প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৪১

0
18

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৪১ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________

তিনজন যখন চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টের থেকে বের হবে তখনই দুম করে অত্যন্ত শব্দ হওয়ায় সেই শব্দের দিক আশেপাশের সব মানুষের চোখ পড়ে। পিছনে ঘুরে অনিল আর মীম ও সেই দিকেই তাকায়। পিছনে ফিরেই আত্মা কেঁপে ওঠে মেজরের। তাদের থেকে খুবই সামান্য দূরত্ব রেখেই মেঝেতে পা চেপে ধরে বসে আছে সাদাফ। আর তার থেকে একটু খানি সরে ইয়া বড় একটা ট্রলি নিয়ে পড়ে আছে বিদেশি মেয়ে। ট্রলিটা যে তার বড় সাইজের তিনটা লাগেজ টানার জন্য ব্যবহার করছিল তা বোঝাই যাচ্ছে। সাদাফ সাথেই তো ছিলো তাহলে পিছিয়ে গেল কিভাবে এসব ভাবনা বাদ দিয়ে তার কাছে যেয়ে বসে তার পায়ে হাত দেয় অনিল। মীম সিকিউরিটির লোককে জিজ্ঞেস করে সে জানায় যে বেখেয়ালি ভাবে ধাক্কা লাগে দুজনের আর তখনই ওই ভারী ট্রলির চাকা উঠে যায় সাদাফের পায়ে। মীম তাকিয়ে দেখে সাদাফের উন্মুক্ত পায়ের আঙুল থেকে অনেক র*ক্ত ঝরছে। আর অনিল নিজের হাতে টিস্যু নিয়ে সেই র*ক্ত বন্ধের চেষ্টা করছে। বিদেশি মেয়েটা সর‍্যি সর‍্যি বলে পাগল হয়ে যাচ্ছে। সে যে খেয়াল করেনি তা বলেও দুঃখ প্রকাশ করছে বারবার। মেয়েটার এমন অবস্থা দেখে সাদাফ অনিল বারবার বলছে কোন সমস্যা নেই। তার কোন দোষ নেই। সে যেতে পারে। মেয়েটার ফ্লাইটের সময় হয়ে যাওয়ায় সেও বাধ্য হয়ে চলে যায়। কিন্তু যেতে যেতে যে কতবার সর‍্যি বলেছে তার হিসাব নেই।
মীম নিজেও বসে পড়ে সাদাফের পাশে। তার সাইড ব্যাগ থেকে হাতড়ে একটা ছোট মেডিসিন বক্স বের করে সেখান থেকে এন্টিসেপ্টিক আর ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ হাতে নিয়ে বক্স পাশে রাখে। এরপর কিছু খোঁজে। অনিল আর সাদাফ তার কান্ড দেখে যাচ্ছে নিশ্চুপ। এতোক্ষন সিকিউরিটি তাদের আশেপাশের মানুষের ভীড় কমিয়ে ফেলেছে। এয়ারপোর্টের চিত্র আবার আগের মতো স্বাভাবিক। মীম অনিলকে বলে সাদাফকে ধরে নিয়ে চেয়ারে বসাতে। অনিল বাধ্য ছেলের মতো তাই করে। সাদাফকে এয়ারপোর্টের ওয়েটিং জোনের নীল রঙের চেয়ারে বসিয়ে নিজেও পাশে বসে পড়ে। মীম মেঝেতে এক হাটু ঠেকিয়ে বসে সাদাফের পায়ের কাছে। তারপর কোন কথা ছাড়াই তার পায়ের কাঁটা আঙুলে হাত দিলেই চেঁচিয়ে ওঠে সাদাফ,

~একি মীম তুমি আমার পায়ে হাত দিচ্ছ কেন?

~আমি পায়ে হাত দিলে কি সমস্যা ভাইয়া?

~তুমি ভাবি হও আমার। পায়ে হাত দিলে কেমন দেখায় ব্যাপারটা?

