মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #শেষ_পর্ব (বর্ধিতাংশ)

0
26

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#শেষ_পর্ব (বর্ধিতাংশ)

লেবার রুমের বাইরের দাঁড়ানো সকলে যেন এক অনন্ত অপেক্ষার প্রহর গুনছে। ভেতরে রিমির যন্ত্রণার একেকটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে, আর বাইরে প্রতিটা শব্দ আরশানের বুকে তীরের মতো বিঁধছে। যে কোনোদিন কোনকিছুতেই ভয় পেত না, সে আজ খুব ভয় পাচ্ছে। নরমাল ডেলিভারি পেইন সম্পর্কে জানার পর আরশান সিজারের কথা বলেছিলো যাতে রিমির কষ্ট কম হয় রিমি শুরু থেকেই চেয়েছিল ও নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করবে। ওর শারীরিক দুর্বলতা থাকলেও মনের জোর ছিল প্রবল। কিন্তু এখন সেই যন্ত্রণার তীব্রতা যখন চরমে, আরশান আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছিল না। আরশান আর না পেরে বললো — “এখানে দাঁড়িয়ে থাকা আমার পক্ষে আমার সম্ভব না! আমি ওর কাছে যাবো”

সুরভী বেগম তখন বললেন — “তুই এখানেই একটু শান্ত হয়ে দাঁড়া, তুই ওখানে গিয়ে কি করবি?”

“আম্মু, ওর কোনো কষ্ট হচ্ছে সেটা শুনতে পাচ্ছো না? ওর এই কষ্টের জন্যে আমিও দায়ী, আমি এখানে আরামে কিভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো?”

আরশান কখনো মায়ের সঙ্গে কড়া গলায় কথা না বললেও আজ রেগেই কথাগুলো বলল, আরাফাত সাহেবও ওখানে চিকেন, উনি তো ছেলের স্বভাব জানেন! উনি বললেন যেতে, কিন্তু এই হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ডাক্তার আরশানকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিতে চাননি। সিনিয়র সার্জন আরশানকে বাধা দিয়ে বললেন…

“মি. আরশান, পেশেন্টের এখন খুব ক্রুশিয়াল টাইম চলছে। আপনি ভেতরে থাকলে হয়তো প্যানিক করবেন, এতে আমাদের কাজে সমস্যা হতে পারে। প্লিজ, আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন”

আরশানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে ডক্টরের দিকে এক পা এগিয়ে এসে খুব নিচু গলায় বলল…

“এই মুহূর্তে ওর পাশে থাকাটা আমার জন্যে জরুরি আর আমি কোনো প্যানিক করব না, শুধু ওর হাতটা ধরে থাকতে চাই।”

আরশানের কথা শুনে উনি আর দ্বিমত করতে পারলেন না। তিনি ইশারায় আরশানকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন। মাস্ক পরে ভেতরে ঢুকতেই আরশানের বুকটা কেঁপে উঠল। উজ্জ্বল আলোর নিচে রিমি ঘামে ভেজা অবস্থায় শুয়ে আছে। ওর মুখটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে, চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। আরশান দ্রুত গিয়ে রিমির মাথার কাছে বসল এবং ওর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। রিমি ব্যথার ঝোঁকে চোখ বন্ধ করে ছিল। আরশানের পরিচিত স্পর্শ পেতেই ও জোর করে চোখের পাতা মেলল। ওর চোখ যেন আরশানকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো। ও খুব অস্ফুট স্বরে বলল…

“আরশান… আমি… আমি আর পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে…”

আরশান রিমির কপালে জমে থাকা ঘাম নিজের হাত দিয়ে মুছে দিল। ওর গলা ধরে এলেও ও নিজেকে শান্ত রাখল। রিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে ও ফিসফিস করে বলল…

“তুমি পারছ তো, তুমি খুব ভালো করছ। জাস্ট আর একটু চেষ্টা করো। আমার হাতটা শক্ত করে ধরো।”

ডক্টর বারবার রিমিকে বলে দিচ্ছিলেন কখন পুশ করতে হবে, কখন থামতে হবে।

“রিমি, লম্বা শ্বাস নাও। পুশ করো…Yes, just like that!”

