প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ২৯

0
19

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ২৯ (কপি করবেন না)
___________________________

~অ…অ..অনিল ভ..ভাই আপ…আপনার ঘুমকা…কাতুরে কণ্ঠে কি বি…ষ মিশিয়ে রে..রেখেছেন? আমার মনে হচ্ছে আমি ম..ম..রে যাচ্ছি আ..আপনার এমন কণ্ঠে। এটা আপনি কি কর..করলেন আমার স..স..সাথে!

এতো এতো কথা সাহস করে বলে দেওয়ার পরে বুকের ওড়না খামচে ধরে চোখ খিঁচে বন্ধ করে অনিলের উত্তর শোনার অপেক্ষায় বসে আছে তনু। ওভাবেই কিছুক্ষণ যাওয়ার পর ঘনঘন নিঃশ্বাসের শব্দ পৌঁছায় তনুর কানে। খিঁচে থাকা চোখ মেলে তখন হতাশ হয়ে কানের থেকে ফোন হাতে নিয়ে সেখানে দেখে সে। কল তো চলছে কিন্তু তার অনিল ভাই যে ঘুমিয়ে পড়েছে ফোন কানে নিয়েই তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি তার।
কি আর করা। কল কেটে নিজেও বালিশে মাথা রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করে তনু।
.
.
.
.

প্রতিদিনের ন্যায় শনিবার সকালেও তনুর বাবা জালাল সাহেব টিভি চালিয়ে খবর দেখছে খুবই মনোযোগ দিয়ে। আজ সেখানে দেখাচ্ছে,

~এই মূহুর্তে আমি দাঁড়িয়ে আছি গুলশান ১ এর “হোসেন কমপ্লেক্স” এর সামনে। এই বহুতল ভবনের সপ্তম তলার ফ্ল্যাট নাম্বার 7C তে অঞ্জলি সাহা নামক এক ব্যক্তির লা*শ পাওয়া গিয়েছে। সাধারণ ত*দ*ন্তে এটাকে আ*ত্মহ*ত্যা মনে হলেও গন্ডগোল রয়েছে। এই অঞ্জলি সাহা সেই মহিলা যাকে দুইদিন আগে ভাইরাল হওয়া অরুপ দাসের ভিডিওতে অ*ন্ত*র*ঙ্গ অবস্থায় দেখা গিয়েছে। আজ সকালেই সেনাবাহিনী একটা টু*ক*রো লা*শ পেয়েছে যা অরুপ দাসের মনে হলেও নিশ্চয়তার জন্য ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে ইতোমধ্যে। সেইজন্যই অঞ্জলি সাহার মৃ*ত্যু স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনী নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়েছে এই কে*স। মেজর এএকে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় এই কেস এখন গিয়েছে ক্যাপ্টেন তাহমিদের হাতে।
সকলের সাথে আমার নিজেরও মনে হচ্ছে অঞ্জলি সাহার মৃ*ত্যু*র পিছনে চক্র খু*নে*র সংযোগ অবশ্যই আছে।
বাকিটা সেনাবাহিনীর হাতে ছেড়ে বিদায় নিচ্ছি আমি সাদাফ আদনান। ক্যামেরায় আশিক।

খবর দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টিভি বন্ধ করে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন জলিল সাহেব। আজকাল আর এইসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না তার।
.
.
.
.

“ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে তাই চারদিনের জন্য টেক্সাস যাচ্ছি। প্রচন্ড ব্যস্ত থাকবো তাই যোগাযোগ নাও হতে পারে। তুমি চিন্তা করবা তাই জানিয়ে গেলাম। ভালো থেকো আর নিজের খেয়াল রেখো।”

সকাল বেলা “Anil Bhai” এই নাম্বার থেকে এমন ম্যাসেজ দেখেই প্রথমে মনটা খুব খারাপ হয় তনুর। কিন্তু পরেই তার খেয়াল হয় যে অনিল ভাই তাকে জানিয়ে তার কাছে এক্সপ্লেইন করেছে তার যাওয়ার কারণ। মনের মধ্যে প্রজাপতি উড়াউড়ি শুরু হয় তার। অনিল ভাইয়ের কাছে নিশ্চয়ই সে গুরুত্বপূর্ণ। না হলে কি সে চিন্তা করবে ভেবে এই ম্যাসেজ করতো?

