বিপরীত_মেরুর_টানে #পর্ব_৩০

0
12

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_৩০
#লেখনীতে: আরিবা নাওশীন

সোনিয়া আর ড্রাগনের সেই নাটকের পর ক্যাফেতে যখন পিনপতন নীরবতা নেমে এল, রিন্নি তখনও আরাভের শার্টের হাতা খামচে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর বুকের ধড়ফড়ানিটা কমছেই না। আরাভ খুব সাবলীলভাবে নিজের ট্যাবটা পকেটে রেখে রিন্নির দিকে তাকাল। ওর সেই গম্ভীর প্রফেসরের চশমার আড়ালে এখন এক অদ্ভুত বিজয়ী হাসি।

আরাভ রিন্নির কপালে ঘাম জমে থাকা দেখে নিজের রুমাল দিয়ে মুছিয়ে দিল। “কী হলো জেরি? প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস কি বেশি টাফ হয়ে গেল? তোমার হাত যে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে!”

রিন্নি এবার যেন ধাতস্থ হলো। সে এক ঝটকায় আরাভকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। “আপনি… আপনি একটা আস্ত নির্দয় রোবট! আমাকে নিয়ে ডেটে আসার নাম করে এখানে অ্যাকশন মুভি দেখালেন? আপনার কি একবারও মনে হয়নি যে আমার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?”

আরাভ মুচকি হেসে রিন্নিকে আবার কাছে টেনে নিল। “তোমার হার্ট অত দুর্বল নয় রিন্নি। যে মেয়ে প্রফেসরের চোখের ওপর চোখ রেখে হুমকি দেয়, তার হার্ট জ্যাম হওয়ার সুযোগ নেই। আর শোনো, ওই ড্রাগনটা তোমাকে ছোঁয়ার আগেই ওর সিস্টেম আমি ক্র্যাশ করে দিয়েছিলাম। বিশ্বাস হচ্ছে না?”

রিন্নি মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। আরাভ এবার নিচু স্বরে বলল, “চলো, এবার সত্যি কোনো নিরিবিলি জায়গায় যাই। যেখানে শুধু তুমি আর আমি। কোনো পুলিশ নেই, কোনো হ্যাকার নেই। আজ রাতে কিন্তু বাপের বাড়ি যাওয়ার পাসপোর্ট আমি বাতিল করে দিয়েছি।”

গাড়িটা যখন লেক সাইডের একটা সুন্দর নির্জন রিসোর্টের সামনে থামল, তখন সন্ধ্যার ছায়া নামতে শুরু করেছে। চারপাশটা জোনাক পোকার আলোয় ঝলমল করছে। রিন্নি গাড়ি থেকে নেমে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

“এটা তো কোনো ল্যাবরেটরি মনে হচ্ছে না স্যার? এখানে কি কোনো লুকানো সেন্সর আছে?” রিন্নি বাঁকা চোখে তাকাল।

আরাভ হাসতে হাসতে রিন্নির কাঁধে হাত রাখল। “এখানে শুধু একটা সেন্সর আছে সেটা হলো আমার চোখ। তোমার প্রতিটি মুভমেন্ট আজ আমি রেকর্ড করব, তবে সিসিটিভিতে নয়, আমার মনের হার্ড ড্রাইভে।”

ওরা রিসোর্টের খোলা বারান্দায় ডিনার করতে বসল। মোমবাতির আলোয় আরাভকে আজ বড্ড মায়াবী লাগছে। সোনিয়ার দেওয়া অপবাদ আর বিকেলের সেই উত্তেজনার পর এই মুহূর্তটা যেন এক টুকরো স্বর্গ।

আরাভ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, “রিন্নি, তোমাকে একটা সত্যি কথা বলা হয়নি। সোনিয়া যে আজ ক্যাফেতে ড্রাগনকে নিয়ে এসেছিল, ওটা ও নিজের ইচ্ছায় করেনি। ওকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল।”

রিন্নি কফির মগে চুমুক দিয়ে অবাক হয়ে বলল, “মানে? ওকে আবার কে ব্ল্যাকমেইল করবে?”

আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিন্নির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। “সোনিয়া আসলে ড্রাগনের বোনের মতো। কিন্তু ওদের পেছনের আসল মাস্টারমাইন্ড একজন মহিলা। যাকে সোনিয়াও চেনে না। সোনিয়া শুধু আমার ওপর ওর পুরনো ভালো লাগা থেকে এই ষড়যন্ত্রে পা দিয়েছিল। কিন্তু ও বুঝতে পারেনি যে ওর আবেগটাকে কেউ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।”

রিন্নি এবার নরম গলায় বলল, “সোনিয়াকে কি পুলিশ খুব ম-ারবে? ওর তো আসলে কোনো অপরাধ নেই, ও তো শুধু হিংসা করত আমাকে।”

আরাভ রিন্নির আঙুলে আলতো করে একটা চাপ দিয়ে বলল, “হিংসা আর ষড়যন্ত্রের মাঝে একটা পাতলা দেয়াল থাকে রিন্নি। সোনিয়া সেটা টপকে গিয়েছিল। তবে ওর জন্য আমার মায়া নেই, আমার চিন্তা তোমাকে নিয়ে। ওরা এখন নতুন এক খেলায় নেমেছে। সোনিয়া জেল থেকে একটা কথা চিৎকার করে বলছিল সেটা হলো তোমার আম্মুর কাছে থাকা কোনো এক পুরনো চিঠির কথা।”

রিন্নি চমকে উঠল। “আমার আম্মু? উনি তো সাধারণ একজন গৃহিনী। ওনার কাছে কী চিঠি থাকবে?”