রিমি আরশানের হাতটা এতটাই জোরে খামচে ধরল যে আরশানের আঙুলের নখ বসে গেল, কিন্তু আরশান টেরও পেল না। তখন রিমির ওই যন্ত্রণা ভরা মুখটি ব্যতীত ওর নজরে যেনো আর কিছু পড়ছিল না। ওর একেকটা আর্তনাদে আরশান চোখ বন্ধ করে মনে মনে প্রার্থনা করছিল যেন সব যন্ত্রণা ওর ওপর চলে আসে, রিমি যেন একটু আরাম পায়! টানা কয়েক মিনিটের সেই শরীর আর মনের মরণপণ যুদ্ধের পর এক নবজাতকের তীক্ষ্ণ কান্নার শব্দ ভেসে এলো। আরশানের হাতের ওপর রিমির নখের আঁচড়গুলো তখনো রক্তবর্ণ ধারণ করে আছে, কিন্তু রিমির অবশ হয়ে আসা শরীরটা ওই কান্না শুনে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে শিউরে উঠল। ডাক্তার বললেন — “congratulations, it’s a boy!”

নার্স দ্রুত হাতে নবজাতককে পরিষ্কার করে একটি ধূসর নীল মখমলের তোয়ালেতে জড়িয়ে ধরলেন। নার্স যখন সেই ছোট্ট, লালচে গোলগাল শরীরটাকে রিমির বুকের ওপর আলতো করে রাখল, রিমির দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। এই সেই মায়াবী পরশ, যার প্রতিটি স্পন্দন রিমি নিজের পাঁজরের নিচে গত কয়েকমাস ধরে লালন করেছে। ছোট্ট হাতের আঙুলগুলো যখন রিমির বুকের ওপর নড়াচড়া করছিল, রিমির মনে হলো সব যন্ত্রণা, সব কষ্ট এই একটি মুহূর্তের কাছে বড় তুচ্ছ। আরশান তখনো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। ওর চোখ দুটো স্থির হয়ে সেই ছোট্ট মানুষটার দিকে নিবদ্ধ। ওর কপালে রগগুলো এখনো উত্তেজনায় ফুলে আছে। ও রিমির দিকে এক পা এগিয়ে গেল, কিন্তু ওর দৃষ্টি বাচ্চার ওপর থেকে সরছে না। ও খুব সন্তর্পণে ওর তপ্ত হাতের একটা আঙুল ওই বাচ্চার তালুর কাছে নিল। সাথে সাথেই ছোট্ট মুঠোয় ওই আঙুলটা আটকে যেতেই আরশানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে হুট করেই রিমির দিকে ঝুঁকে পড়ল। ওর মনে তখন এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি আর এক ধরণের ইনসিকিউরিটি কাজ করতে শুরু করলো! ও একদম রিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে, ওর সেই গম্ভীর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল…

“I thought I was going to be the only man in your life!”

রিমির শরীরে এখনও যন্ত্রণা হচ্ছে, গলার স্বর বসে গেছে। কিন্তু আরশানের মতো একজন লজিক্যাল আর ডমিনেটিং মানুষের মুখে এমন চূড়ান্ত পর্যায়ের ছেলেমানুষীর ন্যায় কথা শুনে রিমি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের জল মোছার শক্তিটুকুও ওর নেই, কিন্তু সেই অবস্থাতেই ও শব্দ করে হেসে উঠল। রিমি ধরা গলায় হাসতে হাসতে অস্ফুট স্বরে বলল — “আপনার এই পজেসিভনেস কি কোনোদিন থামবে না আরশান? ও আপনার ছেলে আর আপনি কিনা ওকে নিজেই হিংসা করছেন?”

আরশান রিমির চোখের কোনে জমে থাকা পানিটুকু নিজের আঙুলে মুছে নিল, তারপর ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। এরপর রিমির কানের লতি ছুঁয়ে আবারও খুব নিচু গলায় বলল — “Don’t get too attached to him. You are mine, first and always”

রিমির ওই মুহূর্তে খুব হাসতে ইচ্ছা করছিলো, কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই! হাসির শক্তিটুকুও নেই। তবে ও এইটুকু বুঝে গেছে যে আরশান হয়তো আজীবন এমনই থেকে যাবে। লোকটার ভালোবাসা অদ্ভুতরকমের সুন্দর!
_____________________________________

