বিপরীত_মেরুর_টানে #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৪৬

0
12

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪৬

ম্যানশনের ভেতর তখন যেন নরক নেমে এসেছে। আরাভ এক হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে অন্য হাতে নিখুঁত নিশানায় ট্রিগার টিপছে। ওর চোখের মণি দুটো আজ আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। টাইগারের পাঠানো প্রতিটি লোক হলরুমে ঢোকার আগেই লুটিয়ে পড়ছে।

আরাভ কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল, “শিশ! টাইগারের র-ক্তের টান কি তোকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছে যে তুই ভুলে গেলি জেরি কোনোদিনও তোকে ভালোবাসেনি? লেন্স পরে নীল চোখ বানিয়ে ভালোবাসা পাওয়া যায় না, ওটা অর্জন করতে হয়।”

নিচ থেকে শিশের হাসির শব্দ শোনা গেল, যা একদমই স্বাভাবিক নয়। “অর্জন? আরাভ চৌধুরী, আপনি ওকে মৃ-ত ভেবে ফেলে রেখেছিলেন, আর আমি ওকে তিল তিল করে বাঁচিয়ে তুলেছিলাম! আজ রিন্নি নয়, রিমিকে আমি আমার সাথে নিয়ে যাব। দরকার হলে ওকে জোর করে নিয়ে যাব!”

আরাভ নিচে নেমে এল। ওর পরনের কালো শার্টটা ঘামে আর বারুদের গুঁড়োয় মাখামাখি। ঠিক সেই সময় হলরুমের মাঝখানে টাইগারের প্রবেশ। টাইগার একগাল হেসে বলল, “সাব্বাস আরাভ! অনেকদিন পর তোর আসল রূপ দেখলাম। কিন্তু আজ খেলাটা শুধু বুলেটের নয়, আজ খেলাটা ইমোশনের।”

টাইগার একটা রিমোট চেপে ধরল। ম্যানশনের ভেতরে থাকা বড় স্ক্রিনে ফুটে উঠল ড্রেসিংরুমের পেছনের সিক্রেট প্যানেলের দৃশ্য। সেখানে রিন্নি আর নয়না আটকা পড়ে আছে, আর প্যানেলের দরজার ওপাশে ড্রাগনের লেজার বোম সেট করা।

টাইগার বলল, “আরাভ, অস্ত্র ফেল। নয়তো এক ক্লিকে তোর জেরি আর বোন দুজনেই ছাই হয়ে যাবে।”

আরাভ মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। ওর হাত কাঁপছে। ও জানে, টাইগার বা ড্রাগন কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। শিশ পাশ থেকে চেঁচিয়ে বলল, “টাইগার ভাই, এটা কী করছো? রিমি যেন কোনো আঘাত না পায়!”

টাইগার শিশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। “চুপ কর গাধা! মেয়ের মায়া ছাড়। আরাভ চৌধুরীকে হাঁটু গেড়ে বসানোই আমার আসল উদ্দেশ্য।”

সিক্রেট প্যানেলের ভেতরে রিন্নি হঠাৎ ওর মাথায় একটা তীব্র ব্যথা অনুভূত হলো। পাঁচ বছর আগের সেই দুর্ঘটনার দৃশ্যগুলো ঝড়ের গতিতে ওর চোখের সামনে দিয়ে চলে যেতে লাগল।

গাড়ির ব্রেক ফেইল, আর আরাভের আর্তনাদ সবই আজ ওর মস্তিষ্কের জট খুলে দিল। ও বুঝতে পারল, ও রিমি নয়, ও আরাভের ‘জেরি’। ডক্টর জামান ওকে বাঁচিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু টাইগারের ভয়ে ওকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আর শিশ? শিশ সবসময় ছায়ার মতো থেকে ওকে নিয়ন্ত্রণ করত।

রিন্নি নয়নার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “নয়না, সিক্রেট এক্সিটটা খোলো। আমি জানি ড্রাগনের এই লেজার সিস্টেম কীভাবে হ্যাক করতে হয়। পাঁচ বছর আগে আমিই এই ম্যানশনের সিকিউরিটি ডিজাইন করেছিলাম।”

নয়না অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রিন্নির চোখে এখন আর সেই অসহায় রিমির ছায়া নেই। নয়না দ্রুত ল্যাপটপ বের করল। রিন্নির আঙুলগুলো কিবোর্ডে বিদ্যুৎগতিতে চলতে শুরু করল।

হলরুমে আরাভ ধীরে ধীরে ওর পিস্তলটা মেঝের ওপর রাখল। ওর চোখে একরাশ ঘৃণা। টাইগার হাসতে হাসতে আরাভের দিকে এগোলো। “কী মাফিয়া আর্কিটেক্ট? হার মানলি শেষ পর্যন্ত?”

