বিপরীত_মেরুর_টানে #আরিবা_নাওশীন #সূর্চনা_পর্ব

0
17

পাত্রপক্ষের সামনে ট্রে হাতে ঢোকার পর, সোফায় বসা পাত্রের জায়গায় নিজের ডিপার্টমেন্টের খিটখিটে রাগী প্রফেসরকে দেখে রিন্নির হাতের ট্রে-টা উল্টে পড়ার উপক্রম, অবাক হওয়ার সীমা ততক্ষণে আকাশ ছুঁয়েছে।

আরাভ চৌধুরী! যার ভয়ে পুরো ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট তটস্থ থাকে, যিনি ক্লাসে একটু এদিক-ওদিক হলেই ডাস্টার ছুড়ে মা*রেন , সে এখন তার ড্রয়িংরুমে খুব ভদ্র সেজে বসে আছে। পরনে দামি সাদা পাঞ্জাবি, হাতে ঘড়ি, আর মুখে এমন এক অদ্ভুত অমায়িক হাসি যা রিন্নি গত দু-বছরে কোনোদিন দেখেনি।

রিন্নি মনে মনে ভাবল, “আল্লাহ! আজ কি কিয়ামত হবে? এই রোবটটা আমার বাড়িতে কী করছে?”

আরাভও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। রিন্নিকে নীল শাড়িতে দেখে এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের চশমাটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। ক্লাসের সেই চুপচাপ টাইপ মেয়েটা যে শাড়িতে এতোটা শান্ত আর সুন্দর দেখাতে পারে, সেটা তার ইকুয়েশনের বাইরে ছিল। তবে গাম্ভীর্য তার স্বভাবজাত। গলা পরিষ্কার করে আরাভ রিন্নির বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আংকেল, আপনার মেয়ে তো আমার প্রিয় ছাত্রীদের একজন। তবে ও যে এতোটা চুপচাপ সেটা জানতাম না।”

রিন্নি মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করল। প্রিয় ছাত্রী! কালকেই তো ল্যাবে নোট জমা দিতে দেরি হওয়ায় সবার সামনে তাকে ঝাড়ি দিয়েছেন। রিন্নি টেনে টেনে নিচু স্বরে বলল, “আসসালামু আলাইকুম স্যার। আপনি এখানে.. মানে আপনি কি পাত্রের কোনো আত্নীয়?” বেশ আশা নিয়েই প্রশ্নট করল রিন্নি।

আরাভ একটু হাসল। সেই হাসিতে বিদ্রূপ নাকি ভালো লাগা ছিল বোঝা দায়। সে বলল, “কেন, পাত্র হিসেবে কি আমার যোগ্যতা খুব কম মনে হচ্ছে? নাকি ক্লাসে নম্বর কম দেব বলে ভয় পাচ্ছেন?”

রিন্নির মা-বাবা হবু জামাইয়ের রসিকতায় হাহাহা করে হেসে উঠলেন। কিন্তু রিন্নির পেটের ভেতর তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সে ভাবছে, এই লোকটা যদি শেষ পর্যন্ত তার বর হয়, তবে তো বাসর ঘরেও তাকে ফিজিক্সের সূত্র মুখস্থ করতে হবে!

আরাভ হঠাৎ নিচু গলায় শুধু রিন্নি শুনতে পায় এমনভাবে বলল, “আজকে কিন্তু আপনার সেই ন্যাকামি মেশানো গলার স্বরটা একদম শোনা যাচ্ছে না মিস রিন্নি। ভয় পেয়েছেন নাকি?”

রিন্নি এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে ফিসফিস করে জবাব দিল, “ভয় পাব কেন? আ,,, আমি কারো বাপরেও ভয় পাই না!”

আরাভ একটা বাকা হাসি দিয়ে বলে,” ওহ্ আচ্ছা!”

আরাভ একটু নিজের বাবার দিকে ঝুকে বলল,” আব্বু আপনাকে এখানে কেন আনছি?”