নয় বছর পর….ড্রয়িং রুমের সোফায় আয়ান মুখ গোমড়া করে বসে আছে। ওর একপাশে ইনায়া, অন্যপাশে রিমি। আয়ানের প্রাক্তন প্রেমিকা বাবার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করেছে কিছুদিন আগে, মেয়েটার সঙ্গে আট মাস সম্পর্ক ছিল আয়ানের। তার বিয়ের পর থেকেই ছেলেটা হতাশায় ভুগছে। কিছুতেই যেনো ভুলতে পারছেনা। ইনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়ানের দিকে তাকাল। ওর পিঠে হাত রেখে বেশ শাসন করেই বলল —”আয়ান, কি করছিস তুই? যে মেয়ে তোকে ফেলে নিজের বাবার পছন্দকে প্রাধান্য দিয়েছিল, তার কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিস? ও তোকে সত্যিই ভালোবাসলে কি আর এভাবে তোকে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারত?”

রিমি ওর পাশে বসে আয়ানকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। ও নরম গলায় বলল — “আয়ান, তুমি মন খারাপ করো না তো। ওই মেয়ের কথা চিরতরে ভুলে যাও। যে মানুষটা একবার তোমাকে অসম্মান করে চলে গেছে, তার কথা ভাবার মানেই হয় না। তুমি অনেক ম্যাচিউর এখন, এতো দুর্বলতা তোমাকে মানায় না।”

আয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক এই সময় বাইরে হাঁটতে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন আরাফাত সাহেব। চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে ছোট ছেলের এই ছন্নছাড়া দশা দেখে উনি বেশ বিরক্ত। উনি সিড়ি বেয়ে নেমে এসে দাঁড়ালেন এবং গলার স্বর কিছুটা চড়িয়ে বলে উঠলেন — “তুমি কি এভাবেই কাজকর্ম ফেলে এভাবেই শোক পালন করে যাওয়ার প্ল্যান করেছ আয়ান? কয়দিন ধরে তোমাকে বলছি অফিসে গিয়ে নতুন প্রজেক্টের ফাইলগুলো দেখতে। আরশানের সঙ্গে গিয়ে কাজগুলো দেখলেও তো অনেক কিছু শিখতে পারতে!”

আয়ান অসহায় চোখে বাবার দিকে তাকাল। ও জানে, অফিসে যাওয়া মানেই বড় ভাইয়ের শাসনের মুখোমুখি হওয়া। কাজের বিষয়ে অমনোযোগী হলে আরশান মোটেই ছাড় দেয় না আর এই মুহূর্তে এতো শাসন সহ্য করার মতো মানসিক অবস্থা বেচারার নেই। আয়ান করুণ স্বরে বলল — “আব্বু, ভাইয়া শুধু বকে! এক মিনিট দেরি হলে কিংবা ফাইলে একটু ভুল হলেও ভাইয়া এমনভাবে তাকায় যে….”

“বাচ্চাদের মত কথা বলার বয়স তোমার এখন নেই আয়ান, এইসব বাদ দিয়ে কাল থেকে কাজে যাবে আর যদি ওই মেয়ের শোক কাটানো তোমার জন্যে খুব কষ্টের কাজ হয়ে যায় তাহলে বলো, ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি”

“ঠিক আছে, মেয়ে খোঁজো। আমার বিয়ে করতে আপত্তি নেই”

আয়ানের কথা শুনে উপস্থিত সকলে চমকে উঠলো! কথাটা বলেই আয়ান নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিলো। আরাফাত সাহেবকে তখন ইনায়া বললো — “ও নিজের মুখে বলেছে আব্বু, তুমি আর দেরি করো না। দ্রুত একটা মেয়ে দেখো ওর জন্যে নাহলে ডিপ্রেশনে শেষ হয়ে যাবে ও!”

আরাফাত সাহেব ওখানে আর কিছু বললেন না, তবে ছেলে যখন রাজি হয়েছে তখন মেয়ে খুঁজতে শুরু করে দেবেন বলে মনে মনে ঠিক করে নিলেন!
___________________________________

