#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_১১
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
বাসর ঘরের দরজায় গিয়ে আরাভের মেজাজ যে পর্যায়ে পৌঁছাল। ভেতরে রিন্নি বসে আছে, আর বাইরে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে আরাভের ছোট ভাই ফাহিম আর তার একঝাঁক কাজিন।
আরাভ ঘরের দরজার সামনে আসতেই ফাহিম হাত বাড়িয়ে ব্যারিকেড তৈরি করল। সাথে আরাভের চাচাতো বোন শায়লা আর মামাতো ভাই রিফাত। ফাহিম দাঁত বের করে বলল, “থামুন ভাইজান! গেটে তো আব্বুর ভয়ে ছাড় দিয়েছেন, কিন্তু এই দরজার চাবিকাঠি আমাদের হাতে। বিশ হাজার টাকা বের করুন, নাহলে আজকে রাতে আপনাকে এই বারান্দায় দাঁড়িয়েই নক্ষত্র গুনতে হবে।”
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত তখন পৌনে দুইটা। সে ক্লান্ত স্বরে বলল, “ফাহিম, তোদের কি কমন সেন্স একদম নেই? টাকা কেন দেব? এটা আমার নিজের বাড়ি, নিজের ঘর। আর যে ভেতরে আছে সে এখন আমার লিগ্যাল ওয়াইফ। তোরা কোন লজিকে আমার পথ আটকাচ্ছিস?”
শায়লা চিবুক উঁচিয়ে বলল, “লজিক দিয়ে বিয়ে হয় না ভাইয়া, রিচুয়াল দিয়ে হয়। টাকা না দিলে আজ রিন্নি ভাবীর সাথে আপনার দেখা হওয়া ইমপসিবল।”
আরাভ এবার সত্যিই ক্ষেপে গেল। “শোন, আমার টাকাগুলো সব হালাল উপায়ে কামানো। দিনরাত ল্যাবে খাটুনি দিয়ে, স্টুডেন্টদের খাতা দেখে আমি এই সেভিংস করেছি। তোদের এই অন্যায্য আবদার পূরণ করার জন্য আমি টাকা গাছ থেকে পাড়ি না। ছাড় বলছি!”
ফাহিম নাছোড়বান্দা। “টাকা না দিলে ছাড়ব না। আপনি তো কিপটের একশেষ! ভাবীর ভাগ্য খারাপ যে আপনার মতো এক রোবটের পাল্লায় পড়েছে।”
আরাভ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। সবাই ভাবল টাকা দেবে, কিন্তু আরাভ মানিব্যাগ থেকে একটা ছোট কাঁচি বের করল। ফাহিমরা ভয় পেয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। আরাভ গম্ভীর মুখে বলল, “তোরা যদি আর এক মিনিট আমার পথ আটকাস, তবে কাল থেকে তোদের সবার নেট কানেকশন আমি ডিসকানেক্ট করে দেব। আর ফাহিম, তোর বাইকের চাবি অলরেডি আমার পকেটে। চাবি চাস নাকি টাকা চাস?”
আরাভের রণমূর্তি দেখে কাজিনরা একে অপরের দিকে তাকাল। আরাভ ধমক দিয়ে বলল, “রাস্তা ছাড়! আমার ধৈর্যের সীমা পার হয়ে যাচ্ছে।”
ফাহিম বিড়বিড় করে বলল, “আস্ত একটা হিটলার! ভাবী যে কীভাবে এর সাথে রাত পার করবে আল্লাহই জানে।” তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পথ ছেড়ে দিল। আরাভ গটগট করে ভেতরে ঢুকে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিল।
ঘরের ভেতর রিন্নি খাটের মাঝখানে জড়সড় হয়ে বসে ছিল। দরজার ওই বিকট শব্দে সে প্রায় লাফিয়ে উঠল। সে দেখল আরাভ শেরওয়ানির কলারটা ঢিলে করছে, আর তার চোখমুখ রাগে লাল হয়ে আছে।
আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে বলল, “আমার ওই ভাই আর কাজিনরা কি নিজেদের ডাকাত মনে করে? বিয়ের শুরু থেকে শুধু টাকা আর টাকা! আমার হালাল টাকাগুলো নেওয়ার জন্য ওত পেতে বসে আছে। আপনি কি এদেরকে কিছুই বলতে পারেন না?”
