একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—২১

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—২১

রাত্রি তখন মধ্য প্রহর প্রায়। মাহাদের ঘুম ভেঙে গেলো। শহরে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যেস গ্রামে এসে তাড়াতাড়ি ঘুৃমাতে হয় আর এই মধ্যরাতে জাগনা পায়। এমনটা প্রায় নিত্যদিনই হয়। পাশে তাকালো রাইসুল রহমান শুয়ে আছে। জল চৌকিতে শুয়ে ছিল বাবা ছেলে। ছোট চৌকি হওয়াতে দুটো মানুষের বেশি জায়গা হয় না। নাজিরের নতুন বাড়িতে দুটোই ঘর আর চৌকি। সাঈদ কে রেখে এসেছে মালাদের বাড়ি শাহিনের সঙ্গে। মাহাদের ঘুম ভেঙে যাওয়াতে শোয়া থেকে উঠে পড়লো। তাকালো পাশে রাইসুল রহমানের দিকে। জানালা খুলে দিলো সে। হু হু করে কুয়াশা ভেতরে প্রবেশ করলো। শীতল করলো শরীর। লেপের ভেতর গরমই লাগছিলো। তখন হঠাৎই প্রকৃতির ডাকে সাড়া এলো। পেট গুড়গুড় করছে। চৌকি থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনের দাঁড়ালো। চারদিকে অন্ধকার তার মধ্যে কুয়াশা। মাহাদ ওর সঙ্গে থাকা টর্চ লাইট নিয়ে পানি ভর্তি বদনা সহ বাড়ি থেকে বেরোলো। পায়খানা বাড়ির বাইরে রয়েছে। বাহির হতেই শিশির বিন্দুর টপটপিয়ে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া অনুভব করলো। শীতে শিউরে উঠলো গায়ের লোম। তড়িঘড়ি করে কাজ সেরে বেরিয়ে আসলো। টর্চ লাইট জ্বালানো হলেও বেশিদূর পর্যন্ত আলো পৌঁছাতে পারছে না। কুয়াশা গ্রাস করে নিচ্ছে সবটা। মাহাদ শীতের তোপে তড়িঘড়ি করে বাড়ির ভেতর আসার জন্য পা বাড়ালো। কিন্তু একধাপ এগোতেই থেমে গেলো মাহাদ। বাড়ি থেকে সামান্য দূরে কারো আর্তনাদ কন্ঠে, ‘ অ্যাওও’ বলে উঠলো। মনে হচ্ছে ব্যথা পেয়েছে কেউ। কন্ঠটা কোনো এক নারীর ছিলো এতটুকু বুঝতে পেরেছে সে। মাহাদ টর্চ লাইট ইতিমধ্যে বন্ধ করেছে। পিছনে ফিরে কান পেতে আওয়াজ শোনার চেষ্টা করলো। কিন্তু শুনতে পেলো না। তবে বাঁশের ঝোপের আড়ালে কিঞ্চিৎ আলোর রেখা দেখতে পেলো। মাহাদ এগিয়ে গেলো কিছুটা। হ্যাঁ সত্যিই এবার ফিসফিস কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। সুনসান নীরবতা রাত্তে কে বাঁশ বাগানের আড়ালে?মাহাদ ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো। নাজিরের বাড়িটা একটু ফাঁকা জায়গায় বটে। আশে পাশে বাড়ি একটু দূরে। দূরের প্রথম বাড়িটাই মাতবর বাড়ি। কুয়াশা না থাকলে দেখা যেতো স্পষ্ট। এগিয়ে যেতে যেতে মানুষের কন্ঠ আরো জোরে শুনতে পেলো। বাঁশ বাগানের কাছে এসে দাঁড়ালো। সামান্য কাছে ছাড়া দেখা যাচ্ছে না কিছুই। টর্চ ও জ্বালাতে পারছে না। হঠাৎই আলো জ্বলে উঠলো। কেউ একজন বলে উঠলো,

“এই সময়ই পায়ে কাঁটা ফুঁটতে হলো। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কইরা বাড়ি যাইতে হবে।”

অপরজন ব্যথ্যাতুর কন্ঠে বলল,

“ হুম ওষুধের কাজ বেশিক্ষণ থাকবো না।”