টাইগার আরাভকে মারার জন্য পিস্তল তুলল, ঠিক সেই সময় ম্যানশনের লাইটগুলো দপ করে নিভে গেল। পুরো ম্যানশন অন্ধকারে ডুবে গেল।

অন্ধকারের মাঝখান থেকে রিন্নির কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “টাইগার! পাঁচ বছর আগে তুমি আমাদের জীবন ধ্বংস করেছিলে, আজ আমি তোমাকে সেই সুযোগ দেব না।”

পরক্ষণেই প্যানেলের দরজা খুলে রিন্নি আর নয়না বেরিয়ে এল। রিন্নির হাতে একটা অত্যাধুনিক শটগান। সে এক নিমেষে টাইগারের পায়ে নিখুঁত নিশানায় গুলি চালাল।

টাইগার যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শিশ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল রিন্নির বেগুনি চোখে আজ ওর জন্য কোনো মায়া নেই। রিন্নি শিশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“শিশ, তোমার ওই নীল লেন্সের মিথ্যে মায়া আজ শেষ। তুমি টাইগারের ভাই হয়েও আমার পাশে ছিলে এই পাপের কোনো ক্ষমা নেই। তবে তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে বলে তোমাকে পুলিশে দেব না, শুধু আজীবনের জন্য আমার জীবন থেকে মুছে দেব।”

শিশ ভেঙে পড়ল। ও জানত না টাইগার রিমিকে ম-ারার পরিকল্পনা করবে। ও অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ম্যানশন থেকে বেরিয়ে গেল।

আরাভ রিন্নিকে জড়িয়ে ধরল। ওর বুকে মাথা রেখে রিন্নি ডুকরে কেঁদে উঠল। “স্যার, আমার সব মনে পড়েছে। আমি আর রিমি নই, আমি আপনার জেরি।”

আরাভ রিন্নির কপালে একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। ওর চোখের সেই পাথুরে কাঠিন্য গলে আজ পানি হয়ে গেছে। ও ফিসফিস করে বলল, “আমি জানতাম তুমি ফিরে আসবে জেরি। ড্রাগনের সব জাল ছিঁড়ে তুমি আমার কাছেই ফিরে এলে।”

কিন্তু শান্তি এত তাড়াতাড়ি ফিরল না। টাইগার মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় হাসতে লাগল। “তোরা ভাবছিস সব শেষ? ড্রাগন তো এখনো আড়ালে। আর আরাভ… তোরা কি জানিস ডক্টর জামান কেন রিমিকে লুকিয়ে রেখেছিল? ”

আরাভ আর রিন্নি একে অপরের দিকে তাকাল।
আরাভ টাইগারের কলার চেপে ধরে বলল, “বল! রিন্নির বাবা-মা এখন কোথায়? ড্রাগন কি তাদেরও কোনো ক্ষতি করেছে?”

টাইগার ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে হাসল। “তারা তো পাঁচ বছর ধরে ভাবছে তাদের মেয়ে ওই কার এক্সিডেন্টে মা*রা গেছে। ডক্টর জামান তো মৃ*তদেহ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিলেন। ওরা এখনো এই শহরেই থাকে, তবে ম-ৃত মানুষের মতো বেঁচে আছে।”

আরাভ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ও রিন্নির হাত শক্ত করে ধরে গাড়ির দিকে এগোল। রিন্নি অস্ফুট স্বরে বলল, “স্যার, মা-বাবা কি আমাকে চিনতে পারবে? এই বেগুনি চোখ, এই বদলে যাওয়া চেহারা… ওরা কি মেনে নেবে?”

আরাভ রিন্নির চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “মা-বাবার চোখ কোনোদিন ভুল করে না জেরি। তুমি যেমনই হও, তুমি তাদের কলিজার টুকরো। আর আমি তো আছিই।”

শহরের এক শান্ত আবাসিক এলাকায় রিন্নিদের বাড়ি। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রিন্নির বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। পাঁচ বছর আগে এই গেট দিয়েই সে কনের সাজে বেরিয়েছিল। আজ সে ফিরেছে এক নতুন পরিচয় আর একরাশ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে।

আরাভ বেল বাজাল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। রিন্নির বাবা। ওনার গাল ভেঙে গেছে, চোখের নিচে কালচে দাগ। মেয়ে হারানোর শোক ওনাকে যেন দশ বছর বুড়ো করে দিয়েছে।

ভদ্রলোক আরাভকে দেখে অবাক হলেন। “আরাভ? তুমি এই মাঝরাতে?” ওনার নজর তখন আরাভের পেছনে দাঁড়ানো রিন্নির দিকে গেল। ওনার চোখে বিস্ময়, কিন্তু কোনো চেনা আভাস নেই।

আরাভ খুব ধীর গলায় বলল, “বাবা, আমি আজ আপনার আমানত ফেরত দিতে এসেছি। ড্রাগন আর ডক্টর জামান আমাদের সাথে অনেক বড় খেলা খেলেছিল। জেরি ম-রে যায়নি বাবা, ও বেঁচে আছে।”

আরাভ রিন্নিকে সামনে এগিয়ে দিল। রিন্নি ডুকরে কেঁদে উঠে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। “বাবা! আমাকে চিনতে পারছেন না?”

