#রিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_৩
#আরিবা_নাওশীন
আরাভের দেওয়া পারসোনাল অশান্তি টেক্সটটা পড়ার পর রিন্নির সারা রাত ঘুম হলো না। একবার ভাবল রিপ্লাই দেয় “আপনি আস্ত একটা হিটলার!” কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, কাল তো আবার ওনার ক্লাসেই যেতে হবে। লোকটা যা খিটখিটে, হয়তো ল্যাব থেকেই বের করে দেবে।
পরদিন সকালে রিন্নি যখন ইউনিভার্সিটির গেটে পৌঁছাল, দেখল এক বিশাল জটলা। সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে আছে পার্কিং জোনের দিকে। রিন্নি ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই তার চোখ চড়কগাছ!
কালো রঙের একটা জাঁদরেল ইয়ামাহা আর-ওয়ান ফাইভ (R15) বাইক থেকে এক যুবক নামছে। পরনে নেভি ব্লু জিন্স, তার ওপর কালোলেদার জ্যাকেট। চোখে ডার্ক সানগ্লাস। লোকটা যখন হেলমেট খুলল, রিন্নির মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।
এ কি আমাদের সেই হাড়কিপ্টে হাসির প্রফেসর আরাভ চৌধুরী? চশমা ছাড়া তাকে দেখতে কোনো মুভি স্টারের চেয়ে কম লাগছে না। রিন্নি বিড়বিড় করে বলল, “আল্লাহ! রোবটটা তো দেখি জ্যান্ত মানুষ হয়ে গেছে!”
আরাভ বাইক থেকে নেমে চুলগুলো একবার হাত দিয়ে ঠিক করে নিল। ঠিক তখনই তার নজর পড়ল রিন্নির ওপর। রিন্নি তখনো হাঁ করে তাকিয়ে আছে। আরাভ হেঁটে তার সামনে এসে দাঁড়াল। সানগ্লাসটা একটু নামিয়ে নাকের ওপর রেখে বলল, “কী হলো মিস রিন্নি? মুখটা বন্ধ করুন, মাছি ঢুকতে পারে।আমি জানি আমি অনেক হ্যান্ডসাম। আর হ্যাঁ, গত রাতের ম্যাথটা ঠিক করেছেন তো?”
রিন্নি থতমত খেয়ে বলল, “ইয়ে… মানে স্যার,আপনি বাইক চালাতে পারেন? আমি তো ভাবছি আপনি শুধু রিকশায় চড়েন আর ফিজিক্সের সূত্র আওড়ান।”
আরাভ একটা বাঁকা হাসি দিল। “বাইক চালানো কি ফিজিক্সের গতির সূত্রের বাইরে? মোশন, ভেলোসিটি আর ব্যালেন্স এগুলো ঠিক থাকলে বাইক চালানো কোনো ব্যাপারই না। ”
রিন্নি আর কথা বাড়ালো না। এমনিও তার সাথে কথা পারা যাবে না। কোথা দিয়ে কোনখানে নিয়ে কিভাবে ঘুটিয়ে আসবে পরে নিজের মাথাই ঘুরে যাবে। তাই ক্লাসে চলে গেল।
ল্যাবের ভেতর এসি চলছে ঠিকই, কিন্তু রিন্নির মনে হচ্ছে সে আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে। আজ ভাইভা। সে একেকজনকে ডাকছে আর এমন কঠিন কঠিন প্রশ্ন করছে যে একেকজন বের হওয়ার সময় মনে হচ্ছে যুদ্ধ ফেরত সৈনিক।
রিন্নির পালা আসতেই সে বুক দুরুদুরু করে কেবিনে ঢুকল। আরাভ ফাইলের দিকে তাকিয়ে মাথা না তুলেই বলল, “বসুন মিস গিন্নি… থুড়ি, মিস রিন্নি।”
রিন্নি দাঁত কিড়মিড় করে বসল। “স্যার, আপনি কি আমার নাম ভুলে গেছেন নাকি ইচ্ছা করে করছেন?”
আরাভ এবার তাকাল। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বলল, “নাম মনে রাখা ফিজিক্সের কোনো দরকারি থিওরি নয়। যাই হোক, আমাকে ল অব থার্মোডাইনামিকস-এর সেকেন্ড ল-টা একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলুন তো।”
রিন্নি আমতা আমতা করে টেনে টেনে বলল, “স্যার, আসলে… তাপ তো সবসময় গরম থেকে ঠান্ডার দিকে যায়… মানে…”
“আমি ন্যাকামি শুনতে চাইনি, লজিক চেয়েছি,” আরাভ টেবিল চাপড়ে বলল। “আপনি কি জানেন এই ‘গরম থেকে ঠান্ডা’ হওয়ার প্রসেসেই আপনার আর আমার বিয়েটা হচ্ছে? আমি হলাম সেই গরম মাথা, আর আপনার মাথায় তো ঠান্ডা বাতাস ছাড়া আর কিছু নেই।”
রিন্নি অপমানে ফেটে পড়ল। “আপনি ভাইভাতেও এসব ব্যক্তিগত কথা কেন আনছেন? আপনি কি প্রফেশনাল হতে পারেন না?”
