একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—২৩-২৪

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—২৩-২৪

মাহাদের হাতে ছুুরির আঘাত লাগার পর তীব্র ব্যথায় মাথা ঘুরে সাঈদের গায়ে ঢলে পড়ে। তার পরও রক্তের বন্যা বইতে থাকে। এমন সময় উপায় একমাত্র ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া। গ্রাম্য ডাক্তার আছে তবে রাইসুল রহমান ভরসা পেলো না। আপাতত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে গ্রামের ডাক্তার কে ডেকে এনে চিকিৎসা নেয়। সাময়িকের জন্য রক্ত বন্ধ হয়। তিনিও পরামর্শ দেন পৌর শহরে যেতে। ছুরির ক্ষত হেলাফেলা করা যাবে না। তার পর রাতেই পৌর শহরে মাহাদ কে নিয়ে যায় রাইসুল রহমান সাথে যায় সাঈদ। মাহাদ যেতে মানা করলেও ও শোনেনা। বার বার বলল,

“তুই থাক। বিয়ের প্রথমদিন নতুন বউ রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।”

সাঈদ মুখের উপর বলে দিলো,

“ আমার পূর্ণতা তোর জন্য সম্ভব হয়েছে। মনের প্রণয়ের চেয়ে বড় আর কি আছে বল? তোর খারাপ সময়ে পাশে থাকতে না পারলে কিসের বন্ধু?”

মাহাদ আর কিছু বললো না। সাঈদ কে চিনে সে শত বললেও শুনবে না। হাতের মাংস ব্যথা করছে প্রচন্ড। টনটন করছে জায়গাটা। নৌকা চলছে নদীর বুকে। করিম মিয়া নৌকা বাইছে। রাইসুল রহমান এবার শুধালেন,

“ছুরি কে মেরেছে বলতো? দেখেছো কাউকে?”

মাহাদ ঠোঁট চেপে ব্যথা সহ্য করছিলো। বাবার প্রশ্নে তাকালো। বলল,

“তোমাদের পিছনেই হাঁটতে সবে দুধাপ ফেলেছি তখনই আচমকা কেউ ছুরি বসালো। আমি দেখতে পাইনি আঁধারে তবে এতটুকু বলতে পারি সে হামিদই ছিলো। মাতবর বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথাও লুকিয়ে ছিলো রাগ ও হিংসার বশবতী হয়ে প্রতিশোধ নিতে আঘাত করেছে। ছুরিটা হাতে না মেরে পেটে হলে এতক্ষণে মরেও যেতে পারতাম। আল্লাহ সহায় ছিলেন বলে এ যাত্রার বেঁচে গেছি।”

তার পর পৌর শহরে হসপিটাল থেকে ব্যান্ডেজ করিয়ে ঔষুধপত্র নিয়ে মধ্য রাতে ফিরেছে তারা। ডাক্তার ছিলো না রাইসুল রহমান নিজের পরিচয় দিয়ে ডাক্তার কে ডেকে এনেছিলো পাশেই থাকতো বলে।

শিউলি জেগে ছিলো। করিম মিয়া বাড়ি আসলে দুয়ারে ঠকঠক আওয়াজ হয়। তখনই ঘর থেকে ছুটে আসে। আমেনা দুয়ার খুলে দিয়ে সবে দাড়িয়েছে তার আগেই শিউলি শুধালো,

“ আব্বা উনি ঠিক আছেন? ডাক্তার কি কইলো?”

“কইলো ক্ষত গভীর ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু একটু সময় লাগবো। হাড় পর্যন্ত ছুরি পৌঁছেছিলো।”

শিউলির চিন্তা খানিকটা কমলেও মাহাদের ব্যথাময় মুখটা ভেসে উঠলেই কষ্ট লাগছে। মনে হচ্ছে ব্যথা অনুভব করছে সে নিজেও।

“আম্মা ঘুমাইয়া পড়ো।”

শিউলি শুনলো তবুও ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। আমেনা পাশ থেকে করিম মিয়া কে বলল,

“ছেলেটারে একবার দেইখা আসি?”

