#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৪০ (কপি করা নিষেধ)
___________________________________
জালাল সাহেবের শরীর দিন দিন বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রায়শই পেটে ব্যথা নিয়ে শুয়ে থাকতে হয়। ডাক্তারের ভাষ্যমতে আগে আলসার হয়েছিল পাকস্থলীতে। সেখান থেকেই তা রুপ নিয়েছে ক্যান্সারে। আধুনিক চিকিৎসার জগতে ক্যান্সার মরণব্যাধি নয়। এর যথেষ্ট প্রতিকার আবিষ্কার হয়েছে যুগে যুগে। কিন্তু জালাল সাহেবের নিজের প্রতি গাফিলতির ফলে তার শরীরে বাসা বাঁধা ক্যান্সার মরণব্যাধিতেই পরিণত হয়েছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেওয়ায় তা ধীরে ধীরে আজকের অবস্থায় এসেছে।
ডাক্তার সুব্রত কর্মকার এর কেবিন থেকে পুরো কথা শুনে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বের হচ্ছে তনু। নিজ বাবার শারীরিক অসুখের চেয়ে এখন তার মানসিক অবস্থা বেশি আশংকাজনক হয়েছে। বাবা ছাড়া মাথার উপর আস্থার হাত রাখার মতো কেউ নেই তনু আর তার মায়ের। দাদাবাড়ীর তরফে তার বাবা একাই জীবিত তাই সেই পক্ষে কোন আত্মীয় নেই। আর কোন এক কারণে তার নানাবাড়ির সাথে তাদের কখনোই কোন সম্পর্ক ছিল না। আজীবন বাবা মায়ের সাথে একা একা বড় হয়েছে তনু। আর এখন যখন জানতে পারছে সেই বাবাও বেশিদিন থাকবে না তার কাছে, নিজেকে এই কথা মানানোর মতো মনোবল তনুর নেই। কি করবে, কিভাবে করবে কিছুই তার মাথায় আসছে না।
হাসপাতালের লম্বা করিডোর দিয়ে হুশ জ্ঞান খুইয়ে উদভ্রান্তের মতো হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে তনু। মাঝখানে কতো জনের সাথে ধাক্কা লাগলো তার ইয়ত্তা নেই। হাটতে হাটতে যখন ইমারজেন্সি ওয়ার্ড এর সামনে দিয়ে অতিক্রম করে তখন হাহাকারের শব্দ শুনে থেমে যায় তনু। একটু এগিয়ে যেয়ে দেখে সিড়ির হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ষোল কি সতেরো বছরের মেয়ে। সে কি আর্তনাদ তার! সে কি গায়ে কাঁটা দেওয়া কান্না! তনু সহ্য করতে না পেরে মেয়েটার কাছে একটু এগিয়ে যেয়ে যেই জিজ্ঞেস করতে যাবে কিছু তখনই এক মহিলা পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে যেয়ে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে। তাদের কথায় তনু বুঝে যায় তারা মা মেয়ে। আর এই ইমারজেন্সিতে তার বাবা মারা গিয়েছে তাই তাদের এই অসহায় অবস্থা।
নিজের মনের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। তারপর আবার চোখের সামনে তারই মতো এক মেয়ের বাবা হারানোর যন্ত্রণা। অসহনীয় কষ্টে ছটফটিয়ে উঠলো তনু। কোনদিকে না তাকিয়ে দৌড়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়ে তনু। রাস্তা দিয়ে পাগলের মতো দৌড়ে যাচ্ছে। অথচ কোথায় যাচ্ছে, কোথায় তার গন্তব্য কিছুই জানা নেই তার।
.
.
.
.
মীম আর অনিলের সম্পর্কের দারুণ পরিবর্তন ঘটেছে। সেই রাতের পরে তাদের মধ্যে থাকা যোজন দূরত্ব দূর হয়েছে। মীম যে মনে মনে একটা ফারাক রেখে চলতো অনিলের সাথে সেই ফারাক সে নিজ দায়িত্বে ঘুচিয়েছে। এখন তার একটা দিব কাঁটা অসম্ভব এই মেজর ছাড়া তা সে ভালোই বুঝতে পেরেছে। সেদিন বিশেষ সময়ে সে তো প্রশ্নই করে ফেলে,
“আপনি কি জাদু জানেন মেজর?”
