বিপরীত_মেরুর_টানে #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৩৬

0
10

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৩৬

আরাভের বুকের ভেতরটা যেন একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, যা প্রতি মুহূর্তে একটু একটু করে লাভা উদগীরণ করছে। ফাহিমের নিথর দেহের পাশে বসে ও যখন ওর শীতল কপালে হাত রাখছিল, তখনো ওর মনের কোণায় একটা ক্ষীণ আশা বেঁচে ছিল জেরি আছে। আমার রিন্নি আছে। ও ফিরে আসবে। ও আমাকে বকা দেবে, আবার বাপের বাড়ি যাওয়ার হুমকি দেবে।

কিন্তু সেই আশার প্রদীপটা নিভিয়ে দিতে ওটি (OT) থেকে বের হয়ে এলেন সিনিয়র সার্জন। ওনার চোখের চশমাটা ঘোলা হয়ে গেছে, হয়তো ভেতরে থাকা মানুষটার অসহায়ত্ব দেখে ওনারও চোখ ভিজেছিল।
আরাভ টলতে টলতে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়াল। ও কিছু বলতে পারল না, শুধু দুহাতে ডাক্তারের হাত দুটো জাপটে ধরল। ওর চাউনি যেন এক হাজারটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে।

ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করলেন। ধরা গলায় বললেন
“মাফ করবেন প্রফেসর আরাভ। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। ফাহিম সাহেব নিজের জীবন বাজি রেখে ওনাকে বাঁচানোর যে ঢাল তৈরি করেছিলেন, তা সফল হতো। রিন্নি শরীরের ক্ষতগুলো হয়তো সেরে যেত… কিন্তু সমস্যাটা হলো ওনার প্রেগন্যান্সি। যদি উনি গর্ভবতী না হতেন, তবে ফাহিম সাহেবের ওই আত্মত্যাগ ওনাকে বাঁচিয়ে রাখত। কিন্তু ওনার জ-রায়ুতে প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে আর প্রচণ্ড ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছে। ওই ছোট্ট প্রাণটাকে বাঁচাতে গিয়ে মা-ও আজ হার মেনে নিলেন। রিন্নি আর আমাদের মাঝে নেই।”

কিছুক্ষণ থেমে ডাক্তার আবার বলল,”আমাদের ছেড়ে যাওয়ার আগে,,,,,
—-
হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ ওটিতে তখনো অলৌকিক এক যুদ্ধ চলছিল। ফাহিমের আত্মত্যাগ আর ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টায় রিন্নির নিথর শরীরে প্রাণের স্পন্দন ফিরতে শুরু করেছিল। যখন সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিল, তখন রিন্নি হঠাৎ জোরে একটা নিশ্বাস নিয়ে চোখ মেলল। ওর ফ্যাকাসে ঠোঁট দুটো নড়ছিল। ডাক্তাররা পরম বিস্ময়ে ওর মুখের কাছে কান পাতলেন।

রিন্নি অস্ফুট স্বরে শুধু একটা শব্দই উচ্চারণ করল “আমার… আমার সন্তান?”
সার্জনরা একে অপরের দিকে তাকালেন। ওনাদের চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। কেউ সাহস পাচ্ছিল না এক জননীকে তার সন্তান হারানোর খবরটা দিতে। রিন্নি যখন সবার নীরবতা দেখল, ও বুঝে নিল ওর শরীরের ভেতর সেই ছোট্ট স্পন্দনটা আর নেই।

ওর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগল। যে বাঁচার তাগিদ নিয়ে ও কিছুক্ষণ আগে চোখ মেলেছিল, সেই ইচ্ছেটা যেন মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেল। ওর হার্টবিটের গ্রাফটা আবার দ্রুত নামতে শুরু করল।
রিন্নি বুঝতে পারল ওর সময় শেষ। ও ক্লান্ত চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল

“ডাক্তার সাহেব… আমার জন্য আর কষ্ট করবেন না। আমার বাগানটা তো উজাড় হয়ে গেছে। যে সোনামণিটার জন্য আমি কাল রাত থেকে স্বপ্ন বুনছিলাম, ও যখন একা চলে গেছে… আমি মা হয়ে এখানে থাকব কী করে? আমার ফাহিম ভাই নিজের র*ক্ত দিয়ে আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল… ওকেও আমি একা যেতে দিতে পারি না।”

রিন্নি থামল, কয়েকবার বড় বড় নিশ্বাস নিল। ওর চোখের সামনে তখন আরাভের সেই কান্নামাখা মুখটা ভাসছে। ও এক দুর্বল হাসি দিয়ে ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বলল
“ডাক্তার সাহেব… আমার প্রফেসরের খেয়াল রাখবেন। ও মানুষটা খুব কঠিন, কিন্তু ভেতরটা মোমের মতো। ও যখন ল্যাপটপ নিয়ে রাত জাগবে, ওকে একটু কফি দিয়ে বলবেন জেরি আপনাকে ঘুমাতে বলছে। ও নিজের যত্ন নিতে একদম জানে না। ওকে বলবেন… আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি। ও যেন নিজেকে অপরাধী না ভাবে। ও যেন আবার হাসে, আবার বেঁচে থাকে।”

আবারও লম্বা একটা শ্বাস নিল।কথা বলতে পারচ্ছে না। শ্বাস বার বার থেমে যাচ্ছে যেন চাচ্ছে না রিন্নি আর পৃথিবী অক্সিজেন গ্রহণ করুক। কোনো মতে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,” আপনার হাসি মুখটা শেষ বার দেখা ইচ্ছেটা পূরণ হলো না হিটলার সাহেব। আমাদের সংসারও হলো না। স্যারকে বলবেন সে যেন অন্য কারো সঙ্গে বাধে ঘর। যদিও তার পাশে অন্য কেউকে আমার সহ্য হয় না কিন্তু সে একা থাকলে পা*গল হয়ে যাবে, তাই এই সামান্য ত্যাগটা আমি সহ্য করে নিলাম। তাকে বলবেন, তার হাসিতেই আমি থাকব সে যেন হাসতে না ভুলেন তাহলে আমার অস্তিত্ব পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে।”

রিন্নির চোখের শেষ পানিটুকু গাল বেয়ে বালিশে গড়িয়ে পড়ল। মেশিনের বিপ শব্দটা হঠাৎ দীর্ঘ হয়ে গেল। রিন্নি ওর প্রিয় স্যার-কে একা ফেলে পাড়ি দিল সেই দেশে, যেখানে ওর অনাগত সন্তান আর প্রিয় দেবর ফাহিম ওর জন্য অপেক্ষা করছে।
—–
ডাক্তাররা আরাভে কাধে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য পুরো করিডোরটা যেন বরফ হয়ে জমে গেল। আরাভের কান ঝঁঝঁ করতে লাগল। ও যেন শুনতে পাচ্ছে না কিছু। শুধু ওর চোখের সামনে ভাসছে রিন্নির সেই শেষবার তাকানো ট্রাকটা যখন পিষে দিচ্ছিল, তখন ওর চোখে থাকা সেই না বলা কথাগুলো।

করিডোরের ওপাশে নয়না দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। রিন্নি আর ও শুধু প্রতিবেশী ছিল না, ওরা একই সাথে বড় হয়েছে, একই পুতুল খেলেছে, একই স্কুলে পড়েছে। রিন্নি ছিল ওর বোনের মতো, ওর ছায়ার মতো। নয়না যখন শুনল যে রিন্নিও নেই, তখন ওর মুখ দিয়ে কোনো কান্নার শব্দ বেরোল না। ও শুধু একটা অমানুষিক চিৎকার দিয়ে নিজের দুহাতে নিজের গলা খামচে ধরল।

“নাআআআ! রিন্নি আপু! তুমিও গেলে? ফাহিম তো গেলই, তুমিও আমাদের একা করে দিলে? ওরে আল্লাহ, এ কেমন বিচার তোমার? একটা হাসিখুশি পরিবারকে এক নিমিষে শ্মশান করে দিলে?” নয়না পা-গলের মতো হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতে ও মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে লাগল। “রিন্নি আপু দেখ, ফাহিম তোমায় নিতে এসেছে! ও একা যেতে পারছিল না তো, তাই তোমাকেও নিয়ে গেল! হা হা হা! সবাই চলে গেল… আমি কেন বেঁচে আছি?”

