#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩১ (কপি করা নিষেধ)
___________________________________
রামপুরার পশ্চিমে হাতিরঝিল থেকে মোটামুটি কাছে একটা পুরাতন পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের পার্কিং এরিয়ায় রয়েছে বেশ পুরনো একটা সাদা রঙের টয়োটা গাড়ি। সাদা হলেও রঙটা চটে গিয়ে তাতে ময়লা হয়ে হলদেটে ভাব দেখা দিচ্ছে। অথচ এই রঙ চটে যাওয়াতেও ভাবসাবে আসেনি পরিবর্তন। নিজের সেই নতুনত্বের জৌলুস রয়ে গিয়েছে তা অবলীলায় বলা যায়। গাড়িটা পুরনো হলেও যে এটার প্রতিনিয়ত বেশ যত্ন নেওয়া হয় আর এরজন্য যে কেউ বা কয়েকজনের বেশ কসরত করতে হয় তাও গাড়িটার বয়সের সাথে রুপ তুলনায় বোঝা বেশি কঠিন নয়। রামপুরা পশ্চিমের ওই এলাকা অনেক পুরনো সেই হিসেবে পাঁচতলা বিল্ডিং টাও অনেক পুরনো। আর ওই এলাকায় পার্কিং সহ বিল্ডিং রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটাই। তার মধ্যে এই বিল্ডিংয়ের পার্কিং দেখেই চারতলার একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকে রাসেল নামের মাঝবয়সী এল লোক। এই গাড়িটাই তার নিজের বাচ্চার মতো। প্রিয় স্ত্রী যখন বেঈমানী করলো রাসেলের হাত ছেড়ে যখন প্রেমিকের হাত ধরলো তখন এই গাড়িটাকেই তো সে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। নাহলে তিন কূলে কেউ না থাকা রাসেল স্ত্রীর এমন ধোঁকা সহ্য করে আদৌও বাঁচতো কি না তার জানা নেই। সেই জন্যেই তো পুরাতন গাড়ি তার রুপ জৌলুস এভাবে ধরে রাখতে পেরেছে। আর এই গাড়িই তো কত কত ভালো কাজের সঙ্গী তার মতে।
রাসেল আজ চারদিন হচ্ছে তাদের বিল্ডিংয়ে একজন নতুন দারোয়ান দেখছে। যদিও এসবে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। গেটে কে এলো কে গেলো তা নিয়ে তার কি যায় আসে! কিন্তু এই যে নতুন দারোয়ান তার সাথে ওইদিন গেটে দাঁড়িয়ে কথা বললে জানতে পারে লোকটার নাম আব্দুর করিম। গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর। লোকটার বয়স কম আর দেখতে মোটামুটি ভালো। সেই জন্যই রাসেলের আগ্রহ জাগে লোকটার সাথে কথা বলার। এতো কম বয়সে দারোয়ান এর চাকরি কেন করে জানতে চাইলে আব্দুর করিম জানায় যে সে গ্রামের ছেলে আর আট ভাইবোনের মধ্যে সে সবার বড় হওয়ায় গরীব পরিবারের সব দায়িত্ব তার উপর। তাইতো ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েই পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে ধরতে হয়েছে পরিবারের হাল। রাসেল বেশ দুঃখ প্রকাশ করেছে। এখন রাসেল আর আব্দুর করিমের ভালোই কথাবার্তা হয়।
আজও তাই। বিকালের আলো শেষ হয়ে যখন সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে তখন গাড়ি নিয়ে গেটে এসে হর্ন বাজাচ্ছে রাসেল। আব্দুর করিম গেট খুলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে দেয় রঙচটা হলদেটে টয়োটা গাড়িটা।