সুদর্শন পুরুষটা হয়তো এমন সময়ে অর্ধাঙ্গিনীর মুখে এমন প্রশ্ন আশা করেনি। তাইতো ফর্সা কপালে ভাজ পড়ে বেশ কয়েকটা। ডার্ক ব্রাউন চোখের সাহায্যে নিজ রমণীর আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে। এদিকে লজ্জার ছিটেফোঁটাও না থাকা মীম সবসময়ের মতো ওই ডার্ক ব্রাউন চোখের দৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। লজ্জায় হাসফাস করতে থাকে। অনিল অবশ্য তার পাথুরে হৃদয়ের বউয়ের এমন লজ্জায় নত হওয়া সর্বদা উপভোগ করে। দুনিয়ার সাথে লড়াই করা মেয়েটা, নির্ভীক, বেপরোয়া মেয়েটা তার কাছে এলেই একদম একটা আদুরে পুতুল হয়ে ওঠে। একটু আদর যত্নেই কেমন মোমের মতো গলে পড়ে। বুকে টেনে নিলে অনিলের বুকের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টায় থাকে।
নিজের বুকের মধ্যে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা রমণীর মুখটা দু’হাতের আজলায় নিয়ে লাল হয়ে ওঠা নাকের ডগায় আদুরে স্পর্শে চুমু খেয়ে অনিল বলে,
“আপনাকে জাদু করতে পেরেছি বলছেন মাই হাইনেস?”
রমণীর অবস্থা এবারেও লজ্জায় লাল-গোলাপি হয়। সেই রঙিন মুখে চেয়ে শব্দ করে দাত বের করে হেসে ফেলে অনিল। এদিকে তার হাসিতে তার রমণীর লজ্জা বাড়ে ধাপে ধাপে কয়েকগুণ বেশি।
“এভাবে আমাকে লজ্জা পেয়ে যখন আমার বুকেই লুকিয়ে থাকেন আপনাকে একদম অনিল আবরারের বউ বউ লাগে আড়ালপ্রিয়া। মনে হয় টুপ করে খেয়ে ফেলি।”
প্রচন্ড লজ্জায় হাসফাস করেও মুখ খুলে মীম উত্তর দেয়,
“অনিল আবরারের বউ বউ লাগে মানে? আমি মাশফিয়া মীম অনিল আবরারের বউই। আপনি কি ভুলে যান মাঝে মাঝে মেজর?”
মেয়েটাকে নিজের বুকের মধ্যে পিষে ফেলার পায়তারা করছে যেন মেজর। ওভাবে তাকে রেখেই বলে,
“আপনাকে ভুলে যেতে পারি আমি? আপনাকে ভুলতে হলে যে নিজেকে ভুলতে হবে ম্যাডাম। মরতে হবে। মানুষ তো আর আত্মা ছাড়া বাঁচতে পারে না।”
অদ্ভুত ভাবে শিউরে ওঠে মীম। চোখ দুটো জ্বলে ওঠে তার। নিজের মুখটা ওই সুরক্ষিত বুক থেকে তুলে অনিলের মুখের উপর ঝুকে যায় সে।
“ভালোবাসেন আমাকে মেজর?”
কোন জবাব নেই মেজরের মুখে। শুধু অনিমেষ চেয়েই থাকে মেয়েটার মুখের দিকে। মীম জানে সে কোন উত্তর পাবে না। কারণ আজকাল সে প্রায়ই অনিলকে এই প্রশ্ন করে। কিন্তু কখনোই উত্তর পায় না। এবারেও তাই-ই হলো। কোনো নেই মেজরের মুখে। কিন্তু এবার যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু। মীম কিছুক্ষণ চুপ থেকেই আনমনে বললো,
“আমি বোধহয় ফেঁসে গিয়েছি মেজর। আমাকে কি জাদু করেছেন বলুন তো?”
