মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_৩৮

0
25

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩৮

খাওয়া-দাওয়া শেষে ডক্টর জুবায়ের যখন বিদায় নেবেন, ঠিক তখন আরশানের ফোনে একটা জরুরি অফিসিয়াল কল এল। আরশান ওনাকে এগিয়ে দিতে চাইলেও জুবায়ের সাহেব ইশারায় ওকে কথা বলতে বলে হাসিমুখে রিমির দিকে তাকালেন। রিমি পরম মমতায় ওনাকে সদর দরজার বাইরে এগিয়ে দিতে এল। রিমি একটু ইতস্তত করে ডক্টর জুবায়েরকে জিজ্ঞেস করল…

“ওর সঙ্গে কথা বলে কী বুঝলেন? এখন কি ওর অবস্থার আগের থেকে আরেকটু উন্নতি হচ্ছে?”

জুবায়ের সাহেব তৃপ্তির হাসি হাসলেন। রিমির চোখের সেই আকুতি ওনাকে মুগ্ধ করল। তিনি বললেন…

“হ্যাঁ, অনেকটা। আরশান এখন নিজের আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে। এভাবেই যদি ও শান্ত থাকে, তবে বছরে দুই একবার কাউন্সিলিংয়ে গেলেই চলবে। তবে হ্যাঁ, সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া অবধি চিকিৎসা একদম বন্ধ করা যাবে না।”

একটু থেমে জুবায়ের সাহেব রিমির মাথায় হাত রাখলেন। ওনার কণ্ঠস্বরটা এবার বেশ গম্ভীর শোনাল!

“আরশান এমন স্বভাবের ছেলে যে ও হয়তো কখনও তোমার সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি বলবে না ও তোমাকে কতটা ভালোবাসে। কিন্তু সত্যি বলতে, ও তোমার জন্য অনেক আগে থেকেই মরিয়া ছিল। তুমি এই বাড়িতে আসার পর থেকেই ও তোমার প্রতি এক তীব্র টান অনুভব করতে শুরু করেছিল। সেশনের সময় ও নিজেই আমার কাছে সেই অনুভূতির কথা স্বীকার করেছিল।”

রিমির চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। ও অস্ফুট স্বরে বলল — “আরশান… ও নিজে আপনার কাছে আমার কথা বলেছিল?”

ডক্টর জুবায়ের মৃদু হেসে বললেন — “ও তোমার নাম তখন সরাসরি বলেনি ঠিকই, কিন্তু ও যখন জেদ করে তোমাকে বিয়ে করল, তখন আমার আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে ও কার কথা বলছিল। ওকে শুধু একটু সময় দিও মা, আর ধৈর্য হারিও না। He really loves you a lot”

জুবায়ের সাহেব কথাগুলো বলেই গাড়িতে উঠে চলে গেলেন, কিন্তু রিমি তখনও ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। কখন যে ওর চোখের কোণে নোনা জল জমেছে, ও নিজেও টের পায়নি। ও এতদিন ভাবত আরশানকে ও পাত্তা দিত না বলেই হয়তো শুরুর দিকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ওর সঙ্গে অমন আচরণ করতো। আর পাঁচটা বড়লোকের ছেলেদের মত আরশানের মনে হয়তো ওকে পাওয়ার বাসনা জেগেছিল তাই জোর করে বিয়েও করেছে। ওকে কষ্ট দিয়ে, ওর স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে আরশান হয়তো পৈশাচিক শান্তি পেত এটাই ছিল রিমির ধারণা। কিন্তু আজ রিমির পুরোনো হিসেব নিকেশ ওলটপালট হয়ে গেল, অবশ্য আরশানের প্রতি ওর ধারণা আরো কিছুদিন আগেই বদলাতে শুরু করেছিল কিন্তু আজ তা আরো বদলে গেলো। আরশান প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নয়, বরং একদম শুরু থেকেই ওকে পছন্দ করত? যে মানুষটা কোনো কিছুতেই এখন ভয় পায়না সেই এখন রিমি হয়তো সুযোগ পেলে পালাবে এমন ভাবনায় বুদ হয়ে এক অদ্ভুত অসহায়ত্বে ভুগেছে? শাফিনকে অব্দি ভার্সিটি থেকে ট্রান্সফার করিয়ে ছেড়েছে আরশান, সবকিছু করেছে শুধু ওর জন্যে। এসব ভাবতে ভাবতেই লম্বা এক নিঃশ্বাস নিলো, ও বুঝতে পারল, আরশানের রুক্ষ খোলসের নিচে আসলে একটা অন্য রূপ লুকিয়ে আছে, যে কেবল ভালোবাসার কাঙাল কিন্তু জানে না সেটা প্রকাশ করতে হয় কীভাবে! বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেলেও রিমি ভেতরে আসছে না দেখে আরশান নিজেই বেরিয়ে এল। রিমিকে ওভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও এগিয়ে এসে একদম পেছনে দাঁড়ালো। আরশানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর নৈঃশব্দ্য ভেঙে দিল — “এখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন এখনও?”