~শুধুই ভাবি মনে করো তোমরা আমাকে? আমি তো জানতাম ফেম স্টারস এর বাকি চারজন আমকে ভাবির সাথে সাথে ছোট বোন ও মনে করে।

~সত্যিই জানো তুমি। অনিলের সূত্রে ভাবি তুমি। কিন্তু নিজের যোগ্যতায় ফেম স্টারস এর বোনের মর্যাদা পেয়েছো।

~তো ভাই অসুস্থ হলে ছোট বোন সেবা করতে পারবে না? এর জন্য এখানে ভাবি হওয়ার প্রসঙ্গ উঠে আসবে? ব্যাপারটা কেমন দেখায় না দেখায় তাও ভেবে তবে তোমাদের সঙ্গে আচরণ করতে হবে আমাকে?

~আমি সেভাবে বলিনি রে মেয়ে।

~আর কোন ভাবেই বলতে হবে না। যদি ব্যাপারটা এতটা খারাপই দেখাতো তাহলে তো তোমার বন্ধু পাশেই বসে যার সূত্রে ভাবি মনে করো তোমরা, সে কি চুপচাপ দেখতো? তাকে তো আমার চেয়ে অধিক ভালো জানো তোমরা। বাই দ্যা ওয়ে। পায়ে ব্যান্ডেজ হয়ে গিয়েছে আপাতত এভাবেই হাসপাতাল অব্দি যাওয়া যাবে। লেখায় যেয়ে ভালো করে ড্রেসিং করিয়ে নিও।

এই বলে উঠে দাঁড়িয়ে যায় মীম। সাদাফ একপলক তাকে ধরে বসে থাকা অনিলের পানে চেয়ে দেখে সে অদ্ভুত শান্তিপূর্ণ দৃষ্টিতে মীমের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদাফের দৃষ্টি দেখে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে অনিল। সাদাফ যেন সব উত্তর পেয়ে যায় নিজের। মীম এবার সাদাফের অন্য পাশের চেয়ারে বসে ব্যাগ থেকে পানি বের করে খায়। সাদাফ দেখে তার পায়ের র*ক্ত বন্ধ করে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে মীম। সে ওভাবেই মেঝেতে তাকিয়ে ভাবে, তার মনে প্রথম দেখা থেকেই এই মেয়েটার জন্য হালকা একটা অনুভূতি হয়েছিল। কিন্তু নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের পরে সব ঝেড়ে নিজেকে ওই হালাল নারীর জন্য গুছিয়ে রেখেছে সে। তাও যদি এদিক ওদিক থাকা কোন অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভূতি মীমের জন্য থেকে গিয়েছিল তাও সেদিন হাসপাতালে অনিলের সাথে মীমের বিয়ের মূহুর্তে সব ভুলেছে সে। মীমকে মনে প্রাণে নিজের ছোট বোন হিসেবে মেনেছে এতোদিন।
কিন্তু আজ সে বুঝছে এই গোমড়ামুখী, চুপচাপ স্বভাবের, নিজের ভাবনায় বিভোর থাকা মেয়েটার মনে লুকায়িত নরম মনের হদিস অনিল আবরার বহু আগেই পেয়েছে। এমন শক্ত একটা মেয়ের জীবনসঙ্গী মেজর এএকের মতো একটা মানুষই তো হতে হবে। এরা দুজন যে একে অপরের পরিপূরক। মীম ছাড়া অনিল আর অনিল ছাড়া মীম যে অসম্পূর্ণ। তাইতো উপরওয়ালা এদের মিলিয়ে দিয়েছেন। সাদাফ মন থেকে চাইলো এরা দুইজন যেন আজীবন এমন থাকে। এদের জীবনে যেন কোন বাঁধা না আসে। তনিমা যেন এদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে থার্ড পারসন হিসেবে না ঢোকে। অনিল যে সর্ব*নাশা রাস্তায় এগোচ্ছে তাতে যেন সবকিছু শেষ না হয়।