মেজর এবারেও চুপ। অথচ মীমের মুখে উক্ত বাক্য শুনেই মীমকে নিচে শুইয়ে দেয় ঠাস করে। মীম অবাক হওয়ার সময় টুকুও পেলো না তার আগেই বুঝতে পারে তার টি-শার্ট উঁচু করে নরম তুলতুলে পেটে যেখানটিতে তিন বছর আগের খামচে ধরার চিহ্ন রয়েছে সেখানেই উত্তপ্ত ওষ্ঠপুট চেপে ধরেছে তার মেজর। থেমে থাকেনি মেজর অজস্র চুমুতে জায়গাটা সিক্ত করে সে। মীমের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে এই ঘটনার কয়েক দিনেই। কারণ যখনই সে অনিলকে এই প্রশ্নটা করে অনিল প্রতিবারই এভাবেই তার কলঙ্কের দাগের উপর নিজের আধিপত্য বিস্তারে মত্ত হয়। যেন এভাবেই সে মীমের সমস্ত ক্ষত ওভাবেই তুলে ফেলতে মরিয়া।
এসব কয়েকদিন আগের কথা ভাবতে ভাবতেই গাড়ির জানালার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসা মেজরের পানে চেয়ে দেখে মীম। অনিল ও একপলক সেই নজর দেখেই খুব আড়ালে আবডালে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ডান হাতে স্টিয়ারিং সামলে বাম হাতে মীমের কোলের উপরে রাখা তার ডান হাত টেনে নিজের ঠোঁট ছুইয়ে দেয় মেয়েটার হাতে। তারপর আবারও পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। মীমের মতো বেপরোয়া মেয়ে তার জন্য নিজের উপর কি পরিমাণ লাগাম টেনেছে তা অনিল জানে। সাধারণত আজকাল মেয়েরা প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট এক্সপেক্ট করে স্বামী বা বয়ফ্রেন্ড থেকে। এদিকে সে তার রমণীকে হাইনেস ডাকলেও ঘটে সম্পুর্ন উল্টা কিছু। ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের অবাধ্য, বেপরোয়া মেয়ে অনিলকে প্রিন্স ট্রিটমেন্ট দেয় সর্বদা। এই মেয়ের মধ্যে অনিলের দাদির সব গুণাবলি দেখে অনিল। ছোটবেলায় যেভাবে তার দাদিকে দেখতো স্বামী সেবা করতে, তার বউও তাকে সেভাবেই সেবা করে। এভাবেও এখনকার মেয়েরা স্বামী অন্ত প্রাণ হয় তা নিজের বউকে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতো না অনিল। অথচ এই মেয়ের অতীত রেকর্ড সবকিছু আছে অনিলের কাছে। সেই রেকর্ডের মীম আর তার ঘরণী মীমকে কিছুতেই মিলাতে পারে না অনিল। শুধু একটা কথায় তার মাথায় ঘোরে ‘কিভাবে সম্ভব? কোথাও কোন ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো?’
.
.
.
.
রিসোর্ট ফুলবাগ। যা নির্মাণ করা হয়েছে গাজীপুর। অত্যন্ত মনোরম স্থানে অবস্থিত এই রিসোর্টের। ভেতরের পুরো থিমটাই হচ্ছে গ্রামীণ সৌন্দর্য। গ্রামের পরিবেশ ক্রিয়েট করতে যে যে উপাদান প্রয়োজন তা ভরপুর রয়েছে এখানে।
কালো ছাদখোলা জীপ নিয়ে গাজীপুরের রিসোর্ট ফুলবাগ এ প্রবেশ করে ছয়জন মানুষ। ড্রাইভিং সিটে বসা সুদর্শন এক যুবক। নীল শার্ট এর সাথে সাদা ফরমাল প্যান্ট। কোমরে কালো বেল্ট। হাতে দামী কালো বেল্টের ঘড়ি। তার পাশে বসা একজন। পিছনে বাকি চারজন। চোখ দুটো ঢেকে রাখা কালো রোদ চশমার আড়ালে।
