একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—২২

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—২২

“আব্বা আমি উনাকে কিছুতেই বিয়ে করবো না। আপনি আমাকে না জানিয়ে কিভাবে বিয়ে ঠিক করলেন? আমার মতামত তো দূর জানানোর প্রয়োজন টুকু মনে করলেন না?”

নুরুল আলম কথা কাটাকাটিতে রেগে আছে। একের পর এক জবাব দিতে আছে নিধি। সে কিছুতেই বিয়ে করবে না। হুট করে সন্ধ্যায় সময় লাল বেনারসি নিয়ে এসে নীরা পরাতে লাগলো। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলল আজ তার বিয়ে। কার সাথে কে কিছুই জানে না সে। এক মুহূর্তের জন্য মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যেন। স্তদ্ধ হয়ে গেলো। ভালোবাসার স্বীকৃতি পাওয়ার সময়ে এ কোন ঝড় নেমে এলো?
নিধি নাকোচ করে ঘর থেকে বাহির হতে চাইলো কিন্তু নীরা আঁটকে দিলো। বলে দিলো বাহির হতে নিষেধ আছে। এই বুঝি ভালেবাসায় গড়া হৃদয়ের ঘর তাশের ঘরের মতো পরিনত হলো। নিধি ভয় পেলো। আগমন ঘটলো সাহেলের। ঘরবন্দী করে রেখে চলে গেলো সেখান থেকে। নিধি চিৎকার করেও কাজ হলো না। শুনলো তার চিৎকার। সালেহা বেগম ও নিরুপায়। কোনোভাবে নাজির কে খবর দিবেন এই উপায় ও পেলো না কারণ রুপসি তাকে নজরে রেখেছে। তারই সামনে বসে কুটিল হাসছে। যেন আস্ত ডাইনি সব ধ্বংস করে তবেই খ্যান্ত হবে। তার পর আগমন ঘটলো নুরুল আলমের। ঘরের দরজা খোলার আওয়াজে নিধি দৌড়ে গেলো। নরুল আলম কে দেখে শুধালো,

“ এসব কি হচ্ছে আব্বা?”

“যা শুনেছো তাই সত্যি। তৈরি হয়ে এসো নয়তো এমনই বিয়ে হবে।”

তখনই নিধি রেগে উপরোক্ত কথাটি বলে। নরুল আলম এবার মেয়ের দিকে তাকালেন। শক্ত কন্ঠে বললেন,

“মেয়েদের মতামত আবার কি? আমি তোমার খারাপ চাইবো না নিশ্চয়ই। ”

“ কেন আব্বা মেয়েরা কি মানুষ না? তাদের মতামত কেন নাই? বিয়ে করে সারাজীবন যে মেয়েটা থাকবে সে মতামত না দিলে আপনারা কেন দিবেন? মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছি বলে কি পাপ করেছি? নাকি আপনার মেয়ে হয়েছি বলে……
ঠাসসসস।
নিধি কথা শেষ করতে পারলো না তার আগেই কষিয়ে একটা চড় পড়লো ওর গালে। শব্দ হলো বেশ জোরে। নুরুল আলম হিংস্র পশুর মতো গিজ্জাচ্ছে। নিধি চড়ের ভারে নুয়ে পড়লো মেঝেতে। ব্যথা পেলো হাতে তবুও টু শব্দ করলো না। তিনি আবার গর্জে উঠে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,

“ সম্মান নষ্ট করার আগে উচিত কাজ করছি।”

“ম মানে কি বলতে চাইছেন?”

নিধি মেঝে থেকে উঠতে উঠতে জানতে চাইলো। ওর চোখে মুখে আগ্রহ।

“ আলমিরার ভেতরে প্রেমপত্র থাকে, বাইরে গিয়ে ঢলাথলি করে পিরিতে কথা বলো পরপুরুষের সাথে এটা নষ্টামি নয়?”