রাতের আঁধার একটু গাড় হলেই পশ্চিম রামপুরার পুরো এলাকা জুড়ে লোডশেডিং হয়। ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। কারণ লোডশেডিং হওয়ার মধ্যে সাধারণ দৃষ্টিতে অস্বাভাবিকতার কিছুই নেই। দেশজুড়ে প্রায়শই হয়ে থাকে এই ঘটনা। বিরল কিছু নয়। তবে বিরল ঘটনা ঘটে লোডশেডিং হওয়ার পরে। রাসেলের নিবাস যেই পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে সেখানেই ঘটে সেই বিরল ঘটনা। অন্ধকারে যখন গেট খুলে দেয় বিল্ডিংয়ের নতুন দারোয়ান আব্দুর করিম তখনই বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করে ফরমাল শার্ট প্যান্ট পরিহিত তিনজন পুরুষ। মুখে মাস্ক আর চোখে কালো সানগ্লাস। আব্দুর করিম ইশারায় কিছু বললেই দুইজন থাকে নিচে আর আব্দুর করিমের সাথে আরেকজন যায় চারতলার সেই ফ্ল্যাটে যেখাবে রাসেলের আবাস। দুইজন যারা নিচে থেকে গিয়েছে তারা রঙচটা হলদেটে টয়োটা গাড়িটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে। সুক্ষ্ণভাবে প্রতিটি কোণে পরীক্ষা করে দেখতে থাকে। একজন সামনে ড্রাইভাবের পাশের সিটের নিচে থেকে কিছু একটা পেয়েই অন্যজনকে ডেকে দেখিয়ে দুজনেই নিঃশব্দে হেসে ওঠে।
রাসেল বাসায় ফিরে কেবল কাপড় বদলে নীল রঙের একটা চেকচেক লুঙ্গি সাথে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখনই লোডশেডিং হয়। তাই সে কাজ রেখে বারান্দায় যেয়ে দাঁড়িয়েছিল। দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে এসে দরজা খুলে দিতেই সামনে হাস্যজ্বল আব্দুর করিমের মুখ দেখে নিজেও সৌজন্য হাসে রাসেল। তারপর কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই রাসেল বলে,
“আপনার সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে রাসেল ভাই।”
“কে?”
“যার পরিচয় জানা আপনার জন্য খুব একটা সুখকর হবে বলে মনে হয় না।”
“ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বলে সরাসরি বলো আব্দুর করিম।”
“আচ্ছা তবে তাই হোক।”
তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মুখে কিছু একটা স্প্রে করে আব্দুর করিম। লুটিয়ে পড়তে নিলেই আব্দুর করিমের সাথে থাকা সাদা শার্ট পড়ে সুঠাম দেহের একজন তাকে ধরে ফেলে। তারপর দুইজন মিলে রাসেলকে নিচে নামিয়ে নিজেদের গাড়িতে তুলে তারা তিনজন উঠে বসে। আব্দুর করিমকে সব গুছিয়ে রাখার নির্দেশ করে সাদা শার্ট পরিহিত লোক। আব্দুর করিম অর্ডার পেয়ে সাথে সাথে অভ্যাস বসত স্যালুট করে। এদিকে ছদ্মবেশী দারোয়ান রুপী আব্দুর করিম, অর্থাৎ আর্মি অফিসার ফারহান সবুজের কান্ডে হেসে ওঠে ড্রাইভিং সিটে বসা ক্যাপ্টেন তাহমিদ আর পিছনে রাসেলের সাথে বসা আর্মি সদস্য। কিন্তু এখানেও তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে ক্যাপ্টেন তাহমিদের পাশে বসে এখনো আহত থাকা মেজর এএকে।
তার চোখের গভীরতায় আর্মি অফিসার ফারহান সবুজ বুঝে গিয়েছে যে এই ভুল ছদ্মবেশে থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বার হলে তার খবর করে ছাড়বে এই দয়ামায়াহীন মেজর।
গাড়ি চলা শুরু হয়। পশ্চিম রামপুরা থেকে ক্যাপ্টেন তাহমিদ গাড়ি বের করতেই মেজর একটা কল করে কাউকে। তারপর শুধু এতটুকুই উচ্চারণ করতে শোনা যায় তাকে,
“Done.”
প্রায় সাথে সাথে ইলেক্ট্রিসিটি চলে আসে এলাকা জুড়ে। মুখের মাস্ক নামিয়ে চোখের সামনে তুলে ধরে একদৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে মেজর এএকে গাড়ি থেকে প্রমাণ হিসেবে পাওয়া বস্তুটার দিকে। কি জানি কি হলো, তবে মেজরের ঠোঁট ছুইয়ে গেল এক অদৃশ্য হাসি। হয়তো নিজের আন্দাজে ছোড়া তীর সঠিক নিশানায় যাচ্ছে দেখেই এমন হাসি ফোটে তার মুখে যা অন্যদের পক্ষে দেখা বা বোঝা অসম্ভব।
.