“ না এখন ঘুমাইবো। ডাক্তারে বিশ্রাম নিতে কইছে।
র*ক্ত ঝরার কারণে শরীর দুর্বল হইছে। আবার বিয়ের আয়োজন আছে মেলা কাজ চল ঘুমাই সবাই।”

করিম মিয়া শিউলি কে ঘরে পাঠিয়ে নিজেও ঘুমাতে গেলো। শিউলি ঘরের ভেতরে গিয়ে শুয়ে পড়লো। প্রথমে ঘুম না আসলেও এক সময় মাহাদ কে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লো।

________
মধ্য রাতে ঘরে ফিরে সাঈদ নিধির ঘরে প্রবেশ করে। তাদের জায়গা দেওয়া হয়েছে নাজির আর মালার ঘরে। আর ওরা দুজনে জায়গা নিয়েছে উঠোনের এক কেনো। সাঈদ ঘরে গিয়ে দেখে নিধি গভীর ঘুমে। ওদের ফেরার শোরগোল হয়তো কানে পৌঁছায়নি। সারাদিনের ধকলে কারণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সাঈদ বসে পড়লো নিধির পাশে। কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারই পানে। ঘুমের ঘোরে লেপ টানছে মাঝে মধ্যে। হয়তো শীত লাগছে। বধূ সাজ নেই গায়ে তবুও অসম্ভব সুন্দর লাগছে তার কাছে।
অবশ্য যে সত্যিকারে ভালোবাসে তার কাছে সাজসজ্জা ছাড়াও সুন্দর লাগবে,মুগ্ধ হবে।

অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সাঈদ শুয়ে পড়লো নিধির পাশে। লেপ টেনে নিতেই নড়েচড়ে উঠলো সে। বিরক্ত হলো মুখশ্রী। ঘুমেই মধ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করলো। ঘরের কুপি জ্বলছে টেবিলের উপর। সাঈদ ওর বিরক্তি মাখা মুখ দেখে হেসে ফেললো জোরে। সেই হাসির শব্দে নিধির ঘুম ছুটে গেলো। চোখ খুলে তাকালো। নিভু নিভু দৃষ্টিতে সাঈদের মুখখানা নজরে আসলো। প্রথমে চমকে উঠলেও ভালোভাবে দৃষ্টি মেলে সাঈদ কে দেখে স্থির হলো। শুধালো,

“কখন আসলেন আপনি? ”

“খানিক আগে।”

“তাহলে ডাকলেন না কেন?”

“দেখছিলাম আপনাকে। এতো সুন্দর বোধ-হয় আগে কখনো লাগেনি।”

“ সাজসজ্জাহীন ও সুন্দর লাগছে? নিত্যদিনই তো এইরকমই থাকি।” কিছুটা অবাক হয়ে শুধালো নিধি। সাঈদ বিপরীতে উত্তর দিলো।

“উহু। আজ আলাদা লাগছে।”

“কারণ কি শুনি?”

সাঈদ সামান্য ঝুঁকে গেলো ওর দিকে তার পর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“আজ আপনি আমার অধ্যাঙ্গিনী হয়েছেন এজন্য আমার চোখে আপনাকে অধিক সুন্দর লাগছে।
মনে হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা পবিত্র সম্পর্কে জড়ানোর পর পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য ও মুগ্ধতা ঢেলে দিয়েছে তোমার আর আমার মাঝে।”

নিধি অপলক তাকিয়ে রইলো। সাঈদ বার কয়েক দৃষ্টি ফেলে নিধির হাতখানা নিজের বুকের উপর রাখলো। বলল,

“ অস্থিরতা টের পাচ্ছেন? আপনাকে পাওয়ার আনন্দে বুকের পাশে অনুভূতির ঝড় বইছে।”