নিধি স্তদ্ধ হয়ে গেলো। ভেতর ভেঙে আসলো। এমন কথাও শুনতে হলো? সে নষ্টামি করে? আর তিনিই বা চিঠির কথা জানলো কি করে? তখনই নজর পড়লো জানালার দিকে রুপসি আর নীরা দাঁড়িয়ে আছে। রুপসি হাসছে নিঃশব্দে। যে হাসি তার এই পরিনতির কারণ বুঝাচ্ছে। নিধি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নুরুল আলমের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিলো,

“আমি কোনো নষ্টামি করিনি। তবে হ্যাঁ পাপ করেছি এই বাড়িতে আপনার সন্তান হয়ে জন্ম নিয়ে। ভালোবাসা কোনো পাপ নয়। পাপ কিছু মানুষ বানায় কিন্তু সবাই নয়। আমি বিয়ে করলে সাঈদ কে’ই করবো আব্বা।”

নুরুল আলম আরেকটা থাপ্পড় মারলেন নিধির গালে। কর্কশ কন্ঠে বলল,

“তোমার হামিদ’কেই বিয়ে করতে হবে।”

এবার নিধি দমলো না ভয় ও পেলো না। চড় খেয়েও স্থির রইলো। চিৎকার করে বলল,

“মাতবর বাড়ির কিছু কাপুরুষ স্ত্রী আর কন্যার গায়ে হাত তোলা ছাড়া আর কি পারে?”

নুরুল আলমের মাথায় আগুন ধরানোর জন্য এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিলো। এই বুঝি কুরক্ষেত্র বাঁধবে। তার আগেই রুপসি গিয়ে আটকালো। শশুড় কে কানে কানে কি যেন বলল। তার পর উনি বেরিয়ে গেলেন। নিধির উদ্দেশ্য বলে গেলো,

“তৈরি না হলে এমনই নিয়ে আসবে একটু পর।
মাতবর বাড়ির মান সম্মান ধুলোয় মিশতে দিবো না।”

নুরুল আলম বেরিয়ে যেতেই নিধি রুপসির দিকে গরম চোখে তাকালো। রাগত স্বরে ভাঙা কন্ঠে জানতে চাইলো,

“আপনি এসব বাড়াবাড়ি করে লাগিয়েছেন না? আপনি ছাড়া কেউ এমন কুরুচিপূর্ণ কথা বলতে পারে না। নোংরামি আপনার ভেতরে এজন্য সবাই কে এক ভাবেন।”

রুপসি শব্দ করে হেসে উঠলো। কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

“গলা নিচু করে কথা বলে ননদী। তোমার চাবিকাঠি এখন আমার হাতে।”

রুপসি বেরিয়ে গেলো। নিধি জোরেই বলল,

“জীবন গেলেও অন্য কাউকে বিয়ে করবো না। ”

________

শিউলি শুয়ে পড়েছিলো হঠাৎ দুয়ারে ঠকঠক আওয়াজে উঠে পড়লো। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে কেউ একজন দুয়ার থেকে চলে গেলো মাত্র। শিউলি করিম মিয়া কে শুধালো,

“কে আব্বা? কি বলতে আইসে?”

করিম মিয়া উঠোনের দিকে আসতে আসতে কিছুটা চিন্তিত কন্ঠে বলল,

“ নিধি মা’র নাকি আইজ বিয়া। যাইতে কইলো মাতবর। হঠাৎ বিয়া কোনো আয়োজন ছাড়া বুঝতাছি না কিছু।”

শিউলি অবাক হলো। আবারো শুধালো,

“কার সাথে আব্বা?”