আরশান রিমির নামে যে জায়গা কিনে দিয়েছিল ওখানে একটা অনাথ আশ্রম তৈরি করেছে রিমি, যেখানে বাচ্চারা থাকে ও লেখাপড়া করে। রিমি মাঝে মাঝে নিজেই ওখানে পরিদর্শনে যায়। গতকালও গেছিলো। বাচ্চাদের সঙ্গে সময়ও কাটায়। তো সেখান থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে আজ বিকেল হয়ে গেছিলো। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে যেই একটু শুয়েছে তখন ঘড়ির দিকে তাকাতেই ঘড়ির কাঁটা জানান দিলো যে ছেলের সুইমিং ক্লাসের ছুটির সময় হয়ে গেছে। প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী, বিকেলের দিকে আরাফাত সাহেব নাতিকে ক্লাসে দিয়ে আসেন, আর ক্লাস শেষ হলে রিমি গিয়ে ওকে নিয়ে আসে। আরশানের পানির ফোবিয়া আছে, তাই ও ছেলেকে এখনই সাঁতার শেখাচ্ছে। আরশান চায় ওর ছেলে সেই সব পারুক যাতে ওর ভয় আছে বা যা ও করতে পারেনি। রিমিও এতে আপত্তি জানায়নি। ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়াতেই কানে এলো সিড়িতে ছোট ছোট পায়ের শব্দ আর সেই সাথে অতি পরিচিত এক চঞ্চল কণ্ঠস্বর। রিমি একটু অবাক হয়েই করিডোরে বেরোলো। ওদের একমাত্র ছেলে আরিশ হন্তদন্ত হয়ে ওপরে উঠছে, ঠিক ওর পেছনেই আরশান আসছে। আরশানের এক হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ, আর অন্য হাতে আরিশের সেই নীল রঙের ছোট ব্যাগটা যেখানে ওর পানির বোতল আর তোয়ালে থাকে। আরিশ ওর মাকে দেখেই দুই হাত বাড়িয়ে দৌড়ে আসতে চাইল। “আম্মু!” বলে চিৎকার দিয়ে ও যেই না রিমির কাছে যেতে যাবে, ওমনি আরশান ক্ষিপ্র গতিতে আরিশের জ্যাকেটের কলার আর হাত আলতো করে টেনে ধরে গম্ভীর হওয়ার ভান করে ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল, “জুনিয়র! আমাদের মধ্যে কী ডিল হয়েছিল? মনে আছে?”

ছোট্ট আরিশ হঠাৎ থমকে গেল। ছোট কপালে কয়েকটা চিন্তার ভাঁজ ফেলে ও যেন কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করল। তারপর মাথা চুলকে বলল — “আমরা যখন একসঙ্গে থাকব, তখন তুমি আম্মুকে আগে হাগ করবে, তারপর আমি!”

ছেলের মুখে এমন অদ্ভুত চুক্তির কথা শুনে আরশান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে রিমির দিকে তাকালো। রিমির তখন থমকে যাওয়ার দশা। ও অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল — “ছেলের সঙ্গে এ আবার কেমন চুক্তি?”

রিমি অবশ্য এখন আর এই মানুষটার কাণ্ডকারখানায় অবাক হয় না। প্রায় এক দশকের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও আরশানের সেই পজেসিভনেস এক বিন্দুও কমেনি বরং তা এখন আরিশের সাথে এক ধরণের মিষ্টি প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। আরশান সবসময়ই তো ভাবনার বাইরের কিছু একটা করে বসে থাকে। তো আরশান ঘরে ঢুকে আগে নিজে রিমিকে জড়িয়ে ধরতেই রিমি বললো — “ছেলের সঙ্গে এমন না করলেই কি নয়?”

“You’re mine first! তাহলে কেনো ও আগে থাকবে?”

এ কথা শুনে রিমি হেসে ফেললো, বাবা তো মাকে ছাড়ার নামই নিচ্ছে না দেখে পাশ থেকে আরিশ বললো — “বাবা, এখন আমার টার্ন তো!”

ছেলের কথা শুনে আরশান ভ্রু রিমিকে ছেড়ে কুঁচকে তাকাতেই রিমি বললো — “সরো তো এবার, আমাকে ছেলেকে আদর করার পালা”

এ কথা শুনে রিমি নিচু হয়ে বসতেই আরিশ এসে মাকে জড়িয়ে ধরে গালে চু’মু খেলো, পাশে আরশান হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিমিকে এখন আরেক ছেলের সঙ্গে ভাগ করে নিতেই হয়, কিছু করার নেই!
______________________________________