রিন্নি ঘোমটার নিচ থেকে টেনে টেনে বলল, “ওরা তো মজা করছিল স্যার। বাসর রাতে সবাই এমন করে।”
“মজা?” আরাভ হাত নেড়ে বলতে শুরু করল, “মজা আর চাঁদাবাজির মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে মিস রিন্নি! আপনি আর আপনার পরিবার মিলে আমার মাথাটা আজ চিবিয়ে খেয়েছেন। এখন আমার পরিবারও শুরু করল। গেটে টাকা দিলাম, কাজী সাহেবকে এক্সট্রা দিলাম, এখন আবার দরজায়! আপনি কি জানেন এই টাকা দিয়ে আমি ল্যাবের জন্য একটা নতুন স্পেকট্রোমিটার কিনতে পারতাম?”
রিন্নি এবার বিরক্ত হয়ে ঘোমটা সরিয়ে ফেলল। “চুপ করুন তো! বাসর রাতে কেউ স্পেকট্রোমিটারের কথা বলে? আপনি কি সারা জীবন এই খিটখিটে বুড়ো হয়েই থাকবেন? আমার কত ইচ্ছা ছিল আপনি ঘরে ঢুকে আমার প্রশংসা করবেন, একটা গান শোনাবেন… আর আপনি আসছেন টাকার হিসাব নিয়ে?”
আরাভ খাটের এক কোণায় ধপাস করে বসল। “প্রশংসা? আপনার প্রশংসা করার মতো মুড কি রেখেছেন আপনারা? আর গান? ওই তানিনকে ডেকে নিয়ে আসুন, সে গিটার বাজিয়ে আপনাকে গান শোনাবে। আমি এখন শুধু ঘুমাতে চাই।”
রিন্নি এবার ফেটে পড়ল। “যান! ঘুমান গিয়ে! সোফায় গিয়ে ঘুমান। আমি একাই এই খাটে থাকব। আপনাকে বিয়ে করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ইকুয়েশন ছিল।”
আরাভ চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে রিন্নির দিকে ঘুরল। তার রাগটা হঠাৎ করে যেন একটু কমে এল। সে দেখল রিন্নির চোখে পানি টলমল করছে, আর নীল বেনারসিতে তাকে আসলেই অপার্থিব সুন্দর লাগছে।
আরাভ একটু নরম স্বরে বলল, “রিন্নি, আমি আসলে… ওই ফাহিমদের ওপর বিরক্ত ছিলাম। আপনার ওপর নয়।”
রিন্নি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “লাগবে না আপনার সাফাই। আপনি তো আমাকে শুধু প্রজেক্ট মনে করেন। যান, আপনার প্রজেক্টের ফাইল নিয়ে বসে পড়ুন।”
আরাভ এবার রিন্নির একটু কাছে সরে এল। রিন্নির হাতটা ধরার চেষ্টা করতেই রিন্নি হাত সরিয়ে নিল।
আরাভ বিড়বিড় করল, “উফ! ল্যাবের রিঅ্যাকশন হ্যান্ডেল করা সহজ, কিন্তু এই মেয়েকে হ্যান্ডেল করা তো দেখছি অসম্ভব।”
আরাভ হঠাৎ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “রাগ করেছেন? আচ্ছা মানছি, আমার বিহেভিয়ারটা একটু আন-ব্যালেন্সড ছিল। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই নীল শাড়িতে আপনাকে দেখলে যে কেউ তার লজিক হারিয়ে ফেলতে পারে? এমনকি আমার মতো রোবটও।”
রিন্নি এবার আড়চোখে তাকাল। “সত্যি বলছেন? নাকি এটাও আপনার কোনো থিওরি?”
আরাভ পকেট থেকে সেই মখমলের ছোট বক্সটা বের করল। ভেতর থেকে একটা হীরের নাকফুল বের করে রিন্নির সামনে ধরল। “এটা ওই টাকা দিয়ে কেনা না যা ফাহিমরা চাচ্ছিল। এটা আমি আলাদা করে রেখেছিলাম আপনার জন্য। ন্যাকামি ছেড়ে এটা পরুন তো।”
রিন্নি নাকফুলটা দেখে এক মুহূর্তের জন্য সব রাগ ভুলে গেল। সে টেনে টেনে বলল, “আপনি নিজের হাতে পরিয়ে দিন।”
আরাভ নাকফুলটা পরিয়ে দেওয়ার সময় রিন্নির গালের খুব কাছে চলে এল। রিন্নির নিশ্বাসের গতি বেড়ে গেল। আরাভ রিন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “রিন্নি, বাসর রাতে মানুষ অংক করে না ঠিকই, কিন্তু আজ আমি আপনাকে একটা নতুন ইকুয়েশন শেখাতে চাই। যেখানে রাগ প্লাস অভিমান সমান সমান ভালোবাসা।”
রিন্নি এবার হাসল। “আপনি তো রোমান্টিক কথাও ফিজিক্স মিশিয়ে বলেন স্যার!”