“ওই পাড়ার হামিদ কে চিনো না? তার সাথে কিন্তু পোলাডা বেশি সুবিধার না। জমাজমি আছে একটু তবে মাতবরের একশ ভাগের বিশ ভাগ ও হবে না। এমন পোলার লগে মাতবর বিয়ে দিতাছে কেন বুঝবার পারছি না।”

শিউলি বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। লোকটাকে শিউলিও চিনে। কেমন যেন লোভাতুর দৃষ্টি দেখলেই ঘৃণা লাগে। এমন মানুষের সঙ্গে হবে নিধি আপার বিয়ে? শিউলি মেনে নিতে পারলো না। নিধি কাউকে পছন্দ করে এতটুকু সে জানে কিন্তু কে তা জানেনা। তবে নিশ্চয়ই নিধি আপার বিরুদ্ধে বিয়ে। শিউলির মন আনচান করে উঠলো। করিম মিয়া ততক্ষণে ফতুয়া গায়ে দিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। শিউলি আবদার করলো,

“আমিও যাই আব্বা? নিধি আপারে একবার দেখমু বউ সাজে।”

“আইচ্ছা আয়। আমেনা দুয়ার বন্ধ কইরা দে।”
বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে।

__________

মাতবর বাড়িতে মানুষের আগমন ঘটছে। গ্রামের মানুষদের বিয়ে পড়ানোর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সকলে আসতে শুরু করেছে সবে। মাহাদ, নাজির আর রাইসুল রহমান মাতবর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সাঈদ আর জিহান গেছে তাদেরই বাড়ি একটা জিনিস আনতে। যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিহান আর সাঈদ তখনই হন্তদন্ত হয়ে আসলো। ওরা তিনজনে ওদেরই অপেক্ষা করছিলো। সাঈদের হাত ভয়ে কাঁপছে। মাহাদ শুধালো,

“নিয়ে এসেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে এবার যাই। খেলা আজ মোড় নিবে কঠিন।”

সাঈদ কিছু বুঝতে পারছে না। ভাবতে পারছে না কিছু। শুধু যে যা বলছে তাই শুনছে। মাহাদ সাঈদের হাত থেকে জিনিসটা নিয়ে একটা কাপড়ে পেঁচিয়ে আড়াল করলো। তার পর মাতবর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো।

ওরা গিয়ে দেখলো বর বেশে বসে আছে এক লোক। যে নাজির ব্যতীত সকলের কাছে অপরিচিত। মাহাদের কাছে অপরিচিত হলেও একবারের দেখা মানুষ। এর মধ্যে শিউলির আগমন ঘটলো। বাড়ি থেকে বাহির হতেই পথে মালার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো ও সবটা বলেছে। তাই-তো দৌড়ে আসলো এখানে। মাহাদ চোখের ইশারায় নিধির কাছে যেতে বলল। ওই মালাকে বলে এসেছিলো শিউলিকে বুঝিয়ে বলতে এবং কি করতে হবে তা জানাতে। শিউলি মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো সেদিকে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ঘরে রুপসি আর নীরা দাঁড়িয়ে আছে। নিধি কাঁদছে আর কিছু বলছে। শিউলি ওদের দেখে থেমে গেলো। ঘরে গেলে নিশ্চিত বাহির করে দিবে তাই উপায় খুঁজলো। তার পর একজন কে দিয়ে রুপসি আর নীরা কে ডেকে বলালো নুরুল আলম ডাকছেন ওদের জুরুরি এখনই যেতে বলেছে পাহারা হিসাবে আমি থাকবো। ওরা দুজনে তবুও সর্তকতায় বাহির থেকে দুয়ার লাগিয়ে দিয়ে গেলো তাছাড়া চারদিকে মানুষ পালানোর পথ নেই। ওরা যেতেই শিউলি দুয়ার খুলে ঘরে ঢুকলো। নিধি ওকে দেখে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলল,

“সাঈদ কে বলে দিস শিউলি তার নিধি অন্য কারো হবে না। কবুল কেবলমাত্র তারই নামে পড়বে। নয়তো এই জীবন বিসর্জন দিবো। শুধু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। কতটা জোর করতে করতে আমিও দেখবো। ”