.
.
.
৩রা অক্টোবরের সন্ধ্যা নেমেছে ছয়টার আগেই। পশ্চিম রামপুরা থেকে গোপন কাজ সেরে ক্যান্টমেন্টে ফিরেছে মেজর সাতটা বাজার আগেই। ভাগ্যক্রমে আজ তাদের ঢাকার ট্রাফিকে পড়তে হয়নি। রাসেল নামের এই ড্রাইভারকে যে আঁটকে রেখেছে সেনানিবাসে তা এই মূহুর্তে গোপন রাখতে চাইছে মেজর। তাইতো সে নিজে, ক্যাপ্টেন তাহমিদ, অফিসার ফারহান সবুজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান, জেনারেল নারায়ণ কর্মকার, মেজর জেনারেল আর কয়েকজন সদস্য ব্যতীত অন্যকেউ জানেনা এই ব্যাপারে। কর্ণেল ফারুক রায়হান পর্যন্ত অগ্যত এই ব্যাপারে। রাসেলকে রাখা হয়েছে সেনানিবাসের এক গোপন কারাকক্ষে। যার ইনচার্জ মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করে মেজর এএকে-কে। কর্ণেলকে এই চক্র খু*নে*র কে*সে সেধে খুব একটা জড়ায়নি মেজর আবার কর্ণেলও এতদিন তেমন আগ্রহ দেখাইনি। কর্ণেল ফারুক রায়হান যে মেজর এএকে-কে খুব একটা পছন্দ করে না এটা জানে না ঢাকা সেনানিবাসে এমন কেউ নেই। মেজরের গাম্ভীর্যতা, কঠোর ব্যক্তিত্ব সবকিছু অতিরঞ্জিত মনে করেন কর্ণেল। তাইতো কেউ চাইনিও এরা একসাথে কাজ করুক। অথচ এই নির্লিপ্ত কর্নেলকেই ইদানীং এই কে*সের ব্যাপারে আদ্যোপান্ত খবরাখবর সংগ্রহ করতে দেখা যাচ্ছে। এর কারণ জানা না থাকলেও মেজর চাইছে না এখনই কিছু সামনে আনতে। তাইতো নিজের সাসপেন্ড আর চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার নাটক করেছে। কর্ণেল নিজেও তাই-ই জানে। এদিকে মেজরের দেশ ত্যাগের খবর শুনেই কর্ণেল তার প্রাপ্য ছুটি নিয়ে ছুটে গিয়েছে নিজ পিতৃভূমি খাগড়াছড়িতে। এই খবরে মনে মনে হাসলেও খুশিও হয়েছে মেজর। কারণ কর্ণেল না থাকায় তার কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করবে না। সে নিজের মতো তদন্ত করতে সক্ষম।
রাত আটটার দিকে গোপন কারাগারে প্রবেশ করে টেবিলের একপ্রান্তে চেয়ার টেনে পায়ের উপর পা তুলে দাম্ভিকতার সহিত বসে মেজর। চেয়ার টানার শব্দে টেবিলের অন্যপ্রান্তে মাথা ঠেকিয়ে চেয়ারে বসা ক্লাস্ত পরিশ্রান্ত রাসেন নিভু নিভু চোখে তাঁকায় সামনে বসা ব্যক্তিকে দেখার জন্য।
মাথার উপর জ্বলছে হলুদ আলোর একটা কম পাওয়ারের লাইট। লাইটের চারপাশে আবার বেস্টনী দেওয়া। সেই বেস্টনীর ছায়া পড়েছে অপরপ্রান্তে বসে সাথে আর্মি ইউনিফর্ম পরিহিত লোকটার উপর। তাইতো তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। লোকটা হয়তো বুঝতে পারছে রাসেলের মনোভাব। তাইতো হেলান দিয়ে বসা থেকে টেবিলের দিকে কিছুটা এগিয়ে আলোর নিচে নিজের মুখ নিয়ে এসে বসে।
এদিকে আর্মি ইউনিফর্ম পরে বসা মেজরের মুখ দেখেই রাসেলের মুখ থেকে না চাইতেও বেরিয়ে যায়,
“অ..অ..অনিল আবরার!”
.
..
..
..
..
চলবে____
(আজকের পর্বে শুধুই মেজর আর মেজর।)