সমস্ত মন খারাপ পোটলাপুটলি বেঁধে জানালা দিয়ে পালালো তার।
.
.
.
.
তনু যাতে তার হাসপাতালে থাকার ব্যাপারে জানতে না পারে তাই মিথ্যা লিখে এই ম্যাসেজ দিয়ে নিজের ওই গোপন ফোন বন্ধ করে রাখে অনিল। মীম এখন যখন তখন যাওয়া আসা করে তার কাছে। বিয়ে করে স্ত্রীর অধিকার দিয়েছে তাই বাঁধাও দিতে পারছে না। তার নজরে পড়লে সংসার শুরু হওয়ার আগেই ভেঙে যাবে সেই ব্যাপারে অন্তত নিশ্চিত অনিল। এই মুহূর্তে সে কাউকেই কিছু বলতে পারবে না। নিজের পরিকল্পনা মাফিক এগোতে হবে তাকে। পাখি খাঁচায় ঢুকেছে সবে এখনো খাঁচার দরজা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সবকিছু পূর্ব পরিকল্পনা মতো এগোলেও তার উপর এমন আ*ক্র*মণ, তার সহকর্মীদের এমন মৃ*ত্যু আর মীমের সাথে তার হঠাৎ বিয়ে সবকিছু ছিলো পরিকল্পনার বাইরে। ওই দু*র্ঘ*ট*নার পরে ইন্সট্যান্ট সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মীমকে নিজের নামে আঁটকে রাখার। যাতে যা কিছুই হোক এই মেয়ে তার নাগালের বাইরে যেতে না পারে।
অথচ এখন বসে সে ভেবে চলেছে কাজটা কি আদৌও ঠিক করেছে সে নাকি হঠকারিতায় ভুল করে বসলো?
.
.
.
.

গণমাধ্যম তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে অরুপ দাসের মা*র্ডা*র আর অঞ্জলি সাহার আ*ত্ম*হ*ত্যা নিয়ে। সেনাবাহিনীর উপর চড়াও হয়েছে দেশের জনগণ আর তাতে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে চলেছে সবুজ সাংবাদিকেরা। তিল কে তাল বানিয়ে খবর প্রকাশ করে কে কোন চ্যানেলকে টপকে যাবে সেই প্রতিযোগিতায় ভুলে বসেছে ঠিক ভুলের পার্থক্য। মেজর এএকে কে নিয়ে হচ্ছে রঙবেরঙের খবর। যে মেজর আ*ত*তা*য়ীর হাতে গু*লি খেয়ে নিজেই হাসপাতালে পড়ে আছে সে কিভাবে বাঁ*চাবে দেশকে? এতো অসম্ভব। এসব নিউজ ছড়াচ্ছে মিডিয়া। তারা সাধারণ মানুষকে উষ্কে দিচ্ছে যাতে সেনাবাহিনী বাধ্য হয়ে এএকে সম্পর্কে কোনো স্টেটমেন্ট দেয়। একজন এতো কম বয়সী সফল মেজর কিন্তু কখনো মিডিয়া বা কোনো মাধ্যমের সামনে যায়নি সেই মেজরকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে আনতে পারলে সংবাদ ব্যবসা হবে রমরমা। তাইতো কেউই পিছিয়ে পড়তে রাজি নয়। ‘RA News’ অর্থাৎ সাদাফের চ্যানেলে হয়েছে একাধিক মেজর। তার বস কনিকা আহমেদের একটাই চাওয়া সাদাফের থেকে যেন সে মেজরকে সামনে আনার কাজ করে। অথচ সাদাফ বেঁকে বসেছে। সে কিছুতেই কোন অন্যায় করবে না। মেজর দোষী হলে সে নিজেই সবার আগে মেজরের কীর্তি ফাঁস করে দিতো। তার জানের জান বন্ধু কিনা এতোসব সে দেখতোই না। কিন্তু এখন যেখানে সে জানে মেজর সম্পূর্ণ নির্দোষ তারপর আবার অনিল। তার ভাই গুলো যদি নির্দোষ হয় তো তারা বিপদে পড়বে এমন নিউজ সে জীবিত অবস্থায় ‘এ আর নিউজ’ থেকে বের হবে না। প্রয়োজনে সে নিজের নাম ব্যবহার করবে, নিজের পদবী নিজের পাওয়ার নিজের টাকা এমনকি নিনের প্রাণ পর্যন্ত ব্যবহার করবে ওদের রক্ষায়। সেখানে এই মহিলা তাকে বলছে এএকে কে এক্সপোজ করতে। মিটিংয়ে একদফা কঠি তর্ক-বিতর্ক হয়েছে কনিকা আহমেদ আর সাদাফের মাঝে। অফিসের এমডি হিসেবে নিরপেক্ষ থেকেছেন সাদাফের রশিদা খানম। কিন্তু তিনি নিজেই এই কনিকা নামের মহিলার উপর বিরক্ত হচ্ছে। কারণ সে সেই ছোট্ট বেলা থেকে সাদাফের সব বন্ধুকে নিজের ছেলেই ভেবেছেম ওরা কেমন তা তার অজানা নয়। আর না অজানা মেজর এএকে ওরফে অনিল আবরার খান কেমন মানুষ। কেমন তার যত্নশীলতা নিজের কাজের প্রতি। সেই নিজের ছেলে ভাবা ছেলেটাকে বিপদে ফেলার প্ল্যানিং করছে তারই এক কর্মচারী ভেবেই শরীর রাগে লাল হয়ে যাচ্ছে। তিনি দেখতে চান আজ তার ছেলে কতক্ষণ নিজের জেদ ধরে রাখতে পারেন।
.
.
.
.