“আপা শান্ত হও সাঈদ, নাজির ভাই উনি সকলে এসেছে। তোমাকে কিছু করতে হবে না ভরসা রাখো।”

শিউলির কথায় একটু আশার আলো দেখলো তখনই নীরা এসে হাজির হলো। ওকে দেখে প্রচন্ড রেগে গেলো। হাত ধরে টেনে বাহির করে দিতে দিতে বলল,

“এ বাড়ি কখনো আসবি না। তুই আমার পছন্দের মানুষ কে কেড়ে নিয়েছিস লোভী।”

শিউলি বুঝতে পারলো না তার কথার অর্থ তবে ও আর দাঁড়ালো না চলে গেলো বিয়ে পড়ানো হবে সেই আসরে। গিয়ে দেখতে পেলো মাহাদ জমিদারি যুগের এক বিশাল তলোয়ার ধরে আছে হামিদের গলায়। আর প্রশ্ন করছে,

“বল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার সঙ্গে তোর অবৈধ সম্পর্ক আছে।”

মাহাদের এই কথায় মুহূর্তে সকলের মধ্যে বাজ পড়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হলো। শুরু হলো হইচই কানাঘোষা। সাহেল রেগে মাহাদ কে ছাড়াতে আসলো নাজির গিয়ে বাঁধা দিলো। হামিদ ভয়ে গলার হাত দিয়ে আছে। বলছে,

“ না আমার কারো সঙ্গে সম্পর্ক নেই।”

মাহাদ তলোয়ার আরেকটু চেপে ধরলো। হামিদ গলায় ব্যথা অনুভব করলো। মাহাদ দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“ মিথ্যা বলবি না। আমি কাল রাতে তোদের দুজন কে একসাথে নির্জন জঙ্গলের পাশে পুরোনো বাড়িতে দেখেছি।”

হামিদ চমকে উঠলো। ভয় আরো বাড়লো। তাকালো সামনে রুপসির দিকে। দুজনের ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে। মাহাদ কিভাবে জানলো,দেখলো বলে ভাবলো। সাহেল হুঙ্কার ছাড়ছে,

“আমার বউয়ের নামে আর একটা মিথ্যে বললে খু*ন করবো তোকে।”

মাহাদ তার কথা কানে নিলো না। হামিদ কে আবারো বলল,

“তাড়াতাড়ি শিকার কর নয়তে তলোয়ার চালিয়ে দিবো।”

ধারালো তলোয়ারের আগা সামান্য চমড়ায় লাগতেই কেটে গেলো একটু, রক্ত বাহির হলো সামান্য হামিদ ‘আহহহ’ বলে চিৎকার দিলো। নুরুল আলম কোথাও থেকে ছুটে আসলো। জানতে চাইলো,

“ কি হচ্ছে এখানে?”

নুরুল আলমের পিছনে নীরা আর নিধিও রয়েছে। গ্রামের সকলে তামাশা দেখছে। একে অপরের সঙ্গে এসব নিয়েই আলোচনা করছে, কেউ আবার হাসছে। মাহাদ কারো কথা কানে না নিয়ে হামিদ কে হুশিয়ারী করলো ,

“ শেষ বার বলছি বল।”

তখনই রুপসি নাটক শুরু করলো। নুরুল আলম আর সাহেলের সামনে গিয়ে কেঁদে উঠলো।

“ দেখুন বাবা উনি আমার উপর মিথ্যে দোষারোপ করছেন। সেদিন আমাদের বাড়ি আসার পর আমাকে কুপ্রস্তাব দেওয়ায় রাজি হইনি বলে আমাকে ফাঁসাতে চাচ্ছে।”