ইনায়া আজ দুপুরে এসেছিল ওর মেয়েকে নিয়ে, সন্ধ্যা হতেই তানভীর অফিস থেকে ফেরার পথে ইনায়াকে নিতে এলো। ওরা ডিনারের আগেই চলে গেছিলো। রাতে, ডিনার টাইমে আরাফাত সাহেব আয়ানের বিয়ের প্রসঙ্গটা তুললেন। কিন্তু আরশান ওর স্বভাবজাত সেই শীতল কণ্ঠে বলে দিল — “আয়ান এখন আবেগের বশবর্তী হয়ে যা বলছে তা কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ও কেবল একটা মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় ওকে বিয়ে দেওয়া মানে অন্য একটা মেয়ের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলা। এখনই ওর বিয়ের প্রয়োজন নেই।”

আয়ান কোনো প্রতিবাদ করল না। ও তো মন ভাঙা মজনুর মতো প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিভৃতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। আরশানের কথার ওপর কথা বলার সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই এই মুহূর্তে ওর নেই! ডিনারের পর বেশ অনেকটা সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু আরশান ঘরে ফিরছে না। রিমি শোবার ঘরে অপেক্ষা করতে করতে ভাবল, লোকটা গেল কোথায়? রিমি ঘর থেকে বেরিয়ে একটু পা বাড়াল পাশের করিডোরে। ইনায়ার রুমের ঠিক পাশের ঘরটাই এখন আরিশের। একসময় এই ঘরটাতেই ছিল রিমি। ছেলের ঘরের দরজাটা সামান্য ভেজানো। রিমি উঁকি দিতেই দেখল, বিছানার ওপর আরশান আর আরিশ মুখোমুখি বসে আছে। রিমি কৌতূহলী হয়ে একটু কান পাতল। দেখল আরশান খুব নিচু স্বরে আরিশকে কিছু একটা বলছে।

“আরিশ, একটা কথা সবসময় মনে রাখবে, বাইরে কেউ যদি তোমাকে বু’লি করার চেষ্টা করে, তবে এক সেকেন্ডের জন্যও চুপ থাকবে না!”

আরিশ বড় বড় চোখ করে বাবার কথা শুনছে। আরশান ওর ছেলের ছোট হাতটা নিজের মুঠোয় নিল। তারপর খুব দক্ষ ভঙ্গিতে আরিশের চারটে আঙুল মুড়িয়ে বুড়ো আঙুলটাকে ওপর দিয়ে এনে একটা শক্ত মুষ্টি তৈরি করে দিল।

“যদি কেউ তোমাকে আঘাত করে, তবে তুমি পাল্টা আঘাত করবে। কাউকে পাঞ্চ করলে ঠিক এইভাবে করবে কব্জি সোজা রেখে কাঁধের পুরো শক্তিটা হাতের আঙুলের এই হাড়গুলোর ওপর আনবে। Just like this!”

আরশান বাতাসের ওপর একটা ক্ষিপ্র মুভমেন্ট করে দেখাল। আরিশও ঠিক বাবার মতো হাতটা করে দেখালো — “এভাবে বাবা? একদম জোরে?”

রিমি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে চমকে উঠল। আরশান কিনা ছেলেকে শেষমেশ মা’রপিট শেখাচ্ছে? অবশ্য আরশানের ওপর ওর বিশ্বাস আছে, ও নিশ্চয়ই এমনকিছু ছেলেকে শেখাবে না যেটা করা অপ্রয়োজনীয় বা অনুচিত। ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে আরশান যখন রুমে এলো রিমি তখন বললো — “কফি খাবে?”

“আনো”

রিমি দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি বানিয়ে নিয়ে বারান্দায় এল। এখানে দুটো চেয়ার রাখা, আরশান রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। রিমি আসতেই ও ঘুরে দাঁড়ালো। রিমি নিজের চেয়ারটা টেনে বসলো, আরশান তখনও দাঁড়িয়ে। রিমি প্রশ্ন করল — “তুমি আরিশকে ওভাবে পাঞ্চ করা শেখাচ্ছিলে কেন?”

আরশান মুহূর্তের জন্য থামল। কফির কাপটা হাতে ধরে রেখেই ও রিমির দিকে আড়চোখে তাকাল।

“I’m teaching him self-defense”

রিমি একটু অবাক হয়ে ওর বাহুটা আরও শক্ত করে ধরল! — “হঠাৎ কেনো?”