নয়নার মা-বাবা ওকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতেই ও চিৎকার করে উঠল, “ছোঁবে না আমাকে! কেউ আমাকে ছোঁবে না! ওই ড্রাগনকে আনো আমার সামনে! আমি ওর কলিজা চিবিয়ে খাব! ও আমার বোনকে মে-রে ফেলেছে! ও আমার ফাহিমকে কেড়ে নিয়েছে!” নয়না হঠাৎ নিজের মাথা সজোরে মেঝের টাইলে ঠুকতে লাগল। র-ক্তে ভেসে যাচ্ছে ওর কপাল, কিন্তু ওর কোনো হুঁশ নেই। ও যেন আস্ত এক উন্মাদিনী হয়ে গেছে।

আরাভ তখনো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। ওর চোখে পানি নেই, আছে শুধু এক ভয়ংকর শূন্যতা। ও ধীর পায়ে রিন্নির ম-রদেহের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সাদা কাপড়ে ঢাকা রিন্নির সেই স্নিগ্ধ মুখ। মনে হচ্ছে ও ঘুমাচ্ছে। আরাভ রিন্নির কপালে হাত রাখল।

“জেরি… ওঠো। দেখো, আমি তোমার সেই রিপোর্টটা পকেটে নিয়ে ঘুরছি। তুমি বলেছিলে না, আমি তোমাকে গুরুত্ব দিই না? এই দেখো, আমি আজ থেকে সব কাজ ছেড়ে দিয়েছি। আমি আর ল্যাপটপ ছোঁব না জেরি। শুধু একবার চোখ খোলো। একবার স্যার বলে ডাকো। আমাদের ওই বাচ্চাটাকে নিয়ে তুমি যেখানে যেতে বলবে, আমি সেখানেই যাব। জেরি… তুমি কথা বলছ না কেন?”

আরাভ এবার রিন্নির নিথর দেহটা বুকের সাথে জাপটে ধরে এক বুকফাটানো হাহাকার করে উঠল
“কেন আমাকে একা করে দিলে জেরি? আমি তো বলেছিলাম আমি তোমায় সব বিপদ থেকে দূরে রাখব! আমি কেমন প্রফেসর যে নিজের স্ত্রীর প্রাণের ইকুয়েশন মেলাতে পারলাম না? ফাহিম… তুইও চলে গেলি? তোরা দুজনে মিলে আমাকে এই জনসমুদ্রে একলা করে দিলি? আমি এখন কাকে আগলে রাখব? কার জন্য বাড়ি ফিরব?”

আরাভের সেই আর্তনাদে হাসপাতালের করিডোরের লাইটগুলো যেন ভয়ে কাঁপছে। গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন মাথা নিচু করে দূরে সরে গেল। আফজাল চৌধুরী আর রিন্নির বাবা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদছেন। একপাশে নয়নার অট্টহাসি আর কান্না মিশে এক বীভৎস আবহ তৈরি হয়েছে।

চৌধুরী ভিলার সেই সোনালী দিনগুলো আজ র-ক্তে ভেজা ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেল। যে ফাহিম রিন্নিকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের বুক পেতে দিয়েছিল, সে আজ সার্থক; কিন্তু আরাভ চৌধুরী বেঁচে থেকেও এক জ্যান্ত লা-শ। ওর দুহাতে আজ শুধু প্রিয়জনদের র-ক্ত আর পকেটে থাকা এক টুকরো কাগজ, যাতে লেখা ছিল এক অনাগত স্বপ্নের কথা যা জন্মানোর আগেই চলে গেল।

চলবে,,,
(হতাশ হয়েন না টুইশ আছে। আমি হতাশ করব না এটা বিশ্বাস রাখুন। কাহিনিতে এটা প্রয়োজন ছিল তাই।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here