আরাভ বাঁকা হাসল। “যখন আপনি আমার ক্লাসে দেরি করে আসেন, তখন তো আপনিও আনপ্রফেশনাল হন। যান, আপনার ভাইভা শেষ। আপনি গাধার মতো উত্তর দিয়েছেন, তাই আপনাকে সি-প্লাস দেওয়া উচিত। কিন্তু যেহেতু আপনি আমার ‘হবু পারসোনাল অশান্তি’, তাই বি-মাইনাস দিয়ে ছেড়ে দিলাম।”
রিন্নি রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল, “আপনার এই দয়ার মার্ক আমার লাগবে না স্যার! আমি আব্বুকে বলব আমি আপনার মতো একটা রোবটকে বিয়ে করব না।”
আরাভ হেলান দিয়ে বসে খুব শান্তস্বরে বলল, “আপনার আব্বু অলরেডি আমাকে তার প্রয়োজনীয় সব কথা বলেছেন। তিনি আমাকে আপনার চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেন। সো, গুড লাক উইথ দ্যাট!”
বিকেলে আরাভ বাসায় ফিরতেই দেখল ড্রয়িংরুমে এলাহি কাণ্ড। আফজাল সাহেব ডেকোরেটরের সাথে চিল্লাপাল্লা করছেন।
“আরে ভাই, গেইটটা লাল কেন হবে? আমার ছেলের বউ নীল পছন্দ করে, গেইট নীল করবেন!” আফজাল সাহেবের ধমক শুনে আরাভ দাঁড়িয়ে পড়ল।
আরাভ ব্যাগটা রেখে বলল, “আব্বু, তুমি কি পা-গল হয়ে গেছ? নীল গেইট কেউ দেয়? মনে হবে কোনো হাসপাতালের এমার্জেন্সি গেট।”
আফজাল চৌধুরী ছেলের দিকে তেড়ে এলেন। “তোর কাছে কে জানতে চাইছে? তুই তো একটা অসামাজিক জা-নোয়ার। নিজের বিয়ের খবরটাও তো আমি না বললে পাড়ার লোক জানত না। আর খবরদার, সাজগোজের ব্যাপারে কোনো ফিজিক্সের মাথা খাটাবি না!”
আরাভ বিরক্ত হয়ে সোফায় ধপাস করে বসল। “আব্বু, বিয়েটা কি তোমার নাকি আমার? তুমি যেভাবে লাফাচ্ছ, মনে হচ্ছে তুমিই নতুন করে পালকি চড়বে।”
“তোর বিয়ে মানেই তো আমার মুক্তি! তোকে ওই মেয়ের হাতে তুলে দিয়ে আমি একটু শান্তিতে বিড়ি ফুঁকব,” আফজাল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন। “তা রিন্নি মা’র কী খবর? ক্লাসে কি আজও ডাস্টার ছুড়ে মে*রেছিস?”
আরাভ গুমরা মুখে বলল, “ও তো পড়ার নামে ন্যাকামি করে। আজকে ভাইভাতে থার্মোডাইনামিকস বলতে গিয়ে আমাকেই উদাহরণ বানিয়ে ফেলল।”
আফজাল চৌধুরী এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। “সাবাস মা রিন্নি! তোর মতো শক্ত হাড়কে ওই মেয়েই চিবিয়ে খাবে। যা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়। কাল তোর হবু শ্বশুরবাড়িতে মিষ্টি পাঠাতে হবে।”
এদিকে রিন্নির মাথায় চলছে বিশাল শয়তানি বুদ্ধি। সে জানে সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। তাই সে তার বেস্ট ফ্রেন্ড তানিয়াকে ফোন করল।
“তানিয়া, প্ল্যান রেডি। আমি এখন ফিট হওয়ার ভান করব। যখনই আরাভ আসবে, আমি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করব। আর তুই বলবি যে আমার কোনো একটা মানসিক সমস্যা আছে। দেখি লোকটা তখন বিয়ে করে কি না!”
