#বুকের_পাঁজর
#লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা)
#পর্ব:০৭
মাঝরাতে গ্রামের জমিদার বাড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে। অমাবস্যার রাতে কি ভয়ংকর কি না শোনাচ্ছে সেই কান্না।ইসলাম শিকদারের নিজের ভাই তো নেই।চাচাতো ভাই যারা ছিল তাদের মধ্যে হিমের নানা মানে সবার ছোটো ভাইটা ছাড়া সবাই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। ইসলাম শিকদার এক বাপের এক ছেলে,তাই অর্থ যা পেয়েছে সব একাই,কাজেও লাগিয়েছে। কিন্তু তার ছোটো চাচার তিন ছেলে এক মেয়ে।ছেলে গুলো যা সম্পত্তি পেয়েছিল তার কিছু কাজে লাগাতে পারেনি।মেয়ে রহিমা বেগম তো ইসলাম শিকদারের স্ত্রী।নিজের যথেষ্ট সম্পত্তি থাকায় চাচাতো ভাই+স্ত্রীর ভাইদের ছেলে মেয়েদের জন্য অনেক করেছেন। সবাইকে নিজের টাকায় লেখাপড়া শিখিয়েছেন।নিজের সন্তানদের মধ্যে তফাত করেননি ।তাইতো তারা সবাই আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে।বাবার সমান চাচা’কে হারিয়েছে তারা।তিনি না থাকলে তারা কি আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো!!
রহিমা বেগম আর ছেলেরা তো আছেই।তিন গিন্নিও পারছে না নিজেদের কে সামলাতে।তাদের সবার বিয়ের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন,তার পছন্দেই আজ তারা শিকদার বাড়ির বউ।বিয়ে করে ঘরে ঢুকতেই তিনি বলেছেন শিকদার বাড়িকে নিজের বাড়ি ভাবতে। কোনোকিছু খারাপ লাগলে নির্দ্বিধায় বলার অধিকার দিয়েছেন।
তিন বউকে মেয়ের মতো স্নেহ করেছেন।এক বাবা মা কে ছেড়ে এসে তারা নতুন বাবা মা পেয়েছিল।আজ বাবাহারা হলো।
হামিম,হাসিব,হিম কারো চোখে এখন পানি নেই।এখন কাদা যাবে না,বাড়ির বড় ছেলে তারা।দায়িত্বের শেষ নেই।
হিম রাস্তা থেকে শুকনো খাবার কিনেছিল।বাড়িতে রান্না করা হয়নি আর গ্রামে গিয়ে তাদের বড় ঝামেলায় ফেলানোর দরকার নেই।এমনিতেও কারো গলা দিয়ে খাবার নামবে না।
তাই এই শুকনো খাবার দিয়ে কোনো রকমে পেট চালালে হয়,না খেয়ে থাকা কারো জন্য ভালো হবে না।
ভোর রাতে কান্নার শব্দ কারো তীব্র হলো,ইসলাম শিকদারের মেয়ে বোন এসে পড়েছে।কান্না থামার নামই নিচ্ছে না।আকলিমা বেগমের মেয়ে নূর মাকে সামলানোর চেষ্টা করছে।আর তার ছেলে নীড় হিমদের সাথে রয়েছে।
কাঁদতে কাঁদতে নাজেহাল অবস্থা।চোখের পানি থামার নাম ই নিচ্ছে না।দুচোখের পাতা এক করেনি কেউ।আযান দিয়েছে বেশক্ষণ হলো।হিম’রা বাবাদের উঠিয়ে নামাজ পড়তে নিয়ে গেছিল।মোনাজাতে চোখের পানি ফেলেছে সবাই।
আকরাম শিকদারের চাচাতো ভাইদের মেয়ে বউ’রা হিরাদের নিয়ে নামাজ পড়েছে।রহিমা বেগম স্বামীর লাশ থেকে একটু দূরে একটা চেয়ারে থম মেরে বসে আছেন।