মাহাদের কাছে একজনের কন্ঠ একটু পরিচিত লাগছে। কিন্তু ঠাওর করতে পারলো না প্রথমে। ওদের দুজনের আরো কিছু কথোপকথন শুনতে পেলো। যা শুনে ও অবাক হলো। এবার না চাইতেও দুজনের পরিচয়ই জেনে গেলো। তখনই আবারো আলো জ্বললো। আলোর রেখা অনুযায়ী ঘন বাঁশের আড়াল থেকে মাথা বাড়িয়ে যা দেখলো তাতে মাহাদ স্তদ্ধ হয়ে গেলো। অবিশ্বাস্য চাহনি! কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলো না। হা হয়ে গেলো মুখখানি। ওরা দুজনে একে অপর কে ধরে হাঁটতে থাকলো। মাহাদও ওদের পিছু নিলো। ওরা গিয়ে থামলো গ্রামের এক পুরোনো বাড়িতে। যেখানে কেউ থাকে না বলে জানতো। ইটের তৈরি ছোট একটি প্রচীরহীন ঘর। ওরা ঢুকেই তার পর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো। এদিকটায় মানুষ দিনেই আসে কম রাতে তো দূর। মাহাদ অনেকটা সময় অপেক্ষা করার পর আশে পাশে নজর বুলিয়ে ঘর গুলোর দিকে পা বাড়ালো। নিঃশব্দে দাঁড়ালো ঘরের পিছনের দিকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই ঘরের কোনো জানালা নেই। ঘরে কি হচ্ছে দেখতে পারছে না। মাহাদ চেষ্টা চালালে তবুও। অন্ধকারে কিছু দেখতেও পাচ্ছে না তেমন। হঠাৎই ঘরের ভেতর সাময়িকের জন্য আলো জ্বলে উঠলো। ঘরের দেওয়ালে ইটের ফাঁক দিয়ে কিঞ্চিৎ আলোর রেখা বেরিয়ে আসলো। আলো মুহূর্তে বন্ধ হলো। মাহাদ আশার আলো দেখতে পেয়ে বামে এগিয়ে গেলো। ইটের ফাঁকে দৃষ্টি রেখে দেখার চেষ্টা করলো। অন্ধকার ব্যতীত কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটু আগের মতো আবারো হুট করে আলো জ্বলে উঠলো স্পষ্ট হলো ঘরের মানুষ দুটো। দ্বিতীয় দফায় মাহাদ অবাক হলো। অবাকের তোপে মুখ চেপে ধরলো আপনা-আপনি। মুখ ফিরিয়ে নিলো দেওয়াল হতে। নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারলো না। মাহাদ আগের মতোই পিছন দিয়ে নিঃশব্দে চলে আসলো বাড়ির দিকে।

___________

সূর্যের আগমনে দিনের সূচনা ঘটলো। আলোর প্রতিমা ছড়িয়ে শীত কিছুটা কম করলো। রোদ উঠেছে এজন্য শীত আজ একটু কম হবে বলে ধারণা করলো। শিউলি আজ সকালে দেরিতে উঠেছে। বেলা তখন গড়িয়ে গিয়েছে। কাল সারারাত ঘুম হয়নি জানা কারণে৷ আনন্দে, খুশিতে ঠোঁটের হাসি সরেনি এক মুহূর্তের জন্য।

পাপিয়া সকালে উঠেই শাশুড়ির কাজে সাহায্য করতে লেগে পড়ে। জাহিমা বেগম না চাইতেও ছেলের জন্য মানিয়ে নিয়েছেন যদিও পাপিয়া ভয় পায় তাকে। কারণ বিয়ের দিন মুখ ভার করে ছিলো বলে। আজই তাড়াহুড়ো করে বাহিরে কলপাড়ে থালাবাসন মাজতে নিয়ে গেলো। জাহিমা বেগম মানা করলেও শুনলো না বরং দুজনে একসাথে কাজ শুরু করলো। তখনই পাশ থেকে এক প্রতিবেশী মহিলা মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো,

“এতো মাথায় তুলিস না লো। অন্য একটা ঘর সংসার খেয়ে এসেছে কখন এটাও খায় কওন যায় না। এতো সুন্দর পোলাডারে এমন মাইয়ার লগে বিয়া দিলা ভাইবা অবাক হইয়া যাই জাহিমা।”

পাপিয়ার হাত থেমে গেলো। চোখের কোনে জল এলো মুহূর্তে। জাহিমা বেগম একবার ওর দিকে চেয়ে মহিলাটার দিকে তাকালো। হাসি মুখে কড়া জবাব দিলো,