মুহূর্তে হতভম্ব হয়ে গেলো নাজির,মাহাদ, জিহান সহ সকলে। সাহেল রেগে মাহাদ কে একটা ঘুষিও মারলো। সাঈদ জোরে একটা লাথি মারলো হামিদের কোমরে। ও এতোক্ষণে সবটা বুঝতে পারলো। মাহাদের থেকে তলোয়ার নিয়ে চেপে ধরলো জোরে। হামিদ যেন বুঝতে পারলো খুব শিগগিরই গলা কেটে পড়বে তখনই ভয়ে বলে উঠলো,

“ হ্যাঁ আমি বলছি।”

সকলে ওর দিকে দৃষ্টি দিলো। উত্তর শোনার আগ্রহে তাকালো। রুপসি ভয়ে শীতেও ঘেমে গেলো। থামানো কিংবা পালাবার কোনো পথ নেই বুঝতে পারলো। হামিদ তার দিকে চেয়ে ভয়ে ভয়ে বলল,

“ হ্যাঁ তার সঙ্গে আমার অবৈধ সম্পর্ক আছে।”

কেউ অবাক হলো কেউ বা অবিশ্বাস্য চাহনিতে তাকিয়ে রইলো। এবার নাজির লাথি মেরে বলল,

“তাহলে বল এই ন*টি কেন এই বাড়ি বউ হয়ে আসলো আর তুই কেন নিধিকে বিয়ে করতে আসলি?”

“ সবটা রুপসির সাজানো খেলা ছিলো। সম্পতির লোভে সাহেল কে বিয়ে করেছে। সাহেল কে যা বলতো তাই শুনতো বিয়ের আগেও। টাকা পয়সা, গহনা সব দিতো এনে। আমি রুপসির থেকে পেতাম সব। নামমাত্র সাহেলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো আমারে বাসতো। নিধির সঙ্গে বিয়ে হলে এই বাড়িতে ঘর জামাই হয়ে থাকতে পারবো। কাজ হয়ে গেলে আমরা দুজনে সব নিয়ে দূরে চলে যেতাম এমনটাই সাজানো ছিলো।”

সাহেল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথা হারিয়ে ফেলেছে। নরুল আলম শুধু শুনে যাচ্ছে। রুপসি তখনই জোর গলায় বলল,

“ ম ম মিথ্যে সব মিথ্যে। তুমি ভয়ে মিথ্যে কেন বলছো হামিদ? নাকি তোমারো আমার উপর নজর ছিলো এজন্য মিথ্যে বলছো?”

নিধি তখনই তীব্র বেগে এসে কষিয়ে একটা চড় মারলো। বলল,

“ মিথ্যে নয় সত্যি। সেদিন আমিও আপনাদের বন্ধ ঘর থেকে একসাথে বেরোতে দেখেছি আপনার শাড়ি, চুল এলোমেলো ছিলো। প্রশ্ন করলে মিথ্যা বলেছেন ঘরে গল্প করছিলেন শুধু। কেউ পরপুরুষের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে গল্প কে?”

চারদিকে হইচই আরো বাড়লো। নুরুল আলম সম্মান হারানোর ভয় পায় সেটাই আজ হলো।
এর সঙ্গে প্রকাশ পেলো আরো এক সত্য ঘটনা রুপসির পেটের সন্তান সাহেলের নয় হামিদের। যার স্বকৃতি নেই। অবৈধ সন্তান কে সাহেলের উপর চাপাতে বুদ্ধি করে বিয়ে করেছে। যাতে সন্তানের লোভে আরো হাতের মুঠোয় রাখতে পারে। দশ মাসের আগে সাত মাসে সন্তান হলে আল্লাহর রহম বলে চালিয়ে দিতো এমনটা সাজিয়ে রেখেছিলো। কানাঘুষা শেষে নুরুম আলম রাগে চাবুল মারতে শুরু হামিদ কে এবং রুপসিকে গ্রাম ছাড়া করার র্নিদেশ দিলো। চাবুক তাকেও মারতে চেয়েছিলো তবে মাহাদ আঁটকে দিয়েছিলো। একজন নারী যতই খারাপ হোক তার গায়ে আঘাত করার অধিকার তাদের নেই। শাস্তি স্বরূপ ওদের বিয়ে দিয়ে গ্রামছাড়া হতে হবে দুজন কে। এখনো বিধান নগরের আশে পাশে তাদের যেন না দেখা যায় এই র্নিদেশ দিলো নুরুল আলম।