অনিল তার ভাই সম বন্ধুর দিকে তাকিয়ে তার ঘাড়ে জোরে হাত রেখে ঝাকি দেয়। যেন সে সাদাফের মনের কথাগুলো পড়ে নিয়েই তাকে ইশারা করে বোঝাচ্ছে, ‘আরে ব্যাটা ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
.
.
.
.
একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে সাথে হাতা কাঁটা টি-শার্ট চোখে কালো সানগ্লাস পরে সুইমিং পুলের কিনারায় রাখা আরামকেদারায় বসে আছে তাহমিদ। তার চোখে চশমা থাকায় মনে হচ্ছে সে তাঁকিয়ে আছে পানিতে অশালীন ভাবে ভিজতে থাকা মেয়েদের দিকে। অথচ তার চোখ যে পুলের অপর পাশে কয়েকটা খোলামেলা পোশাকের মেয়েকে নিয়ে অশ্লীল অবস্থায় বসে থাকা এক মধ্যবয়সী লোকের দিকে তা বোঝা অসম্ভব। এমন খোলামেলা পরিবেশে এতো মানুষের সামনেই লোকটার কাজকর্ম মোটেই থেমে নেই। লোকটা নিজেও শুধু একটা হাটু সমান বাথরোব পরে বসে আছে আরামকেদারায়। আর মেয়েগুলো তাকে ঘিরে নানান শারিরীক অশ্লীলতা করেই যাচ্ছে।
মেয়েগুলোর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাইশ বা তেইশ বছরের হবে তারা। অথচ নষ্টামি করছে চল্লিশ ঊর্ধ্ব একটা বয়স্ক লোকের সাথে। হিসাব করলে দেখা যাবে বাবার বয়সী লোক। লজ্জা, ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতে যেয়েও নেয় না তাহমিদ। ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ঊর্ধ্বে দায়িত্ব। আর এই লোক এর ঠিকুজিকোষ্ঠী বের করা এখন তার অন্যতম দায়িত্ব। হাতে রাখা ফ্রেশ জুসের গ্লাসটা ঘোরাতে ঘোরাতে ওইদিকেই হাঁটতে থাকে তাহমিদ। এমন ভাবে দুলে দুলে অঙ্গভঙ্গি দেখাচ্ছে যেন সে এখন মাতাল। আর সামনের দৃশ্য তাকে আকৃষ্ট করছে খুব।

~হ্যালো লেডিস।

সুদর্শন এক যুবকের কথায় তার দিকে কর্ণপাত করে লোকটা। সাথে মেয়ে গুলোও। লোকটা সম্পর্কে তাহমিদ যতটা স্টাডি করেছে তাতে সে জানতে পেরেছে যে লোকটা শুধু সুন্দরী যুবতীই নয়, সুদর্শন যুবকদের উপরেও যথেষ্ট দূর্বল। আর স্বি সুযোগ কাজে লাগাতেই তাহমিদ নিজেকে এই জা*নো*য়া*র সমতূল্য লোকের সামনে খোলামেলা ভাবে উপস্থাপন করছে।
এমন সুদর্শন যুবক দেখে নিজের শরীর ঘিরে থাকা মেয়েগুলোকে চলে যেতে বলে লোকটা। তারপর নিজে একটু সরে বসে তাহমিদকে বসার জন্য বলে হাতের ইশারায়। তাহমিদ মনে মনে প্রচন্ড অস্বস্তি অনুভব করলেও মুখে তার ছাপ পড়তে দেয় না। লোকটার ইশারা অনুযায়ী কাজ করে। লোকটার গা ঘেঁষে বসে। ছোঁয়া লাগার সাথে সাথে কেমন যেন শিউরে ওঠে তাহমিদ। তার কাছে মনে হচ্ছে আজ সে পুরুষ হয়েও না রে*প হয়ে যায়। বেচারা ইজ্জত হারানোর ভয়ে ভিতরে ভিতরে একদম চুপসে গিয়েছে। এই মেজরটা তাকে কোথায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে ভেবে মনে মনে ইচ্ছামত গালি দিচ্ছে তাকে। এখান থেকে বেঁচে ফিরলে সে মেজর এএকের কিছু না করতে পারলেও নিজের বন্ধু অনিলকে ইচ্ছামত ধোলাই করবে বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
লোকটা তাহমিদের দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

~স্যামুয়েল রোজারিও।

অনিচ্ছা স্বত্তেও করমর্দন করে তাহমিদ। নিজের পরিচয় লুকিয়ে বলে,

~আকাশ রায়।

~হিন্দু?