রিমির ধ্যান ভাঙল। ও চমকে পেছনে ফিরল। আরশানের চোখেমুখে সেই চিরচেনা কর্তৃত্ব আর কঠোরতার ছাপ, কিন্তু রিমির কাছে আজ সেই চাউনিটা অন্যরকম মনে হলো। ও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে বলল….

“এমনিই দাঁড়িয়ে আছি। আজকের আকাশটা দেখুন না আরশান, কী দারুণ লাগছে!”

আরশান একবার আকাশের দিকে দায়সারাভাবে তাকালো। বৃষ্টির পর মেঘমুক্ত আকাশে চাঁদটা যেন আজ একটু বেশিই উজ্জ্বল, কিন্তু আরশানের পাথুরে মনে তার কোনো প্রভাব পড়ল না। ও বরাবরের মতো ভাবলেশহীন স্বরে উত্তর দিল…

“বৃষ্টি না থাকলে আকাশ রোজ যেমন থাকে, তেমনই আছে। এতে নতুনত্বের কিছু নেই। বোরিংI I don’t understand why you try to find beauty in everything”

রিমি এবার আরশানের চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। আজ ওর চোখে ভয় নেই, বরং আছে এক গভীর কৌতূহল আর অবুঝ এক মায়া। ও একটু চিবুক উঁচিয়ে খুব শান্ত গলায় প্রশ্ন করল…

“আচ্ছা, আমি তো আপনার সামনেই থাকি। আমাকেও তো আপনি রোজ দেখেন। তার মানে কি আমাকে দেখেও আপনি বোর হন? আমার মধ্যেও কি এখন কোনো সৌন্দর্য খুঁজে পান না?”

রিমির এমন সরাসরি আর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে আরশান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রিমির চোখের চাউনি আর ঠোঁটের সেই প্রশ্নবোধক হাসি আরশানের ভেতরের সেই দাপুটে সত্তাটাকে কেমন যেন নড়বড়ে করে দিল। ও কোনো উত্তর দিল না, কেবল রিমির মুখচ্ছবিটা গভীর নিবিষ্টতায় দেখল। এই মেয়েটাকে ও হাজারবার দেখেছে, কিন্তু তবুও কেন যেন প্রতিবারই নতুন কোনো একটা টান ওকে ওর দিকে টেনে আনে। আরশান ভ্রু কুচকে রিমির থুতনি ধরে প্রশ্ন করলো…

“তুমি কি আমায় দেখে বোর হয়ে গেছো?”

“প্রশ্ন আমি আগে করেছি, উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করছেন?”

আরশান চোখ গরম করে বললো — “answer me first”

আরশান ছোটো ছোটো কথাকেই বড় ইস্যু বানিয়ে ফেলে আর রেগে যায় আর ওর এই রাগ কিভাবে কন্ট্রোল করতে হয় সেটা রিমি মোটামুটি আয়ত্ত করে ফেলেছে।
____________________________________