মেজর এএকে কে ডিসমিস করার জন্য র‍্যালী বের হয়েছে রাস্তায়। দলে দলে লোক জমা হচ্ছে সে র‍্যালীতে। তাদের দাবী হচ্ছে এই মেজর এএকে একটা অযোগ্য মানুষ। যার কোন যোগ্যতাই নেই চক্র খু*নের কে*স সামলানোর। তাই তাকে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহত দিতে মানুষ ভীড় জমিয়েছে। এসব কিছু দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছে সকলে। মীমের মাথায় আগুন জ্বলছে। যেভাবেই হোক লোকটা এখন থেকে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ। ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে পড়েছে তারা একে অপরের সাথে। এদিকে অনিলের সততা তার যোগ্যতা নিয়ে যেখানে পুরো দেশের কোনো সেনা সদস্য আঙুল তুলতে পারে না। সেখানে কিছু মানুষের প্ররোচনায় আজ একদল অসাধু মানুষ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপদস্ত করার চেষ্টা করে চলেছে তাকে।

মীম দেরি করে না হাসপাতালে যেতে। সে কেবিনে ঢুকেই দেখে অনিল আধশোয়া হয়ে কেবিনে থাকা টিভিতে তাকেই হেয় করে বের হওয়া খবর দেখছে নির্বিকারে। তার চোখ দুটো অনুভূতি শূন্য। কেবিনে অনিল ছাড়া আর কেউ নেই। এমন অবস্থা দেখে কণ্টকিত ঢোক গিলে মীম। সে জানেনা এই লোকটার নামে কবুল বলার পর থেকেই সে কিভাবে এই লোকের দুঃখ কষ্ট সব অনুভব করতে পারছে। এই যে লোকটা যে অনুভূতি শূন্য চোখে চেয়ে আছে টিভির দিকে কেউ দেখলেই বলবে এসব নিউজ খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিচ্ছে অনিল। সামান্য এসবে তার কিছুই হয়নি। অথচ মীম ওই অনুভূতি শূন্য চোখ দেখেই বুঝে নিয়েছে শক্ত খোলসের আবরণে বদ্ধ মানুষটার মনে চলছে ঝড়। নিজের নির্লিপ্ত ভাব দেখিয়ে সবাইকে বোকা বানাতে পারলেও স্বীয় স্ত্রীকে পারলো না মেজর এএকে।

কেবিনে কারো উপস্থিতি টের পেতেই দরজার দিকে তাকিয়ে মীমকে দেখেই অনুভূতি শূন্য চোখ দুটোতে কোমলতার দেখা মেলে। আরেকটু উঠে বসে অনিল তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে ডেকে উঠলো,

~এসেছেন মাই হাইনেস? আমি অপেক্ষা করছিলাম আপনা…..