এতো ঝামেলার মধ্যে একটা ভালো কাজ হলো সাঈদ আর নিধির বিয়ে। সবটা স্বপ্নের মতো ছিলো। কল্পনাও বোধ-হয় এতো তাড়াতাড়ি হয় না। নুরুল আলম শেষে আর কথা বলতে পারেননি মেয়ের সম্মান সাথে এই বাড়ির সম্মান রক্ষার্থে বিয়ে দিতে অমত করলো না। আর না মুখ আছে মেয়ের দিকে তাকানোর।
কাল রাতে মাহাদ না দেখলে আজ কি হতো?
একটা নোংরা খেলার শিকার হতো নিধির জীবন। সাঈদ হারাতো ভালোবাসা। নিধি হয়তো জীবন শেষ করার সিদ্ধান্তেই অটল থাকতো। সবশেষে পরিনত হতো ধ্বংস কিন্তু সবটা কল্পনার সুন্দর হয়েছে। এমনটাই তো ওরা চেয়েছিলো। আল্লাহ সহায় থাকলে সবই সম্ভব। আর পাপ কখনো লুকিয়ে রাখা যায় না। একদিন ঠিকই বেরিয়ে আসে শুধু সময়ের অপেক্ষায়।

________

বিয়ে পড়ানো শেষে নিধি সাঈদের হাত ধরে মাতবর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলো। শুধুমাত্র মায়ের থেকে বিদায় নিলো বাবা ভাইয়ের দিকে তাকালো না পর্যন্ত। নুরুল আলম নিরবে দেখে গেলেন। মাথায় এখনো সবটা ঘুরপাক খাচ্ছে। সাহেল রুপসির কান্ধে কয়েকটা লাথি মেরেছে তার পর বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। মাহাদ, নাজির আর জিহান সাঈদ আর নিধিকে নিয়ে এসে দাঁড়ালো মাতবর বাড়ির সামনে। যেখানে মালা আর পাপিয়া তাদের অপেক্ষায় আছে। নিধিকে সাঈদের সঙ্গে দেখে ওরা দুজনে খুশি হলো। শিউলি নিধির পাশে আছে। নাজির এসে নিধির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“তোর ভাই আছে না? তুই আমার বাড়ি থাকবি।
শুধু জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না এটা মেনে নিবি।”

নিধি কেঁদে উঠলো। জড়িয়ে ধরলো বড় ভাইকে। নাজির স্নেহের হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিলো। সাঈদ সকলকে কৃতজ্ঞতা জানালো তার পর মাহাদ কে আলিঙ্গন করে বলল,

“তুই আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ বন্ধু। আমার ভাই আমার বিপদের সঙ্গী। তোর মতো বন্ধু এই জগতে খুঁজে পাওয়া কঠিন।”

মাহাদ ওর কাঁধে চাপড় দিয়ে হেসে বলল,

“এতো আবেগে ভাসতে হবে না চল নতুন বউ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি? তোর জন্য আমি সব সময় পাশে আছি, থাকবোও। আমার বিপদে তোকে আর আরহাম কে ছাড়া কাউকে পাইনি তা ভুলিনি।”

সাঈদ ওকে ছেড়ে দিলো। চারদিকে অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। কুয়াশায় দূরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। সকলে বাড়ির দিকে যাবে এগোতে চাইলো। মাহাদ শিউলির দিকে তাকালো। করিম মিয়া কে খুঁজলো উনি আসছেন রাইসুল রহমানের সঙ্গে আলাপ করতে করতে। শিউলির তারই দিকে চেয়ে আছে। মাহাদ তার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“কি দেখছো?”