“আমার মাথার উপরে কেউ নাই বুবু। আমি তো দেখতাছি সংসারে আনন্দ ফিরে আইছে তাইলে সমস্যা কোথায়? আমার পোলার শুধু চেহারা সুরত সুন্দর নয়, মন ও সুন্দর তাই উপর দেইখা বিচার করে না।”

প্রতিবেশী মহিলার মুখ কালো হয়ে গেলো। ভেতরে ভেতরে ফুসে উঠলো তা জাহিমা বেগম টের পেলো। চলে গেলো হনহনিয়ে। পাপিয়া কৃতজ্ঞতায় মুগ্ধ হয়ে পাশের মানুষটার দিকে চাইলো। ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে তিনি হেসে শুধালেন,

“কি দেখতাছো?”

“আম্মা আপনি আপনার ছেলেই মতো ভীষণ ভালো।”

তিনি আবারো হাসলেন। কল ঠেসে পানি দিয়ে পাতিল ধুইতে ধুইতে বললেন,

“আমার ছেলে কে সব সময় ভালো রাইখো। ও তোমার জন্য অনেক লড়াই করছে মা।”

পাপিয়া মাথা নাড়ালো। আবারো মন দিলো কাজে। জিহান দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সবটা দেখলো শুনলো। মনের ভেতর আনন্দ অনুভব হলো। বউ শাশুড়ি এভাবে মিলে থাকলে লোকের কথায় কি আসবে যাবে? জিহান এবার বাড়ির ভেতরে গেলো। ডাক ছাড়লো পাপিয়ার নাম ধরে।
পাপিয়ার বাসন মাজা শেষ জাহিমা বেগম যাইতে বলল,

“দেখো বাবুর কিছু লাগে কিনা।”

পাপিয়া হাত ধুয়ে শাড়ির আঁচল কোমর থেকে বাহির করে হাত মুছতে মুছতে ঘরে গেলো। দেখলো জিহান খাঁটের উপর বসে আছে।

“কিছু লাগবে?”

“হুম।”

“কি লাগবে বলুন।”

“আগে এদিকে আসো।”
পাপিয়ার ভ্রু উঁচু হলো। মুখ দেখে ভাবসাব অন্য বুঝছে পারলে। তাই তো বলল,

“অকারনে ডাকলেন কেন? রাঁন্ধন চড়াতে হবে আমি গেলাম।”

পাপিয়া দুয়ার থেকেই চলে যেতে নিলে জিহান তড়িৎ গতিতে এসে ওর শাড়ির আঁচল টেনে ধরে।
চৌকাঠ পেরোনোর আগেই পা থেমে গেলো পাপিয়ার। আঁচলে টান পড়লে পিছনে ফিরতে বাঁধ্য হলো। জিহান মিটিমিটি হাসছে। আঁচল ধরে এগিয়ে নিয়ে আসলো নিজের দিকে। না চাইতে হলো জিহানের দিকে। দু’হাতে পাপিয়াকে আগলে নিয়ে বলল,

“পালাই পালাই করো কেন? এতোদিন তো পালিয়েই ছিলে এখন না-হয় একটু পাত্তা দেও।”

পাপিয়া হাতের বাঁধন ছাড়াতে ব্যস্ত হলো। সঙ্গে বার,বার খোলা দুয়ারের দিকেও তাকালো। বলল,

“সারাজীবন পড়ে আছে। এখন কাজের সময় পাত্তা দিতে পারবো না ছাড়ুন আমি যাই।”

জিহান ছাড়লো না। কপালে কপালে ঠেকিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে প্রতিত্তোর করল,

“প্রেমের বয়স তো সারাজীবন থাকবে না।”

“বিয়ের প্রেম হয়? বিয়ের পর সম্ভব হয় ভালোবাসা, যত্ন আর দায়িত্ব।”

“প্রেমিক স্বামী দুই যখন হয়েছি তখন প্রেম, ভালোবাসা দুটোই হবে।”

পাপিয়া আর কোনো কথা বললো না। কারণ জানে লোকটার সঙ্গে যুক্তিতে পারবে না। তাই অনুরোধ কন্ঠে ধীরে বলল,

“ রাঁনতে যাই? না রাঁনলে খাবেন কি? প্রেম ভালোবাসা দিয়ে পেট ভরে না।”

“মন তো ভরে। মন আর চোখের তৃষ্ণার কাছে পেটের ক্ষুধা কিছুই না মেয়ে।”