আরাভ রিন্নির থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। “কারণ ফিজিক্স মানেই হলো সত্য। আর সত্যটা হলো আমি আপনাকে ছাড়া আমার লাইফের কোনো সলিউশন খুঁজে পাচ্ছি না।”
ঠিক তখনই জানালার ওপাশ থেকে ফাহিমের গলা শোনা গেল, “ভাইজান! লজিক কি শুরু হয়েছে নাকি এখনো টাকার শোকে আছেন?”
আরাভ আবার খেপে গিয়ে জানালার দিকে চেঁচিয়ে বলল, “ফাহিম! তোকে যদি আমি কাল সকালে জ্যান্ত কবর না দিয়েছি তবে আমার নাম আরাভ চৌধুরী না! ভাগ এখান থেকে!”
রিন্নি খিলখিল করে হেসে উঠল। আরাভ আবার রিন্নির দিকে ফিরল। “শুনুন রিন্নি, আমাদের জীবনটা হয়তো এই টম আর জেরির মতোই কাটবে। আমি তাড়া করব, আর আপনি ন্যাকামি করে পালাবেন। রাজি?”
রিন্নি আরাভের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “রাজি স্যার! তবে শর্ত একটাই ল্যাবে কিন্তু এখনো আমি আপনার স্টুডেন্ট, সেখানে ছাড় দিতে হবে।”
আরাভ রিন্নির চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল, “সেটা ল্যাবে গিয়ে দেখা যাবে। এখন আপাতত নো মোর ফিজিক্স, শুধু আমরা। আচ্ছা আশা করি সুন্দর হয়েছে তোমার? ”
রিন্নি অবাক হয়ে বলল,” মানে?”
আরাভ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ” মানে আর পাঁচটা বাসর রাতের মতোই তো রোমান্টিক হলো। এবার বই বের করো। সামনের মাসেই তোমার ফাইনাল পরিক্ষায় তারিখ দিয়ে দিবে। ”
রিন্নি ঠোঁট ফুলিয়ে বিড়বিড় করলো, “এটাই বাকি ছিল। স্বপ্ন সত্যি হলে গেল। এমন এত স্বপ্ন দেখলাম তা পূরণ হলো না এটাই হতে হলো। শালা খাচ্চার একটা। তোর বাচ্চা তোকে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে দিবে না দেখিস!”
আরাভ নিজের চশমাটা পড়ে বলল,”আমাকে গালি দেওয়া শেষ হলে এবার বই বের করো!”
রিন্নি কপাল হাত। “মন পড়তে পারেন নাকি আপনি? ”
আরাভ:” সময় নষ্ট করছো?”
রিন্নি:” বই আনি নি সাথে।”
আরাভ এবার চিৎকার করে উঠল।” কীহ্? তাহলে তুমি আসছো কেন?”
রিন্নি :” আরে আজব তো! কখনও শুনছে মেয়ে সাথে করে বইখাতা নিয়ে আসে? খাট আসবাবপত্র নিয়ে আসে”
আরাভ :” তুমি স্টুডেন্ট তুমি বই আনবা। এটাই তোমার একমাত্র জীবনসঙ্গী। ”
রিন্নি :”আবার শুরু হলো জ্ঞান! তাহলে আপনি কে?”
আরাভ হতাশ হয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তে তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসল হাতে তার রিন্নির ক্লাসের বই।
এক বিশ্বজয়ী হাসি দিয়ে আরাভ বলল,”আমি তো ভুলেই গেছিলাম আগের বছরের ফাহিমের বই তো এখনও আছে। তাড়াতাড়ি আসো আর পড়া শুরু করো।”
রিন্নি উপরের সিলিংফ্যানে দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ধন্যবাদ এত রোমান্টিক এক রাত আমায় উপহার দেওয়ার জন্য। শালা হিটলার।’
চলবে,,,,
(রোজায় কোনো রোমান্টিক আশা করলে পাপ লাগবো😁)