ভেতর থেকে রিন্নির মা দৌড়ে এলেন। তিনি রিন্নির বেগুনি চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। রিন্নি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মা!”

মা রিন্নিকে জড়িয়ে ধরলেন। রিন্নির বাবা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি রিন্নির মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, “আমার মেয়ে ফিরে এসেছে? কিন্তু তোর চোখ… তোর চেহারা…”

আরাভ পাশ থেকে সব বুঝিয়ে বলল। ডক্টর জামানের সেই মিথ্যাচার, ড্রাগনের ষড়যন্ত্র আর রিন্নির স্মৃতি হারানোর গল্প শুনে ওনারা শিউরে উঠলেন। মা রিন্নিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “যেভাবেই হোক, আমার ম-রা মেয়ে জ্যান্ত ফিরে এসেছে, এর চেয়ে বড় পাওনা আর কিছু নেই।”

পরদিন সকালে পুলিশ আর আরাভের ফোর্স মিলে ডক্টর জামানের বাড়ি ঘিরে ফেলল। ডক্টর জামান পালানোর চেষ্টা করেননি। তিনি ড্রয়িংরুমে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। আরাভ আর রিন্নি ভেতরে ঢুকতেই তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

“আমাকে মাফ করে দাও মা! আমি নিসন্তান ছিলাম, রিন্নিকে যখন আধম*রা অবস্থায় পেলাম, তখন আমার মনে হলো ওপরওয়ালা আমাকে একটা মেয়ে দিয়েছেন। আমি চেয়েছিলাম ও শুধু আমার হয়ে থাকুক। ড্রাগন আমাকে ভয় দেখিয়েছিল, আর আমি সেই সুযোগে তোমাদের জীবন থেকে ওকে সরিয়ে দিয়েছিলাম।”

রিন্নি ওনার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আপনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আমার মা-বাবার বুকটা পাঁচ বছর খালি রেখেছেন। এই অপরাধের ক্ষমা নেই ডক্টর। তবে আমি আপনার বিরুদ্ধে মামলা করব না, শুধু আপনি এই শহর ছেড়ে চলে যাবেন। আমার চোখের এই বেগুনি রং প্রতিবার আয়নায় দেখলে আপনার কথা মনে পড়বে মানুষের স্বার্থপরতা কত ভয়ংকর হতে পারে।”

আরাভ ডক্টর জামানকে পুলিশের হাতে না দিয়ে ওনাকে শহর ছাড়ার আদেশ দিল। কারণ রিন্নি চাইছিল না ওর পুনর্জন্মের শুরুটা কোনো অভিশাপ দিয়ে হোক।

আরাভ আর রিন্নি যখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল, তখন দেখল রাস্তার ওপারে শিশ দাঁড়িয়ে আছে। ও রিন্নির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসল। ও বুঝে গেছে, রিন্নি এখন ওর নিজের দুনিয়ায় ফিরে গেছে, যেখানে ওর কোনো জায়গা নেই।

শিশ বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। একতরফা প্রেমের এই বিষাদ নিয়ে ও হয়তো অন্য কোথাও নতুন জীবন শুরু করবে।

সপ্তাহ খানেক পর। আরাভ আর রিন্নির মা-বাবা এবং আরাভের মা-বাবা মিলে এক বিশাল দাওয়াতের আয়োজন করেছে। রিন্নি আজ লাল রঙের একটা কাতান শাড়ি পরেছে। ওর বেগুনি চোখ দুটো আজ খুশিতে জ্বলজ্বল করছে।

আরাভ রিন্নির কানে কানে বলল, “জেরি, তুমি তো তোমার মা-বাবাকে ফিরে পেলে। এবার কি আমাদের ছোট পরিবারের কথা ভাবা যায়?”

রিন্নি লাজুক হাসল। “এখনো তো ড্রাগন ধরা পড়েনি স্যার! ওনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আমি শান্ত হচ্ছি না।”

আরাভ রিন্নির হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “ড্রাগনের দিন ঘনিয়ে এসেছে। তবে আজ রাতটা শুধু আমাদের।”

বাইরে তখন চাঁদের আলোয় পুরো বাগানটা হাসছে। যে বিপরীত মেরুগুলো একদিন বিচ্ছেদ আর যন্ত্রণায় হারিয়ে গিয়েছিল, আজ তারা এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়েছে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here