তাকে শেষ করতে না দিয়েই মীম যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। শক্ত করে জড়িয়ে। অনিল একটু অবাক হলেও তা প্রকাশ করেনা। সে ভাবেনি মেয়েটা এতো জলদি এতো সাবলীলভাবে তার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারবে। কিন্তু মেয়েটা তার ভাবনার চেয়েও বেশি বাস্তববাদী আর শক্ত মনের। অনিল ও স্ত্রীর পিঠে ডান হাত তুলে তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলে,

~কি হয়েছে পাখি? অশান্ত লাগছে আপনাকে?

মীম অনিলের বুকে মুখ গুজে বসে ছিলো। এমন নরম কথায় সে অনিলের বুক থেকে মাথা তুলে নিজের নরম ছোট দুই হাতের আঁজলায় অনিলের মুখ তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে দেখে নিয়ে বলে,

~আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। মেজর এএকের মতো যোগ্য একজন সেনাকর্মকর্তা আমি আমার জীবনে দেখিনি আমার বাবা ছাড়া। পুরো দুনিয়া আপনাকে অবিশ্বাস করলেও আপনার স্ত্রী আপনাকে বিশ্বাস করে মেজর। জানপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে।

কি জানি কি ছিলো এই সামান্য দুইটা বাক্যে! মেজর এএকের গম্ভীরতা ভেঙে গুড়িয়ে যেতে সময় লাগে না এমন কথায়। ইশশ মেয়েটা তার জীবনে এসেই তাকে কেমন সুখ সুখ অনুভূতি দিচ্ছে! একটা জাদুর বক্স এই মেয়েটা। অনিল আবারও নিজের ইমোশনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অভাবনীয় কাজটা করেই বসলো।

কাঁটা দিয়ে বেঁধে রাখা মীমের চুল থেকে কাঁটাটা এক টানে খুলে নিয়ে মেঝেতে ফেলে দিতেই মীমের লম্বা চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে বিছানায় লুটোপুটি খাচ্ছে। আর মীমের এই লম্বা চুলই অনিলের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগে। মীমের মুখের উপর পড়ে থাকা চুল ডান হাতে তার কানের পাশে গুজে দিয়েছে। কানের পাশ থেকে হাত ধীর গতিতে স্লাইড হয়ে গলায় নেমে আসে। মীম শিরশির করে ওঠে। সে বুঝে যায় এখন কি আসতে চলেছে। বুঝেই সে ওই ডার্ক ব্রাউন চোখের দিকে তাঁকিয়ে থাকার সাহস পেলো না। নিজের চোখ বন্ধ করে ফেলে। অনিল তাকে কাছে টেনে উজ্জ্বল শ্যামলা মেয়েটার হালকা লাল গোলাপি মিশেলের ঠোঁট আঁকড়ে ধরে। কিন্তু এবার আর প্রথম বারের মতো হিং*স্র*তা প্রকাশের জন্য নয়। এবার তার আচরণ বড্ড নাজুক। যাতে তার হাইনেস কিছুতেই ব্য*থা পেতে না পারে সেভাবেই চুমু খেতে থাকে। এবং খেতেই থাকে সময় জ্ঞান ভুলে। মীম ও এবার স্বামীর ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেনি। সময়ের দিকে খেয়াল নেই দুজনের কারোই। তারা মত্ত্ব সদ্য জন্ম নেওয়া অনুভূতির দুনিয়ায়।
.

..
..
..
চলবে____

.

(আপনারা বেশি হতাশ হবেন না প্লিজ। অনিলের ব্যাপারটা খুবই জলদি ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আর ট্রাস্ট মি তখন আপনারা চমকে যাবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here