কথাটা শেষ করেই পাপিয়া কে ছেড়ে দিলো। আঁচল টা মাথা পর্যন্ত টেনে দিতেই ও দৌড়ে বাহির হয়ে গেলো। জিহান খাঁটের উপর বসে হাসতে থাকলো। এভাবে প্রতিটি দিন সুন্দর হবে ভেবে স্বপ্ন দেখলো। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়াও জানালো।

________
মালা দেশি মুরগীর মাংস রাঁধছে। ওর মা সকালে এসে একটা বড় মোরগ ধরে দিয়ে গেছে। এতো মেহমান লাগবে তো। মা মেয়ে মিলে কাটাকুটি করে মালা একাই চড়ালো। ওর মা গেছেন নিজের কাজে। ও আরো আগে থেকে রান্ধন পারে। মালা মাংস কসাচ্ছে আর নাজির পাশে বসে আছে। তাকিয়ে দেখছে মালাকে। কেমন সুন্দর করে সংসার সামলাচ্ছে। রাইসুর রহমান, মাহাদ,সাঈদ মিলে বাইরে হাঁটতে গিয়েছে। রাঁধতে রাঁধতে মালার চুলের খোঁপা খুলে গেলো। চুলগুলো সামনে আসতে নিলে বিরক্ত হলে। মালা নাজির কে না বললে ও উঠে এসে মালার চুলগুলো খোঁপা করে দিলো। প্রথমে না পারলেও কয়েকবার চেষ্টার পর সফল হলো। মালা হাসতে হাসতে বলল,

“অনেকদিন আগে সিনেমায় দেখছিলাম নায়ক এভাবে খোঁপা করে দেয়।”

নাজির আবারো পাশে বসলো। চুলোর জ্বাল এগিয়ে দিয়ে বলল,

“ তুমি আমার নায়িকা। আমার মনের রানী আমার জীবনসঙ্গিনী।”

“ আপনি আমার নায়ক, আমার মনের রাজা আমার জীবনসঙ্গী।”

মালাও নাজিরের মতো মিলিয়ে বলল। তার পর দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। একসাথে হাসার মধ্যে শান্তি আছে, সুখ আছে। মাহাদ আগে বাড়ির দিকে আসাতে নাজির আর মালার কিছু কথা শুনতে পেলো। দেখতে পেলো তাদের প্রাণোচ্ছল হাসি। মনে মনে হাসলো সে নিজেও। অন্যের ভালোবাসা দেখতেও আনন্দ লাগে। খনিকের জন্য সে অবশ্য ওদের জায়গায় নিজেকে আর শিউলি কে কল্পনা করেছিলো।

নাজির দুয়ারের কাছে মাহাদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,

“দাঁড়িয়ে কেন আসো।”

মাহাদ ভেতরে আসলো। মালার দিকে একবার তাকিয়ে নাজিরের উদ্দেশ্য বলল,

“তোমার সঙ্গে আমার কিছু জুরুরি কথা আছে নাজির।”

“হ্যাঁ বলো।”

“একান্ত। ঘরে এসো একটু।”

নাজির উঠে পড়লো। মালা তেমন মাথা ঘামালো না। দুজনে ঘরের ভেতর চলে গেলো। সে রাঁধতে ব্যস্ত থাকলো।

________

শিউলি আমেনা বেগমের পিছুপিছু ঘুরছে। তিনি এমন করার কারণ বুঝতে না পেরে শুধালেন,

“ কি হইছে? এভাবে ঘুরছিস কেন পিছুপিছু? ”

“আম্মা মালা গোর বাড়িত যাই?” শিউলির মিনমিনে কন্ঠ। আমেনা এতক্ষণে মেয়ের মতলব বুঝতে পারলো। নাকোচ করলো।

“ মানুষে খারাপ কইবো বিয়ের আগে দেখা হওয়া দেখলে। কালই তো বিয়ে তোর আব্বায় পৌর শহরে বাজার সদাই করবার গেছে। তোর চাচাও সঙ্গে গেছে। সকলে খুশি এতো ভালো পোলা তার উপর ডাক্তার।”

উচ্ছাস নিয়ে কথাটা শেষ করলো আমেনা। কিন্তু শিউলির মুখ ভার হলো। তিনি সেটা লক্ষ্য করলেন। বললেন,