তানিয়া হাসতে হাসতে বলল, “দোস্ত, আরাভ স্যার কিন্তু ফিজিক্সের মানুষ, উনি পালস চেক করলেই তোর অভিনয় ধরে ফেলবেন।”
“ধরতে পারবে না! আমি হার্টরেট কমানোর জন্য ইউটিউবে টেকনিক দেখেছি,” রিন্নি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।
পরদিন সকালে আরাভ আর তার মা রিন্নিদের বাসায় এলেন বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করতে। তানিয়া আসছে বান্ধবির বিয়ের বলে কথা তাই। রিন্নি তখন ঘরে ওড়না পেঁচিয়ে শুয়ে আছে। যখনই আরাভ তার রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, রিন্নি একটা বিকট চিৎকার দিয়ে মেঝের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল।
হাসান সাহেব আর বেগম সাহেবা দৌড়ে এলেন। “মা! মা কী হয়েছে তোর?”
রিন্নি চোখ উল্টে অদ্ভুত সব আওয়াজ করতে লাগল। তানিয়া পাশ থেকে কান্নার ভান করে বলল, “আঙ্কেল, রিন্নির তো সেই পুরনো রোগটা আবার শুরু হয়েছে! ও মাঝেমধ্যেই নিজেকে আইনস্টাইনের নাতনি মনে করে উল্টোপাল্টা কথা বলে!”
আরাভ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। তার মুখে সেই পরিচিত ধূর্ত হাসি। সে এগিয়ে এসে রিন্নির পাশে বসল। রিন্নি মনে মনে ভাবল, “এবার বাছাধন, পালাও! পা-গল বউ কে চায়?”
আরাভ হঠাৎ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “অ্যাক্টিংটা বেশ ভালো হচ্ছে। তবে একটা ইনফরমেশন দিয়ে রাখি নিউটনের থার্ড ল অনুযায়ী, আপনি মেঝেতে যত জোরে আছাড় খেয়েছেন, আপনার কোমরে তার সমান প্রতিক্রিয়া বল কাজ করছে। ব্যথাটা কি একটু বেশি লাগছে না?”
রিন্নি চোখ বন্ধ করেই দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বিড়বিড় করল, “আপনি একটা আস্ত শয়তান!”
আরাভ উচ্চস্বরে সবার উদ্দেশ্যে বলল, “আংকেল, চিন্তার কিছু নেই। এটা মোটেও মানসিক রোগ না। এটা আসলে বিয়ের আগে ভীতি বা প্রি-ওয়েডিং স্ট্রেস। আমি ফিজিক্সের ল্যাবে এর চেয়েও বড় বড় শক সামলেছি। আপনারা বিয়ের ডেট ঠিক করুন, ওকে ঠিক করার দায়িত্ব আমার।”
রিন্নি এবার চোখ খুলে রাগে উঠে বসল। “আপনি কীভাবে বুঝলেন আমি নাটক করছি?”
আরাভ হাসল। “রিন্নি, আপনি যখন পড়ে গিয়েছেন, তখন আপনার হাতটা মেঝেতে এমনভাবে রেখেছিলেন যেন চোট না লাগে। একজন সত্যিকারের অজ্ঞান হওয়া মানুষ নিজের হাড় বাঁচিয়ে পড়ে না।”
সবাই হাহাহা করে হেসে উঠল। রিন্নি বুঝল, এই লোকের কাছে তার কোনো চালাকিই খাটবে না। সে যেন এক জ্যান্ত ডিটেক্টর মেশিন!
রিন্নি বিছানা ছেড়ে উঠে গজ গজ করতে করতে বারান্দায় গেল। আরাভ পেছন থেকে এসে বলল, “বিয়ে ভাঙার প্রজেক্টটা কি এখানেই ক্লোজড? নাকি আরও কোনো এক্সপেরিমেন্ট বাকি আছে?”
রিন্নি টেনে টেনে বলল, “আপনি শুধু আমার বিয়ের রাতটা আসতে দিন। ওইদিন আপনাকে দিয়ে আমি সারা রাত ঘর মোছাব, দেখে নেবেন!”
আরাভ চশমাটা ঠিক করে বললেন, “নিশ্চয়ই। যদি ঘর মোছার মাধ্যমে ফ্রিকশন বা ঘর্ষণ বল কমানো যায়, তবে আমি রাজি।তবে সেই রাতে আমার অন্য প্লান আছে। সেটা বলছি না কারণ আমি কাজে বিশ্বাসী। এমনিও লজ্জা-শরম আমারও তো আছে।যদিও আপনার সামনে বিয়ে আগে পর্যন্তই দেখাব তারপরও এখন বলতে পারব না। কাল ল্যাবে দেখা হচ্ছে, মিসেস চৌধুরী।”
রিন্নি হা করে তাকিয়ে রইল। লোকটার সাথে ঝগড়া করেও কেন জানি জেতা যাচ্ছে না। উল্টো তার এই অদ্ভুত সব কথাগুলো কেন জানি শুনতে মন্দও লাগছে না।
চলবে,,,,,

