বিপরীত_মেরুর_টানে #পর্ব_২

0
17

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_২
#আরিবা_নাওশীন

আরাভরা চলে যাওয়ার পর রিন্নি নিজের ঘরে গিয়ে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথায় তখনো আরাভের সেই ধূর্ত হাসি আর ওয়েলকাম টু দ্য টিম বাক্যটা লুপের মতো বাজছে। নীল শাড়িটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, কিন্তু রিন্নির মনে হচ্ছে ওটা একটা ফাঁসের মতো তাকে শ্বাসরোধ করে মা`রছে।

“আম্মা! ও আম্মা!” রিন্নি ঘর থেকে চিৎকার করে উঠল।

তার মা বেগম সাহেবা ঘরে ঢুকে দাঁত বের করে হাসলেন, “কী হয়েছে রে মা? জামাই তো মাশাআল্লাহ হীরের টুকরো! যেমন স্মার্ট, তেমন শিক্ষিত। তোকে তো একদম মানিয়েছে পাশে।”

রিন্নি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বসে টেনে টেনে বলল, “হীরের টুকরো না ছাই! উনি আস্ত একটা পাথর। আম্মা, তুমি জানো না উনি ক্লাসে কী করেন। গত পরশুদিন শুধু একটা ভুল সূত্রের জন্য আমাকে আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। আর তুমি সেই জল্লাদের হাতে আমাকে তুলে দিচ্ছো?”

মা ভ্রু কুঁচকে বললেন, “আরে পাগ°লী, বাইরে কড়া মানুষরাই ভেতরে নরম হয়। আর তুই তো একটু ইমম্যাচিউর, তোকে শাসন করার জন্য ওরকম একজনই দরকার। আমি তো রাজি, তোর আব্বুও রাজি। ব্যস, আগামী মাসেই তোর ল্যাবরেটরি শিফট হয়ে আরাভের ড্রয়িংরুমে চলে যাচ্ছে!”

বাড়ির ইকুয়েশনে সে এখন একদম একা।

পরদিন সকালে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার সময় রিন্নির পা সরছিল না। আজ ল্যাবে আরাভ চৌধুরীর ক্লাস। কালকের সেই ব্যক্তিগত ঘটনার পর আজ তার মুখোমুখি হওয়া মানেই নিজের সম্মান বিসর্জন দেওয়া।

ল্যাবে ঢুকে দেখল সব স্টুডেন্ট পিনপতন নীরবতায় কাজ করছে। আরাভ চৌধুরী তার সেই চিরচেনা গম্ভীর মেজাজে সবার কাজ চেক করছে। পরনে আজ নেভি ব্লু শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চশমার ফ্রেমটা নাকের ডগায়। রিন্নি সন্তর্পণে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসার চেষ্টা করতেই সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“মিস রিন্নি রহমান, আপনি কি মনে করেন এটা আপনার শ্বশুরবাড়ি যে যখন খুশি হেলেদুলে আসবেন?”

পুরো ল্যাব হো হো করে হেসে উঠল। রিন্নি অপমানে লাল হয়ে গেল। মনে মনে বলল, “কাল রাতে তো শ্বশুরবাড়ি করার জন্যই ওভাবে দাঁত বের করে হাসছিলেন, আজ আবার কী হলো?”

রিন্নি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “সরি স্যার, বাস মিস হয়ে গিয়েছিল।”

আরাভ তার ডেস্কে ফিরে গিয়ে ফাইল চেক করতে করতে বলল, “বাস মিস করেছেন নাকি আয়নার সামনে ন্যাকামি করতে গিয়ে সময় পার করেছেন সেটা আমি ভালো জানি। ল্যাব শেষে আমার কেবিনে আসবেন। আপনার গত সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্টে প্রচুর ভুল আছে।”

রিন্নি রাগে গজগজ করতে করতে ল্যাব শেষ করল। তানিয়া ফিসফিস করে বলল, “কিরে, কাল তো পাত্রপক্ষ আসার কথা ছিল। কী হলো? স্যার কি কিছু জানেন?”