আরশান আবারও কফিতে চুমুক দিয়ে বললো…

“ওর ক্লাসের কয়েকটা ছেলে কয়েকদিন ধরে ওকে বু’লি করার চেষ্টা করছে। আরিশ হয়তো শান্ত স্বভাবের, কিন্তু আমি চাই না আমার ছেলে দমে থাকুক”

রিমির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ও সোজা হয়ে বসে আরশানের চোখের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল — “কী বলো? আরিশকে বু’লি করছে? অথচ ও তো আমাকে কিছুই বলেনি! প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পর আমি ওর সাথে কত গল্প করি, ও তো একবারও এমন কিছুর আভাস দেয়নি আমাকে!”

আরশান এবার সামান্য হাসল, এক চিলতে বাঁকা এবং গূঢ় হাসি! ও রিমির গালের ওপর দিয়ে নিজের একটা আঙুল আলতো করে বুলিয়ে দিয়ে খুব ধীরস্থিরভাবে বলল…

“Relax, Rimi. It’s a man’s matter. তাই ও আমাকে বলেছে”

এ কথা শুনে রিমি মুখ গোমড়া করে ফেললো — “বাহ! ভালোই তো। বাবা ছেলে মিলে সিক্রেট রাখতে শুরু করে দিয়েছো”

বারান্দার ঠান্ডা বাতাসটা রিমির অবাধ্য চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছে। আরশান রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এক হাত পকেটে আর অন্য হাতে ধরা আধখাওয়া কফির কাপ। আরশানের হঠাৎ মনে পড়লো ওদের প্রথম দেখা হওয়ার দিনটা, বারান্দায় ইনায়ার পাশে দাঁড়িয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো মেয়েটা। তারপর পেরিয়ে গেলো এতগুলো বছর! সেসব ভেবে আরশান মৃদু হাসলো। এর মধ্যে রিমি বলল, “তুমি কি জানো আরশান, তোমার ভাবসাব আজকাল আরিশও কপি করা শুরু করেছে? আমার তো মনে হচ্ছে ও বড় হয়ে একদম তোমার মতো হবে!”

আরশান কফির কাপটা চেয়ারের ওপর রেখে হঠাৎ নিচু হলো। রিমির এক হাত ধরে ওকে হ্যাঁচকা টানে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল নিজের একদম সামনে। রিমির খুব কাছে মুখ নিয়ে এল, ওর সেই তপ্ত নিশ্বাস রিমির নাকে আছড়ে পড়ছে।

“Let him copy, আমার মত হলে মন্দ কি?”

“আরশান! কখনো কি আপনার স্বাভাবিক আচরণ করতে ইচ্ছা করেনা?”

আরশান রিমির চিবুকটা এক আঙুলে উঁচিয়ে ধরে রিমির কানের লতিটা দাঁত দিয়ে হালকা কামড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল—

“Being normal is so boring!”

রিমি চোখ বন্ধ করে আরশানের বুকে মাথা রাখল। আরশানের হার্টবিট ও পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে। আরশান রিমির চুলের ভেতর হাত চালিয়ে দিয়ে ওর মাথাটা একটু পেছনের দিকে টেনে ধরল, যাতে রিমি ওর চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়।

“Love me more than anyone else ok? ছেলেকে একটু বেশিই ভালোবাসো তুমি!”

এ কথা শুনে রিমির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। লোকটা কি প্রচণ্ড পজেসিভ! ও আরশানের গলা জড়িয়ে ধরে ওর খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল — “আমার আদরের ছেলেকে আমি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি, তোমাকে না হয় একটু বেশি ভালোবাসবো, চলবে?”

এ কথা শোনামাত্র আরশান রিমিকে কোলে তুলে বললো — “তাহলে আমাকে ইন্টারেস্ট দিতে হবে, তাহলে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো!”

আরশানের চাওয়ার সামনে রিমির কোনো জেদ বারণ কিছুই আজ অব্দি কাজ করেনি, এখন বরং রিমি আরশানের প্রতিটা স্বভাব আপন করে নিতে শিখেছে। আরশানের সঙ্গে সময় কাটাতে দিয়ে রিমির জীবনের সেই অনিশ্চিত সময়ের কথা মনে পড়লো যখন সকলদিক থেকে সে প্রায় অসহায় নিরুপায় হয়ে পড়েছিল। সেই মুহূর্তে না চাইতেও আরশান ওর জীবনে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছিল। যে মানুষটাকে ঘৃনা করার পরেও ভালোবাসা, সম্মান, পরিবার সব দিয়েছে তার সকল আবদার শিরোধার্য!!

____ সমাপ্ত ____

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/17MCNJH1nY/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here