তিন বউ তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।বাড়ির মানুষ রা খাওয়ার আয়োজন করছে।সবাইকে কিছু তো খেতে হবে।
সবাইকে চা খেতে দেওয়া হয়েছিল,শিকদার বাড়ির সবার চোখ আবার ভিজে উঠল।আজকে সব স্বাভাবিক থাকলে তারা একসাথে বসে চা খেতে।হয়ত হামিমের বিয়ে নিয়ে লাফাতো।
ইসলাম শিকদারের মেয়ে আর বোন এখনো থেমে থেমে কেঁদে উঠছেন।তারা জানতো সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।গ্রামের বাড়ি যেয়ে সবাইকে একসাথে দেখতে চায়, কিন্তু সামান্য আন্দাজ করেননি যে তিনি সবাইকে এক জায়গায় দাঁড় করাবেন ঠিকই কিন্তু দেখতে পারবেন না।
হিম’রা বাপ চাচা দের সাথে রয়েছে। ইসলাম শিকদার কে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে কবর দেওয়া হবে।যোহরের নামাজের পর তার জানাযা।
কবরস্থান দেখেই হিম হামিম চলে গেছে কাফনের কাপড় সহ দরকারি কিছু জিনিস কিনতে।
হাসিব নীড় আর হিমের বন্ধুরা উধাও।যখন ফিরল তখন সব ঘামে ভেজা।কষ্টে সব ভুললে চলবে না,চাইলে আমরা মৃত্যু কে ঠেকাতে পারব না কিন্তু যারা আছে তাদের রক্ষা করতে তো পারব।
হিম এসেই আগে ওদের কাছ থেকে সব খবর নিল।নিজের প্রফেশনের প্রভাব পরিবারের উপর পড়বে না,সে রাস্তা ও রাখেনি। কিন্তু মানুষের ভালো মানুষের সহ্য হয়না।বিজনেসে অনেক শত্রু আছে তাদের যারা অপেক্ষায় আছে একটা সুযোগের।কখন কি হবে কেউ বলতে পারে না।তাইতো নিজের বন্ধুদের এতদূর আনা হিমের। ওদের উপর কেউ নজর দিবে না কিন্তু ওকে যখন তখন লাগতে পারে।তাই ও শুধু নির্দেশনায় দিয়েছে,কাজ ওরা করেছে।হাসিবের উপর বিশ্বাস নেই তবে নীড়ের উপর ভরসা করা যায়।তার আর নীড়ের ব্যাপার টা না হয় তাদের মধ্যেই থাক।
খিচুড়ি রান্না করা হয়েছে।প্রথমে কেউ খেতে চায়নি কিন্তু না খেলে কি হবে? হারানো মানুষ টা ফিরে আসবে!!!আবেগে বিবেক হারালে চলবে না। ভেবে একটু খেলো সবাই।গলা দিয়ে নামতেই চাইছে না।রাতেও কিছু খেতে পারেনি কেউ।নামে খেয়েই রেখে দিয়েছে।
“খাবে না?”
প্লেটে খিচুড়ি নিয়ে রহিমা বেগমের পাশে বসে জিজ্ঞেস করল হিরা।মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে আছে ও। নিষ্প্রাণ চোখে ওর দিকে তাকালেন রহিমা বেগম।
“আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। একদিন সবাইকেই তো তার কাছে যেতে হবে।দাদুকে ডেকেছেন তাই তিনি চলে গেছেন। কিন্তু সে তো তোমার অযত্ন করেনি কখনো।তোমার কতই না খেয়াল রাখতো।সে তো অপেক্ষায় থাকবে তোমার।আর আমাদের খেয়াল কে রাখবে।দাদা তো তোমার উপর আস্থা রেখেই আমাদের রেখে গেছে।তার তোমার খেয়াল রাখার দায়িত্ব আমাদের দিয়ে গেছেন।এখন তুমি কিছু না খেলে নিজের যত্ম না নিলে আমরা তো তার কাছে অপরাধী হয়ে যাব।আর এমনিতেও সে তো আমাদের দেখছেন। তোমাকে এই অবস্থায় দেখে তার কতটা খারাপ লাগছে বুঝতে পারছো না?”