রিন্নি দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “জানবেন না মানে? উনি নিজেই তো সেই পাত্র! আস্ত একটা ভণ্ড।”

তানিয়া চোখ কপালে তুলল, “কীহ! আরাভ স্যার তোর বর হবে? দোস্ত, তুই তো শেষ! বাসর রাতে তোকে দিয়ে ক্যালকুলাস করাবে নির্ঘাত।”

ল্যাব শেষে রিন্নি ভয়ে ভয়ে আরাভের কেবিনে ঢুকল। কেবিনে আরাভ তখন খুব মন দিয়ে ল্যাপটপে কিছু টাইপ করছে। রিন্নিকে দেখেও না দেখার ভান করে কিছুক্ষণ দাড় করিয়ে রাখল। গুমোট নীরবতা ভাঙল আরাভ নিজেই।

“বসুন।”

রিন্নি ধীরেসুজে বসল। আরাভ ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “কাল বাসায় যা হয়েছে তা ল্যাবে কেন টেনে আনছেন? আপনার চেহারায় বিরক্তি স্পষ্ট। প্রফেশনাল লাইফে পারসোনাল ইমোশন আনবেন না।”

রিন্নি এবার ফেটে পড়ল, “আপনি আনছেন না? সবার সামনে ওভাবে অপমান করলেন কেন? আপনি তো জানেন আমি কেন দেরি করেছি। সারা রাত টেনশনে আমি ঘুমাতে পারিনি।”

আরাভ ল্যাপটপ বন্ধ করে রিন্নির দিকে ঝুঁকল। চশমাটা টেবিলের ওপর রাখল। তার চোখের ধারালো চাউনি দেখে রিন্নি কথা হারিয়ে ফেলচ্ছে। আরাভ নিচু গলায় বলল, “টেনশন কেন? আমাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার উত্তেজনায় নাকি বাসর রাতের সিলেবাস নিয়ে দুশ্চিন্তায়?”

রিন্নি তোতলাতে শুরু করল, “আ,,, আপনি,,, আপনি কী অসভ্য! আমি একদম বিয়ে করব না আপনাকে।”

আরাভ একটা সিগনেচার মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “তা তো কালকেও বলেছিলেন বারান্দায়। লাভ তো কিছু হলো না। আমার আব্বু অলরেডি কমিউনিটি সেন্টার বুকিং দিতে চলে গেছে। আপনার বাবাও বোধহয় ডেকোরেটর নিয়ে ব্যস্ত।”

“আপনি কেন এমন করছেন?” রিন্নির চোখে জল টলমল।

আরাভের মুখভঙ্গি একটু নরম হলো, তবে গম্ভীর্য গেল না। তিনি বললেন, “শুনুন রিন্নি, ফিজিক্সে আমরা পড়ি যে বিপরীত মেরু একে অপরকে আকর্ষণ করে। আপনার ওই অতি ন্যাকামি আর আমার এই অতি গাম্ভীর্য এই দুটোকে এক করলে রেজাল্ট কী আসে তা দেখার জন্য আমি এই এক্সপেরিমেন্টটা করছি। ডোন্ট ওয়ারি, আপনাকে খুব বেশি কষ্ট দেব না। তবে হ্যাঁ, ল্যাবে দেরি করলে ডাস্টার কিন্তু আপনার কপালেই থাকবে।”

রিন্নি কান্না গিলে বলল, “আমি আব্বুকে বলব আপনি আমাকে প্রজেক্ট বলছেন। আমি কোনো জড় পদার্থ না!”