আফজাল চৌধুরী ছেলের দিকে দাত কটমট করে তাকিয়ে বলল, “তুই আমাকে আনছিস? আমিই তো উল্টো তোর রীতিমতো পা ধরে মেয়ে দেখতে নিয়ে আসলাম!”

আরাভ রিন্নির দিকে চোখ রেখেই বলল, ” উফ্ আব্বু এসব ফালতু কথা বলার সময় আছে? বলো যে, ছেলে-মেয়েকে আলাদা রুমে কথা বলতে পাঠানো উচিত। ”

আফজাল ছেলের নির্লজ্জতা দেখে অবাক। “এটা কি ধরনের কথা আরাভ। আমি তোমার বাবা হই।আমি জানি কখন কি দরকার?”

আরাভ: ” বলতে লজ্জাও লাগছে না তাই না?”

আফজাল :” লজ্জা কেন পাবো? সেটা তোর পাওয়া উচিত যা নেই।”

আরাভ: ” বাপ হয়ে ছেলের কষ্ট বুঝছো না তাই! ”

আফজাল: ” কেন অক্সিজেন কেড়ে নিছি তোর? ”

আরাভ : ” উফ আব্বু তুমি বলবা নাকি আমিই বলব যে মেয়ের সাথে আমি আলাদা কথা বলতে চাই।তখন বিষয়টা কিন্তু ভালো দেখবে না। ”

আফজাল: “থাক বাপ! মান-সন্মানের মাথা খাইস না। বলছি!”

এদিকে এদের ফিসফিস কথার দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। বেগম রোকেয়া চৌধুরী বলল,” কি শুরু করছো তোমরা? এত ফিসফিস কিসের?”

আরাভ: ” আব্বু যদি আম্মুরে বলছো না তাহলে দেইখো আমি কি করি!”

আফজাল: ” তোরে ভয় পাই আমি? বাপ তুই না আমি?”

আরাভ:” তাই না? ভয় পাও না? ঠিক আছে!”

আফজাল তাড়াতাড়ি বলে,” দাড়া বাপ।” তারপর হাসান সাহেবকে বলল,” ভাইজান এবার তো ছেলে-মেয়েকে আলাদা কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত ”

হাসান সাহেবও হাসি মুখে বলে,” হ্যা হ্যা নিশ্চয়ই! ”

হঠাৎ রিন্নি বলে উঠল, ” কোনো দরকার নেই।”সবাই তার দিকে তাকায়। আরাভ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে চা খাওয়ায় মন দেয়। রিন্নি ভেবাচেকা খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে, ” না মানে ঠিক আছে!”

রিন্নির বলতে দেরি হয় আরাভের উঠে দাড়াতে দেরি হয় না। রিন্নি বড়বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।,” সমস্যা নেই আগে চা খেয়ে নিন, ঠান্ডা হয়ে যাবে ”

আরাভ সামনে হাটতে হাটতে বলল,”চলো!”

বারান্দায় পা রাখতেই রিন্নি আর কোনো ভনিতা করল না। স্যারের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলে দিল, “স্যার, আপনি কি পাগ-ল হয়ে গেছেন? আপনি আমার আব্বু-আম্মুকে মানা করে দেন। আমি এই বিয়েতে একদম রাজি না!”

আরাভ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলল, “অস্বীকার করার কিছু নেই মিস রিন্নি, আমিও যে আপনার জন্য ম*রে যাচ্ছি তা নয়। আপনার ওই টেনে টেনে কথা বলা আর অকারণ ন্যাকামি সহ্য করার মতো ইমিউনিটি আমার এখনো তৈরি হয়নি।”

রিন্নি চোখ কপালে তুলে বলল, “তাহলে তো খুবই ভালো! ভেতরে গিয়ে বলে দিন যে আপনি আমায় পছন্দ করেননি। আমিও বলে দেব আপনাকে আমার একদম অসহ্য লাগে।”