চোখ থেকে ঝরঝর করছে পানি পড়ছে রহিমা বেগমের। খুব কম বয়সেই বিয়ে হয়েছে তার,মানুষটার সাথে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে।তার সন্তানদের মা হয়েছে,কতই না স্মৃতি তাদের।
ওনার তো এখনো মনে হচ্ছে উনি স্বপ্ন দেখছেন,ঘুম ভাঙলেই পাশে নিজের প্রাণপ্রিয় স্বামীকে দেখতে পারবেন।এসব ভাবার মাঝেই তার সামনে কেউ খিচুড়ি তুলল।
“নেও,খাও।”
হিরা নিজের হাতে খাবার তুলে দিল মুখে।ওনাদের এসব দেখে চোখ জুড়ালো অনেকের।ওদিকে হাওয়া তার ফুফুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে খায়িয়ে দিয়েছে।হাবিবা হালিমা তাদের বাবাদের কে খায়িয়ে দিয়েছে।তার বাড়ির তিন গিন্নি তাদের তিন ছেলে আর নীড়কে খাবার খাওয়াচ্ছিলেন।
“আজকে নিজের ছেলে না বলে কেউ একটু খায়িয়ে দেয় না, দুঃখ!!”
শিহাবের কথায় রোকেয়া বেগব হেসে ওর মুখের সামনে ভাত ধরলেন।নীড়ের পর এই ছেলেটায় হিমের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।হাসিব হিমের বন্ধুরা এক সাথেই পড়াশোনা করেছে।তবে কলেজ আলাদা।আর শিহাব হিমের সাথেই পড়েছে তাও অনেক বছর আগে।হিম খুব মেধাবী ছাত্র হওয়ায় সাথে পারিবারিক ক্ষমতা থাকায় খুব কম সময়ে নিজের পড়াশোনা শেষ করেছে। ডিগ্রী নিয়েই হাসপাতালে জয়েন হয়নি,সবাই জানে ঐ সময় টা সে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেরিয়েছে।যদিও ছেলেটাকে দেখে একদম ই মনে হয় না যে সে ঘুরতে ভালো বাসে তবে শিকদার বাড়ির কারো কাছে এটাই বাস্তব বা কারো কাছে অজুহাত।
যায় হোক,হিমের বন্ধুরা সবাই হাসিবের সমবয়সী।এর মধ্যে শিহাব ছেলেটাই এতিমখানায় বড় হয়েছে,নিজের বলে কেউ নেই।খেলার মাঠে দুজনের পরিচয়,একজনের স্বভাব আরেকজনের বিপরীত হওয়ার পরেও কীভাবে যে ফ্রেন্ডশীপ হলো কে জানে।
“ইস, আমাদের যদি কেউ খায়িয়ে দিত!!”
আফসোসের স্বরে বলল আহাদ।ওর কথায় আবির,আকাশ সম্মতি জানালো।হামিম,হাসিব,হিম,নীড়,শিহাব,আহাদ,আবির,আকাশ এক টিম বলা চলে।যদিও হামিম সবার বড় তবে ওদের সাথে বেশ জমে ওদের।হামিমের তেমন কোনো ক্লোজ ফ্রেন্ড নেই,দেখা হলে কথা হয় এই যা।
তিন গিন্নি নিজেদের ছেলের সাথে ওদেরকেও খায়িয়ে দিলেন।তারপর নিজেরা খেলেন।
ইসলাম শিকদার কে গোসল করানো হচ্ছে।তখন বাড়ির মহিলাদের বলা হলো গোসল করতে।হিম’রা বাবাদের নিয়ে গ্রামে পুকুরে গোসল করতে গেছে।
বাড়ির কলপাড়েই গোসল করছে হিরা’রা।দ্রুত গোসল করে সবাই নামাজ পড়ে নিল।যোহরের নামাজ পড়ে এসেই ইসলাম শিকদার কে নিয়ে যাওয়া হবে।কবর খোঁড়া হয়েছে বেশ আগে।
হিরা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল।ওর কান্নায় সবার চোখের বাধ ভেঙে গেল।কাছের মানুষ গুলো হাও মাও করে কেঁদে উঠল।
ইসলাম শিকদার কে নিয়ে যাওয়া হবে। আকলিমা বেগম,রহিমা বেগম আর ইসলাম শিকদারের বোন পাগলের মতো আচরণ করছে।বাড়ির বাকি মহিলারা তাদের সামলানোর চেষ্টা করছে।হিরা হাবিবার বুকে মাথা রেখে কেঁদে ই যাচ্ছে।