“বলুন গে। কিন্তু আপনার আব্বু আমার ফ্যান। তিনি বরং খুশিই হবেন যে আমি আপনাকে ঠিক করার দায়িত্ব নিয়েছি,” আরাভ আবার ল্যাপটপ খুলল। “এখন যান। কাল যেন অ্যাসাইনমেন্ট রি-সাবমিট করা থাকে। আর শোনো”

রিন্নি দরজার কাছে গিয়ে থামল। আরাভ মুখ না তুলেই বলল, “কাল নীল শাড়িতে খুব একটা খারাপ লাগছিল না। তবে নীল রঙটা একটু বেশিই মায়াবী, আপনার মতো বোকাদের সাথে যায় না।”

রিন্নি হনহন করে বেরিয়ে এল। লোকটা প্রশংসা করল নাকি অপমান, সেটা বুঝতে বুঝতেই তার আধঘণ্টা কেটে গেল।

বিকালে আরাভ বাসায় ফিরতেই আফজাল চৌধুরী ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছিলেন। ছেলেকে দেখে তিনি বললেন, “কিরে প্রফেসর সাহেব, গিন্নিকে দেখে আসলে ক্লাসে?”

আরাভ সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, “গিন্নি না আব্বু, ওটা একটা আপদ। এখনো বাচ্চা রয়ে গেছে।”

আফজাল সাহেব হাসলেন, “তুই তো আবার বড় বেশি মুরুব্বি হয়ে গেছিস! তা বিয়েটা কি ভেঙে দেব? কাল তো খুব কষ্ট দেখাচ্ছিলে।”

আরাভ হঠাৎ নড়েচড়ে বসল, “না না, ভাঙার দরকার নেই। যখন কথা দিয়েছি, তখন রাখা উচিত। তাছাড়া লজিক্যালি চিন্তা করলে, আমার এখন সেটল হওয়া দরকার।”

আফজাল চৌধুরী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “লজিক রাখ তোর পকেটে। মেয়েটারে তো ভয় দেখাচ্ছিস না তো? দেখিস, বাসর রাতে যেন ও তোকে দেখে পুলিশে ফোন না দেয়!”

আরাভ বিরক্ত হয়ে বলল, “আব্বু! তুমি একটু বেশি বলছো।”

“বেশি তো বলবোই! যে ছেলে নিজের বিয়ের পাত্রী দেখার সময় বাপের সাথে ওইরকম ট্যারাট্যারা কথা বলতে পারে, তার কপালে দুঃখ আছে।”

আরাভ মনে মনে হাসল। রিন্নিকে জ্বালাতে তার বেশ ভালোই লাগছে। যে মেয়েটা ক্লাসে সবসময় বিড়াল ছানার মতো মুখ করে থাকে, তাকে নিজের শাসনে রাখার মধ্যে একটা আলাদা থ্রিল আছে। কিন্তু
এই প্রজেক্ট সামলাতে গিয়ে তার নিজের হার্টবিট ফিজিক্সের সব নিয়ম ভেঙে ত্বরান্বিত হবে।

রাতের বেলা রিন্নিকে টেক্সট করল আরাভ। রিন্নি তখন পড়ার টেবিলে বসে স্যারের মুণ্ডুপাত করছিল। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল “অ্যাসাইনমেন্টের ৩ নম্বর ম্যাথটা ভুল আছে। ওটা ঠিক না করলে কাল ক্লাসে প্রবেশ নিষেধ। ইতি, তোমার হবু পারসোনাল অশান্তি।”

রিন্নি ফোনটা বিছানায় আছাড় মা-রল। তারপর রাগে টেনে টেনে বিড়বিড় করতে লাগল, “হবু পারসোনাল অশান্তি! আসুক বিয়েটা হোক, আপনার লাইফ যদি আমি প্যান্ডুলামের মতো না দোলাইছি তবে আমার নামও রিন্নি না!”

চলবে,,,
(একটু ২-৩ লাইনে কমেন্ট করুন তাহলে তাড়াতাড়ি লেখার আগ্রহ পাই)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here