“ আপনি তো ভালো কেন? আপনি কি জাদু জানেন? কেমন সবাই কে মিল করে দিতাছেন।”

শিউলির প্রশ্নে মাহাদ মিটিমিটি হাসলো। প্রতিত্তোরে বলল,

“ হ্যাঁ জাদু জানি। আমার চেয়েও বড় জাদুকরী তুমি।”

“কিভাবে?” শিউলি অবুঝের ন্যায় প্রশ্ন করলো। মাহাদ ভাবনা ছাড়াই বলে দিলো,

“এই যে আমার মতো একজন মানুষ কে প্রেমে পড়তে বাঁধ্য করলে, শত,শত কিলো পথ পাড়ি দিয়ে এই গ্রামে আসতে বাঁধ্য করলে এ কি জাদু নয় বলো?”

শিউলির দৃষ্টি নরম হলো। মাথা নিচু করে হেসে উঠলো।

“আপনি সুন্দর কথা কইতে জানেন। আমি যাই আব্বা আইছে।”

শিউলি করিম মিয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। রাইসুল রহমান আর তিনি মাত্র আসলেন তাদের কাছে। করিম মিয়া বিদায় জানিয়ে শিউলি কে আগে গেলো। ওরা সকলেও পা বাড়ালো সামনে। মাহাদ সবার পিছনেই ছিলো। ও সবে দুই ধাপ ফেলেছে তখনই থেমে যেতে বাধ্য হলো। কেউ একজন পিছন থেকে আঘাত করলো। মাহাদ চিৎকার করে ব্যথ্যাতুর কন্ঠে বলে উঠলো, “ আহহহ”

সকলে ভড়কে পিছনে তাকালো। ততক্ষণে মাহাদ মাটিতে হাঁটু গেরে বসে পড়েছে। অন্ধকারে কেউ একজন ছুটে পালালো। জিহান দৌড়ে গেলো তার পিছু। মালা হ্যারিকেন এগিয়ে আসলো সকলে দেখলো মাহাদের হাতের পেশীর মাংসে ছুরি ঢুকে আছে। সেখান থেকে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে। রাইসুল রহমান সহ সকলে ভয় পেলো। ছেলের জন্য অস্থির হয়ে পড়লো। শিউলি আর করিম মিয়া কিছুটা এগিয়ে গিয়েই মাহাদের চিৎকার শুনে ছুটে এলো। মাহাদ ব্যথায় চোখ বন্ধ করে আছে। সাঈদ বসে পড়লো আগলে নিলো মাহাদ কে। মাহাদ ব্যথা গিলে শক্ত হয়ে একহাতে ছুরিটা মাংস গেরে যাওয়া থেকে থেকে বাহির করলো। তখনই আরো রক্তের বন্যা বইতে শুরু করলো। পুরো শরীর রক্তে মেখে গেলো। মাহাদ ব্যথার তীব্রতায় কাতর হলো তবুও চিৎকার করলো না। শিউলি ভয়ে কেঁদেই দিলো। বসে পড়লো তার পাশে। কাঁদতে কাঁদতে হাত স্পর্শ করলো। রাইসুল রহমান কাউকে কিছু বলছেন। পাপিয়া আর নিধি দৌড়ে কিছু একটা আনতে গেলো। মুহূর্তেই ফিরলো পরিষ্কার কাপড় নিয়ে। রাইসুল রহমান ক্ষতস্থানে শক্ত করে বেঁধে দিলো। তবুও র*ক্তের ঢল নামতেই থাকলো। জুরুরি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে বলে তিনি জানালেন। শিউলির কান্না বাড়লো। মাহাদ কেবল ডানে শিউলির দিকে একবার তাকালো তার পর ধীরে ধীরে নিতেজ হয়ে চোখ বন্ধ করে লুটিয়ে পড়লো সাঈদের গায়ের উপর।

চলবে………………….?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here