নিধি লজ্জা পেলো সামান্য। মুখ লুকাতে সাঈদের বুকই বেছে নিলো। মাথা রাখলেো ওর বুকের বাম পাশে। সাঈদ একহাত পিঠে আরেকহাত রাখলো নিধির মাথার উপরে। বুকের ধুকপুক স্পন্দন টের পাচ্ছে সে। তীব্র গতিতে স্পন্দিত হচ্ছে। সাঈদের গাঢ় চুমো টের পেলো কপালে ও চুলে। নিধি আড়ষ্ট হলো। কম্পিত ও জড়ানো কণ্ঠে বলল,

“ভালোবাসার অনুভূতিতে সিক্ত হতে আপনার আলিঙ্গন বেছে নিলাম। আপনি সব সময় এভাবে বুকের ভেতর আগলে রাখবেন সংগোপনে।”

“ সব সময়, সারাজীবন। আপনি শুধু এভাবে চুপটি করে থাকবেন আমার বুকের মাঝে।”

________

অনেক অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত সময়টি আসলো অবশেষে। বিকেল গড়িয়ে পড়েছে। শিউলি বউ সেজেছে। ওকে ঘিরে বসে আছে মালা,নিধি,পাপিয়া সহ গ্রামের আরো দুটো মেয়ে।
মালা ফিসফিস করে কানে কানে কি যেন বলছে আর শিউলি লজ্জায় মরিমরি হয়ে মাথা নিচু করে ফেলছে। চুপ করতে বলছে। কিন্তু মালা শুনছে না লজ্জা দিতে মাহাদ কে নিয়ে শত কথা বলছে।

এদিকে বরযাত্রী ও এসে গেছে। সবাই চেনাজানা মানুষ। বেশিজন অবশ্য আসেনি। মাত্র বিশের ঘরে তাও আবার দুই বাড়িরই অতিথি মিলিয়ে। খাওয়ার দাওয়ার পর্ব মিটিয়ে কাজি এগিয়ে এসে বসলেন সকলের মাঝে। গ্রামের সকলকে বিয়ে পড়ানোর দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।
সবার সার্মথ্য থাকে না পুরো গ্রাম খাওয়ানোর তবে বিয়ে পড়ানোর সময় ডাকে সকলে। শেষে অলিমা খেয়ে চলে যায় সকলে। কাজি প্রথমে খুতবা পাঠ করলেন তার পর বিয়ে পড়ানোর তাগদায় কন্যার বাবা সহ আরো দুজনকে পাশে রাখলেন। সামনে মাহাদ বর বেশে মাথা নিচু করে বসে আছে। সকলের কথামতো রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকেছে যদিও ইচ্ছে ছিলো না একটুও তবুও নিয়ম হিসাবে মানছে। কাজি এবার বিয়ে পড়ানো শুরু করলো।

“করিম মিয়ার একমাত্র মেয়ে শিউলি আক্তার কে দশ হাজার এক টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনি বিবাহ করতি সম্মত?
সম্মত থাকলে বলুন,বাবা কবুল।

মাহাদ মুহূর্তে সময় না নিয়ে বলে উঠলো,

“কবুল, কবুল, কবুল।”

তিনবার বলতে বলার প্রয়োজন হলো না। সাঈদ পেছন থেকে ওকে ঘুতো দিলো। ফিসফিস করে বলল,

“ এতো তাড়া? বউ পালিয়ে যাচ্ছে না রে। একটু তো লজ্জা কর।”

