#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব-৪২
#আরিবা_নাওশীন
আরাভ তার কালো এসইউভি নিয়ে রেড জোন থেকে বের হচ্ছিল। নয়নার দেওয়া ডক্টর জামানের ফাইলটা তার পাশের সিটে রাখা। মস্তিষ্কটা যেন একটা উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি। একদিকে রিমির ওই মায়াবী মুখ, অন্যদিকে ড্রাগনের পাঁচ বছর আগের সেই নিখুঁত ষড়যন্ত্র। ঠিক তখনই রাস্তার মাঝখানে একটা মেয়েকে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরাভ কষে ব্রেক চাপল। টায়ারের ঘর্ষণে রাস্তায় কালো দাগ পড়ে গেল।
গাড়ি থামতেই রিমি এক দৌড়ে এসে ড্রাইভিং সিটের জানলায় মুখ বাড়িয়ে দিল। “মাফিয়া সাহেব! আপনি কি অন্ধ? নাকি ইচ্ছে করেই আমাকে পিষে দেওয়ার ধান্দা করছেন?”
আরাভ চোয়াল শক্ত করে বলল, “রাস্তার মাঝখানে এভাবে কেউ দাঁড়ায়? ম*রার শখ হয়েছে আপনার? তাহলে ট্রেনের সামনে গিয়ে দাড়ান!”
রিমি গাড়ি দিকে আগাতে আগাতে বলে, ” আরে গম্ভীর সাহেব!আমার যদি কিছু হয় তাহলে ওই ট্রেন চালকের নাম মামলা হয়ে যাবে।”
“আহা কত ভালোবাসা একটা অপরিচিত মানুষের জন্য। ইডিয়েট! ট্রেনের নিচে পড়লে চালকে কিছু হবে না কিন্তু আমার গাড়ির নিচে পড়লে জনগন গন পিটুনি দিবে আমায়। ফাজিল একটা!”
“ম*রলে তো আপনার ল্যাপটপ পাহারা দেওয়ার কেউ থাকবে না!” রিমি দাঁত বের করে হাসল। “চট করে দরজা খুলুন।বাইরে অনেক রোদ। আজ আপনাকে একটা জাদুকরী জায়গা দেখাতে নিয়ে যাব। না গেলে কিন্তু আমি গাড়ির বনটের ওপর শুয়ে থাকব!”
আরাভ জানে রিমির এই পাগলামির কোনো ওষুধ নেই। তাছাড়া ওর নিজেরও রিমিকে চোখে চোখে রাখা দরকার। ও দরজা আনলক করতেই রিমি ধপ করে ভেতরে ঢুকে বসল। “সোজা চলুন ওই পাহাড়ের ঢালটার দিকে!”
শহর ছাড়িয়ে গাড়ি যখন বনের কাঁচা রাস্তায় ঢুকল, চারপাশটা নিঝুম হয়ে এল। রাস্তা শেষ, এখন হাঁটতে হবে। গাড়ি থামিয়ে তারা হাঁটতে শুরু করল। বিকেলের রোদ তখন ম-রে আসছে। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পর আরাভ থমকে দাঁড়িয়ে রিমির দিকে ফিরল। ওর গম্ভীর গলায় আজ এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা।
“রিমি, একটা কথা সত্যি করে বলবেন? আপনি কেন আমার পেছনে পড়ে আছেন? আমি একজন অন্ধকার জগতের মানুষ, আমার চারপাশে শুধু শত্রু আর র-ক্ত। আমার সাথে আপনার এই বন্ধুত্ব আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে। তবুও কেন?”
রিমি থমকে গেল। চঞ্চল মেয়েটার চোখে এক মুহূর্তের জন্য গভীরতা এল। সে একটা শুকনো ডাল দিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে কাটতে বলল, “জানি না। কেন যেন মনে হয় আপনার ওই পাথুরে চাউনিটা আসলে একটা মিথ্যে আবরণ। প্রথম যেদিন আপনি আমাকে ওই বখাটেদের হাত থেকে বাঁচিয়ে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ঝাড়ি দিলেন আমার মনে হয়েছিল আমি আপনাকে চিনি। বহু বছরের চেনা কেউ যেন আপনি। কেন জানি আপনাকে একা ছাড়তে ইচ্ছে করে না।”
আরাভের হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রিন্নিও ঠিক একইভাবে ওর একাকীত্বে ভাগ বসাতে চাইত। আরাভ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আপনি অনেক বেশি কল্পনাপ্রবণ রিমি। চলুন, অন্ধকার হয়ে আসছে।”
ঝরনা দেখার নেশায় রিমি আরাভকে বনের একদম গভীরে নিয়ে এল। কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল সামনে আর কোনো রাস্তা নেই, শুধু ঘন ঝোপঝাড় আর প্রাচীন সব বটগাছ।
“রাস্তা কোনটা রিমি?” আরাভ ফোন চেক করে দেখল সিগন্যাল উধাও।
রিমি এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “আমি তো ভেবেছিলাম এই পাইন গাছটার নিচ দিয়েই রাস্তা… আসলে সব গাছগুলো এখন কেমন যেন এক রকম দেখাচ্ছে!”