সময়ের চাকা যে কতটা দ্রুত ঘোরে, তা আজ ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি করল রিমি। যে মানুষটার সাথে এক ছাদের নিচে থাকা তো দূর, নাম শুনলেও রিমির গায়ে জ্বালা ধরত, সেই আরশানের সঙ্গেই আট-আটটা মাস কীভাবে কেটে গেল, ও টেরই পায়নি। ঘৃণা আর জেদের দেয়ালগুলো কখন ধসে গিয়ে সেখানে মায়া আর নির্ভরতার চারা গজিয়েছে, তা আজ রিমির প্রতি মুহূর্তের অস্থিরতা বলে দিচ্ছে। এই তো মাত্র দশদিন হলো আরশান কোনো এক জরুরি প্রজেক্টে শহরের বাইরে গেছে। দুই সপ্তাহের ট্যুর, আরও তিনটে দিন এখনও বাকি ফিরতে। আরশান প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা অন্তর ফোন করে রিমির খবর নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ফোনের ওপাশের ওই কণ্ঠস্বর রিমির মনের তৃষ্ণা মেটাতে পারছে না। ও মিস করছে আরশানের সেই গম্ভীর চাহনি, অসময়ে করা সেই শাসন আর ভাবলেশহীন মুখে বলে যাওয়া গভীর কথাগুলো। সামনে পরীক্ষা না থাকলে হয়তো রিমি সব ফেলে আরশানের সাথেই চলে যেত। সন্ধ্যাবেলাটা আজ বাড়ির সবার সাথেই কেটেছে। সুরভী বেগম, ইনায়া আর আয়ানের সাথে বসে জমিয়ে আড্ডা দিয়েছে রিমি। রাতে খাওয়ার পর ও ইনায়ার ঘরে গিয়েছিল। ইনায়া আর তানভীরের সম্পর্কটা এখন বেশ একটা পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। ইনায়ার সেই এনগেজমেন্ট পেছানোর সিদ্ধান্তে তানভীরের পরিবার প্রথমে একটু নাখোশ হলেও, তানভীর নিজেই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে আগে একে অপরকে বোঝা জরুরি, বিয়ে তো সারা জীবনের ব্যাপার। তানভীরের এই স্বচ্ছ ধারণা ইনায়ার মনে ওর প্রতি সম্মান আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইনায়ার সাথে কিছুক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে আলাপ করে রিমি নিজের ঘরে ফিরে এল। কাল সকালেই পরীক্ষা, তাই শরীরটাকে বিশ্রাম দেওয়া জরুরি। আরশানের ফোনের সময় হয়ে এসেছে। দশটা বাজতেই ফোনটা বেজে উঠল। আধ ঘন্টা মতো কথা হলো।পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই রিমি এক অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব করল। সাধারণত পরীক্ষার দিন ও নিজেকে খুব শান্ত রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু আজ মেজাজটা বড্ড খিটখিটে হয়ে আছে। বিছানায় বসে নিজের এই মেজাজের কারণ খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ একটা পুরোনো চিন্তা ওর মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। ও ঝট করে বিছানা ছেড়ে উঠে আলমারির এক কোণ থেকে ছোট্ট একটা প্যাকেট বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। পাঁচ মিনিট পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিমি অপলক তাকিয়ে আছে ছোট্ট কিটটার দিকে। এই নিয়ে চার-চারবার! ফলাফল সেই একই! শূন্য। রিমি একরাশ হতাশা নিয়ে বেসিনের ধারে বসে পড়ল। ওর এই ব্যাকুলতার পেছনে একটা বড় কারণ আছে। এতদিন পেরিয়ে গেলেও আরশানের সেই separation anxiety বা রিমিকে হারিয়ে ফেলার ভয়টা কমেনি। ডক্টর জুবায়েরের সাথে রিমি কথা বলে বুঝেছে, আরশানের মনে যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, তার জন্য একটা স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। রিমি ভেবেছিল, যদি তাদের জীবনে একটা সন্তান আসে, তবে আরশানের ওই ভয়টা হয়তো কেটে যাবে। রিমিকে নিয়ে ওর ওই অকারণ স্ট্রেস কমে আসবে। কিন্তু সমস্যা একটাই আর সে আরশান নিজেই! মাসখানেক আগে এক বিজনেস পার্টিতে যখন বাচ্চা নিয়ে কথা উঠেছিল, আরশান খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে ও এখনই কোনো সন্তান চায় না। আরশান এসব বিষয়ে ভীষণ সচেতন, ও চায় রিমির পুরো সময়টা শুধু ওর জন্য থাকুক। আর ও সেখানে স্পষ্ট জানিয়েছে যে এখন সন্তান চায়না! রিমির এখন হতাশ লাগছে, জানেনা যে কবে ওর মনের ইচ্ছা পূরণ হবে!
____________________________________