আরাভ জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওটাই তো কোড জেরি। যে কোডটা আমি এখনো ডিকোড করতে পারিনি। তোমার আম্মুর সাথে আমার কাল কথা বলতে হবে। তবে আজ রাতে নয়। আজ রাতে আমি আর কোনো জটিল সমীকরণ মাথায় নিতে চাই না।”

আরাভ হঠাৎ রিন্নিকে টেনে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। রিন্নি থতমত খেয়ে বলল, “আরে স্যার! কি করছেন? কেউ দেখে ফেলবে তো!”

আরাভ রিন্নির চুলের ঘ্রাণ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ থেকে এই ‘স্যার’ শব্দটা ব্যান করে দিলাম। আজ আমি তোমার কাছে কোনো প্রফেসর নই। আজ আমি শুধুই আরাভ। যে তোমার ওই হাঁটুর নিচে থাকা বুদ্ধি আর কপালে থাকা রাগের প্রেমে পড়েছে।”

রিন্নি লজ্জায় আরাভের বুকে মুখ লুকাল। সে ফিসফিস করে বলল, “আপনার এই শিরায় থাকা শয়তানটা কি আজ সত্যিই শান্ত?”

আরাভ রিন্নির কানে আলতো করে একটা কামড় দিয়ে বলল, “শয়তানটা শান্ত জেরি, কিন্তু প্রেমিকটা আজ বিদ্রোহী। আজ রাতে কোনো পাহারা চলবে না। আজ রাতে শুধু আত্মসমর্পন হবে।”

চৌধুরী ভিলা: রাত ১২টা
ওরা যখন বাড়ি ফিরল, দেখল ড্রয়িংরুমের আলো এখনো জ্বলছে। আফজাল চৌধুরী আর রোকেয়া বেগম বসে আছেন। ফাহিম এক কোণায় বসে ফোনে কাকে যেন ধমকাচ্ছে। সেটা অবশ্যই নয়না হবে।

রিন্নিকে দেখেই রোকেয়া বেগম এগিয়ে এলেন। “রিন্নি মা, তোর আম্মু ফোন করেছিলেন। উনি খুব কান্নাকাটি করছেন।”

রিন্নি ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী হয়েছে মা? আম্মু কাঁদছেন কেন?”

আফজাল চৌধুরী একটা খাম আরাভের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে এই চিঠিটা পাঠিয়েছে কেউ। রিন্নির আম্মুর পুরনো একটা ছবি আর সাথে একটা হুমকি। রিন্নিকে নাকি ওরা তুলে নিয়ে যাবে যদি না তুই ওই ব্লু-চিপটার ফাইনাল কোড ওদের দিস।”

আরাভের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে রিন্নির দিকে তাকাল। রিন্নির চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠেছে। আরাভ এক ঝটকায় চিঠিটা নিয়ে কুঁচকে ফেলল।

সে রিন্নিকে আগলে ধরে বজ্রকণ্ঠে বলল, “আব্বু, ওরা আমার জেরি’র সাথে অন্যায় করেছে সহ্য করেছি, আমার চরিত্রে কালি ছিটিয়েছে তাও মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমার শ্বশুরবাড়িতে হাত দিয়েছে এটা ওরা ঠিক করেনি। ফাহিম! ড্রোনের ক্যামেরা চেক কর। চৌধুরী ভিলার চারপাশের এক ইঞ্চিতেও যেন কোনো অজানা ছায়া না থাকে!”

আরাভ রিন্নিকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ওর কানের কাছে বলল, “জেরি, কালই আমরা তোমার আম্মুর কাছে যাব। ওই চিঠির রহস্য আর তোমার ছোটবেলার যে কোডটা ওরা খুঁজছে, সেটা আমি বের করবই। ভয় পেও না, তোমার এই বর থাকতে কেউ তোমার চোখের জল স্পর্শ করতে পারবে না।”

রিন্নি আরাভের হাতটা শক্ত করে ধরে ঘরে ঢুকল। সে জানে, আগামীকাল এক নতুন ঝড়ের শুরু হবে। কিন্তু এই প্রফেসরের ওপর ওর এখন অগাধ বিশ্বাস।

চলবে…
(পরিক্ষার কারণে তেমন সময় পাচ্ছি না। আর পরিক্ষা চলে তাই তেমন ভাবতেও পারচ্ছি না। এই ২-৩ পর্ব কষ্ট করে বুঝে নিন। পরের কাহিনীর জোট খুলব। এখন মাথা চলছে না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here