আরাভ গর্জে উঠল, “ফাজলামি পেয়েছেন? এটা কোনো পার্ক নয়! এখানে নেটওয়ার্ক নেই, কোনো লোকালয় নেই। রাত হলে বন্য জা-নোয়ার বের হবে। আপনার এই চঞ্চলতার জন্য আজ আমাদের জান যাবে!”
আরাভ নিজেই পথ খোঁজার চেষ্টা করল। রিমি ভয়ে ভয়ে ওর পেছনে হাঁটছিল। হঠাৎ ঝোপের আড়ালে একটা সূক্ষ্ম বাঁশের কঞ্চিতে রিমির কামিজের ঘের আটকে গেল। সে দ্রুত পা টানতেই চড়চড় শব্দে কামিজ ছিঁড়ে পাজামার একটা বড় অংশ হাঁটু থেকে অনেকটা ওপর পর্যন্ত ছিঁড়ে গেল।
“উহ্! মাগো!” রিমি চিৎকার করে বসে পড়ল।
আরাভ দ্রুত পেছনে ফিরল। দেখল রিমি যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে, আর ঝোপের কাঁটায় ওর পা ছড়ে র-ক্ত বের হচ্ছে। পাজামাটা এমনভাবে ছিঁড়েছে যে রিমির উরুর দিকের অংশটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে। রিমি দুই হাতে লজ্জা আর ব্যথায় পা চেপে ধরল।
আরাভ এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ও নিজের গায়ের লেদার জ্যাকেটটা খুলে রিমির দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু জ্যাকেটটা ওর কোমরে জড়াতে গিয়ে আরাভের চোখ আটকে গেল রিমির ডান পায়ের হাঁটুর চার-পাঁচ ইঞ্চি ওপরে।
সেখানে একটা ছোট্ট, গাঢ় কালো রঙের তিল।
আরাভের মস্তিষ্ক যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশের বাতাসের শব্দ ওর কানে আর পৌঁছাচ্ছে না। এই তিলটা কোনো সাধারণ চিহ্ন নয়। রিন্নি যখন ভার্সিটির সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছিল, আরাভ ড্রেসিং করতে গিয়ে এই তিলটা দেখেছিল। রিন্নি তখন লাজুক হেসে বলেছিল “স্যার, এই তিলটা আমার লাকি চার্ম। এটা কিন্তু আমি ছাড়া আর কেউ দেখেনি, এমনকি মা-ও না। আপনিই প্রথম মানুষ যে এটা দেখল।”
আরাভ নিস্পলক দৃষ্টিতে ওই ক্ষুদ্র বিন্দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। রিমির চেহারার সার্জারি হতে পারে, কেমিক্যাল দিয়ে চোখের রঙ বদলে যেতে পারে, কিন্তু শরীরের এমন গোপনীয় চিহ্ন তো আর কেউ বদলাতে পারবে না! ড্রাগন কি তবে সত্যিই লা-শ বদলে দিয়েছিল? ডক্টর জামান কি রিন্নিকে বাঁচাতে গিয়ে ওকে নতুন পরিচয় দিয়ে নিজের কাছে রেখেছে?
আরাভ কাঁপতে কাঁপতে রিমির চোখের দিকে তাকাল। ওই বেগুনি চোখ দুটো এখন লজ্জায় আর ব্যথায় চিকচিক করছে। আরাভ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও মনে মনে চিৎকার করে উঠল “জেরি! তুই বেঁচে আছিস! তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস!”
কিন্তু আরাভ এখন দুর্বল হতে চায় না। রিন্নি সব স্মৃতি হারিয়ে রিমি হয়ে গেছে। ও আলতো করে জ্যাকেটটা রিমির ছিঁড়ে যাওয়া পায়ের ওপর জড়িয়ে দিল। ওর গম্ভীর কণ্ঠে এখন এক অদ্ভুত আবেগ আর কাঠিন্য।
“চুপচাপ বসে থাকুন। আপনার এই চোটটা আমি দেখছি। চিন্তা নেই, আমি থাকতে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।”
আরাভের চোখে এখন আর শুধু সন্দেহ নেই, সেখানে এখন জ্বলছে ফিরে পাওয়ার তীব্র নেশা আর ডক্টর জামানের মুখোশ খোলার আগুন। এই জঙ্গল থেকে বের হওয়ার পর আরাভ চৌধুরী আর আগের মতো থাকবে না। তার রিন্নি ফেরে নি, বরং রিন্নি কোনোদিন মরেইনি।
চলবে…
(যারা যারা রিন্নিকে মে-রে ফেলছি বলে আমায় গালি দিছেন। তারা সবাই আয়নার সামনে গিয়ে আয়নার ভিতরে থাকা মানুষটারে গালি দিবেন।😒 বার বার বলছি গল্পটা শেষ করতে দিন তারপর কমেন্ট করেন একটু ধৈর্য্য ধরেন। নাহ্ এরা একদম উঠে পড়ে লাগছে!)