ইসলাম শিকদারের খাটলার সামনে হিম হামিম আর পেছনে হাসিব নীড়। বাবাদের কে খাটলা নিতে দেয়নি তারা।মুহূর্তেই ভরা বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল।রহিমা বেগম আর ইসলাম শিকদারের বোন ইলা বেগম জ্ঞান হারিয়েছেন। আকলিমা বেগম অর্ধজ্ঞান অবস্থায়।
মাগরীবের নামাজ পড়ে সবাই জমিদার বাড়ি ড্রয়িংরুমে বসে রয়েছে।কালকেই সবাই চলে যাবে।সবাই নির্জীব হয়ে রয়েছে।
আকরাম শিকদার বসলেন মায়ের পাশে।ছেলেকে নিজের পাশে বসতে দেখে তার দিকে ফিরলেন তিনন,ভাঙা কিন্তু শক্ত গলায় বললেন,
“সুমাইয়ার বাবা মাকে ফোন দে।বল কাল সকালে আমাদের গ্রামে চলে আসতে। কেনো বলেছি সেটা কাল জানতে পারবি।আমি নিজের ঘরে গেলাম।”
বলেই চলে গেলেন তিনি। আকরাম শিকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে গেলেন সুমাইয়ার বাবা মাকে কল দিতে।
বাড়িতে পুরুষ বলতে কেউ নেই।সবাই গ্রামের বাজারে গেছে।রহিমা শিকদারের সাথে তার মেয়ে রয়েছে।
আছরের দিকে অনেকেই চলে গেছেন। শিকদার বাড়ির মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই।তিন গিন্নি তাদের স্বামীর চাচাতো ভাইয়ের বউদের সাথে হাতে হাতে কাজ করছেন।তাদের মেয়েরা হিরা’দের সাথে রয়েছে।সবাই সবার সাথে পরিচিত হয়ে নিয়েছে।সবার সাথে গল্প করতে করতে তাদের কষ্ট অনেক টাই কমলো।
রাতে খাবার টেবিলে রয়েছে হরেক রকমের খাবার।গ্রামের টাটকা মাছ,টাটকা সবজির স্বাদ ই আলাদা।নিজেদের বাড়ি মুরগির ডিমসহ মাছের ডিমও রান্না করা হয়েছে।দুপুরেও শিকদার বাড়ির কেউ তেমন একটা খেতে পারেনি।রাতে সবার ই একটু খিদে লাগছে।
প্রথমে পুরুষ রা খাবে,বাড়ির ছেলেরা কি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছে কে জানে।হিম,হামিম,হাসিব,নীড় সাথে তাদের বন্ধুরা সব একঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে।হামিম বলে গেছে তাদের খাবার উপরে দিয়ে আসতে।
“হিরা হাওয়া হাবিবা হালিমা,যা তো সবাই মিলে ভাইয়াদের খাবার দিয়ে আয়।ওরা নিজেদের ঘরেই খাবে বলেছে।”
মায়ের কথায় মাথা নেড়ে হিরা উঠে দাঁড়ালো।ওর সাথে হাওয়া’রাও গেলো।সুমাইয়াও বা বসে থাকবে কেনো।অত খাবার নিয়ে উপরে উঠতে হবে,সে সাহায্য করতেই পারে।
“ঠক ঠক ঠক”
“কে?”
হিমের প্রশ্নে হিরা বলল,
“আমি হিরা। আপনাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছি।”
এক মিনিটের মাথায় দরজা খুলে গেল।কেউ সোফায় বা কেউ বিছানায় বসে।হিম শুধু চেয়ারে বসে রয়েছে।
“বিছানায় রাখ”
খাবার রাখার জন্য জায়গা খুঁজছিল হিরা।হিমের কথা মতো সেখানেই খাবার রাখল ও।হাওয়া’রাও এসে পড়ছে ততক্ষণে।ওর মা বলে দিয়েছে প্লেটে সবাইকে খাবার দিতে।সেই কথানুযায়ী প্লেটে হাত রাখতেই একটা ঠান্ডা হাত ওর হাত ধরে ফেলল।
“আমরা নিয়ে নিতে পারব।”
হিম কখন চেয়ার থেকে উঠল,ও তো দেখেনি।হিমের কথায় মাথা নাড়িয়ে হাত ছাড়িয়ে চলে গেল ও।সবার শেষে হাওয়া যখন বেরোবে তখন তো টের পেলো,কেউ তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে। মনের ভুল ভেবে এড়িয়ে গেল।