“ঠিক আছে এই যাবি আর আসবি। তোর আব্বায় আইলো বলে। উনার আগেই আসবি কিন্তু।”

শিউলি মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো। আমেনা বেগমের হাসিমুখ হুট করে নিভে গেলো। সুখ যে বহু দূরে এতদূর তারা দেখতে পাবে না যখন তখন।

শিউলি বাড়ি থেকে বেরোতেই দেখলো মাহাদ আর জবেদা বিবি নদীর পাড়ে টঙের উপর পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করছে। শিউলি আর গেলো না দাঁড়ালো সেখানেই। মাহাদ হয়তো তাকে দেখতে পেয়েছে। তখনই জবেদা বিবি শিউলি কে ডেকে উঠলো,

“ শিউলি বুবু এখানে আয়।”

শিউলি আশে পাশে চেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। টঙের কাছে আসতেই মাহাদের হাসিমুখ খানা নজরে পড়লো। জবেদা বিবি মাহাদের হাত ধরে আনন্দিত কন্ঠে বলল,

“এই ছেমরা কইতাছে তোরে রাইখা নাকি আমারে নিয়া যাইবো। তুই দিবি?”

শিউলি চোখ বড় বড় করে তাকালো। মাহাদ হাসছে মিটিমিটি। ও বুঝতে পারলো মজা করছে তাই ও নিজেও মজা করে উত্তর দিলো,

“ হ্যাঁ যাও আমার কি? আমারই ভালো গ্রাম ছেড়ে যাইতে হইবো না। এই নদী, মাটির সঙ্গে আমার কত স্মৃতি। ”

“কাঁনবি না তো?”

শিউলি উত্তর দেওয়ার আগেই মাহাদ বলে উঠলো,

“মুখে না বলবে কিন্তু মনে মনে ঠিকই কাঁদবে। কিন্তু আমি তোমাকেই নিয়ে যাবো। কারো কান্না দেখবো না। তোমার মতো সুন্দরীর কাছে সকলে তুচ্ছ।”

জবেদা বিবির গাল টেনে বলল মাহাদ। শিউলি ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার কথা মিথ্যে প্রমান করতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“আমার ঠেঁকা পড়ছে। আমি গেলাম আপনারা দুজনে পরিতের আলাপ করেন।”

শিউলি ওখান থেকে চলে আসতে নিলো। মাহাদ টঙ থেকে নেমে ছুটলো পিছু। জবেদা বিবি মিটিমিটি হাসছে। শিউলি গমগমিয়ে চলছে। মাহাদ পিছু নিয়ে বলল,

“শোনো তুমি ছাড়া কেউ নেই জীবনে। তোমাকে নিয়ে যাবো বলেই পাড়ি দিয়ে এসেছি এই বিশাল নদী।”

শিউলি থামলো না। বললো না কোনো কথা।

“তুমি কি রাগ করেছো? ”

শিউলি তবুও নিশ্চুপ। আড়ালে কেবল মিটিমিটি হাসছে। মাহাদ এবার থেমে গেলো। শিউলি খানিকটা এগিয়ে গিয়ে পিছনে ফিরলো। বলল,

“বউ আমি আপনার জন্যই সাঁজবো। সঙ্গে দানি বুড়ি হিসাবে বুড়িকে নিতে পারেন তবে তা দুদিনের জন্য নিয়ম রক্ষার্থে বুঝলেন?”

“তুমি বললে আমি সবই বুঝি। তুমি মানুষটাই সরল অঙ্ক।”

শিউলি চলে গেলো। মাহাদ আবারো জবেদা বিবির কাছে গেলো। জবেদা বিবির চোখ এখন জল টলমল করছে। তারা মূলত এতোক্ষণ শিউলির চলে যাওয়া নিয়ে গল্প করছিলো। জবেদা বিবির গল্পের সঙ্গী শিউলি তাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হবে। মাহাদ আবার এসে টঙের উপর বসলো। বলল,

“তোমাকেও নিয়ে যাবো চলো। আমার তো মা নেই আমিও থাকবো হসপিটালে তোমরা দাদি নাতনী মিলে থাকবে একসাথে।”

“মন্দ হতো না কিন্তু শিকর ছাইড়া যাইতে পারমু না ভাই। তোর দাদার কবর আছে আছে এখানে দেখলেও শান্তি পাই।”

ভালোবাসা বুঝি এমনই। মৃত্যুর পরেও থেকে যায়।
মানুষটা নেই তবুও কবরের থেকে বহুদূরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে না।