কোনো এক ছুটির দুপুরের অলস সময়ে আরশান বিছানায় বসে একটা বিজনেস ম্যাগাজিনে চোখ বোলাচ্ছিল। বাড়ির পরিবেশটা বেশ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রিমি প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকল, ওর চোখেমুখে এক ধরণের শিশুসুলভ উত্তেজনা। ও একদম আরশানের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে আবদার করল…

“আরশান! শুনুন না, আমাদের ভার্সিটির ঠিক পাশের মাঠটায় বিশাল একটা মেলা বসেছে। আমরা কি আজ বিকেলে সেখানে যেতে পারি?”

আরশান ম্যাগাজিন থেকে চোখ না সরিয়েই কপাল কুঁচকাল। মেলা! যেখানে ধুলোবালি, অসহ্য শোরগোল আর মানুষের গাদাগাদি এমন জায়গার কথা ভাবলেও আরশানের (OCD) মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ও খুব গম্ভীর গলায় উত্তর দিল….

“রিমি, এইসব বাচ্চাদের মতো বায়না কেন করো? মেলায় গিয়ে ধুলো আর ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করার কোনো মানে হয় না। অন্য কোথাও যেতে চাইলে বলো, ডিনার বা লং ড্রাইভে নিয়ে যাচ্ছি।”

রিমি এবার দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। ও আরশানের সোফার হাতলে বসে ওর একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে ঝাঁকাতে শুরু করল।

“ওসব তো যেকোনো সময় করা যায়। কিন্তু মেলা তো সবসময় বসেনা। ওখানে যাওয়ার আনন্দটাই আলাদা। আমার খুব নাগরদোলনায় চড়তে ইচ্ছে করছে। কত বছর হয়ে গেল কোনো মেলায় যাই না! প্লিজ, প্লিজ না করবেন না!”

আরশান পাত্তা না দেওয়ার ভান করে ম্যাগাজিনটা উল্টালো। কিন্তু রিমির এই বিরামহীন হাত ঝাঁকানো আর বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে “প্লিজ” বলাটা ওর মনোযোগের দেয়াল ভেঙে দিল। আরশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্যাগাজিনটা টেবিলের ওপর রাখল। রিমির এই চনমনে রূপটা ও আজকাল খুব উপভোগ করে, যদিও মুখে সেটা স্বীকার করে না।আরশান রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল — “ঠিক আছে, এক শর্তে নিয়ে যেতে পারি,”

রিমির চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল — “কী শর্ত?”

“আমাকে কোনো রাইডে বা নাগরদোলনায় ওঠার জন্য জোর করতে পারবে না। রাজি?”

রিমি মুহূর্তেই খুশিতে ডগমগ হয়ে সায় দিল।

“একশবার রাজি! আপনি শুধু সাথে থাকলেই হবে।”

বিকেলে মেলাপ্রাঙ্গণে পৌঁছাতেই রিমির উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠে গেল। হরেক রকমের আলোকসজ্জা, মাইকে বাজতে থাকা গান আর খাবারের গন্ধে মেলার মাঠ ম ম করছে। প্রচুর ভিড়, আরশানের জন্য যা আগে ছিল বিভীষিকার মতো। কিন্তু রিমির সাথে গত কয়েক মাসে জনবহুল জায়গায় যাতায়াত করতে করতে আরশানের সেই তীব্র বিরক্তি এখন অনেকটাই সয়ে গেছে। ও এখন মানুষের ধাক্কা সামলানোর চেয়ে বেশি মনোযোগ দেয় রিমির নিরাপত্তার দিকে। ভিড়ের মধ্যে কেউ যেন রিমিকে স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য আরশান এক হাত দিয়ে রিমির কোমর আগলে রেখে ওকে নিজের দিকে টেনে রাখল। রিমির সেদিকে খেয়াল নেই, ও রঙিন চুড়ি, মাটির গয়না আর খাবারের স্টলগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।আরশান বিরক্তি মাখা মুখে একবার চারপাশটা দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বলল — “মানুষ যে কেন টাকা খরচ করতে এই ধুলোবালির মধ্যে আসে!”