ঘন কালো অন্ধকার কে ধীরে ধীরে সূর্যের আলো গিলে ফেলছে। চারিদিকে ভোরের হালকা আলো,পাখির ডাক, সাথে মন জুড়ানো বাতাস।
গ্রামের মানুষ নামাজ পড়েই সকাল সকাল দোকানে চলে যায়।গরম চায়ের সাথে সবার সাথে আড্ডা দেওয়া,জমে যায় পুরো।গ্রামের আসলেই শিকদার বাড়ির ছেলেরা এই মুহুর্ত টা পায়।প্রতিবছর শীতে আসা হয়,এবার ভাগ্য টেনে নিয়ে আসলো।
বাড়ির মেয়েরা একটু হাঁটতে বেরিয়েছে।মন খারাপের মুহূর্তের সাথে পরিবেশ টা মিলে যাচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর সবকিছু। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ফিরে এলো তারা।এসেই চা পেয়ে গেল।
সকাল সাতটার দিকে জমিদার বাড়ির কেয়ারটেকার জসীম গরুর মাংস, মুরগী,ডিম সহ অনেক বাজার নিয়ে হাজির হলো।তাকে নাকি এসব রহিমা বেগম আনতে বলেছেন।ওনার কথা মতো রোকেয়া বেগম শাশুড়ি কে ডাকতে গেলেন।বাড়ির পুরুষ রা সবে বাড়িতে এসেছে।
“আমিই বলেছি ওকে এসব আনতে।”
“কিন্তু এসব কেনো মা?এসবের তো কোনো প্রয়োজন দেখছি না।”
আকরাম শিকদারের কথায় রহিমা বেগম তার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললেন,
“প্রয়োজন আছে বলেই আনিয়েছি। সুমাইয়ার বাবা মা আসবে আজকে।ওনাদের সাথে কথা বলে কালকেই হামিম সুমাইয়ার বিয়ে দিয়ে দেব।তোমার বাবা তার ছেলে মেয়ের সন্তানদের বিয়ে দেখে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার ভাগ্যে নেই।তাই তার শরীরের ঘ্রান বাতাসে থাকতেই আমি ওদের বিয়ে দিতে চাই।আশা করি কারো কোনো সমস্যা নেই।”
বলে উনি জমীমের আনা জিনিস গুলো দেখলেন। অতঃপর জসীমের দিকে তাকাতেই সে বলে উঠল,
“মাছ সাড়ে আটটার আগেই পেয়ে যাবেন ভাবি।”
ওনার কথায় আস্বস্ত হয়ে উনি বাড়ির বউদের ডাক দিলেন।
“বড় বউ,মেঝ বউ আর ছোটো বউ তোমরা তোমাদের স্বামীকে নিয়ে আমার ঘরে এসো।হামিম হিম দাদুভাই তোমরাও এসো।আর বাকি বউমারা রান্নার কাজ শুরু করে দেও।”
বলেই তিনি নিজের ঘরের দিকে গেলেন।ওনার পিছু পিছু বাকিরা ছুটল।
___________________________________________________________________________
“শেষে বিয়েটা এভাবে হবে?”
উদাস কন্ঠে বলল হিরা।ওর কথার কোনো জবাব নেই। সামান্য অনুষ্ঠান করার মতো পরিস্থিতিও নেই।
সুমাইয়া অবাকতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।বাকি বোনদের চোখের ইশারায় আসতে বলে হাবিবা ওকে নিয়ে উপরে চলে গেল।
বাড়ির আর মেয়েরা গেলো নিজের মায়েদের সাহায্য করতে। আকরাম শিকদারের চাচাতো ভাইয়েরা ড্রয়িংরুমে বসে তাদের মধ্যে কথা বলছে। অপেক্ষা সবার রুম থেকে বেরোনোর।
___________________________________________________________________________
বিছানায় বসে আছেন রহিমা বেগম।তার পাশে তিন ছেলে বসা।তিন গিন্নি এক কোণায় দাঁড়িয়ে।হিম হাসিব সোফায় বসে।সবার দিকে তাকিয়ে বড় শ্বাস ফেলে রহিমা বেগম বলা শুরু করলেন,