~হ্যা। আপনি বোধহয় খ্রিস্টান।

~ইউ আর রাইট ইয়াংম্যান।

বলেই তাহমিদের ঘাড়ে বাজেভাবে ছুঁয়ে দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নেয় সেই অসহ্য রকম ছোঁয়া। ইনিয়েবিনিয়ে স্যামুয়েল রোজারিওর সাথে বেশ ভাব জমায়। এদিকে তাহমিদের হাতে পরা ব্রেসলেট প্রচন্ড পছন্দ করে বসে স্যামুয়েল। তাহমিদ ও আমোদেই স্যামুয়েল রোজারিও কে নিজের হাতের থেকে ব্রেসলেট খুলে পরিয়ে দিয়ে বলে উপহার। প্রথমে একটু গাইগুই করেও ব্রেসলেট নেয় সে। পরে দেখা হবে বলে কোনমতে উঠে যায় তাহমিদ। মুখে তার মুচকি হাসি ঝুলছে। যেন কাঙ্ক্ষিত কাজটা করতে পেরেছে।
.
.
.
.
পায়ে ব্যথা থাকায় আরাম করে বসার জন্য সাদাফকে পিছনে মীমের পাশে বসিয়ে নিজে সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে অনিল। গাড়ি ছোটে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। এয়ারপোর্টের সীমানা থেকে বের হয়ে শহরের মূল কেন্দ্র থেকে বেশ খানিকটা দূরে এগিয়ে যায় গাড়ি। রাস্তায় একদল লোকের কিছু একটা মিছিল চলছে। অন্যসময় হলে অনিল বের হয়ে এই মিছিলের কারণ আর উপযুক্ততা অবশ্যই চেক করতো। কিন্তু তার হিসাব অনুযায়ী এই মিছিল কেবলই চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য। এর আড়ালে রয়েছে কোন ধ্বংসের বীজ। যা খালি চোখেই চৌকস মস্তিষ্কে মেপে নিয়েছে মেজর। অন্যকাউকে অবস্থা খারাপ বুঝে অনিল ড্রাইভারকে বলে গাড়ি ঘুরিয়ে জঙ্গলের রাস্তা ধরতে। গাড়ি জঙ্গলের রাস্তায় যাওয়ার আগেই অনিল নিজের কাজের বাহানা দিয়ে সাদাফকে নামিয়ে দেয়। সাথে ড্রাইভারকেও সাদাফের সাথে নামিয়ে উবার কল করে। ড্রাইভারকে নির্দেশ করে যেন সে অবশ্যই সাদাফকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে তারপর যায়। তাদের উবার আসলে তাদের উঠিয়ে দেয়। মীমকে ছাড়ে না। নিজের সাথেই রাখে। নিজে বসে ড্রাইভিং সিটে আর পাশে মীম। অনিল দক্ষ হাতে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছে জঙ্গলের রাস্তা ধরে।
কিছুদূর যাওয়ার পরেই একটা তিন রাস্তার মোড় পড়ে। অনিলের গাড়ি এগিয়ে গেলেই মীম মিররে দেখে বাকি দুই রাস্তা দিয়ে দুইটা জীপ তাদের পিছু নিয়েছে। তা দেখেই মীম অনিলের বাহু নিজের দু’হাতে আঁকড়ে ধরে হালকা গলায় চেঁচিয়ে ওঠে,

“মে..মেজরররর….”

অনিল দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং সামলে একপলক নিজের পাশে বসে থাকা অর্ধাঙ্গিনীর মুখপানে চেয়ে মুচকি হেসে ফেলে।

“আমাদের উপর আক্রমণ হয়েছে। মে*রে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কিন্তু আপনার চিন্তার কিছু নেই মাই হাইনেস। কিছু হবে না। আমি আছি তো।”

তারপর আবারও রাস্তায় মনোযোগ দেয়। কিন্তু বাম হাতটা বাড়িয়ে মীমকে টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে কোলের মধ্যে বসিয়ে মীম সহ নিজেকে আটকে ফেলে তার সীটবেল্টে।
ওই গুটিকয়েক বাক্যে কি ছিল মীম জানে না। আর না জানে এই বুকে টেনে নেওয়ার মানে। সে শুধু জানে এখন সে নিরাপদ। দুনিয়ার সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে সে। তার মেজর তার কিছু হতেই দিবে না।
সম্ভবই না।

..
..
..
চলবে____

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here