মাহাদ কেবল হাস্যোজ্জ্বল মুখে সকালের সামনে বসে রইলো। সাঈদের কথার উত্তর পরে দিবে বলল। কাজি কাবিননামা এগিয়ে দিলো। মাহাদ সাক্ষর করতেই কাজি করিম মিয়া সহ শিউলি চাচা ও উকিল বাবা হিসাবে শফিকুল মাস্টার কে নিয়ে শিউলির ঘরে গেলো। চৌকির মাঝখানে সে বসে ছিলো। কাজি সহ অনেকের আগমনে মাথা নিচু করে ঘোমটা টানলো। কাজি কাঠের চেয়ারে বসে একইভাবে শুরু করলো বিয়ে পড়ানো।

“রাইসুল রহমানের একমাত্র ছেলে মাহাদ রহমান কে দশ হাজার এক টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনি বিবাহ করিতে সম্মত আছেন?
সম্মত থাকলে বলুন, মা কবুল।”

শিউলি সঙ্গে সঙ্গে বললো না। ঘোমটার আড়ালে বাবার দিকে একবার তাকালো। মানুষটার মুখে হাসি নেই তবুও জোর করে হাসছে যেন। এদিকে কাজি সহ মালা ও ফিসফিস করে বলছে, ‘কবুল কইয়া দে।”

শিউলির অঁধর থেকে বেরিয়ে আসলো কাঙ্ক্ষিত শব্দ,

“ কবুল।”

“ আরো দুইবার বলো মা।”

“ কবুল,
কবুল।”

“ আলহামদুলিল্লাহ। ঘরের সকলে একসাথে বলে উঠলো। তার পর কাজি সহ প্রায় সকলে বেরিয়ে গেলো। করিম মিয়া ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। ঘর কিছুটা ফাঁকা হতেই মেয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। শিউলি ঘোমটা তুলে বাবার দিকে তাকালো। মুখখানা দেখেই চোখে জল টলমল করলো। করিম মিয়া স্নেহের হাত রাখলেন মাথায়। হাসার চেষ্টা করে বললেন,

“আমার আম্মারে আইজ মেলা সুন্দর লাগতাছে। দেখো আম্মা আমি হাসতাছি তুমি কানতাছো কেন? তুমি কানলে কিন্তু আমিও কানমু।”

শিউলি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো জড়িয়ে ধরলো বাবার হাত। কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আব্বা আমি তোমারে ছাড়া বহুদূর কেমনে থাকমু? তুমি আমারে দেখতা যাইবা, নিজের খেয়াল রাখবা। আমার জন্য মন পুড়লে হাসবা আর ভাববা তোমার শিউলি তোমার হাসি ভীষণ পছন্দ করে সে দূর থেকে খুশি হইতাছে।”

করিম মিয়া চোখের জল আঁটকে রাখতে পারলেন না। ঝরে পড়লো কয় ফোটা জল। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলার শব্দে আমেনা ও জবেদা বিবি ও হাজির হলো। করিম মিয়া বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। আমেনা মেয়েকে শান্তনা দিয়ে চোখের জল আড়াল করে স্বামীর পিছু চললো। জবেদা বসলো নাতনীর পাশে। বলল,

“ বুবুরে পরের ঘরত একদিন যাইতেই হইবো। সেই ঘর তখন নিজের ভাবতে হইবো। বাপের বাড়ি তখন পর হইয়া যাইবো,আসতে হইবো দুদিনের লাগি বেড়াইবার।”

শিউলি কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠছে। কথা বলতে পারছে না। তখনই শাহিন বিয়ের অলিমা দিতে আসলো। সবাই কে দিয়ে একটা খুরমার অর্ধেক শিউলির দিকে বাড়িয়ে দিলো। বলল,

“ দাদিরা কইলো স্বামীর আধ খাওয়া অলিমা খাইতে তাহলে নাকি ভালোবাসা বাড়বো। এটাই নিয়ম।”

শিউলি হাতে নিলো। তার পর মুখে পুরতেই মালা আর নিধি কানে কানে আবারো ফিসফিস শুরু করলো। শিউলি লজ্জা পেয়ে বলল,

“ আপা তুমিও মালার সাধ দিলা? আর মালা তোরে পরে দেইখা নিমু।”