আরাভ একটা বাঁকা হাসি দিল। চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বলল, “আমি কি কখনো বলেছি যে আমি আপনাকে অপছন্দ করি? আমি বলেছি আপনি ইমম্যাচিউর। আর শুনুন, আমার মা আপনাকে পছন্দ করে ফেলেছেন। আর প্রফেশনালাইজম আর পারসোনাল লাইফ আমি মেশাই না। তাই আমি না করার কোনো লজিক খুঁজে পাচ্ছি না।”

রিন্নি প্রায় চিৎকার করে উঠল, “লজিক? আপনি কি রোবট নাকি? বিয়ে করবেন কোনো লজিক দিয়ে না, মানুষের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে! আমি আপনার মতো একজন গম্ভীর, রাগী মানুষের সাথে সারাজীবন কাটাতে পারব না। আপনি সারাদিন ক্লাসেও বকেন, ঘরেও কি করবেন আমি বোঝা হয়ে গেছে?”

আরাভ রিন্নির খুব কাছে এগিয়ে এল। হঠাৎ তার এই সপ্রতিভ ভঙ্গি দেখে রিন্নি দু-পা পিছিয়ে গেল। আরাভ নিচু গলায় বলল, “হয়তো অনেক,,,, থাক! এখনও আপনি ছাত্রী আমার। আমি শিক্ষক-ছাত্রীর সীমানা লঙ্গন করতে চাই না। বকার অধিকারটা যখন ঘরের ভেতরে চলে আসবে, তখন তার মানেটা বদলে যায় মিস রিন্নি। আর শুনুন, আপনি না বললেও এই বিয়েটা হবে। কারণ আমি অলরেডি আপনার বাবাকে বলে দিয়েছি যে আমার আপনাকে পছন্দ হয়েছে।”

রিন্নি স্তম্ভিত হয়ে গেল, “কীহ? আপনি… আপনি এতো বড় মিথ্যাবাদী? আপনি একটু আগে বললেন আপনি রাজি না!”

“আমি বলেছি আমিও যে খুব রাজি তা নয়।কিন্তু একদম রাজী না এটা বলি নাই। কিন্তু আমি যখন একটা প্রজেক্ট হাতে নিই, সেটা শেষ করে ছাড়ি। আপনি আপাতত আমার নেক্সট প্রজেক্ট,” আরাভ খুব স্বাভাবিক স্বরে বলল যেন সে কোনো ল্যাব রিপোর্ট ডিসকাস করছে।

রিন্নি রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, “আমিও দেখে নেব এই বিয়ে কীভাবে হয়! আমি ভেতরে গিয়ে না করে দিচ্ছি।”

কিন্তু ভেতরে যাওয়ার আগেই রিন্নির বাবা আর আরাভের মা হাসিমুখে বারান্দায় ঢুকল। রিন্নির বাবা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “আরাভ তো আমাদের সব বলে দিয়েছে মা। ও তোকে খুব পছন্দ করেছে। আমরা বিয়ের তারিখটা আগামী মাসেই ভাবছি।”

রিন্নি হা করে তাকিয়ে রইল। পাশের দিকে তাকিয়ে দেখল আরাভ তাকে দেখে একটা অত্যন্ত ধূর্ত হাসি দিচ্ছে। আরাভ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় খুব নিচু স্বরে বলল, “ওয়েলকাম টু দ্য টিম, মিসেস চৌধুরী। কাল ল্যাবে সময়মতো আসবেন, দেরি করলে কিন্তু ওখানেই শাস্তি শুরু হবে।”

প্রতিবাদ করার রাস্তা সে নিজেই বন্ধ করে ফেলেছে। গম্ভীর প্রফেসর তাকে এমন এক ইকুয়েশনে আটকে ফেলেছেন যার কোনো সহজ সমাধান তার জানা নেই।

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#সূর্চনা_পর্ব

(রেসপন্সের উপর নির্ভর করে আর লিখব নাকি এখানেই শেষ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here