রিমি আরশানের কথায় শুধু একবার ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো, এরপর ও গিয়ে নাগরদোলার টিকিট নিলো। আরশান বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো, ওর নজরে তখন শুধু মেলাপ্রাঙ্গণের রঙিন আলোর ছটায় রিমির হাসিমাখা মুখটা পড়ছে। এই মেয়েটার হাসির জন্যই ও মাঝে মাঝে ‘বোরিং’ বিষয়গুলো সহ্য করে নেয়। নাগরদোলনা আর রোলার কোস্টারে কয়েক দফা চক্কর দিয়ে যখন রিমি নিচে নামল, তখন ওর চেহারায় রাজ্যের ক্লান্তি আর তৃপ্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। মেলাপ্রাঙ্গণের ভ্যাপসা গরমে ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। আরশান এতক্ষণ নিচে দাঁড়িয়ে বিরক্তিতে ঘড়ি দেখছিল। রিমিকে কাছে আসতেই ও পকেট থেকে টিস্যু বের করল। খুব যত্নে রিমির কপাল আর ঘাড়ের ঘাম মুছে দিতে দিতে আরশান ইংরেজিতে ঝঝকিয়ে উঠল— “What exactly is the peace you find in these rides, নিজের অবস্থা দেখেছ?”

রিমি তখন এক হাতে একটা গরম গরম তেলে ভাজা ফুল পিঠা ধরে ছিল। ওটা থেকে একটা কামড় দিয়ে চিবুতে চিবুতে ও হাসল।

“আপনি বুঝবেন না আরশান। ছোটবেলায় যখন দাদুর সাথে মেলায় আসতাম, তখন কত করে বলতাম এই রাইডগুলোতে চড়ব। কিন্তু দাদু সবসময় বারণ করতেন, বলতেন পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবি। তারও আগে যখন আরও ছোট ছিলাম, মা ভয় দেখাতেন। বলতেন ছোট মানুষ, উপরে উঠলে মাথা ঘুরবে, ভয় পাবি। কিন্তু এখন তো আমি বড় হয়েছি, এখন তো আমার নিজের ইচ্ছামতো ওড়ার অধিকার আছে, তাই না?”

রিমির কথাগুলো শুনে আরশান কিছু বলতে পারল না। ওর যুক্তি যেন এই মেয়েটার সহজ সরল আবেগের কাছে বারবার হার মেনে যায়। মেলাপ্রাঙ্গণের হট্টগোলের মাঝে রিমির এই ছোটবেলার অপূর্ণ ইচ্ছার কথা শুনে আরশানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটার এমন অদ্ভুত আর ছোট ছোট সব ইচ্ছা, যা পূরণ করতে ও আজ পুরো পৃথিবী এক করতে পারে। রিমি ওর আধখাওয়া পিঠাটা আরশানের ঠোঁটের কাছে বাড়িয়ে ধরল।

“একটু খেয়ে দেখুন না! অনেক মজা, একদম গরম গরম।”

আরশান তৎক্ষণাৎ মুখ সরিয়ে নিল — “No! It’s too sweet”

“আরে, একবার খেলে কিছু হবে না। আজকের দিনটা না হয় আপনার ডায়েট চার্টটা ভুলে যান। প্লিজ, একটা কামড় দিন!” রিমি বেশ জোরাজুরি শুরু করল।

আরশান যখন রিমির জেদ সামলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই হুট করে রিমির হাসিখুশি মুখটা ম্লান হয়ে গেল। পিঠা ধরা হাতটা ওর অজান্তেই নিচে নেমে এল। এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় ওর চোখমুখ কুঁচকে গেল। রিমি এক হাত শক্ত করে নিজের তলপেটের ওপর রাখল, আরশান মুহূর্তেই রিমির কাঁধ ধরে ফেলল। ওর গলার স্বর বদলে গেল আতঙ্কে — “কী হয়েছে রিমি?”

রিমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। যন্ত্রণায় ওর মুখটা কুকড়ে উঠেছে। ও পেটে হাত চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে গোঙানির মতো করে বলল — “খুব ব্যথা করছে!”

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1PHQUAvUid/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here