মালা দাঁত বাহির করে হাসতে হাসতে বলল,

“আমারে দেইখা কি করবি? এখন থেকে ডাক্তার সাহেব কে দেখবি।”

বাকি সকলেও এবার হেসে উঠলো। শিউলি আরো লজ্জা পেলো। মালা চৌকি থেকে উঠতে উঠতে বলল,

“ডাক্তার ভাইজানের জুতা চুরি করে আর হাত ধোওনের টাকা মেলা পাইছি। বড়লোক দুলাভাই। একমাত্র শালিকা হই আমি এতটুকু দেওয়ার কথাই অবশ্য।”

নিধি পিছন থেকে বলল,

“ আমারে ভাগ দিবি। তোর সঙ্গ দিছি।”

“বউয়ের বড় বোন তুমি, তোমার ভাগ নাই।”

ওদের মিষ্টি ঝগড়ার মাঝে উপস্থিত হলো নাজির। মালা কে ডেকে বলল,

“ বাহিরে আসো। নিধি তোরে সাঈদ ডাকছে।”

মালা আর নিধির পর সকলে বাহির হয়ে গেলো।কেবল শিউলি একা বসে রইলো। জবেদা বিবি কোথা থেকে আবার এসে কয়টা কথা বলে গেলো। স্বামীর পায়ে সালাম করতে যেন না ভুলে এটা আরো একবার মনে করালো।

__________

শশুড় বাড়ি বহুদূর হওয়াতে নিজের ঘরেই শিউলির বিয়ের রাত যাপন করতে হবে। নাজির অবশ্য নিয়ে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু করিম মিয়া আর আমেনা নিষেধ করেছে এতো মানুষ ছোট বাড়িতে জায়গা কোথায় দিবে। যতদিন থাকবে এখানে থাকুক বলেছে।

শিউলি একা ঘরে বসে আছে। টেবিলের উপর হ্যারিকেন জ্বলছে। আলোকিত হয়ে আছে ঘর।
জানালা বন্ধ হিমেল হাওয়ার গতিবেগের জন্যে।
এবার মাহাদের আগমন ঘটলো। দুয়ারে শব্দ করে প্রবেশ করার কারণে শিউলি টের পেলো। ঘোমটার আড়াল হতে অস্পষ্ট নজরে পড়লো তাকে। মাহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। কাঠের টেবিলে কাছে এসে থেমে হ্যারিকেনের আলোটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলো। ঘরের সর্বত্র আরেকটু উজ্জল হলো। চৌকির দিকে নজর দিতেই লাল বেনারসি পরিহিত তারই সদ্য বিবাহিত অধ্যাঙ্গিনী কে দেখতে পেলো। তবে মুখ দেখতে না পেলো না। অস্থির হলো মন। দেখার ব্যকুলতা বাড়লো মুহূর্তেই। মাহাদ চৌকির কাছে যেতেই শিউলি তড়িৎ গতিতে নেমে আসলো। মাহাদ কিছু বলার আগেই নিচু হয়ে পায়ে সালাম করলো। মাহাদ হাত রাখলো মাথায়। শিউলি সোজা হয়ে দাঁড়াতেই মাহাদের মাথায় দুষ্টুমি চাপলো।বলল,

“কি দোয়া নিবে বলো? স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাকো? নাকি কয়েক সন্তানের জননী হও?”

