেই ওর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত হাসি ফুটে উঠল। চশমাটা হাতে নিয়ে ও আবারও চোখের ওপর বসিয়ে বলল — “আপনি দেখছি আমার চেয়েও আমার চশমার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।”

ইনায়া মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেল। ওর ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় একটু লালচে হয়ে উঠল। ও আমতা আমতা করে বলল — “আই অ্যাম সরি! আসলে ওটা হুবহু ভাইয়ার ফ্রেমের মতো তো, তাই হুট করে বলে ফেলেছি।”

ছেলেটি হাত বাড়িয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দিল — “ইটস ওকে! আপনার যে বিষয়ে আলাপ করতে ভালো লাগে, আমরা সেটা নিয়েই কথা বলব। আলাপ-পরিচয় তো কেবল শুরু, ওটা হতেই থাকবে।”

ছেলেটি একবার কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে দেখল কী কী খাবার আছে। তারপর কিছু আইটেম অর্ডার করল। ইনায়া চুপচাপ বসে ছেলেটিকে পর্যবেক্ষণ করছিল। সত্যি বলতে, এই মুহূর্তে বিয়ে নিয়ে কোনো বড় পরিকল্পনা ওর ছিল না। কিন্তু ছেলেটিকে দেখে ওর মনে কেনো যেনো একটু আশা জাগলো, যদি মনের মিল হয় তাহলে বিয়েতে আপত্তি নেই!

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1ENNLCourf/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here