“সুমাইয়া কে দেখতে যাওয়ার আগে তার সাথে আমার কথা হয়।তিনি চাচ্ছিলেন হামিমের বিয়ে এই সপ্তাহের শুক্রবারেই দিতে তার চোখের সামনে। কিন্তু সে সুযোগ হলো কোথায়।তিনি চলে গেলেও আমি তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছি।যত সময় যাবে তত তার অস্তিত্ব মুছে যাবে।তাই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।তার অনেক স্বপ্ন ছিল।সবার বিয়ে তিনি গ্রামেই দিবেন।হাসিবের জন্য কাউকে পেলে হয়ত তিন ছেলেকেই একসাথে বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করতেন।হাবিবা হালিমার বিয়ের কথা ভাবতেন।বড় করে অনুষ্ঠান করবেন।সে না থাকুক কিন্তু তার স্বপ্ন থেকে গেছে যা পূরণ করার দায়িত্ব আমার।হামিম দাদুভাইয়ের অনুষ্ঠান করে বিয়ে হবে তবে কিছুদিন পর।আপাতত বিয়ে টা হোক।কারো কিছু বলার থাকলে বলতে পারো।”
ওনার কথায় কেউ দ্বিমত করল না।উনি সবার থেকে চোখ সরিয়ে হিমের দিকে তাকালেন যে কিনা মেঝের দিকে তাকিয়ে।
“হিম দাদুভাই ”
ওনার ডাকে হিম তাকালো তার দিকে।ওনার ইচ্ছে করছে আজই এই ছেলের হাতে হিরা কে তুলে দিতে।ভালো থাকতো ছেলেটা। কিন্তু মেয়েটার কথা তো ভাবতে হবে।যেখানে বড় বোন সব অবিবাহিত, চব্বিশ বছর বয়স কিন্তু বিয়ে হয়নি সেখানে মাত্র ষোলো বছরে সংসার করা তো মেয়েটা দুঃস্বপ্নেও ভাবে না।তবে বাস্তব একটাই,বড় বোনদের মতো বুঝমান হয়ে সংসারে ঢোকা তার হবে না,খুব দ্রুতই কারো অর্ধাঙ্গিনী হতে হবে।
“তুমি কিছু বলবে?যদি তুমি চাও তবে ওদের সাথে কালকেই তোমার হাতে হিরাকে তুলে দেওয়া হবে।”
ওনার কথায় বাকিরা অবাক হলেও হিম হাসলো।সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করল। চোখ খুলেই উঠে দাঁড়ালো।
“আবেগে বিবেক হারানোর মানুষ আমি না।ওকে আমি অনেক আগেই চেয়েছি নিজের করতে কিন্তু তোমরা কি ভাবো?আমি তোমাদের জন্য ওকে ছেড়ে রেখেছি।হিরাকে আপন করতে হলে আমার তোমাদের লাগতো না।ওর বয়স টাই আমাকে আটকে রাখার প্রধান কারণ।আর তারপর তোমরা,তোমাদের শিক্ষা।তোমরা বাঁধা দিলে তখন না হয় ওকে একাই নিজের করে নিতাম কিন্তু তোমরা বাঁধাও দেওনি আবার রাজিও হওনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমাকে এ কথা বলতে না,আর আমিও না রাজি হওয়া হতাম না।আপাতত আমি ওকে নিজের করে চাইছি না।ভাইয়ার বিয়ের পর হাবিবার বিয়ে হবে,তারপর ওকে আমি নিজের করব।আজকে হয়ত হিরা আমার হচ্ছে না তবে কালকে অবশ্যই হবে।হিরাকে এতদিন মেয়ে হিসেবে দেখেছো,খুব দ্রুত মিসেস হিরণ শিকদার হিম হিসেবে দেখবে। প্রস্তুতি নিয়ে নেও।”
বলেই বেরিয়ে গেল।ভাইয়ের কথা শুনে হামিম মনে মনে হাসলো।সে জানতো তার ভাই রাজি হবে না। আচ্ছা কি হতো যদি হিরা আর একটু বড় হতো! আর একটু বড় হলেই হিম পেয়ে যেত তার হিমানী কে।হাহ,আপাতত বিয়ের জন্য নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করতে হবে।ভাবতেই বেরিয়ে গেল।দুভাই এখন হারিয়ে যাবে অজানায়।
রহিমা বেগমের ঘরের সবাই কথা হারিয়েছে এক প্রকার। আকরাম শিকদার জানতেন ছেলের কথা।তবে নিজের মায়ের কথায় অবাক হয়েছেন। ভেবেছিলেন হিম রাজি হয়ে যাবে।তবে তাকে অবাক করে হলো না রাজি।
#চলবে?