শিউলি লজ্জা পেলো। মাহাদ বুঝতে পারলো ঘোমটার আড়ালে মেয়েটা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়েছে। সে আবার শব্দ করে হেসে দিলো। পুনরায় বলল,

“দোয়া দিলাম, সবার আগে নিজেকে ভালো রেখো,ভালোবেসো তাহলেই আশে পাশের মানুষগুলোকে ভালো রাখতে ও ভালোবাসতে পারবে। নিজের যত্ন নিলে তবেই চারপাশ যত্নে সমৃদ্ধ হবে।”

শিউলি কেবল শুনে গেলো। মাহাদ এগিয়ে এসে ঘোমটা তুলে ধরলো হাতে। বেরিয়ে আসলো শিউলির মুখখানা। মাহাদের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো। মুখ ফুটে বলে উঠলো,

“ মাশাল্লাহ।”

প্রশংসায় শিউলির মুখশ্রী লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে নিলো। একটু পর আবারো তাকালো। এখনো মাহাদ তাকিয়ে আছে। তাদের মধ্যে দূরত্ব সামান্য। শিউলি ওর দিকে চেয়ে এবার একটা আবদার করলো।

“ আপনি একটু নিচু হইবেন?”

“কেন?” মাহাদ প্রশ্ন করে উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে মাথা নিচু করলো। তখনই ওর চুলে শিউলির স্পর্শ টের পেলো। পাঁচটি আঙুল ওর চুল ছুঁয়ে দিচ্ছে।

“আপনার চুলগুলো আমার ছুঁতে ইচ্ছে করতাছিলো তাই নিচু হইতে কইলাম।”

মাহাদ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ঠোঁটের কোনো কিঞ্চিৎ হাসি স্পষ্ট। শিউলি সেই হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে শান্তি অনুভব করলো। হাতের ব্যথার কথা মাহাদ যেন ভুলে গেছে। প্রিয়তমা কে পাওয়ার আনন্দের কাছে এই ব্যথা যৎসামান্য।

মাহাদ এবার বসলো চৌকির একপাশে। পা ঝুলিয়ে দিয়ে বলল,

“এখানে এসে বসো শিউলি।”

মাহাদ ইশারায় দেখিয়ে দিলো তার বাম পাশে। শিউলি বসলো ঠিকই তবে মুখ আঁধার করে। মাহাদ তা খেয়াল করলো। মুহূর্তে এমন মুখশ্রী মাহাদ কে হতভম্ব করলো। একটুখানি তাকিয়ে থেকে শিউলির থুঁতনি উঁচু করে মুগ্ধ চোখে চেয়ে শীতল কন্ঠে শুধালো,

“আজ এই রাতে মুখ ভার কেন? আজ আমাদের সবচেয়ে আনন্দের দিন হওয়া উচিত,শিউলি।”

শিউলি নিচু দৃষ্টি উঁচু করে মাহাদের চোখের দিকে তাকালো। তার অভিমানী দৃষ্টি। চোখ মুখে অভিমান, অভিযোগ স্পষ্ট। মাহাদ ঠিক বুঝতে পারছে না কারণ কি। তাই আবার শুধালো,

“ বলো কি হয়েছে? অভিমান কেন জমেছে কাজল চোখে ? শ্যাম কন্যা কি জানে না তার চোখে অভিমান বড্ড মানায়, প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে বার,বার। আমি অভাগা প্রেমে সাগরে ডুবে মরবো আর কতবার?”

“আপনি শহর থাইকা ফেরার পর একবারো ‘সোনার কন্যা’ বইলা ডেকেছেন? বলেছেন ‘সোনার কন্যা’ তুমি চুল জবা ফুল কেন গুঁজো না? মনে হয় কত জনম শুনিনাই আপনার সে ডাক। দেখার তৃষ্ণার মতো আপনার মুখে সোনার কন্যা সম্বোধন টাও আমার প্রিয় হয়ে গিয়াছে।”

শিউলি এক নিঃশ্বাসে বলেই থামলো। কিছু কথা আরো বাকি আছে তাই মাহাদ চুপ থাকলো। শিউলি ফের বলল,

“প্রিয়র প্রিয় নামে সম্মোধন শুনবার আশায় আমি তৃষ্ণার্ত।”