__________

রাতে সাঈদ, মাহাদ, নাজির আর রাইসুল রহমান মিলে গল্প করছিলো। একটু আগেই খাওয়া শেষ হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী মাহাদের গায়ে হলুদ দিয়েছে মালা,নাজির,পাপিয়া,সাঈদ,জিহান মিলে। ওরা আবার শিউলির বাড়িও গেছিলো হলুদ মাখাতে। হলুদ শাড়িতে বড় মোহনীয় লাগছিলো শিউলিকে। মাহাদ আড়াল থেকে এক নজর দেখে এসেছে। তবে সাা্ধ মিটেনি। মানুষের ভীড়ে আর গ্রামের মানুষের নিয়ম অনুযায়ী দেখা করা হয় না। দেখতে পেলে অনেকে নানান কথা রটাবে এজন্য আর যায়নি সামনে। মাহাদ দূর থেকে দুয়ারের ফাঁক দিয়ে তারই আনা হলুদ শাড়ি পরিহিত কিশোরী কন্যা কে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলো। শাড়িতে একটু বড়ই লাগে। শিউলি অবশ্য মাহাদ কে দেখতে পায়নি। দুচোখ খুঁজে ছিলো কিন্তু দেখা মিলেনি। আর একটা রাত-দিনের ব্যাপার এতটুকু তৃষ্ণা না-হয় থাকুক তার পর সারাজীবনই দেখবে,একসাথে থাকবে,সংসার করবে ।

তাদের গল্পের আসরের মধ্যে হঠাৎ সালেহের আগমন ঘটলো। দুয়ারে ঠকঠক আওয়াজে সকলে তার দিকে তাকালো। পাপিয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো অস্বস্তিতে। জিহান বুঝতে পেরে আড়াল করলো তাকে। সালেহের দৃষ্টি পাপিয়ার দিকেই ছিলো। জিহানের রাগ উঠলো। হাত মুঠো হয়ে এলো। এমন নোংরা দৃষ্টি স্ত্রী’র দিকে দেখে চোখ তুলে নিতে মন চাইলো। সাহেল কেবল ব্যাঙ্গ হাসলো। বুঝাতে চাইলো তাচ্ছিল্য। তার পর এগিয়ে এসে মাহাদ সহ সকলের দিকে তাকিয়ে নাজির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আজ নিধির বিয়ে দিচ্ছি। প্রয়োজন মনে করলে আসিস এখুনি তবে হ্যাঁ একা।”

হুশিয়ারী করলো মালাকে যেন না আনে। তবে সালেহের কথায় সাঈদের মাথায় বাজ পড়লো। মাহাদের দিকে তাকালো তক্ষণাৎ। নাজির জানতে চাইলো,

“কার সাথে?”

“ পশ্চিম পাড়ার রুপসির ভাইয়ের সালার সাথে।”

সাহেল আর কিছু না বলে চলে গেলো। যাওয়ার আগে মাহাদের দিকে একবার তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে ভুললো না। মাহাদের কপাল জড়ে এলো। সাঈদ অস্থির হয়ে উঠলো। তার এই অস্থিরতা মাহাদ,রাইসুল রহমান আর নাজিরও বুঝতে পারলো। সকালেই মাহাদ তাদের সম্পর্কে বলেছে নাজর কে। সে রাজিও হয়েছিলো কিন্তু এখন কি করবে? নুরুল আলমের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক নেই কেনো কথা শুনবে না তাছাড়া বিয়ে এখনই। সাঈদ উঠে পড়লো। মাহাদের কাছে করুন কন্ঠে বলল,

“কিছু একটা কর। নিধি কে না পেলে আমার জীবন বৃথা হবে। সব হারানো আমার ভাগ্যেই কেন আসে? মা,বাবা এখন প্রিয় মানুষকেও হারাতে বসেছি।ভাগ্য আমার বেলায় কেন নিষ্ঠুর হয় বল?”

মাহাদ সকলকে কিছু কথা বুঝিয়ে বলল। নাজির কে চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝালো। তার পর সকলে মাতবর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। সাঈদের বুক কাঁপছে ভয়ে। নিধির অবস্থা কেমন ভেবে কুল পাচ্ছে না একটুও। মাহাদ শান্তনা দিয়ে বলল,

“ আমরা আছি। নিধি তোরই হবে কথা দিচ্ছি।”

চলবে……………..?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here