হইহই করে জীপগাড়িটা রিসোর্টের গেট দিয়ে প্রবেশ করে। তাদের বেশভূষা আর হইহট্টগোল দেখে যে কেউ বুঝে যাবে এরা প্রতিদিনের জীবন থেকে কয়েকদিনের সময় বের করে এই নির্মল পরিবেশে এসেছে। অথচ পেছনের কাহিনী অজানাই থাকবে সবার।
তাহমিদকে পাঠানো হয়েছে গাজীপুর। মেজরের আদেশেই সে এসেছে এখানে। খু*নের কে*সের সাথে হয়তো গাজীপুরের কোন গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছে মেজর এএকে। তার সন্দেহ মোতাবেক তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত একজনের গাজীপুর যাওয়ার ভীষণ দরকার ছিলো। আর বিশ্বাসের প্রশ্ন উঠতেই মেজর চোখ বন্ধ করে ক্যাপ্টেনের কাঁধে তুলে দিয়েছে অপারেশন “ফুলবাগ” এর দায়িত্ব।
হ্যা গাজীপুরের একটা জনপ্রিয় রিসোর্ট রয়েছে ‘ফুলবাগ’ নামের। আর এই রিসোর্টের যে চক্র খু*নে*র সাথে যোগাযোগ রয়েছে তা রাসেলের মাধ্যমে জানতে পেরেছে মেজর এএকে। তাইতো এখানে পরিকল্পনা মোতাবেক হতে যাচ্ছে গোপনীয় এক সেনা অপারেশন। আর এই অপারেশন এর নামই ‘অপারেশন ফুলবাগ’। এই অপারেশন এর অপারেটিং হেড ক্যাপ্টেন তাহমিদ। তাইতো সাথে কয়েকজন টীম মেম্বার নিয়ে সে খুবই সাদামাটা ভাবে ছুটি কাটানোর ভঙ্গিমায় ঢুকেছে ফুলবাগ নামের রিসোর্টে। সবকিছু বুঝে শুনে নির্ণয় করে তবেই পরিণতি হবে এই অপারেশন এর। ক্যাপ্টেন তাহমিদ বিন্দুমাত্র ভুল করতে রাজি নয়। এই গাজীপুরের রিসোর্ট ফুলবাগে তাণ্ডব হতে যাচ্ছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত ক্যাপ্টেনের সাথে থাকা অন্য সেনাগণ।
.
.
.
.
সাদাফকে জবরদস্তি তার সমস্ত কাজ ফেলে যেতে হচ্ছে চট্টগ্রাম। তার অনাকাঙ্ক্ষিত বউ যার নাম ধাম কিছুই সে জানে না, সেই বউ নাকি এ*ক্সি*ডে*ন্ট করেছে ভার্সিটি যাওয়ার সময় রাস্তায়। এ*ক্সি*ডে*ন্ট করে এখন তাকে দেখার মতো না আছে কেউ আর না আছে হাসপাতালের দায়িত্ব পালনের কেউ। তাই বাধ্য হয়েই মেয়েটা ফোন করে সাদাফকে। এদিকে চট্টগ্রামে দুইদিনের কোনো এক অফিসিয়াল কাজের জন্য যাওয়া লাগবে অনিলের। তাই সেও সাদাফের সাথে যাওয়ার জন্য ফ্লাইট বুক করেছে। অবশ্য অনিলের ভিন্ন এক উদ্দেশ্য আছে। তা এই মূহুর্তে সে কাউকেই বলতে পারবে না। অনিল অবশ্য মীমকেও সাথে নিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম।
তাকে নেওয়ার কোন প্ল্যান ছিলো না। শুধু মাত্র সাদাফের বউয়ের জন্য তাকে নিয়ে যাচ্ছে অনিল। যেহেতু সাদাফের সাথে তার বউয়ের চেনা জানাও নেই, তাই স্বস্তিকর হবে না তার সঙ্গ মেয়েটার জন্য। কিন্তু মীম যেহেতু নিজে মেয়ে তাই তার সাথে হয়তো সহজেই মিশে যেতে পারবে মেয়েটা। আর মীমকে সাথে নেওয়ার বুদ্ধি সাদাফই দিয়েছে। কোনো এক কারণে অনিল আর না করেনি। তাইতো সে স্বস্ত্রীক চট্টগ্রাম যাচ্ছে।
..
..
..
চলবে___