অভিমানী কন্ঠে অভিযোগ শুনে মাহাদ হেসে উঠলো। কঠিন ভয় যা পেয়েছিলো তা নয়। শিউলি কপাল জড়ে তাকিয়ে রইলো তার পানে। মাথায় উপর দোপাট্টা টা মাহাদ আরেকটু সামনে এগিয়ে এনে রাখলো। প্রতিত্তোরে বলল,,

“অভিমানী বঁধূ আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি আমার ’সোনার কন্যা’। আমার প্রথম প্রেম আমার ভালোবাসা। আমার প্রিয় অধ্যাঙ্গিনী সোনার কন্যা তুমিই।”

একটু থামে সে। পরমুহূর্তে আবারো বলে উঠে,

“আজ থেকে শুধু তোমাকে নয়, তোমার মান,অভিমান,অভিযোগ শোনার দায়িত্ব নিলাম। মাঝে মধ্যে অভিমান করিও,তোমায় অভিমানী মুখ আমার ভীষণ পছন্দ। দু’চারটে অভিযোগ কর্মবিরতির পর ও হাসি মুখে শুনবো। সবশেষে ভালোবাসি বলবো।
শোনো,যেদিন আষাঢ়ে ঝুম বৃষ্টি নামবে তুমি আমি ভিজবো দু’জনে। তোমার শাড়ি ভর্তি আলমিরার মধ্যে দু’চারটে চিঠি থাকবে আমার নামে। উদাসিনী দুপুরে টেলিফোনের কন্ঠে একটু মন ভিঁজিও যখনই মনে পড়বে। অচেনা অলিগলি যখন ভালো লাগবে না বলিও নিয়ে আসবো তোমার চিরচেনা এই গ্রামের পথে,নদীর বুক ডিঙিয়ে বহুদূরে।
আর শোনো.,যত্নে রেখো আমাকে, যেভাবে শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখো খুচরো পয়সা।”

শিউলি হাঁটুতে থুতনি রেখে অপলক চেয়ে আছে। কত সুন্দর কথা জানে মানুষটা। কত অনুভূতি, কত প্রতিশ্রুতি! সবটা স্বপ্ন মনে হচ্ছে তার কাছে। মাহাদ কথা শেষ করে শিউলির বাম হাত মুঠোয় নিলো।
অনামিকা আঙুলে একটা আংটি পরিয়ে দিলো।
হ্যারিকেনের আলোয় চকচক করছে। সোনার আংটি এতে কোনো সন্দেহ নেই।

“আপনি আবার আংটি আনছেন কেন? কত গহনা গায়ে। এতো গহনা ভালো লাগে না।”

“আমার সোনার কন্যা কে সোনার আংটি উপহার দিলাম নিজের অর্থে। গহনা তো মায়ের যা তোমার জন্য বরাদ্দকৃত ছিলো। তোমাকে আরো একটা জিনিস দেওয়ার আছে।”

মাহাদ পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিছু একটা বাহির করছে। হাতে ব্যথ্যা অনুভব করলো একটু তা মুখ দেখেই বুঝা গেলো। ব্যান্ডেজ করা আছে। পকেট থেকে জিনিসটি বাহির করে হাতের মুঠোয় বন্ধ করে সামনে ধরলো। তার পর মুঠো খুলতেই নজরে পড়লো রূপোর একটি নুপুর। শিউলির অতি প্রিয় নুপুর। ও অধির আগ্রহে জানতে চাইলো,

“কোথায় পাইলেন? এটা তো আ….

“ হ্যাঁ তোমার। নদীর ঘাটে আমাদের দুজনের মুখোমুখি প্রথম দেখার কথা মনে আছে? যখন তুমি ছুটেছিলে আমায় দেখে সেদিনই পা থেকে পড়ে গেছিলো আম গাছের নিচে। অচেনা মেয়েটার নুপুরটি অতি যত্নে পকেটে রেখেছিলাম কে জানতো ওই মেয়েটাই আমার অধ্যাঙ্গিনী হবে। অথচ আমি কখনো কুড়িয়ে পাওয়া মূল্যবান জিনিস ও এতো যত্নে রাখিনি কখনো যা তোমার পায়ের নুপুরকে রেখেছিলাম তার পর নিজেই অবাক হয়েছিলাম, এই ভেবে ডাক্তার মাহাদ রহমান ও কাউকে এতো তীব্রভাবে ভালোবাসতে পারে?”

“ ভালোবাসা কি আমিও বুঝতাম নাকি? অচিন মানুষ আপনি আইসা সবকিছু এলোমেলো কইরা দিলেন। হৃদয়ের গভীরে উত্তাল ঢেউয়ের মতোন অনুভূতি জাগালেন, বুঝালেন ভালোবাসা কারে কয়। সে ভালোবাসার বাঁধনে আজ আমরা বাঁধা পড়লাম।”

অতঃপর দুজনে হেসে উঠলো। একজন লজ্জায় আরেকজন মুগ্ধতায়। মাহাদ চৌকি থেকে নেমে নিচু হয়ে বসলো। অতঃপর সযত্নে শিউলির পায়ে নুপুর খানা পরিয়ে দিতে গেলো কিন্তু শিউলি বাঁধা দিলো। পা সরিয়ে চকিত কন্ঠে বলল,

“ কি করতাছেন? পায়ে হাত দিতাছেন কেন? স্বামীর স্ত্রী’র পায়ে হাত দিতে নেই দাদি,চাচিদের বলতে শুনছি।”

মাহাদ শুনলো না। পা টেনে নুপুর পরিয়ে দিতে লাগলো। বলল,

“কেন স্ত্রী’র পা ছুঁলে কি পাপ হবে? স্ত্রী স্বামীর পা মালিশ করলে খেদমত আর স্বামীর বেলায় বারণ?
আমি এসব মানি না শিউলি আর মানবো না। তুমি আমার সমান, দুজন দুজনের পরিপূরক হিসাবে সারাজীবন রবো।”

শিউলি মানুষটাকে যত দেখছে, শুনছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে। এমন সুন্দর মনের মানুষ তার ভাগ্য ছিলো ভেবে শুকরিয়া জানালো সৃষ্টিকর্তা কে। মাহাদ ততক্ষণে পায়ের কাছ থেকে উঠে পড়েছে।

শিউলির হাত ধরে চৌকি থেকে উঠিয়ে কাঠের টেবিল হতে হ্যারিকেনটা তার সামনে ধরলো। হ্যারিকেনের কমলা আলো শিউলির মুখশ্রীতে ছড়িয়ে পড়লো, ফুটে উঠলো শ্যাম বরণ সজ্জিত অতিসুন্দর একখানা মুখ। শিউলি আলোর কারনে চোখ বন্ধ করেছে। নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে মাঝে মধ্যে। মাহাদ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইলো। কখন চোখে ঘোর লেগে এলো বুঝতেও পারলো না। হ্যারিকেন টা রাখলো আগের স্থানে। মাহাদ এগিয়ে গেলো ঘুচালো সামান্য দূরত্বটুকুও। শিউলি এবার চোখ খুললো। টের পেলো খুব নিকটে কারো অস্তিত্ব। বুক কাঁপছে অবিরত। হৃদস্পন্দন টের পাচ্ছে। এমন অনুভূতি কখনো হয়নি আগে । মাহাদ প্রথম চুমো এঁকে দিলো শিউলির কপালে, দ্বিতীয় নাকে। শিউলির খুলে রাখা চোখ মুহূর্তে বন্ধ হলো। আবেশে নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে।
মাহাদ নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ঘোর লাগা কন্ঠে বলে উঠলো,

“তোমার মাঝে আমার সর্বসুখ বিরাজ করুক সোনার কন্যা। তুমি বিহীন আমার এই জীবন বৃথা।”

চলবে…………………?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here